বাংলা কবি ও কবিতার সাম্প্রতিক বিবেচনা

একজন কবির কবিতা ভালো না মন্দ, আধুনিক না অনাধুনিক, মানসম্মত না মানহীন- এনিয়ে বিস্তর বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কবিদের মাঝেই এই বিতর্ক প্রবল। যিনি প্রচলিত ছন্দের কবিতায় অভ্যস্ত, তিনি এর বাইরের লেখা কবিতাকে ‘ছন্দছুট’ বলে খারিজ করে দিচ্ছেন। পক্ষান্তরে কবিতা নিয়ে নিরীক্ষা করতে গিয়ে প্রচলিত ছন্দকাঠামোর বাইরে যে সকল সম্মানিত কবি কবিতা চর্চা করছেন, তারা ছন্দানুরাগী কবির কবিতাকে তথাকথিত ‘কমনকবিতা’ বলে খারিজ করে দিচ্ছেন।

কবিতাকেন্দ্রিক অগ্রজ ও অনুজের মধ্যে বাকবিতণ্ডা তো লেগেই আছে হরদম। প্রবীণ কবি খেদ প্রকাশ করেন এই বলে, ‘নবীন কবিদের লেখা কিচ্ছু হয় না। সম্ভাবনা দেখছি না খুব একটা। এদের হাতে বাংলা কবিতার ভবিষ্যত অনুজ্জ্বল।’ এভাবেই প্রবীণ কবি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন নবীন কবির কবিতা। নবীন কবিদের কবিতা মূল্যায়ন করার মতো উদারতা তেমন দেখা যায় না। কেউ কেউ যদিও মূল্যায়নে কিছুটা আগ্রহী হয়েছেন। কিন্তু সেই মূল্যায়নেও রয়েছে স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা। তার ঘনিষ্ঠ শিষ্য অনুজ কবির কবিতার বাইরে মূল্যায়নে তিনি আগ্রহী নন।

আদতে কবিতাকে কবিতা হিসেবে সুচিহ্নিত করার মানদণ্ড কী? হ্যাঁ, এর উত্তরে আলঙ্করিক ব্যাপারগুলোই ঘুরেফিরে আসবে। কিন্তু আলঙ্করিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক অনেক কবির কবিতাই প্রাণহীন। মুগ্ধতা ছড়ায় না পাঠকের মনে। কবিতার রসাস্বাদন বোধকরি ব্যক্তিবিশেষে আলাদা। ব্যক্তির পঠন-পাঠন, অভিজ্ঞতা, অনুভব ও উপলব্ধি ভেদে কবিতার রূপ-সৌন্দর্য্য আবিষ্কার নির্ভর করে। একারণেই কবিতাকেন্দ্রিক বিতর্ক কখনোই স্থির নেই। আমার কাছে যে কবিতা মনোমুগ্ধকর। অন্য কারও কাছে সেরকম নাও হতে পারে। আমি যে ধরনের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে কবির জন্যে পুরস্কার ঘোষণা করি। অন্য কারও কাছে এই সিদ্ধান্ত হাস্যকর বৈকি। এভাবেই যুগযুগ ধরে কবিতা নিয়ে বিতর্ক একটি চিরন্তন বিতর্কের পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছে।

বর্তমানে আমাদের কবিবৃন্দের বিশেষ একটা অসহিষ্ণুতা বোধকরি এখানেই যে, যাদের বয়স কেবল ৩৫ অতিক্রম করেছে, তারাই কবিতা থেকে অবসর নেয়া প্রবীণ কবিদের মতো ‘প্রবীণ উর্দি’ গায়ে গলাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। মঞ্চের মাঝখানের চেয়ারে বসা কৃত্রিম গাম্ভীর্য ভর করে তাঁদের ওপর। আবার যে উদীয়মান কবি কেবলই লিখতে শুরু করেছেন, কবিতাচর্চায় নিবেদিত হওয়ার আগেই গ্রন্থপ্রকাশে উন্মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। আনাড়িপনা দূর হতে না হতেই কবিখ্যাতির মোহ তাকে পেয়ে বসে।

কবিতা লেখা শেষে সকল কবির মনেই একধরনের সাময়িক পরিতৃপ্তিবোধ তৈরি হয়। ক্ষণকালের আনন্দে কবি নিজেই পরে নেন শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। শিল্পের এমনতর বড়াই দোষের কিছু নয়। যেকোনো সৃষ্টির অব্যবহিত পরেই একধরনের আনন্দযোগ দেখা দেয়। এই আনন্দযোগ সাময়িক হলে ভালো। কিন্তু দীর্ঘসময় এই বোধ মনে পুষে রাখলে নতুন কিছু সৃষ্টির পথে এটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব অনুভূতি তার নিজের কাছেই সেরা। অনুভূতি কেন্দ্রিক এমন ধারণা পোষণ করার কারণেই বিতর্কের ডালপালা আরও প্রলম্বিত হয়।

কবিতা নিয়ে নিরীক্ষা দোষের কিছু নয়। কবিতা নিয়ে নিরীক্ষা হতেই পারে। নিরীক্ষার মাধ্যমে কবিতার অভিনব আঙ্গিক তৈরি হয়। কিন্তু নিরীক্ষা যদি হয় বলপ্রয়োগ অসামঞ্জস্য শব্দের কুস্তাকুস্তি। তখন কবিতা প্রাণহীন শব্দ সমাবেশ হয়ে সাধারণ গদ্যরূপ লাভ করে। কবিতার রূপরসগন্ধ থেকে পাঠক বঞ্চিত হন। কবিতায় ভাবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ যখন পাঠকের মনে ভিন্ন কোনো অনুভব উপলব্ধি কিংবা আনন্দদুয়ার উন্মোচিত করতে ব্যর্থ হয়। তখন সেই কবিতার জন্যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই থাকে না পাঠকের মনে। সাদামাটা গদ্যের সাথে কবিতার মূল পার্থক্য হচ্ছে অলঙ্কার সমৃদ্ধ ভাষাকে ভাবের
গভীরতায় অভিনব ঢঙে উপস্থাপন করা। বিষয় যা-ই হোক, কবিতার পঙক্তি পড়ামাত্র পাঠকের মন ভিন্ন ব্যঞ্জনায় মনোযোগী হয়ে ওঠে। আধুনিকতার নামে কবিতায় যথেচ্ছ শব্দ প্রয়োগ কবিতাকে প্রাণহীন দুর্বোধ্য করে তোলে। কবিতাকে ‘শব্দের খেলা’ বলে অভিহিত করা হলেও যথাযথ শব্দবিন্যাস কবিতার ক্ষেত্রে আসলেই কঠিন। শব্দবিন্যাসের অভিনবত্বই একজন কবির কবিতাকে স্বতন্ত্র অবয়ব দেয়। কবিতায় যেমন শব্দ-বিন্যাস জরুরি, সেই সাথে বোধের বহিঃপ্রকাশে এমন শব্দ বাছাই করতে হবে যা সত্যি সত্যি বোধের বাহন হবে।

সম্প্রতি আমাদের কবিমহলে দলবাজি এবং গোষ্ঠিকেন্দ্রিকতা কবিতার জন্যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। কোনো কোনো প্রকাশক কিংবা পত্রিকার স¤পাদক ব্যক্তিগত সুবিধা বাগিয়ে নিতে গিয়ে অকবিকে “মহান কবি” “শ্রেষ্ঠ কবি” আখ্যা দিচ্ছেন। আবার অনেক ‘কবি কাম স¤পাদক’কে তোয়াজ করে শ্রেষ্ঠ কবি বানিয়ে দিচ্ছে তার প্রশংসামুখর তেলবাজ সাঙ্গপাঙ্গরা। এভাবেই তৈরি হচ্ছে পত্রিকাকেন্দ্রিক গোষ্ঠীবদ্ধতা। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার বৃত্ত ভেঙে স¤পাদক বের হতে পারেন না। ফলে ঘুরে ফিরে কিছু নির্ধারিত ব্যক্তির লেখা তার পত্রিকায় স্থান পায়। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। পত্রিকার একজন যোগ্য সম্পাদক কখনো ব্যক্তির মুখ দেখে নয়; লেখার বহুমাত্রিকতা এবং প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় রেখে তবেই লেখা প্রকাশে উদ্যোগী হন। এমন প্রকাশক অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারেন।

প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কিংবা সংগঠনকেন্দ্রিক গোষ্ঠিবদ্ধতা দেখা যায়। এই প্রবণতা বর্তমানে প্রবল। ফেইসবুকের কল্যাণে বিভিন্ন কবিবন্ধুর ব্যক্তিগত টাইমলাইনে ঢু মারলেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী খেদ প্রকাশ চোখে পড়ে। উদাহরণ স্বরূপ- যে সকল সম্মানিত লেখক বাংলা একাডেমি সংশ্লিষ্ট। তাদেরকে “বাংলা সাহিত্যের মোড়ল” কিংবা “বাংলা সাহিত্যের এজেন্ট” বলে হেয় করতেও দেখা যায়। এক্ষেত্রে সম্ভবত তাদের কর্তৃত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে দায়ী করা হয়। এছাড়া পক্ষপাতিত্ব তো আছেই। সে যা-ই হোক, কিছুদিন আগে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’ (নবপর্যায়ে ৬৯তম সংখ্যা, চৈত্র ১৪২১) পত্রিকা ‘নতুন সময়ের কবিতা’ শিরোনামে একটি বিশেষ বাছাই সংখ্যা প্রকাশ করে। যা নিয়ে তুমুল সমালোচনা সৃষ্টি হয়। বড় অভিযোগ ছিল ‘পক্ষপাতিত্বের’। মূলত কবিতার ভাবালুতায় উর্বর এই ভূখণ্ডে কবিতা চর্চা করে অগণিত কবি। রীতিমতো বিস্ময় জাগানিয়া ব্যাপার। তাদের মাঝ থেকে বাছাই করে “বাছাই সংখ্যা” প্রকাশ করা মানে বিতর্ক আরও উসকে দেয়া। সন্দেহ করি, যদি ৫০০ কবির কবিতা নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সেখানেও একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি বাদ পড়ার সম্ভাবনা আছে।

সম্প্রতি নতুন কবিতা নিয়ে কথা হচ্ছে। বস্তুত কবিতা কখনো পুরনো হয় না। বয়সের বিবেচনায় কবি পুরাতন হতে পারেন কিন্তু কবিতা নয়। মহৎ কবিতা চির নতুন। যুগযুগ ধরে সমকালকে সাঙ্গ করে বেঁচে থাকে প্রকৃত কবিতা। ফলে বর্তমানে লেখা কবিতাও কেবল কাব্যগুণ সমৃদ্ধ না হওয়ায় পুরনো হয়ে যেতে পারে। আবার কাব্যগুণসমৃদ্ধ একশ বছর আগের কবিতাও নতুন সাম্প্রতিক কবিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। বর্তমানে কাব্যভাষা এবং বিষয়ে অভিনবত্ব আনতে গিয়ে অনেক কবির কবিতাই তার অজান্তে দুর্বোধ্য হয়েছে। ফলে পাঠক কবিতাবিমুখ হয়েছে। এটা ঠিক যে, কবিতার পাঠক কোনো কালেই বেশি ছিল না। কিন্তু বোধকরি এইসময়ে বাংলা কবিতা পাঠকবিচ্ছিন্ন। কবিদের কবিতা কবিবন্ধু পর¯পরের মাঝে সীমাবদ্ধ। তবে এমন প্রশ্ন ওঠা অবান্তর নয় যে, বর্তমান বাংলা কবিতা কেবল কবিদের জন্যে? সাধারণ পাঠকের মনে কবিতার দুর্বোধ্য বোধকে ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলেই এমন বিচ্ছিন্নতা।

জনপ্রিয়তা কিংবা পুরস্কারের মোহ একজন মৌলিক কবির আরাধ্য হতে পারে না। সম্প্রতি কবিখ্যাতির মোহ চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র সাহিত্য পুরস্কার আর সম্মাননার হিড়িক। সাহিত্যের বাজার এই আয়োজনে ভীষণ জমজমাট এখন। অথচ এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, পার্থিব মোহের আধিক্যে গা ভাসিয়ে দিলে কবির সৃজনক্ষমতা মৌলিকত্ব হারায়। শিশুর সারল্য আর প্রকৃতির উদারতা কবিস্বভাবের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। বিশেষ ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠিকে তুষ্ট করে কবিতা লিখতে গেলে কবিতার নৈর্ব্যক্তিকতা ক্ষুন্ন হয়। সম্প্রতি আরও একটি ব্যাপার লক্ষণীয়, একজন কবির তুলনামূলক দুর্বল কোনো কবিতা কিংবা পঙক্তি নিয়ে হাসি তামাশা করতে দেখা যায়। যা মোটেও কাম্য নয়। কারণ, কবির সব পঙক্তি কালোত্তীর্ণ হবে এমনটি বলা যায় না। একটি কবিতা কিংবা পঙক্তির গ্রহণযোগ্যতায় একজন কবি শত শত বছর পাঠকের কাছে সমাধৃত হতে পারেন। কবি বেঁচে থাকেন মূলত তাঁর কাব্যবিন্যাসের স্বকীয়তায়। তাই উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে কোনো কবিকে হেয় করার মনোভঙ্গি নিয়ে তার অপেক্ষাকৃত দুর্বল লেখাকে জনসমক্ষে নিয়ে আসা রীতিমতো অন্যায়। সর্বোপরি কবিতা হচ্ছে শিল্পের প্রভাববিস্তারী শক্তিশালী মাধ্যম। আর তাই কবিতার নান্দনিক অনুভব ছুঁয়ে থাকুক একজন কবির মানসভূগোল।

ফারুক সুমন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *