এলিভেটর

স্বপ্নের থেকে তিনশ ষাট ডিগ্রি উত্তরে অ্যাপ্টিটিউডের লক্ষ্যভেদ। তারপর ব্যক্তিগত জানকারির গল্প শুনতে শুনতে অদ্ভুত এক আহ্নিক গতি টের পাচ্ছিল আভেরি। রাতটা সকাল হয়ে আসছে ক্রমশ। খাটের উপর স্তূপাকার হয়ে রয়েছে ‘হেলেন অফ ট্রয়’ আর সিরাজদৌল্লার ‘রক্তাক্ত পলাশী’। ভোরের স্বপ্নের বদলে আভেরি চোখের সামনে ছেঁড়া ছেঁড়া কথা জুড়ে দেখছিল অন্য মনের স্বপ্নপূরণের চলচ্ছবি।
‘এইসব কোম্পানিতে মাইনে কম কিন্তু ইনক্রিমেণ্ট যা হয় না… প্রথম স্টেপ-এ একটু স্ট্রাগল, তারপর উঁচায়ি কি সিঁড়ি চড়তে যাও…’
‘আমি জানি তুমি একদিন খুব বড় হবে। তোমার সব স্বপ্ন পূরণ হবে।’
“সে তো আমিও জানি। কিন্তু তোমার কি খবর? পড়াশুনার তো নামগন্ধ নেই। চাকরি তো একটা পেতে হবে, না কি?’
‘হ্যাঁ, আমি পড়ছি তো, চেষ্টাও করছি। সামনের বছরের মধ্যে আশা করি হয়ে যাবে। চিন্তা করো না।’
‘মুখে বাতেলা মারলে কিচ্ছু হবে না। এতো বছর তো দেখলাম, কিছুই তো করতে পারলে না। টাকা পয়সা নষ্ট করা ছাড়া! আসলে কিছু করারই ইচ্ছা নেই তোমার। সারাদিন ঘুরে বেড়ালে আর কি বা হবে…’
কপালে আর ঠোঁটের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘামে ভরে উঠছিল আভেরির। শীতটা কমে এসেছে কিন্তু রাতের বেলা কাঁথার প্রয়োজন হচ্ছে। চোখে জল এলে নাকটা কেমন জ্বালা করে ওঠে। খুব কষ্ট হয় ওর তখন। নিজেকে সামলে নিল সে।
‘তুমি আমার পাশে থেকো। এনকারেজ করো…’
‘সারা জীবন ওইসবই অজুহাত দাও তোমরা। আমাকে দেখেও ইচ্ছা করেনা… কি আর বলব…সারা বছর ধরে-’
মাঝপথে কথার মেয়াদ শেষ করে হঠাৎ কেটে গেল ফোনটা। মোবাইলে সময়টা একঝলক দেখে নিল আভেরি। সকাল ছটা সাত। রাত ১১ টা থেকে ৬ টার ডিউটি দিয়ে ব্যাটারির চার্জও আস্তে আস্তে ফুরিয়ে এসেছে। শীতের সকালগুলো সব সকালের থেকে অন্যরকম। এত কুয়াশা যে সামনের কিছু বোঝার উপায় নেই। কিন্তু শুধু কি কুয়াশা… অঝোর বর্ষণেও তো ঝাপসা হয়ে যায়। সিলিঙের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল সে। অনেকক্ষণ পর আবার খুব শীত করছে। পাশবালিশটা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরে কাঁথাটা নাক পর্যন্ত টেনে চোখ বুজল আভেরি।

#
সদর দরজা থেকে কাদা সোল ছাপ একজোড়া উডল্যান্ড জুতো নিজেদের মধ্যে কেয়ারলেস দূরত্ব সামলে উঠে গেছে উপরে। ভিজে ভিজে সন্ধেটা বয়ে বেড়াচ্ছে ল্যাম্পপোস্টের আলো আর সেই আলো দরজার খড়খড়ির হরাইজন চিরে অনধিকার প্রবেশের আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে কতোগুলো ছাতার মাথা, রংবাহারি রেইন কোট, রিক্সার ভ্যাঁপু থেকে চাকার শব্দ দরজা পেরিয়ে নিজেদের গন্তব্য উদ্দেশ্যে গতি তুলছে মাঝে মধ্যেই। সিঁড়ির তলার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী কিন্তু নিয়নের মত ঔজ্জ্বল্য আরও ঝকঝকে করছে যাতায়াতের পথে ফেলে যাওয়া নানান শ্রাবণ চিহ্নকে। হলুদ রঙের সিন্থেটিকের ওড়নাটা পুরনো অভ্যাসবসত কাঁধের ওপর জড়ো করে নিল আভেরি। নিপুণ ভাবে মেঝে কামড়ে থাকা ছাপগুলোকে পাশ কাটিয়ে চটির ডগায় আঙুল টিপে টিপে বেড়িয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।

#
ফোনটা এতক্ষণ সাইলেন্ট মুডে ছিল, তাই জানা অজানা নম্বরের টেম্পোরারি ডিপোজিশনের উপর আঙুল চালিয়ে চটপট সাফ করে ট্যাক্সির মিটারের দিকে তাকাল আভেরি। এই বৃষ্টি বাদলার দিনে একটা ট্যাক্সি জোগাড় করা যেন আকাশের তারা গোনার সমান। তারপর আবার উত্তর কলকাতা শুনে ট্যাক্সিওলা আলেকজান্ডারের মত রেলা দেখাচ্ছে। অনেক কষ্টের পর যে এটা পাওয়া গেছে এই অনেক। পাঞ্জাবি সর্দারজি বলেই হয়তো… সাড়ে নটা বেজে গেছে। ট্র্যাফিক জ্যাম পেরিয়ে সবে রাসবিহারী ক্রসিং।
‘ইয়ে জ্যাম অ্যাসা হি হোতা হ্যা ক্যা হররোজ?’
‘নহি ম্যাডামজি…বারিশ হুই তো টারাফিক যাম হো গেয়া। আপ কো জলদি হৈ তো হম গলি-গলি সে লেকে চলতে হে।’
সিগন্যাল সবুজ হতেই চেনা কলকাতার অচেনা গলি ধরলেন তিনি। বৃষ্টিভেজা বাড়িগুলোর ঘষা কাঁচের শার্সি ভেদ করে দেখা যাচ্ছে আলো। শহরের ব্যস্ততায় ছুটি টেনে দিয়েছে বৃষ্টি। তিন বছর হল কলকাতার বৃষ্টি দেখেনি আভেরি। পুরনো বছরের সাথে অনেক কিছু ছাড়তে ছাড়তে এগুতে হয়েছে। কিন্তু গন্ধগুলো ছবিগুলো কেমন যেন এক রকম থেকে গেছে, একটুও বদলায়নি। টিউশন ফেরত ছেলেমেয়ের দল, অফিস ফেরত কেরানিরা, চুপি চুপি কিচিরমিচির প্রেমপাখি যেন অ্যাকশন রিপ্লে হয়ে ছুটে আসছিল আভেরির দিকে।
‘আপকে গাড়ি মে রেডিও হে?’
আচমকা প্রশ্নে একটু অবাক হয়ে সর্দারজি শান্ত গলায় বলল, ‘হাঁ জি। হ্যায় না… আপ কো শুননা হে?’
‘বাংলা বালা…’
‘মন চায় আজ সন্ধ্যায়… শ্রাবণের আঙিনায়…’ সুরটা বেশ মনে পড়ছে, কথাগুলোই মনে পড়ছে না। গুনগুন করতে করতে মাথাটা পিছন দিকে হেলিয়ে বসল আভেরি। ট্যাক্সির জানলার কাঁচ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা। ওপরের দিকে কাঁচ খানিকটা নামিয়ে রাখার জন্য কিছু ফোঁটা এসে ছিটে লাগল আভেরির ঠোঁটে নাকে কপালে।

#
গঙ্গার উপর হাওয়ার তালে দুলে দুলে এগোচ্ছিল নৌকাটা। মাঝি ছাউনির পিছনে শক্ত করে ধরে রেখেছে হাল। দ্বিতীয় হুগলী সেতুর মাথায় আকাশটা লাল হয়ে আসছে। পূর্ব পাড়ে কলকাতা থেকে এক ঘণ্টার জন্য ছাড়া পেয়ে সৃজনের বুকে নিজেকে সঁপে দিল আভেরি। ‘চিঙ্গারি কোই ভড়কে…’ পাড় থেকে বেসুরো গান ভেসে আসছে। লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের মত কোনো কৃত্রিমতা নেই কিন্তু রুপালি পর্দার সোনালি মুহূর্তের স্রোত আছড়ে পড়ছিল আভেরির বুকে। ‘পুষ্পা, আই হেট টিয়ার্স…’ সংলাপটা কেউ বলেনি। একরাশ নিস্তব্ধতার ছায়াবৃত্তে ঝাঁক থেকে দলছুট সবার দেখা মিলছে তাদের ঘরে ফেরার পথে। সন্ধ্যে নামার সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে পরিবেশ। এক ঘণ্টার নৌকা বিহার, দরাদরি চলবে না। সাড়ে তিনশো তো সাড়ে তিনশো-ই। ছাউনির মধ্যে নীল-নির্জন যাপনের জন্য পর্দার আয়োজন আছে।
‘দাদা ছাউনির মধ্যে বসতে পারেন… এই যে পর্দা! নামিয়ে দেবো। এক্সট্রা পঞ্চাশ টাকা লাগবে… যাবেন নাকি?’
‘ছাউনির কি দরকার দাদা… আমরা প্রকৃতির মাঝেই তো দারুণ মজা পাচ্ছি!’ উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে সৃজনের কোমর জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখল আভেরি।
‘সামনের সপ্তাহে আমি দিল্লী যাচ্ছি। অফিস জয়েনিং… সাবধানে থাকবে।’
‘আমি ঠিক থাকবো। তুমি নিজের খেয়াল রেখো।’
কথায় কথায় সময় কেটে যাচ্ছিল। ঘড়ি মিলিয়ে মাঝ নদী থেকে দাঁড় টেনে পাড়ে ফিরিয়ে আনল মাঝিভাই। আভেরির রূপকথাগুলো মাঝে মাঝেই কেমন অ্যানিমেটেড জগৎ ছেড়ে বাস্তবে উঠে আসে। যেখানে কোনো কালো নেই, হিংসা নেই, সন্দেহ নেই, অবিশ্বাস নেই- শুধু ভালোবাসা আছে, প্রেমের উষ্ণতা আছে। মাঝির টাকা মিটিয়ে সৃজন আর আভেরি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেছিল ফাঁকা প্ল্যাটফর্মের দিকে। তখন সন্ধ্যে, লালচে কালো আকাশ, সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে হৃদয়স্পর্শী হাওয়া। স্টেশনের ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম, ফাঁকা ওভারব্রিজ, ফাঁকা বেঞ্চি যেন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে দুটো ঠোঁট মেলানোর ষড়যন্ত্র করেছিল আগে থেকেই। স্টেশনের ঘড়িটা কিন্তু নিষ্ঠুরভাবে চলমান। তাই নিস্তব্ধতা খানখান করে চক্রপথের শেষ গাড়ি ঢুকে পড়ল ওদের মাঝে।

#
সেন্ট্রাল এভিন্যু দিয়ে বেরিয়ে ট্যাক্সি এগোচ্ছে। বেশ গতি পেয়েছে এবার কিন্তু ঠিক যতটা দরকার তার থেকে অনেকটাই কম। বৃষ্টি ধরে গেছে, তাই জানলার কাঁচ নামিয়ে মুখটা খানেক বাইরে বের করল আভেরি। ট্যাক্সির চাকায় লেগে জল ছিটকে যাচ্ছে ফুরফুর করে। পান বিড়ি আর ওষুধের দোকানগুলো বাদে সব দোকানের শাটার বন্ধ হয়ে গেছে। শ্যামবাজার থমথমে, ভালো লাগে না একদম। সন্ধ্যেবেলায় কত জমজমাট থাকে! বছর তিনেক আগেও রোজ দেখা হত পাঁচ মাথার মোড়ের নেতাজীর স্ট্যাচুটার সাথে। বাস কন্ডাক্টরগুলোর সাথে মুখ চেনা হয়ে গেছিল। কত দিন বাদে কলকাতার রেডিওতে বৃষ্টির গান শুনল আভেরি। এখন আর.জে সাগ্নিক বৃষ্টিস্নাত রাতের অনুভূতি শেয়ার করছেন শ্যামলী নামের কোনও এক প্রকৃতিপ্রেমীর সাথে। সর্দারজি এসবের কি বুঝছে কে জানে! নিজের মনে স্টিয়ারিং ধরে রয়েছে মাঝে মাঝে মাথাও দোলাচ্ছে…
‘হ্যাঁ বলো…’ ফোনটা দশ সেকেন্ড মত নিজের তালে বাজার পর রিসিভ করল সে।
‘কতদূর এলি? ট্যাক্সি করে নিয়েছিস তো?’ ওপার থেকে মায়ের চিন্তিত আওয়াজ ভেসে এল।
‘এই শ্যামবাজার…’
‘আচ্ছা।’ কট করে কেটে গেল ফোনটা।
মায়ের ফোনটা প্রতিবার আগের মতই থাকে। ফেরার পথে টুক করে জেনে নেওয়া পৌঁছানোর পর একটা মিসড কল… তখন একটু বিরক্তই হত আভেরি। কিন্তু অনেক দিন পর পর এই অনভ্যাসের জালে জড়ানো অভ্যাসটা নাড়া দিয়ে গেলে ভালোই লাগে। ফোনটা আবার ব্যাগে রাখল সে।
কলকাতা এলেই অঞ্জন স্যারের বাড়ি যায় আভেরি। খুব জ্ঞানী মানুষ অঞ্জন মহাপাত্র। পুরাণ নিয়ে গবেষণা করে এখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। কলেজ পাশ করে আভেরি যখন দিশেহারার মত একূল ওকূল গোঁতা খেয়ে বেড়াচ্ছিল তখন অঞ্জন স্যার পাশে দাঁড়িয়েছিল। ভালোমতই যাতায়াত চলত স্যারের বাড়ি। হরেক রকম গল্প হয় স্যারের বাড়ি গেলে। সেই ফাঁকে কখন যে সময় গড়িয়ে যায়, খেয়াল থাকে না। আজই তো পৌরাণিক দর্শন নিয়ে দারুণ আলোচনা হচ্ছিল। তার মাঝেই এল রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতির প্রসঙ্গ। অঞ্জন স্যারের বসার ঘরটা সিগারেটের ধোঁয়ায় কেমন ভরে থাকে। এই ব্যাপারটা সৃজন খুব পছন্দ করতো আর মাঝে মাঝে নাকি নিজের ঘরেও এই ধোঁয়াময় আবহ তৈরি করার চেষ্টাও করেছে। অঞ্জন স্যারের অ্যাপার্টমেন্টে থাকে সৃজনরা। ফার্স্ট ফ্লোরে অঞ্জন মহাপাত্র আর থার্ড ফ্লোরে ওরা। প্রতিবেশী আর তার সাথে সৃজনেরও পছন্দের মানুষ স্যার। ওখানেই আভেরির প্রথম আলাপ সৃজনের সাথে। পাঁচ সাড়ে পাঁচ বছর আগের কথা। সেই সব স্মৃতির সাক্ষী একমাত্র সেই মানুষটি। তাই হয়তো অনেকগুলো কারনেই আভেরি ছুটে যায় অঞ্জন মহাপাত্রের কাছে। আজ স্যারের কাছেই জানতে পেরেছিল আভেরি, সৃজন গত বছর দিল্লী থেকে কলকাতার অফিসে ট্রান্সফার হয়েছে। এতোই ব্যস্ত, কখন যায় কখন আসে বোঝাই যায় না। স্যারের কাছেও আর দেখা করতে আসার সময় পায় না। স্যারের বাড়ি থেকে ফিরবার আগে বৃষ্টির তেজ দেখতে জানালায় এসে তিন বছরের না দেখা মুখটা একঝলক দেখতে পেয়েছিল আভেরি। তাই বৃষ্টির অজুহাত দিয়ে আরও দশ মিনিট স্যারের ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে গেছিল সে। স্যার বলছিলেন কয়েকদিন হল অ্যাপার্টমেনটের এলিভেটরটা খারাপ হয়ে গেছে। এখনও সারানো হয়নি।

#
অনিচ্ছাকৃত ভাবে পড়াশুনা মাঝ পথে আটকে গেলে ঠিক কেমন লাগে, আভেরির কাছে সেই অনুভূতি পাতে গরম পরিবেশনা। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির কোনো স্টুডেন্টের সাথে কথা বলতে অনীহা হয়, প্রেসিডেন্সির সামনে আইসক্রিমওলাটার আইসক্রিমও তেঁতো লাগে, যাদবপুরের ক্যাম্পাস অনেক দূর আর অচেনা বলতে একটুও ঠোঁট কাঁপে না, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত প্রিয় বান্ধবীটিকেও ভুলে যেতে অসুবিধা হয় না। একটা পলাতক পলাতক ভাব দিনরাত আঁকড়ে বসে। পালিয়ে যাওয়ার জায়গাগুলোতেও ঠিক মত পালানো হয়ে ওঠে না। দেখা মেলে সি- ইউ, জে-ইউ পাস্আউটস্দের। তাদের জীবনের আকাশছোঁয়া গল্প যেন পা ধরে চোরাবালির আরও গভীরে টেনে নেয় আভেরিকে। গভীরেরই আর দোষ কি? দোষ নেই প্রাইভেট চাকরি খোঁজার সাইটগুলোতেও। বেকারত্ব তো একটা চাকরিলোভী ফেজ অফ লাইফ। ভালো চাকরি, ভালো মাইনে, সম্মান সবসময় ছুটিয়ে মারে। প্রশান্ত বলেছিল ‘চুতিয়া এখনও আশার গ্লো সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বসে আছিস! ওসব ভিতরে হাত থাকলে হয়। সরকারি চাকরি! মামদোবাজি পেয়েছিস নাকি বাঁড়া?’ আভেরির সাথে একই কলেজে পড়ত ও। বিকম পাশ করে সরকারি চাকরির চক্করে না পড়ে প্রাইভেট সেক্টরগুলোতেই ঠাঁই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর ঝাঁ চকচকে লিফটে চেপে সাততলায় ইন্টার্ভিউ দিতে ওঠার সময় প্রতিবারই প্রশান্তর এই কথাগুলো কানে বাজতো। কিন্তু যেটা চুইংগামের মত চিটে গেছিল, সেটা ওই ভেতরে হাত থাকার ব্যপারটা! প্রশান্ত এলিভেটরে বোঝাই হয়ে সাততলায় ওঠার চান্স পায়নি। যেদিন রাতে প্রশান্ত চিরদিনের জন্য সাততলায় শিফ্ট্ হলো, সেদিন একটা ফোন এসেছিল না কি। সুইসাইড নোটটায় আঁকা ছিল একটা কার্টুন। যেখানে একটা এলিভেটর ছয়তলায় ভেঙ্গে পড়েছে আর যাত্রীরা সোজা পৌঁছে গেছে তাদের নির্ধারিত গন্তব্যে! সেখানে ওর কেঁপে যাওয়া হাতে লেখা ছিল পোস্টমর্টেম নিষিদ্ধ!
সৃজন এদেরকে কাপুরুষ বলে। ওর কাছে ক্রোমোজোম ক্ষয় হয়ে চিতায় ওঠার আগের সমস্ত মৃত্যুই ইচ্ছাকৃত। কথাটা হয়তো খুব একটা ভুল বলে না। এতে আর কিছু না হোক, মনের জোর বাড়ে!

#
ট্যাক্সিটা একই গতিতে ছুটে চলেছে আভেরিকে নিয়ে। শ্যামবাজার ক্রসিং ছাড়িয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। বাড়ির পথ ক্রমশ কমে আসছে। অদ্ভুত এক আবেশ জড়িয়ে রয়েছে তাকে। কলকাতা যেন ফিরে পাচ্ছে পুরনো আভেরিকে। রেডিওটা বেজে চলেছে আপন মনে। কত কথা- কত গান- আলাপচারিতা। অনুপস্থিতের মত অদৃশ্য সঙ্গ দিচ্ছেন সর্দারজি ড্রাইভার। সামনের রাইট টার্নে নর্দান এভিন্যু-তে ঢুকে পড়বে ওদের ট্যাক্সি।
‘…হ্যাঁ বন্ধু আমরা জানতে চাই আজকে বৃষ্টি দিনে আপনার মনের কথা.. ‘ টেলি কলারের কাছে ওভার টু করে চুপ করলেন আর.জে সাগ্নিক।
‘জানেন সাগ্নিক, আজ তিনবছর বাদে একঝলক বৃষ্টি পেলাম। জলছবির মত হলুদ ওড়না উড়িয়ে চলে গেল। প্রথমে বুঝতে পারিনি। আমাদের অ্যাপার্টমেনটের এলিভেটরটা খারাপ। তাই সিঁড়ি ধরে উঠে যাচ্ছিলাম ওপরে। হঠাৎ একটা ফোন এল আর দাঁড়িয়ে পড়লাম চারতলায় ওঠার সিঁড়ির চাতালে। আমার প্রেমিকা… কথা বলতে গিয়ে কাঁচের জানলার দিকে তাকাতেই থমকে চুপ করে গেলাম। তিনবছর আগে আমাদের অ্যাপার্টমেনট পেরিয়ে বৃষ্টি যখন ফিরত, প্রতিবার কিছুটা গিয়ে ফিরে দেখত আজও ঠিক একই ভাবে তাকিয়ে ছিল। শুধু সদর দরজায় আমি ছিলাম না ভিজবার জন্য। থাকলেও হয়তো ভিজতে পারতাম না। হুহ্! আমার প্রেমিকা বৃষ্টিতে ভিজলে রাগ করে… আমি আর রাগ করতে পারিনা আজকাল…’
মানিব্যাগটা দুহাতে চেপে ধরে চুপ করে শুনছিল আভেরি। চোখের জল এক ধারায় ঝরে যাচ্ছে। সৃজন চাকরি জয়েন করার পর ভালোবাসার গায়ে একটা উদ্ভট তকমা লাগে। ‘লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ’! খুব মনে আছে কথায় কথায় সৃজন শব্দ দুটো বলে চেঁচিয়ে উঠত। তখন কালবৈশাখি চলছিল আর সাথে চলছিল আভেরির ইউ পি এস সি পরীক্ষা। শরীরের থেকে বেশি বেড়ে গেছিল মনের দূরত্ব। ইউ পি এস সি প্রাথমিক পরীক্ষার ফলাফলের আগেই ওদের কথা বন্ধ হয়ে যায়। তাই পরের ঘটনা আভেরি জানাতে পারেনি সৃজনকে।
‘কাহাঁ পর রুকনা হে ম্যাডামজি?’
বাড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা এগিয়ে এসেছে ওরা। আভেরি সর্দারজির ডাকে নিজেকে সামলে নিল। ওড়না দিয়ে চোখটা হালকা করে মুছে মানিব্যাগটা বের করল।
‘ঠিক হে… এহি পর রোক দিজিয়ে। কিতনা হুয়া?’
‘জি তিনশো পচহত্তর…’

#
ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল আভেরি। এগিয়ে যাওয়া দূরত্ব ফিরে আসতে আসতে অনেক কিছুর সম্মুখীন হয়েছে আজ। হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে। ছাতাটা খুলে নিল সে। ফিরে আসার পথে আর একলা ভিজবে না। মানিব্যাগ খুলে নিজের আর সৃজনের প্রথম অফিশিয়াল ভিজিটিং কার্ড উড়িয়ে দিল হাওয়ার বুকে। এই বৃষ্টিতে ভেজার অধিকার আই এ এস আভেরি সিন্হা আর ইঞ্জিনিয়ার সৃজন সান্যালের কি কোনোভাবেই থাকতে পারে না? 

উল্কা