চুল (চিমামান্দা এনগোজি আদিচি’র গল্প)

আফ্রো-আমেরিকান লেখক চিমামান্দা এনগোজি আদিচি’র জন্ম ১৯৭৭ সালে নাইজেরিয়ায়। ২০০৫ সালে প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হলে তা কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ লাভ করে। ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় আরেকটি উপন্যাস ‘হাফ অফ এ ইয়োলো সান’, যা ২০০৮ সালে অরেঞ্জ পুরষ্কার জয় করে। আদিচি বলেন : My writing is something bigger than I am.

মা প্রতিদিন কাঁদতো। বাবা এক বিকেলবেলায় ক্লাবে পুরো এক কার্টুন গুইননেস বিয়ার পানের পরে একটি চুক্তিতে সই দিয়েছিলেন। তার বন্ধু লুগার্ডসন তাকে তাসের খেলায় আহ্বান জানিয়েছিলো এবং চুক্তিটিতে সে লিখেছিলো : যে জিতবে সে অন্যের সম্পত্তি পাবে এবং এ কথাও বলেছিলো যে এটি অবশ্যই একটি কৌতুক ও কোনোভাবেই বৈধ নয়। এবং তাই বাবা সই করেছিলেন চুক্তিতে এবং খেলায় হেরে গেলেন। লুগারসন চুক্তিটি নিয়ে কোর্টে গেলো, বিচারক ছিলো লুগার্ডসনের অন্তরঙ্গ বন্ধু। সে নির্দেশ জারি করলো যে বাবা সত্যিসত্যি সই করেছেন এবং সে কারণে তাকে সব ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তার কোম্পানী। তার বাড়িগুলো। তার গাড়িগুলো। বিচারক তার পরিবারকে এক সপ্তাহ সময় দিলেন সবকিছু লুগার্ডসনকে দিয়ে দিতে। বাবা বললেন : ‘‘কিন্তু এটি ছিলো একটি কৌতুক! চুক্তিটি ছিলো একটি রশিদের ওপর তাড়াহুড়ো করে লেখা! এটি ছিলো একটি কৌতুক!’’ কিন্তু বিচারক তার কথা বাতিল করে দিলো। বাবা মেঝেতে আছাড় খেলেন এবং কাঁদলেন, মাকে বললেন :‘আমি লুগারসনকে বন্ধু ভাবতাম!’’ মা চিৎকার করে তাকে থামতে বলেছিলেন :‘‘তুমি কি নির্বোধ? সে কিভাবে তোমার বন্ধু হতে পারে? সে অপেক্ষা করে ছিলো কিভাবে তোমার নিকট থেকে তোমার ভাগ্যকে কেড়ে নিতে পারে!’’ এবং মা এ কথাও যুক্ত করলেন যে : তিনি সবসময় অনুভব করতেন লুগারসন তার দিকে অপ্রত্যাশিত দৃষ্টিতে তাকাতো, এ কথা ছিলো মিথ্যা, কিন্তু মা তার গল্পে রং চড়াতে পছন্দ করেছিলেন।

যে গল্পগুলো তিনি নিজেকে এখন প্রতিদিন বলেন আর কাঁদেন তাতে এখন রং চড়াতে হয় না, কেননা গল্পগুলো এখন সত্যি, সেগুলো ছিলো তাদের পুরনো জীবনের গল্প যখন কুইন ড্রাইভ এলাকায় ফুলে ঘেরা বাড়িতে তারা থাকতো, যখন লাগোস শহরের সবাই তাদের বন্দনা করতো। এখন কোনো বন্ধু তাদের ইঁদুরভর্তি ফ্লাটে আসে না, যেখানে তাদের বাড়িওয়ালা প্রায়ই ইলেকট্রিক মিটার খুলে নিয়ে যায়।

কিন্তু মায়ের সবচেয়ে বেশি লজ্জা ছিলো তার চুল, প্রাকৃতিক গুল্মের ঘন পি-ের মতো জট পাকিয়ে গিয়েছিলো, কেননা স্বচ্ছলতা নেই ও তার চুল বাধার খরচ এখন সাধ্যের বাইরে। লাগোস শহরে থাকতে তিনি লম্বা চুলগুলোকে সোজাসুজি পার্ম করতেন এবং এখন তিনি সবসময় মাথায় একটি স্কার্ফ পরে থাকেন, এমনকি যখন একা থাকেন তখনো।

তারা এখন আর স্বচ্ছল নয়, তাই তাদের মেয়েটি তার চুল কেটে ফেলেছিলো এবং বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছে আবার তার চুল উঠেছে, নরম ও ঘন, সে কখনোই তার এই আসল চুল দেখতে পায়নি। তাদের পুরনো জীবনে, যতো দ্রুত সম্ভব তার চুল বড় হতো, তা ছিলো ঝলসানো ও সরু। এখন চুল শক্ত, অসাধারণ এবং লম্বা। সে আঁচড়ায় না, কিন্তু প্রতিদিন সকালবেলায় আঙুল চালিয়ে জট ছাড়াতো ভালোবেসে।

ছেলেটি বাবার সঙ্গে কোম্পানীতে কাজ শুরু করতে চেয়েছিলো, সে এখন হতাশার মাঝে সারাদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে এবং জানতে চায় তার বোন কেন তার কুৎসিত চুলগুলোকে স্কার্ফ দিয়ে ঢেকে রাখে না। মেয়েটি আর ছেলেটি ঘনিষ্ঠ ছিলো, আগে যখন ছেলেটি ক্লাবে গিয়ে ফূর্তি করতো মেয়েটি তার স্কুলের সব এসাইনমেন্টগুলো করে দিতো, এবং সে বুঝতে পারতো না সে কেন বলতো যে তার চুল কুৎসিত, কিন্তু এখন এটা একমাত্র সুন্দর বিষয় যা সে হারিয়েছে। সস্তা জিন দিয়ে তাদের বাবা এখন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে (কখনো সে পুরনো পারফিউমের বোতল থেকে পান করেও নেশা করে, কেননা সে বলে ওতে এলকোহল আছে), এখন তার চুল, উন্মুক্ত ও জড়ানো; এ নিয়ে তার গর্ব তার অবিরত ক্ষুধার চিন্তা থেকে দূরে রাখতো। মেয়েটি আশা করতো সে তাদের ভাগ্য ফেরাবে। তা সম্ভব যদি চুক্তিপত্রটি তারা হাতে পায় এবং এমন কোনো এক বিচারকের কাছে নিয়ে যেতে পারে যিনি দুর্নীতিগ্রস্ত নন।

একদিন লুগার্ডসন আসলো এবং বললো সে জানে তাদের জীবন কী কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সে তাদের এক সন্তানের জন্য তার অফিসে চাকুরীর প্রস্তাব করে, এটুকুই অন্তুঃত সে করতে পারে। লুগার্ডসন ছিলো ধূর্ত ব্যক্তি; তার মন ছিলো সরু, তার বাহুগুলোও ছিলো সরু। তার পরোপকারের ইচ্ছা ছিলো বিরক্তিকর। কিন্তু বাবা তা গ্রহণ করলেন এবং বললেন তার ছেলে চাকুরীটি গ্রহণ করবে। মেয়েটি জানতো তার বাবা চাকুরীর জন্য তাকে গণ্য করবেন না, অথচ পুরনো দিনগুলোতে তার ভাইয়ের স্কুলের এসাইনমেন্টগুলো প্রায় সে করে দিতো।

ছেলেটি কাজে যোগ দিলো এবং বাড়ি ফিরে বললো সে নগণ্য একজন বার্তাবাহক। সে নিচের তলায় রিসেপশনে দাঁড়িয়ে থাকতো ও কোনো সংবাদ প্রদানের জন্য তাকে ডাকা হতো। কিন্তু সে অন্তঃত সামান্য হলেও কিছু টাকা আয় করতো এবং তাতে তাদের আরেকটু ভালো খাবারের সামর্থ্য হলো। যদিও মা বমি করতো, কেননা তিনি বিশ্বাস করতে পারতেন না তিনি এখন একটি নদী থেকে একফোঁটা জলের সমান পাচ্ছেন যা একদিন তারই ছিলো। এক পুরনো বন্ধু, যে কিনা আগে টাকা ভিক্ষার জন্য হাঁটু মুড়ে পড়তো, সে এক সন্ধ্যায় রুটি নিয়ে দেখা করার সময়ে জানিয়ে গেলো যে সে শুনেছে লুগার্ডসন ক্লাবে বড়াই করে বলছিলো যে তাদের বাবার নির্বুদ্ধিতাকে মনে রাখার জন্য সে চুক্তিটি তার অফিসেই রেখেছে ।

মা তার ছেলেকে বললেন চুক্তিটি হাতে পাওয়ার জন্য একটি উপায় বের করতে। ছেলেটি আলাদা আলাদা পন্থায় চেষ্টা করলো, মেয়েটি তাকে আইডিয়াগুলো দিতো যে কিভাবে সে অফিসে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে, কিন্তু কোনো কিছুই কাজ করলো না। ছেলেটি চোখে জল নিয়ে বাড়ি ফিরতো। তাদের বাবা গভীরতর হতাশায় ডুবে গেলেন এবং নিজের প্রসাব পান করতে করতে কথা বলতে শুরু করলেন। মা আগে একবার কাঁদতেন, এখন দিনে দু’বার কাঁদতে শুরু করলেন। মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলো। তখন এক উষ্ণ দিনে মেয়েটি তার চুলের জট ছাড়াচ্ছিলো, যা এখন যথেষ্ট উঁচু হয়েছে এবং ফুঁ দিলে একটি বড়সড় খরগোশের লেজের মতো ছড়াচ্ছে, সে কণ্ঠস্বরটি শুনলো, কণ্ঠস্বরটি তার চুলের ভেতর থেকে আসছিলো। একটি কণ্ঠস্বর যা শোনাচ্ছিলো তার মৃত দাদীমার; কিন্তু তা ছিলো তেজময়। ‘‘চুক্তিটি লুগার্ডসনের এয়ার কন্ডিশনারের মধ্যে।’’ মেয়েটি ভীতভাবে তার মাথার দিকে খেয়াল করলো। তখন আবার কণ্ঠস্বরটি আসলো। সে জানলো তার চুলে কিছু জাদুকরী ব্যাপার আছে, সে আহ্লাদের সঙ্গে অনুভব করলো যে তার চুল অতীতের থেকে কেবলমাত্র মোলায়েমই নয়, এর মাঝে নতুনত্বও আছে। কিন্তু এয়ারকন্ডিশনারের মধ্যে চুক্তিটি আছে এটুকু জানাই শুধু যথেষ্ট নয়। সে আরো বেশি জানতে চায়। তাই সে প্রতি সকালে, জেগে উঠে তার চুলের জট ছাড়াতো এবং কণ্ঠস্বরটির জন্যে অপেক্ষা করতো। শীঘ্রই, কণ্ঠস্বরটি তাকে বলে যা কিছু তার দরকার। চুক্তিটি অফিসের এয়ারকন্ডিশনারের মধ্যে, হাওয়া ঢোকার একটি ফাঁকের মাঝে রাখা আছে, লুগার্ডসন মনে করে যে জায়গাটি কারো চোখে পড়ার মতো নয়। মেয়েটিকে যেতে হবে এবং পরের দিন এটি তাকে পেতে হবে, ঠিক দুপুর হবার পনেরো মিনিটের মধ্যে যেতে হবে, সে পনেরো মিনিটের বেশি অফিসে অবস্থান করতে পারবে নাÑনয়তো সে ধরা পড়ে যাবে।

মেয়েটি লুগার্ডসনের অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো। সে গেটের সামনে গিয়ে নার্ভাস হয়ে পড়লো। তারা যদি তাকে ঢুকতে না দেয়! সে যখন ফিরে আসছে তখন তার চুলের ভেতর থেকে কণ্ঠস্বরটি বলে উঠলো ‘‘মধ্য দিয়ে হেঁটে যাও’’, গেট খোলাই ছিলো, তাকে কেউ দেখেও নি। তাই সে পারলো। সে রিসিপশনের পেছনে দেখলো তার ভাই কুঁজো হয়ে একটি টুলের ওপর বসে আছে। লুগার্ডসনের অফিস ছিলো খালি এবং অদ্ভুত আঁশটে ঘ্রাণ আসছিলো এবং সে এয়ার কন্ডিশনারের কাছে গেলো, হাত এর ভেতরে ঢুকালো এবং একটি খাম বাইরে টেনে বের করে আনলো। তখন সে পায়ের শব্দ শুনতে পেলো; লুগার্ডসন আসছে। সে আকস্মিক ভয় পেয়ে দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো এবং তার আঙুলগুলো তার চুলের মধ্যে চালাতে থাকলো। ‘‘ডেস্কের নিচে যাও।’’ ডেস্কের নিচে কার্পেট বেশ নরম ছিলো এবং সে ঢুকে পড়লো, আশা করতে থাকলো লুগার্ডসন বেশিক্ষণ থাকবে না। সে কারো সঙ্গে ভেতরে এসেছে, এবং হাসছে। মেয়েটি তার ঘড়ি দেখলো। পাঁচ মিনিট চলে গেছে। তারপর আট মিনিট। লুগার্ডসন তখনও কথা বলে যাচ্ছে। তারপর এগারো মিনিট। সে ঘামতে শুরু করলো। সে তার ব্রেসিয়ারের মধ্যে খামটি ঢুকালো। লুগার্ডসনের সঙ্গে লোকটি চলে গেলো এবং লুগার্ডসন এক মুহূর্তের জন্য তার অফিসের ভেতরে আসলো, তখনই ফোন বেজে উঠলো, সে ফোন ধরলো এবং অফিস থেকে বেরিয়ে গেলো। তেরো মিনিট হয়েছে। মেয়েটি ডেস্কের নিচ থেকে যেন ভেসে বেরিয়ে এলো, এবং দৌড়াতে শুরু করলো যতো তাড়াতাড়ি সে পারে, সিঁড়ি থেকে নিচে নামলো, গেটের বাইরে বের হলো, যতোক্ষণ না সে বাসস্টপে পৌঁছালো ততোক্ষণ সে থামলো না।

যখন তার গল্প বলছিলো তখন বাবা চমকে গিয়েছিলেন। কিন্তু মা চুক্তিটি নিলেন এবং গভীর ভক্তি করে ধরে থাকলেন, তারপরে তার স্কার্ফের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলেন। পরদিন তারা বিচারক রতিমি, যিনি দুর্নীতি না করার জন্য পরিচিত তার কাছে এটি নিয়ে এলেন এবং তিনি রুল জারি করলেন যে লুগার্ডসনকে সব কিছু ফেরত দিতে হবে। এটাও যুক্ত করলেন যে, লুগার্ডসনকে তার অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। মা হাসলেন, কাঁদলেন, নাচলেন ও বললেন : যে কদর্য লোকগুলো তাকে এই পরিস্থিতির মাঝে ফেলে গিয়েছিলো কিভাবে তার শোধ তুলবেন।

বাবা শ্যাম্পেনের অর্ডার দিলেন, ছেলেটি তখনও হতবুদ্ধি, সে পরামর্শ দিলো হুইস্কিও অর্ডার দিতে। মেয়েটি মজা পেলো, সে সবসময় তার আঙুল তার চুলে চালাতে থাকলো। এবং তারা সবাই সবসময়ের জন্য সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।

ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন- তুহিন দাস