বৃক্ষমানবী

প্রশ্নচিহ্নটি ঝুলে আছে। বিস্কুট দৌড়ের রশিতে যেমন সুতোর মাথায় বিস্কুট ঝোলে। কিন্তু এই প্রশ্নচিহ্নে কারো অভিজাত অন্তর জিজ্ঞাসিত হয়না।

ঝা চকচকে শান বাঁধানো এমন স্বাস্থ্যবান গুঁড়ি খুব কমদেখা যায়। দিব্বি নিজের ডালপালা ছড়িয়ে ইচ্ছেমত শেকড় গ্রোথিত করে চারপাশে নিজেকে বিস্তৃত করেছি।এটা করার সুযোগ পেয়েছি অভিজাত এলাকা বলে। বছরের সব ঋতুতেই কখনও রুদ্র রোদে কখনও কাঁচামিঠে রোদে আমি স্নান করি। পাতায় পাতায় তৈরী হয় ক্লোরোফিল। সবুজেরা আরো জীবন্ত হয়েযেন পান্নাহয়ে ওঠে।

আচ্ছা আমার কি এই কদম গাছ হবার কথা ছিল! আমি কি এই হয়েই জগতে আসতে চেয়েছিলাম! নাকি অন্যকিছু। সেই কবেই স্বনামধন্য জগাদা বলে গেছেন আমরা সপ্রাণ। কিন্তু বলেননি সেটি কি ধরনের প্রাণ। চারতলা ভবনের ছাদ জুড়ে আমার ছড়ানো ডালপালার নিচে বসে তন্ময় হয়ে যে মানবী আমায় স্পর্শ করে, আমার মত কদমবৃক্ষ হতে চায়… আমি তো সেই হতে পারতাম। কিংবা সেই হত আমি। তাহলে আর আমাকে এই স্থবির হয়ে থাকতে হত না। বৃক্ষ জনমের চেয়ে মানব জনম অনেকআনন্দ ও মজার।
বাতাসে আমার শাখা পাতারা দোলে আর এই অভিজাত ভবনের জানালার শৌখিন পর্দা নাচানাচি করে। ভবনের প্রতিটি গবাক্ষের ওপারের সব কিছু আমি দেখতে পাই জেনে যাই, কেবল একটি ছাড়া।সেখানে কবরের অন্ধকার।

এই এখানে দাঁড়িয়ে আমি কতকিছুর সাক্ষী হলাম। আমারই চারপাশে নোয়াহ, পাজেরো সহ কত কত প্রাডো দিনরাত সাহেবদের নিয়ে ছোটাছুটি করে যতটা ঘাম ঝড়ায় তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশী ঝড়ায় মেমসাহেবদের নিয়ে। আজানের ডানায় ভর করে শহরের রোডবাতি গুলো জ্বলে ওঠার পরে আমার কোটরে বসবাসরত পক্ষীকুল যখন নীড়ে ফিরতে শুরু করে, তখন ভবনের বাসিন্দারাও সুড়সুড় করে চকচকে পলিশ জুতা মচমচিয়ে ফিরতে থাকে। ঝুলন্ত পর্দার রংবেরঙের নকশার ফাঁক দিয়ে আমি তাদের আসল ও নকল চুমুর বিনিময় দেখতে পাই। কোন কোন ঘর যেন সত্যিই স্বর্গের টুকরো দেখে আশ মেটেনা। চাইলেও দেখিনা চাইলেও দেখি। মালগাড়ীর এক ঘেয়ে হুইসেলের মত লাগে। কেবল একটি গবাক্ষ থাকে অন্ধকার।সেখানে আসল নকল, মুখ মুখোশ, স্বর্গ নরক কোন কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। সেখানে অপেক্ষারা দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘ হয়ে, হয়ে ওঠে এক মরুভূমি চোরাবালি। অথচ সেখানেই আমি একটু আলোর ঝলক দেখতে চাই।কেবল একটা ঝলকানি!

এখানেই এক উজির একবার কালো বেড়াল ধরতে চেয়ে থলে ভর্তি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে কী কেলেংকারীই না করলেন!তখন আমার পাতারা সব রিরি করে ওঠেছিল, লজ্জাগুলো ফুল হয়ে ঝরে ঝরে পড়েছিল। অপারেশন ক্লিন হার্টের মতনিত্যকার ঝাঁটপাট দিয়ে সেসব ক্লিন করে ফেলা হয়েছিল।

আমার শাখায় শাখায় সিজনে অসিজনে এত এত ফুল ফোটে সেসবে খুব একটা কেউ গা করেনা। টেনিস বলের মত এই ফুল তেমন কারো সাজে কাজে আসেনা। কেবল ছাদে বসে সেই মানবী যে বৃক্ষ হতে চায় সে দু একটা করে ফুল ছিড়ে নিয়ে বসে থাকে ভোর পর্যন্ত। এত নির্ঘুম রাত সে কাটায় কিকরে! সে আমার পাতায় পাতায় হাত বোলায় আমি বৃক্ষ অনুভূতিতে শিহরিত হই। আমি ভালোবাসায় আক্রান্ত হই। তবে তাতে তার তন্ময়তা প্রভাবিত হয়না। সে থাকে আমারই মত স্থবির। কেন তার এই স্থবিরতা! সেতো একজন মানুষ তার থাকবে মনুষ্য মুখরতা!

আকাশে পুর্নিমার ভরা পোয়াতি চাঁদ। বৃক্ষ চরাচর মেতে উঠেছে আলোর খেলায়। চন্দ্রাবতীর মায়ায় পাতায় পাতায় জোছনার মধু। নিত্যদিনের সেই মানবী ছাদে ওঠল যেমন সে ওঠে। এরপর একটি রশি আমার শাখা বেয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। একি সর্প নাকি রজ্জু!রজ্জুতেই সর্পভ্রম! রজ্জুই-ই কিন্তু সপ্রাণ।কি ঘটতে যাচ্ছে যখন বুঝতে পারলাম আমার পুরো অস্তিত্ব হাহাকার করে ওঠল।এই প্রথম আমার মনে হল বৃক্ষকে কেন কণ্ঠস্বর দেয়া হয়নি!সকাল হতে আর বাকি নেই। জানি আগামীকাল এ নগরী প্রবল শোকে মূহ্যমান কোন নগরী হবেনা, বরং এমন চিত্র কোঁত করে গিলে ফেলে ঢেঁকুর তুলে নিত্য সেই নগরীই থাকবে।
আহারে মানুষ! আহা! থাক, আমার বৃক্ষ জন্মই থাক, মনুষ্যজন্মে কাজ নেই।

কোথায় যেন বেজে যাচ্ছে অপার্থিব চন্দ্রগীত… হে অভিমানী অন্ধকার কুটুরীর বাইরে এক জোছনালোক পৃথিবী… ভালোবাসার কবিতা লিখে চলে ভালোবাসার মানুষ … তুমি দেখলে না! তুমি জানলে না!

ইতিপুর্বে কত ভূমিকম্প ঘটে গিয়েছে, কিন্তু আজ অন্যরকম এক ভূমিকম্প আমায় সমূলে নাড়িয়ে দিল।মানুষনাকি প্রকৃতিরই অংশ। যীশু বিদ্ধ হয়েছিলেন এক টুকরো ক্রুশকাঠে।পূর্ণপ্রাণ প্রকৃতিতে প্রশ্নচিহ্নের মত ঝুলন্ত এক বৃক্ষমানবী…

কাজী লাবণ্য