আমাকে নিয়েই দর্শনের শুরু

একজন ‘আমি’ জন্ম নেয়ার পরই এক বিচ্ছিন্ন বা alienated সত্তা হিসাবে জায়গা করে নেয় তার নিজস্ব পৃথিবীতে এবং কোনো একসময় তৈরি করে তার বাস্তবতার চারদিক, প্রতীকী অবস্থান এবং কল্পিত জগতের মৌলিক অস্তিত্বকে। হঠাৎ কখনো সে তার প্রথম দর্শন-চিন্তায় নিজস্ব ভাষায় নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে— ‘আমি কে, আছি কোথায়, কেন আছি ?’ এই তিন ‘ক’-কেন্দ্রিক বিচ্ছিন্নচিন্তার উত্তরে সে উপস্থিত করে তার ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রথম বিশ্লেষণী দর্শন, আবার কখনো সে নিজেকে সমর্পণ করে অধিবিদ্যাজাত কোনো এক অজানা অচেনা কল্পিত শক্তির কছে। কখনো আবার এই আমি কোনো রকম ভাবনাচিন্তা না করে হারিয়ে ফেলে তার মৌলিক সত্তাকে, নিজেকে বিলিয়ে দেয় পার্থিব মিথ্যা বিষয়ীগততায়। মৌলিক সত্তা হারানো এই ‘আমি’ সত্তাকে আমরা বলবো ‘পতিত সত্তা।’ আমাদের পৃথিবীতে পতিতসত্তার উপস্থিতি সবসময় সবচেয়ে বেশী। পতিতসত্তার মৌলিক কাজ হল অর্থ উপার্জন করা, খাওয়া-দাওয়া করা, হাগু-মুতু করা, যৌন সম্ভোগে আনন্দ পাওয়া, বংশ বিস্তার করা আর বাগাড়ম্বর পূর্ণ বাচাল কথা বলা। দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তার Dasein আর Dasman প্রকল্পে মৌলিক ও পতিত সত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মিশেল ফুকোও তার দর্শনে পরোক্ষভাবে উত্তম আর পতিত সত্তার কথা বলেছেন। পাঠক ইচ্ছে করলে হাইডেগার আর ফুকো পড়ে দেখতে পারেন। হাইডেগার আর ফুকো পড়লে বুঝা যাবে যে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ, আমলা, পেশাজীবী, ব্যাবসায়ী, টকশোতে কথাবলা বুদ্ধিজীবী, কবি, লেখক, শিল্পী সহ অনেকেই পতিত সত্তার দুই নম্বর লোক।


এখন আবার বিচ্ছিন্নবোধের ‘আমি’ নিয়ে কথা বলি। একজন ‘আমি’ যখন বিচ্ছিন্নতাবোধ সহ তার বিশ্বে অবস্থান করে তখন তার চিন্তার জগতেও দেখা দেয় বিভ্রান্তি। এই বিভ্রান্তি বিশ্লেষণ করার জন্য আমরা দার্শনিক দেকার্ত, শপেনহাউয়ার, কান্ট, হেগেল, রাসেল, মুর, হ্বিটগেন্সটাইন, ফুকো, দেরিদা, হাইডেগার সহ অন্যান্য দার্শনিকদের দর্শনের সাহায্য নিতে পারি কিংবা ফ্রয়েড, লাঁকা, ইয়ুং প্রমুখের মনস্তত্ত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারি একজন ‘আমি’র বিভ্রান্তিকর অবস্থান। কিন্তু মুশকিল হল, দর্শন ও জ্ঞানতত্ত্বের সবকিছু হজম করার পরেও, ‘কী, কোথায়, কেন’-কেন্দ্রিক প্রশ্নের শেষ হয় না। ভাষানির্ভর ‘আমি’র চিন্তা বারবার বিনির্মিত হয়ে নতুন চিন্তা নিয়ে আসে (বিনির্মান শব্দটি লিখার সাথে সাথে জাঁক দেরিদার ভাষাদর্শনে উল্লেখিত বিনির্মান বা Deconstruction-এর কথা মনে এলো। এ ব্যাপারে পরে একসময় ‘অনুচিন্তন’ লেখা যাবে)।

একজন ‘আমি’র মন থেকে ‘কী,কোথায়, কেন’-বিষয়ক বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আমরা বিজ্ঞানের দর্শন টেনে আনতে পারি। চিন্তা থেকে অধিবিদ্যা বাদ দিয়ে, যৌক্তিক ও গানিতিক বিজ্ঞান গ্রাহ্য করে আমরা বলতে পারি, একজন ‘আমি’ হল একটি ‘জীবনবস্তু।’ দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু একটি অক্সিজেন পরমাণুর সাথে বিক্রিয়া করে যেমন একটি পানির অণু (H2O) তৈরি করে, ঠিক তেমন ভাবে কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, হাইড্রোজেন, ক্যালসিয়াম, সালফার, ম্যাঙ্গানিজ ও অন্যান্য পরমাণু কোনো একটি নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম তেজে, মাত্রায় ও গঠনে সৃষ্টি করে জীবনবস্তু। একটি পানির অণুর যেমন নিজস্ব কিছু মৌলিক ধর্ম আছে, ঠিক তেমনভাবে অণু-পরমাণুর সংগঠন জীবনবস্তুরও কিছু নিজস্ব ধর্ম থাকে। একজন ‘আমি’ জন্ম নেওয়ার পর যেসব জৈব কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, তাই হল জীবনবস্তুর ধর্ম। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, জীবনবস্তু হিসেবে সব ‘আমি’ বা মানুষের চরিত্র/ধর্ম এক হয় না কেন? উত্তরে বলা যায়, পরিবেশের উপর নির্ভর করে একটি পানির অণু যদি বরফ, তরল, বাষ্প ও প্লাজমা হিসেবে অবস্থান করতে পারে, তবে পরিবেশের জন্যই জীবনবস্তু হিসেবে মানুষও বিভিন্ন চরিত্র/ধর্ম নিয়ে অবস্থান করে।

‘আমি’ কোথায় আছি?’—এ প্রশ্নের উত্তরে শব্দব্রহ্ম ‘কুন’ বা Verbum Logos-কে না এনে, বেহেশত থেকে আদম-হাওয়ার বিতাড়িত হবার ঘটনা গ্রাহ্য না করে, যদি গানিতিক যুক্তি নিয়ে ভাবা যায় তবে আমরা সহজেই আমাদের ঠিকানা পেতে পারি। ‘আমি’ যুক্তি সহই বলতে পারে, কোনো একসময় মহাশূন্যে কোন এক এককত্ত্বের মহা বিস্ফোরণ বা Big Bang-এ সৃষ্টি হয়েছিল মহাজগতের। সেই মহাজগতে মিল্কিওয়ে নামে একটি নিহারিকার নক্ষত্র হল সূর্য। নক্ষত্র সূর্যের একটি গ্রহ আছে, নাম পৃথিবী, আর আমি সেই পৃথিবীতে আছি। একটু গানিতিক যুক্তি দিয়ে সত্য বললে ‘আমি’র অবস্থান নিয়ে কোন অধিবিদ্যা আনার প্রয়োজন হয় না। দুনিয়া আর আখেরাত এনে বিভ্রান্তি বাড়ানোর দরকারও পড়ে না।

‘আমি কেন আছি?’—এ প্রশ্নের উত্তরে বলবো, আপনি যেহেতু এখন এই লেখাটি পড়ছেন, সেহেতু বলবো আপনার জন্ম হয়েছে পড়ার জন্য। আপনি যখন খাবেন তখন বলবো, আপনি খাবেন, সে জন্যই এই বিশ্বে আছেন। আপনার ভালোবাসার সময় বলবো, আপনি ভালোবাসার জন্যই এই পৃথিবীতে অবস্থান করছেন, যত পারেন ভালোবাসুন। যদি কেউ হাতে চাপাতি নিয়ে মানুষ খুন করে, তবে তাকে বলবো, তোর জন্ম হয়েছে খুন করার জন্যই, তুই একটা পতিত সত্তা, তুই একটা অমানুষ।

মঈন চৌধুরী