উপমা

উপমাকে আপনারা চিনবেন না। আমি নিজেও তাকে ঠিকঠাক চিনতে পারিনি কখনো। সে-ই উপমা, ক্লাস এইটের টিফিন পিরিয়ডে মেয়েদের কমন রুম থেকে বের হওয়ার সময় যার খোলা চুল দেখেছিলাম। তার চোখ দুটো ছিল মায়া মায়া, চুলগুলো কেমন স্বপ্ন স্বপ্ন। আঙুল নাচিয়ে কথা বলা উপমাকে আমার কাছে মনে হত একটা অসমাপ্ত উপন্যাস, যার রহস্য কেউ কোনোদিনও জানবে না।

সেদিনই প্রথম, সেদিনই শেষ। তারপর আর কখনো উপমা চুল খুলে ক্লাসে আসেনি, স্কুলের বেলকনি দিয়ে হাঁটেনি। তার পাশের বেঞ্চে বসা ঊর্মি চুলে বেণী করে বেণী দুটো বুকের উপর টেনে এনে হাত বোলাতো বাংলা ক্লাশে। উপমা বেণী করেনি কখনো।

উপমা বড় হয়ে গেছে সেই কবেই। তার ছেলেটাও এখন নাকি হাঁটতে শিখেছে। হাঁটতে গিয়ে পড়ে গেলেই লজ্জ্বায় লাল হয়ে হামাগুড়ি দেয়। বাবার পিঠে চড়ে ঘোড়া ঘোড়া খেলে রোজ।

উপমার এখন অনেক অবসর। সারাদিন ঘরে কাজ নেই খুব বেশি। শুনেছি তার বিশেষ বিশেষ কাজের লোক আছে। থালা বাসন ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে তাকে তাকে সাজিয়ে রাখে। ছেলেটাও এখন দুধ ছেড়েছে। খুব একটা সময় দিতে হয় না।

আজকাল সে ফেসবুকে এসেছে। নতুন আইডি খুলে পুরনো মানুষদের খুঁজে খুঁজে রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছে। আমাদের ক্লাসে যে ছেলেটা প্রতিবার ফার্স্ট হত তাকে অবশ্য উপমা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারেনি। বেচারার নামের বানান বড় শক্ত। আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে সবার আগে। আমি ঝুলিয়ে রেখেছিলাম দুইবেলা। তিনবেলার বেলায় আর ভাত হজম হচ্ছিল না। একসেপ্ট করলাম। জানতাম, মেসেজ আসবে।

প্রায় সাড়ে তিন বছর পর উপমা ফেসবুকে মেসেজ পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে, আমি কেমন আছি। আমি রিপ্লে তে লিখলাম না কেমন আছি। উল্টো আমিও একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে লিখে দিলাম, “তুমি কেমন আছো উপমা?”

এটাই আমাদের শেষ আলাপ ছিল। মেসেজটা পাঠিয়েই আমি উপমাকে ব্লকলিস্টে ফেলে দিয়েছি। আমি জানি উপমা ভালো আছে। তবে গত সাড়ে তিন বছরের প্রতিটা ঘুম না আসা রাতের শেষে ভোরের আলো দেখা সকালেও আমি কখনোই ভালো ছিলাম না।

উপমা কেমন আছে সেটা বলার সুযোগ তাকে দেয়া হবে না। হয়তো কোনো একদিন ভুল সবজি দিয়ে মাংস রান্না হবে, সাংসারিক ব্যাপার নিয়ে ছোটখাটো ঝগড়ার মত হবে। স্বামীর বকা খেয়ে তার মায়া মায়া চোখ দুটো কেঁদে কেটে একাকার হবে। এক বুক দুঃখ নিয়ে সে আমার কথা ভাববে। আমাকে মেসেজ পাঠাবে, “আমি ভালো নেই তন্দ্র।”

তারপর একদিন হয়ত তার স্বামী একটা জামদানি শাড়ি কিনে আনবে, ছোট ছেলেটা তার গালের সাথে গাল ঘষে আম্মু আম্মু বলে ডাকবে। সেদিন তার সারা গায়ে একটা সুখ সুখ চলে আসবে। আমি জানি, সেদিন সে আর আমার কথা ভাববে না।

সুখ ব্যাপারটাই এমন অদ্ভুত। মানুষ সুখ পেলে ভালোবাসা ভুলে যায়।

তানভীর মেহেদী