কবি’র কবিতা ভাবনা

জীবনবোধের বাইরে আমি কিছু লিখি না, কবিতা আমার কাছে নাযিল হয়, এই ঐশী শব্দসমূহ আসে প্রকৃতি, মানুষ ও সময় থেকে, যাপিত জীবন থেকে শব্দ তৈরী হয় নিউরনে, তার সন্তান এই কথামালা, আমি জননী আর জনক আমার রাধা-আমার দ্রৌপদী। শিরোনাম, ছন্দ, যতিচিহ্ন, বর্ণমালা ইত্যাদি বিষয়ে আমার নানা নিরীক্ষা আছে। মুখের জোড় আসলে অক্ষরে টিকে থাকে না । প্রতিটা শব্দ অর্থের রাজ্যে নিজেই সর্দার ।

অসীম কোনো সমান্তরাল রেখা সম্ভব না, কেননা অসীম সরল কোনো রেখা সম্ভব না । অসীমে সরল ঝুলে যায়, গুটিয়ে যায় । এই ঘটনাটি ঘটে মহাকাশের মহাব্যাপ্তিতে । আলীর ধ্বনি সেই মহাকাল গর্ভ হতে যে অক্ষর প্রসবে তারাও ঝুলে যায়, ঘন হয়ে থাকে, পাশাপাশি মিলেমিশে থাকে অর্থের পড়শীরা – মহাজনেরা।

দ্যোতক যদি সহজ হয়, দ্যোতনা সহজেই ধরা দেয়; পরিচিত আলাপচারিতায় সহজ বসত গড়তে পারে মানুষ, কিন্তু দ্যোতক হাতিয়ার তার কর্ম সারে ঠিকই চিন্তার গাঁথুনি পোক্ত করে। একজন যদি জিঞ্জাসা করে, ‘খবর কি?’ পারস্পরিক সম্পর্ক সিস্টেমে দোলক নড়ে, এই যোগাযোগে আমার এবং আপনার কোনো সর্দারি নাই। সম্বন্ধ বিচারে প্রশ্নশ্রোতা প্রচার করে আত্মসংবাদ, এখানে কোনো ভনিতা নেই, সাধারণ পরিচিত সমাজ এমনই। শব্দ দেয়ালে আটকে থাকলে কবির আত্মচিৎকারের শ্রোতা হবে কেবল জড় জগৎ। কারো কারো জন্য এমনটাই ঠিক, কারো জন্য হয়তো ভিন্নরকম। এই বিভিন্নতাতেই পরিবর্তন আসে, সমালোচনা করে হোক, সমর্থন করে হোক বা নীরব থেকেই হোক। বিষয়টা হলো কারো এলাকায় কেউ পা মাড়াতে পারছি না- এই অক্ষমতা টের পাওয়া যায়।

মহামতি মলয় রায়চৌধুরীর আলোচনা উল্লেখ দাবী রাখে-

“গত পাঁচ দশকে মানুষের চিন্তাধারা একক বুদ্ধিবৃত্তি (সিংগল ইনটেলিজেন্স) থেকে বহুবিধ বুদ্ধিবৃত্তির (মালটিপল ইনটেলিজেনন্সেস) দিকে যাত্রা করেছে। স্বাভাবিকভাবে তা কবিতা রচনার ক্ষেত্রেও ঘটেছে। একক বুদ্ধিবৃত্তি যে ধরণের স্কিল দাবি করত তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন স্কিলের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। কবিতা রচনার ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন হয়ে চলেছে তা অই ইনটেলিজেন্স যাত্রাপথগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘটেছে। তাছাড়া কবির ‘হেরিটেবিলিটি’ বা উত্তরাধিকারে প্রাপ্তিযোগ্যতায় অভিজ্ঞতার ওজন ক্রমশ ওই মালটিপল ইনটেলিজেন্সকে জটিলতর করে তুলছে। ঠিক যেমন শাস্ত্রীয় গানের ঘরানা ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি গায়ক নিজের কন্ঠস্বরকে প্রাপ্তিযোগ্য উত্তরাধিকারের পাশাপাশি ধ্বনিবৃত্তি দিচ্ছেন, তা বহুবিধ বুদ্ধিবৃত্তির কারণে সম্ভব হচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়ার দৌলতে বুদ্ধিবৃত্তির ব্যক্তিক প্রসার প্রত্যেক কবিকে আত্মশিক্ষিত করতে বাধ্য করছে। আমাদের সময়ে স্কুলে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হতো এখন সেভাবে শিক্ষা দেয়া হয় না। তখন পর্যন্তও ম্যাকলে সায়েবের শিক্ষা-কাঠামো ও টোলের শিক্ষা-কাঠামোর আবছা-রেশ উত্তর-ঔপনিবেশিক বাঙালি-জীবনে থেকে গিয়েছিল। কবিরা মুখস্থ করা যায় এমন কবিতা রচনায় মনোযোগ দিতেন। এখন তো স্কুলের পাঠবস্তুতেও এলাকা বিস্তৃতি ঘটেছে।

বাংলা কবিতা লেখার ক্ষেত্রে এক ধরণের স্বভাবকবিত্বকে লিরিকাল বলার রেওয়াজ ছিল। কবিতাকে মুখস্থ করার জন্য ছন্দে লিরিসিজম জরুরি ছিল। কিন্তু আজকের দিনে দেখা যাচ্ছে নাচের ক্ষেত্রে লিরিকাল হিপহপ বেশ পপুলার। হিপহপ আর লিরিসিজম পরস্পরের বিপরীত বলে মনে করা হত। কিন্তু কোরিওগ্রাফাররা হিপহপ সঙ্গীতকে লিরিকাল ফর্ম দিতে পেরেছেন। অর্থাৎ ‘নব্যোত্তর’ কালের ভাবনাচিন্তা এই জায়গায় পৌঁছেছে যে, সমগ্র কাজটি যেমনই হোক না কেন, ফর্মকে লিরিকাল করে তোলা যায়।

কবিতাকেন্দ্রিক ঘরানা বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক কবিতা-আন্দোলন আর বোধ হয় সম্ভব নয়। সাহিত্যিক-রাজনীতির সুবিধা পাওয়ার জন্য হয়তো গোষ্ঠীবদ্ধতার ও দশক বিভাজনের দরকার পড়ছে , কিন্তু প্রত্যেক কবি তাঁর পাঠবস্তুতে নিজস্বতা আনছেন। যিনি সবে লিখতে আরম্ভ করেছেন, খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে যে তিনিও উত্তরাধিকারে প্রাপ্তিযোগ্যতাকে ছাপিয়ে অন্যত্র চলে যেতে চাইছেন।”

আলী আফজাল খান