কবি বচন

এক.
যিনি কবিতা ভাবেন, কবিতা লিখেন, নিঃসন্দেহে তিনি কবি। তাঁর ভাবনা যে রূপেই বা রূপকে প্রকাশ করে হোক, তিনি কবি বটে। স্থানীয় পর্যায় থেকে জেলা পেরিয়ে দেশ পেরিয়ে বিশ্বকেও ছাড়াতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু প্রাথমিক সত্তায় তাঁরা এক নামে কবি বটে। কেন কবি নন? জীবনানন্দ দাসকে জীবদ্দশায় সীমিত কবি ও পাঠক কবি মানতেন। তাই বলে তিনি কি কবি হন নি? আমার পাড়ার হবিবুর হাটে কবিতা বিক্রি করে বেশ নাম করেছে। ঝাঁকড়া চুল। মুখে খসখসে কবিয়াল ভাব। হাটের দিন চকচকে করে তেল দিয়ে। সবাই তাকে কবি বলে। আমিও তাকে কবি বলেই ডাকি। বলি, ‘ও কবি ভাই, কবিতা শোনাও তো’। কবি হবিবর ধীরে ধীরে সুর তুলে কয়েক লাইন পরেই গতি বাড়তে থাকে এবং এক সময় গভীর তন্ময়তার ভেতর ঢুকে যায়। আমি প্রাণ উজাড় করে তাঁকে শুনি। গাঁয়ের লোকের প্রিয় কবি হবিবর। এখন নাগরিক জীবনে, এই ফেসবুকে একটি নচ্ছার কথা শুনি, কাকের চেয়ে এখানে কবির সংখ্যা বেশি। বেশি তো হবেই। ফেসবুকে আপনি কাকের ছবি ছাড়া কাক পাবেন কোথায়? আর কেন যে মানুষ কাক কথাটা বাদ দিয়ে আরো কালো পাখি কোকিলের কথাটা বলে না! বলে না। কারণ আমাদের মনটাই নেগেটিভ। মনোভাব তাচ্ছিল্যপূর্ণ। উপহারের চেয়ে উপহাসে পারঙ্গম বাঙালি তাই উদার মনে গ্রহণের তরিকাটা ভুলে বিশেষ করে নাকউঁচো শিক্ষিত মানুষ, মন উজাড় করে বলতে পারে না, ‘ভালো’। আরো ভালো হলে আরো ভালো হয়ে উঠবে তুমি। এখানে কবির কপালে তিলকের বদলে তাই ছাই মাখা। আমি নাগরিক জীবনানন্দের মতো বলতে অপারগ যে, সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি। আসুন, কবিতা পড়ি। কবিতা চর্চা করি। কবিতা লিখে চলি।

দুই.
আমার কেবল মনে হয়, কবিতা না পড়লে ও না লিখতে পারলে আমি আর বাঁচতে পারবো না। গুণে-মানে আমার কবিতা যে উত্তম, এটা আমি দাবি করি না। তবে আমি কবিতা নিয়ে ভাবি। বিদেশি কবিতা পড়ি কম। বোদলেয়ার, লোরকা, প্লাথ, এমন কিছু কবির কবিতা পড়েছি। বিদেশি উপন্যাস ও গল্পই আমি বেশি পড়েছি। নিজেকে সে হিসেবে পাঠদরিদ্র ভাবি। এই দীনতা স্বীকার করেই বলছি, বাংলা কবিতার পরম্পরা ধারণ করেই নিজের একটি ফরমেট তৈরি করতে চেষ্টা করছি। আমি বলতে চাই, আমি স্বভাবে কবি। জ্ঞানে আছে দীনতা। তবু কবিতার জন্যে ফেসবুক তো আমার জন্য খোলা থাকবে। ১৯৭৬ থেকে ৯০ সাল পর্যন্ত তখনকার সব কাগজ ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মিত কাগজে লিখেছি কবিতা। আমার বন্ধু নিরঞ্জন ছাপানোর পরে আর পত্রিকায় বা আপন খাতায় কবিতা আমি লিখি নি। হয়তো সমকালে বছর চারেক আগে লিখেছি। কিন্তু আমি ফেসবুকেই নিয়মিত কবিতার নিরীক্ষা করে যাচ্ছি। পাঠক সাথে পেলে আমি কি ডরাতে পারি?

তিন.
সক্রেটিস না লিখেও বিশ্বসেরা দার্শনিক। তিনি আসলে পৃথিবীর মানুষ নাকি প্লেটোর তৈরি মানুষ চরিত্র, এ নিয়েও কথা ওঠে। তবে তাঁর কালের আরো কিছু ভালো মন্দ মানুষের জবানীতে সক্রেটিস এর অস্তিত্ব পাওয়া গেলে, ঐতিহাসিকভাবেই প্রমানিত যে, তিনি ছিলেন এবং তিনি দর্শন জানতেন। প্লেটোর গুরু তিনি। তাঁর কথাগুলো প্লেটোর জবানিতেই পাওয়া যায়। দর্শন, সাহিত্যের অংশ নয়। তবে রবীন্দ্রনাথের কথায় না লিখে বা প্রকাশ না করে কবি বা লেখক হওয়া যায় না। অতএব লিখতে হবে। বা লিখা বলতে হবে, সেটা অনুলিখন হবে। তবেই লিখা। প্রকৃত কবি বা রচয়িতার সাধনা একদিন তার অন্তরে লিখা নাজেল করে। তিনি ঠিক জানেন না, কী লিখবেন বা লিখা কতো বড় হবে। তিনি লিখতেই থাকেন এবং লাইন তৈরি হতেই থাকে। তারপর তিনি বুঝতে পারেন, কী লেখা হলো। কতোটুকু লেখা সংগত। তথন তিনি লেখা এডিট করেন। পুনঃপুনঃ পরিমার্জনার পর লেখা একটা জায়গায় চুড়ান্ত হয়। রবীন্দ্রনাথ থেকে আবুল হাসানের চুড়ান্ত পরিমার্জনা আমরা দেখেছি। কবি বা রচয়িতা প্রকাশের পরেও পরে লেখাকে সংশোধন করে আরেকটি সংশোধিত সংস্করণ বের করেন। লেখার পেছনে লেখকের শ্রম দেখে অবাক হতে হয়। সমালোচক যখন সমালোচনা করেন, এটি কি বিচার করেন? না, তিনি যেন বিচারক! তিনিই যেন রচয়িতার গুরু! তিনি যাকে ইচ্ছে উপরে উঠতে সাহায্য করেন, ফের কাউকে মাটিতে শোয়াতেও কার্পণ্য করেন না। অথচ তিনি মূলধারার সৃজনশীল কেউ নন। যার ভেতর সৃজনশীলতা নেই, তিনি কিভাবেই বা সৃজনের গুরুত্ব বুঝবেন? খেয়াল করুন। একজন সৃজনশীল লেখকই অন্য লেখককে কিছুটা বুঝতে পারেন । তাই একজন সৃজনশীল রচয়িতাকে ওঠাতে-নামাতে তাঁর হাত কাঁপবেই। অতএব একজন ব্যাকরণবিদ লেখক হতে পারেন না। সমালোচকও নন। লেখক সদা সৃজনশীল বটে। নাকি?

ভাস্কর চৌধুরী