দেবদারু ।। প্রথম কিস্তি

আমি সিকদার ডায়মন্ড “দেবদারু” নামে একটি সিরিজ লিখছি নিজস্ব বয়ানে, মানে রাইটার এখানে ন্যারেটরের ভুমিকায় আছে। এটি একটি উপন্যাস এর খসড়াও বটে। যদিও ন্যারেটর এখানে, এই লেখায় একটি চরিত্র হিসেবেই আছে; কিন্তু তার সাথে আমার বা আমার আশেপাশের মানুষের কোনো বাস্তবিক সংশ্লিষ্টতা নেই বা কারো বাস্তব চরিত্রের সাথে এর মিল থাকবার কথা নয়। তবুও আমার লেখা এইসব কাল্পনিক চরিত্রের সাথে যদি কারো ব্যাক্তিজীবন মিলে যায়, সেটা নিতান্তপক্ষে কাকতাল মাত্র। আমি সিকদার ডায়মন্ড দেবদারু’র লেখক হিসেবে এই মর্মে প্রত্যয়ন করছি যে এটা শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র কল্পনাপ্রসূত চরিত্র বা ঘটনার উপর ভিত্তি করে লিখা। যদি কেউ এর সাথে অন্য ঘটনা বা ব্যক্তির মিল খুঁজে পান বা পেয়েছেন বলে মনে করেন, সে দায় নিতান্তই তার। ধন্যবাদ।

লেখক

নিধি নতুন নতুন রমনা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ঢাকায় আত্মীয়হীন হওয়াতে তাকে হলে উঠে যেতে হয়েছে। রুম না পাওয়ায় গণরুমেই দিন যাপন করতে হচ্ছে ওকে। এসব নিয়ে ওর কোনো অভিযোগ থাকতো না, যদি না তাকে রোজ রোজ কোনো একটি বিশেষ দলের মিটিং মিছিলে যেতে না হতো। নিধি এসবে যারপরনাই বিরক্ত হলেও মুখ খুলে না, হোস্টেলের সিট হারাবার ভয়ে।

নিধির সাথে সেদিন আমার পরিচয় হয়েছে ক্যাম্পাসের মুকুল তলায়। ক্যাম্পাসের এদিকটায় বছরের এমন সময়ে আমের মুকুল ঝরে পড়ে থাকে বলে এমন নামকরণ করা হয়েছে। আচ্ছা, আমার সামনে এমন একটা সুন্দরি মেয়ে থাকতে আমি কেন মুকুলতলা নিয়ে অনবরত ভাবছি! নিধি একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘ভাইয়া কেমন আছেন?’ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই, ‘ভাইয়া’ ডাক শুনে ঘাবড়ে যাই আমি। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলি, ‘আমরা কি পূর্ব পরিচিত?’

নিধি অবাক হয়ে বলে, ‘ভাইয়া, আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি, না?” আমি সংকুচিত হয়ে যাই ভেতরে ভেতরে, বড্ড অপরাধবোধ কাজ করে। আমি নিধিকে চেনার চেষ্টা করি, স্মৃতি হাতড়াই। কিছুতেই কিছু মনে পড়ছে না আমার। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে নিধিকে ‘স্যরি’ বলতে যাবো, এমন সময় নিধি বলে ওঠে, ‘আমি সুনয়নার বোন’।

নিধির মুখে সুনয়নার কথা শুনে এক মুহুর্তের মাঝে নিভে গেলাম আমি। চোখের সামনে দিয়ে গেল একরাশ ফ্ল্যাশব্যাক। সুনয়না আর আমি, মানে আমরা ছিলাম সবচেয়ে ভালো বন্ধু। না, এটা বললে মিথ্যে বলা হবে। আমরা বন্ধু ছিলাম না। তবে কী ছিল সুনয়না আমার? আমাদের কি প্রেম ছিল? কই, না তো! আমরা কেউ কাউকে ভালবাসি বলি নি কখনো।

সুনয়না আমাদের পাড়ার সবচেয়ে শান্ত ও সুন্দরী মেয়েটির নাম। আমরা একই ক্লাসে পড়তাম, একই টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়তে যেতাম। কবে কখন কিভাবে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল, মনে নেই। মনে থাকবার কথাও না।

নিধি ভাইয়া বলে ডাকতেই, সম্বিৎ ফিরলো আমার। ‘ভাইয়া, আমি এখন যাই। আজ আবার পলিটিক্যাল মিটিং আছে, আমাকে যেতে হবে।’

‘যাও’, আমি বলি। সুনয়না চলে যায়। স্যরি, নিধি চলে যায়। আজ সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে নিধিকে ডাকি। ডেকে বলি, ‘আমি কি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসতে পারি?’

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই’ – বলেই নিধি হাঁটতে শুরু করে। আমিও পোষমানা কুকুরের মতো পেছন পেছন হাঁটি।

ভাবনার জগৎজুড়ে আবার সুনয়না চলে আসে। অথচ আমি নিধির পেছনে হাঁটছি।

সেইদিন নিধিকে হলের সামনে পৌছে দিয়ে আমি কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। নেশায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিলাম, এই নেশা ভালোবাসায় ডুবে থাকবার। সুনয়নার চেহারাও ভুলতে বসেছিলাম যখন, ঠিক তখনই নিধির সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে আমার স্মৃতিতে আবারো কিছু দিনের জন্যে বেঁচে উঠলো সে।

আমি বাংলা একাডেমি পেরিয়ে মঙ্গলের দিকে যাই, এটাই আমাদের আড্ডার জায়গা। আমরা মানে কতোক ভ্যাগাবন্ড। যাদের সারাদিন আড্ডা ছাড়া কাজ নেই বললেই চলে। আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, এই মঙ্গল আবার কোন জায়গা। এটা একটা গাছের নিচে চায়ের দোকান। নুরু মামা এই দোকান চালায়। তবে এরকম নামের কারণটা আবার খুব সাধারণ। পরে সময় করে সেসব কথা বলা যাবে খন।

আমি ওখানে গিয়ে বসতেই, জুয়েল এক কাপ চা ধরিয়ে দেয় আমাকে। আমি জুয়েলকে বলি আমার পকেটে পয়সা নাই। জুয়েল হাসি দিয়ে বলে, ‘কাকায় আপনাকে আসলেই চা দিতে বলছে’। কেন বলেছে, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল না।

কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে হাঁপাতে ওখানে এলো প্রলয়। প্রলয় একজন উঠতি কবি, প্রথম বই বেরিয়েছে গতবার বইমেলায়। ছেলেটা বোকাসোকা হলেও তার লিখা আর লেখালেখি নিয়ে প্যাশন আমাকে ভাবায়। সে এসেই জানতে চাইলো, আমি কিছু জানি কি না। আমি রিপ্লাই করলাম কী জানবার কথা প্রশ্নের মাধ্যমে।

‘ভাই, একটা কথা’। ‘কী কথা?’ ‘ভাই এইবারের অন্যচোখ ম্যাগাজিনের তারুণ্য সংখাটা পড়ছেন?’ ‘না, পড়ি নি। কেন বল তো?’

‘সাদিয়া একটা কবিতা লিখেছে ওখানে, একটা মানে অনেকগুলো।’ ‘তো! কী হয়েছে?’ আমি বলি। প্রলয় জানায় কবিতার লাইন নাকি অন্য লেখকদের জন্যে ক্ষতিকর।
আমি বলি, ‘দুই এক লাইন পড়ো’।
প্রলয় পড়তে শুরু করে। কবিতার লাইন গুলো এরকম – “আমাকে ঘিরে ধরছে…….”

আমি চুপচাপ প্রলয়ের আবৃত্তি শুনি। খুব রসিয়ে রসিয়ে পড়ছিল সে। আমি ম্যাগাজিনটি হাতে নিয়ে দেখি তাতে জনা কয়েক কবি, সাহিত্যিক ও চিত্রকর এবং নাট্যকার এর নামে যা তা লিখা। প্রলয় উৎসুক চোখে আমায় দেখে। আমার মন খারাপ হয়ে যায়। আমি চুপচাপ বসে থাকি, চুপচাপ বসে থাকে প্রলয়।

রোমেল আর অবনী আসে হাত ধরাধরি করে। হাসতে হাসতে। আমি ওদের উচ্ছ্বল প্রেমময় জীবন দেখে আপ্লুত হই। উঠে দাঁড়াই। প্রলয়কে বলি, ‘চল, যাই’। ও জানতে চায়, ‘কোথায় যাবেন?’ প্রতিউত্তরে আমি বলি, ‘জানি না’।

রোমেল এসে হ্যান্ডসেক করে, অবনী হাগ দেয়। আমি বলি, ‘চললাম’। ওরা বলে, ‘আমরা এলাম আর তোমার যাবার সময় হল?’ আমি বলি, ‘আজ যাই রে, একটু কাজ পড়ে গেছে’। মনে মনে বলি, মন ভালো নেই, কাজ না ছাই।

কয়েকদিন পর, আমি ময়মনসিংহে যাবার জন্যে স্টেশানে দাঁড়িয়ে আছি। নিধি আসে প্লাটফরমে, নিধি আমাকে দেখে না। অন্য ট্রেনে চেপে বসে, হুঁইসেল বাজে। নিজের অজান্তে আমিও চেপে বসি সেই ট্রেনে। আমি জানি না আমার গন্তব্য, তবুও আমি ছুটে চলি অজানায়।

এই যে আমি একদিনের পরিচয়েই একটি মেয়ের পিছু পিছু ছুটছি, এটা আসলে কী? মোহ না কি ঘোর, ভাবতে থাকি। নিধি, সুনয়না, আমি সবাই মহাকালের ট্রেনে উঠে পড়েছি, আমার কল্পনায়। এর মাঝে টিসি এসে ঘুম ভাঙিয়ে পান চিবুতে চিবুতে বলে, ‘টিকেট?’ আমি বলি, ‘নাই’। সে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। আমি জানতে চাই, এই ট্রেন কোথায় যাবে? আর মনে মনে অ্যালেন সাইফুলের যে ট্রেন নরক যায় থেকে আবৃত্তি করি।

ময়মনসিংহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নেমে নিধির পিছন পিছন হাঁটতে হাঁটতে বেড়িয়ে পরি স্টেশন থেকে। হুট করেই দেখা হবার ভান করে নিধির সামনে গিয়ে বলি, ‘আরে, তুমি এখানে?’

নিধি অবাক হয় না। সে বলে, ‘আপনাকে আমি কমলাপুর স্টেশনেই দেখেছি। পিছু নিয়েছেন, ভালো করেছেন। এবার আমার সাথে রিক্সা চেপে বসুন’। আমি সত্যি সত্যি অবাক হয়ে এবার ওর মুখপানে চেয়ে থাকি। ওর মুখে আমি সুনয়নার মুখ দেখতে পাই।

এদিকে রোমেল আর অবনীর বেজায় ঝগড়া চলছে। ওদের দুজনের মাঝে মিল খুব কম, তবুও কী করে ওরা একজন আরেকজনকে এতোটা ভালবাসে! সেটা নিয়ে স্বয়ং বিধাতাও কনফিউজড বলেই আমার মনে হয়।

রোমেল অবনীকে জানায়, কাল রাতে সে কিচ্ছু খায় নি। সিদ্ধি বা মদ কিছুই নয়। অবনীর প্রশ্ন তবে কি সে ইচ্ছে করেই ওর জুনিয়র রুমমেট নিধির মোবাইলে ভালোবাসি লিখে টেক্সট করেছে? রোমেল বলে, ‘কখন পাঠালাম?’ অবনী মোবাইল বের করে স্ক্রিনশট দেখিয়ে দেয়। রোমেল হতভম্ভ হয়ে বসে থাকে মঙ্গলে।

প্রলয়ের সাথে বিথীর ইনবক্সে কথা হয়।

বিথী আবার অনেক কবিদের সাথে মেশে। প্রলয়ের ভাষ্যমতে ওর ঠোঁটে অন্য কবিদের নিঃশ্বাস লেগে থাকে। তবুও আজ প্রলয়ের মন ভালো নেই। অন্য কাউকে না পেয়ে তাই ওর সাথেই চ্যাট করে।

আমার আর নিধির রিক্সা একটি পুরাতন বাড়ির সামনে এসে থামে, আমি ময়মনসিংহ ভালো না চেনায় রাস্তাটার চারপাশে তাকিয়েও ঠিক কোথায় এলাম ঠাওর করে উঠতে পারি না। নিধির কাছে জানতে চাই, ‘তুমি কি আজকেই ঢাকায় ফিরবে? না আমি আমার মতো ফিরে যাবো?’

নিধি বলে, ‘আমি ফিরবো, আপনি থাকেন। ভেতরে আসেন, লাঞ্চের পর একসাথে বেরিয়ে যাবো’। আমি বলি, ‘তুমি যাও, আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। অচেনা মানুষ এর বাড়িতে আমি যাই ন ‘। নিধি বলে, ‘এখানে সুনয়না থাকে’। আমি ভাবতে থাকি, ভেতরে যাবো কি যাবো না।

নিধি ও আমি সুনয়নার বাসা থেকে বেরিয়ে আবার রিক্সা চেপে বসি। স্টেশনে নেমে দু’জন পাশাপাশি টিকেট কেটে একই ট্রেনে ঢাকায় ফিরে আসি। তবুও পুরো ফিরবার পথটায় আমাদের আর কথা হয় না। ঢাকায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায় অনেক। ওকে ওর হলের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যাবার কথা ছিল আমার। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় হলের দারোয়ান গেট খুলে না।

নিধির কেঁদে দেবার মতো অবস্থা হয়। এই প্রথম ফিরবার পর আমি কথা বলি ওর সাথে। বলি, ‘তুমি চিন্তা কইরো না’। নিধি চিৎকার করে ওঠে, ‘আমি চিন্তা করবো না তো কি করবো? এই রাতে আমি যাবো কোথায়?’ আমি নির্ভয় দিয়ে বলি, ‘আমার সাথে’। নিধি সন্দেহের চোখে আমার দিকে তাকায়। জানতে চায় আমার বাসা কোথায়? আমি বলি, ‘গেলেই জানতে পারবে’।

আমি আর নিধি রিক্সা করে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে চলে আসি। নিধি জানতে চায়, ‘এখানে কেন এলেন?’ ওর চোখে ভয় এবং শংকা। আমরা দুজন ইমার্জেন্সিতে ঢুকে মর্গের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। নিধি সাইনবোর্ড পড়ে ভয়ে আমার বাজু চেপে ধরে। আমি মজা পাই আর হাসি। আমার হাসিতে সে মহাবিরক্ত হয়।

নিধিকে নিয়ে বাকিটা রাত আমি গল্প করে কাটিয়ে দিই আইসিইউ’র সামনেকার ফ্লোরে বসে। আমরা গল্প করে রাত পার করেছি বললে মিথ্যে বলা হবে। কিছুক্ষণ পরেই আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে। যেমনটি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেত সুনয়না।

আহ! সুনয়না, সুনয়না! সুনয়নাকে কেন আমি মাথা থেকে নামাতে পারছি না? ওকে এবার আমার মাথার ভেতর থেকে বিদায় দিতে হবে। মনে মনে বলি, ‘যাও সুনয়না, যাও তুমি এবার। আমায় একটু একা থাকতে দাও। প্লিজ, ছাড়ো এবার আমায়’। সুনয়না চলে যায়। আমাদের আর কথা হয় না। নিধির ঝাঁকুনি খেয়ে ঘুম ভাঙে আমার। ‘ভাইয়া, ওঠেন, সকাল হয়ে গেছে। স্যরি, ভাইয়া’। ‘স্যরি কেন?’ ‘আপনার কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’ ‘পড়েছিলে নাকি? আমি টের পাইনি।’

আমরা আবার রিক্সা চাপি। হলের দিকে যাই। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা এতো রিক্সায় কেন চাপি? আমরা আসলে যাচ্ছিলাম নিধির হলে। হুট করেই রিক্সা আটকে ধরে একটি ছেলে। কিন্তু কে এই ছেলে?

সিকদার ডায়মন্ড