প্রত্যাবর্তন

ঘড়িতে বারোটা এক হতেই কাতারে কাতারে মানুষ জমায়েত হচ্ছে স্মৃতি সৌধ প্রাঙ্গণে।সবার হাতে ফুল, শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। আবার রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীরা আসছে মিছিল সহকারে।উঠতি বয়সের যুবকরা বিজয় উল্লাসে বাজি পোড়াচ্ছে, ফটকা ফাটাচ্ছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে ভীড়। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র, জনতা সকল শ্রেণীর মানুষের কলরবে সৃষ্টি হলো এক উৎসব আমেজ। তাই প্রিন্ট মিডিয়া, টেলি মিডিয়া আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৌড়ঝাপও চোখে পড়ার মত।

মৃন্ময় হন্তোদন্ত হয়ে ছুটছে নিউজ সংগ্রহের জন্য। হঠাৎ তার চোখ গেল দূরে শিমুল গাছের তলায় একাকী বসে থাকা এক মহিলার দিকে। মহিলাটি বিড়বিড় করে যেন মন্ত্র পড়ছে আর হাত নাড়িয়ে কি যেন ইশারা করছে। একটু সন্দেহজনক মনে হলো বিষয়টা। তাই মৃন্ময়ের কৌতুহল জাগল মনে। সে বিষয়টা বোঝার জন্য মহিলার পিছন পাশ করে গিয়ে আড়ালে দাঁড়ালো। খেয়াল করল মহিলা একাকী কথা বলছে যেন অদৃশ্য কিছুর সাথে।

হঠাৎ কোনো এক অজ্ঞাত ঘোরে হারিয়ে গেল সে। শার্টে রক্তমাখা এক একুশ-বাইশ বছরের যুবক এসে দাঁড়ালো তার পাশে। মৃন্ময় আৎকে উঠল, জিজ্ঞেস করলো,” একি! আপনার শার্টে রক্ত কেন?”
–আমাকে খুব মেরেছিল ওরা।
–কারা মেরেছিল আপনাকে?
— মিলিটারিরা।
মৃন্ময় অবাক হলো কিন্তু ঘোরের বশে খেই হারালো শব্দের।
পাশ থেকে হঠাৎ মহিলাকে বলতে শুনল সে,
“শাকিল, তুই পালালি কেমন করে?”
— মাগো আমি পালাই নি, ছুটি নিয়ে এসেছি ঘন্টাখানেকের জন্য।
— কেন রে বাপ! আমি যে তোর অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন। আর তুই ফিরে যাবি কেন?
— না মা, তা সম্ভব নয়। আমি এখন ওপাড়ের বাসিন্দা, পৃথিবীটা আমার জন্য নয়।
মৃন্ময় এতক্ষণ এদের কথা লক্ষ্য করছিল। ছেলেটার মুখের কথা আজগুবি লাগলো তার। সে মহিলা কথা বলার আগেই যুবকটিকে আগ বাড়িয়ে প্রশ্ন করলো, “কেন! পৃথিবী আপনার জন্য নয় কেন?”
— আমরা মুক্তি নিয়েছি ভাই।
–আমরা মানে!
–আমি একজন নয় আমরা ত্রিশ লক্ষ।
মৃন্ময়ের কাছে বিষয়টা অদ্ভূত লাগল। মনে মনে ভাবছে, কোনোদুই পাগলের পাল্লায় পড়েছে সে।
মহিলাকে আবার বলতে শুনল মৃন্ময়, “শাকিল তোর উপর বড্ড রাগ হচ্ছে আমার!”
–কেন মা!
— তুই বড্ড দেরী করে এলি যে?
–মা খুব ভীড়তো। ভীড় পেরিয়ে আসতে তো সময় লাগবে, আগামী বছর তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করবো।
— আগামী বছর মানে! তুই কী সত্যিই ফিরে যাবি?

‘বছর’ শব্দটা মৃন্ময়ের কানে তীরের ফলার মত বিঁধল। সে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,”বছর মানে?”
কেউ মৃন্ময়ের প্রশ্নের জবাব দিল না। ছেলেটা একটু বিরক্ত হয়ে,” মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, লোকটা কে? বড্ড বিরক্ত করছে!”
মৃন্ময় একটু লজ্জ্বা পেল। সে ছেলেটার উদ্দেশ্যে তাকিয়ে বলল,” দূঃখিত, আপনার মা একা একা কথা বলছিল দেখে ব্যাপারখানা জানতেই আপনাদের মাঝে এসে পড়েছি। আমি আপনাকে খেয়াল করিনি তখন।
মহিলা এবার মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “একাত্তরের এই দিন থেকে আমার কাছে ফিরে আসার কথা আমার ছেলের। কিন্তু সবাই একাত্তরে এলেও শাকিল আসেনি। আজ এত বছর পর প্রথম এলো।”

মৃন্ময়,মৃন্ময় করে একটা আওয়াজ ভেসে আসছে দক্ষিণ পাশ থেকে। মৃন্ময় সেদিক তাকালো। দেখলো তার সহকর্মী শিশির ছুটে আসছে তার দিকে। সেও হাত নেড়ে তার অবস্থান জানালো। শিশির তার কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ” কী রে! ভীড়ের মধ্যে আলাদা হয়ে গেলি কেন?”
মৃন্ময় হাত দিয়ে শিমুল গাছের দিকে ইশারা করল।
শিশির সেদিকটায় তাকালো এবং বলল, ” কী হলো, পাগলীটার দিকে কী দেখাচ্ছিস!
মৃন্ময় খেয়াল করলো মহিলা একা একাই কথা বলছে। আশেপাশে তাকিয়ে ছেলেটাকে কোথাও দেখতে পেল না।
শিশির তার কাঁধে হাত দিয়ে বলল,” কী হয়েছে?”
— কিছু না। চল সামনের দিকে, নিউজ সংগ্রহ করতে হবে।

এমন সময় মাইকে বেজে উঠল-
“সেই রেল লাইনের ধারে মেঠো পথটার পাশে দাঁড়িয়ে,
এক বৃদ্ধ বয়সী নারী এখনো রয়েছে হাত বাড়িয়ে।”

শ্রী দেব