কাঁধ

ঝিলিক খেয়াল না করে কাদার মধ্যে পা ফেলাতে কিছুটা কাদা ছলকে বাদলের গায়ে ও প্যান্টে লাগলো। বাদল সে দিকে লক্ষ না করে চট জলদি ঝিলিকের হাত ধরে কাঁধে ভর দেয়ার সুযোগ করে দিলো।

যে পায়ে কাদা লেগেছে সে পা নামাবে না। এক পায়ে ভর করে হাঁটো।' কিছুটা সামনে একটা জলের আধার। বৃষ্টির জল জমে বেশ টলমলা যৌবনা ছোট্ট পুকুর হয়ে আছে। অইদিকে নির্দেশ করে বললো, সামনে অই যে খাদে পানি দেখা যাচ্ছে, চলো।’

ঝিলিক বাদলের কাঁধে ডান হাতের ভর দিয়ে খাদের ঢালুতে নেমে এলো। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগুতে হচ্ছিলো।

বাদল জলের কাছে পৌঁছে নিজের হাঁটুতে কাদাযুক্ত পা টা তুলে ওর স্যাণ্ডেল খুলে, পাশে রেখে, অঞ্জলিতে জল তুলে তুলে ওর পা ধুয়ে দিলো। এরপর স্যাণ্ডেলটা পাশ থেকে তুলে, ধুয়ে বললো,
এখন পরো। আর কাদায় পা দেবে না। দেখে হাঁটবে। রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে, জায়গায় জায়গায় পানি জমে আছে।'

ঝিলিক কথা শুনতে শুনতে স্যাণ্ডেলে পা গলিয়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠলো, ‘দেখো! দেখো! অই পাখিটা কী বড়!
তাই না? দেখো, কেমন উড়ন্ত অর্ধবৃত্ত এঁকে এদিকে আসছে!’
হুম! বাজপাখি। আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। এই গাছটায় এসে বসবে। ঠিক ঘুড়ির মত নাটাইয়ে প্রত্যাবর্তন।’
‘যাহ! মনে হয় পাখিটা উনার গৃহপালিত, চেনা। বললেই হয়ে গেলো!’

সত্যি সত্যি কয়েক মিনিটের মধ্যে দুই চক্কর দিয়ে পাখিটা ওদের পাশের পাতা ঝরা গাছটায় এসে বসলো। বোঝা যাচ্ছে, বজ্রপাতে গাছটা মরে গেছে।

ঝিলিক অবাক চোখে জানতে চাইলো,
কী করে বললে, পাখিটা এই গাছটাতেই বসবে?' হেসে উঠে বাদল। পানিতে প্যান্টের কাদা ধুতে ধুতে বললো, ‘জানি, জানি, গণনা জানি। বুঝবে না, কত বড় গণক আমি!’
`যাও! যতসব বাজে কথা। কিসের গণক- টণক! বলো না, কী করে বুঝলে পাখিটা এই গাছে বসবে?’

এবার আর ভণিতা না করে বাদল হাত তুলে গাছটার দিকে দেখালো,
দেখো, ওই দেখো, গাছটায় পাখিটার বাসা। অই বাসাতে অবশ্যই ওর বাচ্চা আছে। আর তুমি যখন কাদা ছিটাচ্ছিলে, তখন আমি তোমার দিকে তাকাতেই পাখিটা ওই বাসা থেকে উড়ে যাচ্ছিলো। বাসাটা তখন চোখে পড়েছে। অতএব মিস, পাখিটা বো হয়ে বাসায় ফিরে আসবে ঘুরে ঘুরে বাচ্চাদের কাছে, এটাই স্বাভাবিক।'
‘আহ! এতো সহজ ব্যাপার! আর তুমি গণক- টণক কত কি বলে আমাকে বোকা বানাচ্ছিলে।’ – বলে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাদলের বুকে ছোট ছোট কিল দিচ্ছিলো।

বাদল উচ্ছ্বসিত হয়ে হা হা হা করে হাসতে হাসতে বললো,
তুমি একটা বোকা মেয়ে।' ঝিলিক বললো, ‘চোখ বন্ধ করো, চোখ বন্ধ করো, তোমার চোখে বড় একটা ময়লা।’

বাদল চোখ বন্ধ করতেই দু’হাতে বাদলের বাহুতে ধরে পায়ের পাতার অংশে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে জিভ দিয়ে বাদলের চোখের পাঁপড়ি থেকে একটা ছোট্ট মরা ডালের অংশ মুখে তুলে, ‘থু' করে দূরে ফেলে বললো, ‘চোখে ঢুকলে এখনই চোখটা ডলে ডলে লাল করে ফেলতে। চলো সামনে এগুই।’ -বলে একটু লজ্জা রাঙা চোখে ওর দিকে তাকালো।
বাদল একদৃষ্টে কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললো,
`চলো।’

ওর খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো, হাত ব্যবহার না করে জিভ দিয়ে কেন চোখের ময়লাটা আনলো! কিন্তু জিজ্ঞাস করলো না। যে ভিন্ন এক অদ্ভূত ভাললাগা অনুভূতি সারা মন শরীরে ছড়িয়ে আছে। থাক না ব্যাপারটা!

আর ঝিলিক ভাবলো, যদি প্রশ্ন করে বাদল তবে বলবে, হাতে তো ময়লা তাই।

ওরা পাশাপাশি কিছুদূর হেঁটে যেতেই খুব জোরে গাড়ি ব্রেক কষার শব্দ হলো পেছনে।
ওরা একসাথে পেছনে ফিরলো।
দেখলো, ওরা বড় রাস্তার যেখানে গাড়ি পার্ক করেছে, তার ঠিক পেছনেই সাদা আরেকটি কার ওদের গাড়ি প্রায় ঘেষে ব্রেক কষেছে। অল্পের জন্য গাড়িতে লাগে নি। সম্ভবত বেখেয়ালে চালাচ্ছিলো।

`এই বাদল! গাড়িটা মাঠে রাখলেই তো পারতে। বন্ধুর গাড়ি। নষ্ট হলে সমস্যা হবে।’

বাদল বুঝলো, ভুল হয়েছে। আসলে এই প্রথম ওরা বেড়াতে এসেছে। আবেগের বাড়াবাড়িতে আপ্লুত ভেতর বাহির। এতো কিছু আর খেয়াল রাখা যাচ্ছে না।

ঝিলিক, তুমি দাঁড়াও। আমি গাড়িটা রাস্তা থেকে নীচে নামিয়ে রেখে আসি।' ‘আচ্ছা।’
`এখানেই থাকো। পাখির বাসাটা দেখো। মানুষের জীবনও এমনই। খাদ্যের জন্য ঘুরে ঘুরে দেখছে পৃথিবী।’

হুম। লেকচার বাদ। যাও, গাড়ি ঠিক করে পার্ক করে আসো। অই বাঁধের মত জায়গাটায় গিয়ে বসবো।'
OK, ম্যাডাম।’

ফিরে এসে বাদল বললো,
কবিতা শুনবে?'
‘বলো।’

“ঝিলিক দিয়েই বাদল নামে
দিন থাকে সময়ের খামে,
কখনও বর্ষা মৌসুমি
কখনও গ্রীষ্মের খরতাপ,
এগিয়ে গেলে দিগন্ত হারায়
এখানেই পথিকের অনুতাপ।”

ওদের ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা রাতের হাত ধরেছে। পাশাপাশি বাড়িগুলো কিছুটা ভূতুড়ে লাগছে। বন্ধুর বাড়ির কাছাকাছি এসে বাদল বললো,
তুমি নামো। এখানে দাঁড়াও। আমি গাড়ি পার্ক করে চাবীটা মাসুদকে দিয়ে আসছি।'
`আচ্ছা, তাড়াতাড়ি এসো। দেরী করো না। বেশিক্ষণ দাঁড়ালে কারো নজরে পড়ে যাবো।’

মিনিট পনের পর রাস্তার আলোয় বাদলের নীল শার্ট কালচে বর্ণে দেখা গেলো, হেঁটে আসছে।

চলো। চোখের ময়লা এনে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।' -বলে, বাদল অন্যদিকে চোখ ফেরালো।
‘তোমাকেও ধন্যবাদ। এতো যত্ন করে পা কোলে তুলে কাদা ধুয়ে দেয়ার জন্য।’ -বলে ঝিলিকের চোখ ছলছল করে উঠলো।

দু’জন হাঁটতে হাঁটতে গলির মাথায় তিন রাস্তার মোড়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো।

দু’জনই একই সময় একই সাথে বলে উঠলো,
`যাই।’

বিপরীত দিকে দু’জন হাঁটতে লাগলো।

ঝিলিক ডাক্তারি পাশ করে সদ্য প্রাকটিস করছে একটা ক্লিনিকে।
আর পারিবারিক কারণে বাদল দু’ বছর গ্যাপ দিয়ে বি.বি. এ অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ছে।

ওরা দু’ দিকে হাঁটা শুরু করতেই এলাকায় লোডশেডিং হলো…

জেবুননেসা হেলেন