ঘুড়ি

আমাকে ৫টা টাকা দিতে পারবি দিদি?

  • কি করবি রে টাকা দিয়ে?
  • ঘুড়ি উড়াবো….
  • আমার হাতে তো এখন টাকা নেই,আচ্ছা দাঁড়া,মায়ের পানের কৌটায় দেখি….

বাবলা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। কানের কাছে ২/১ একটা মাছি ভোঁ ভোঁ করছে, সেগুলো তাড়াচ্ছে। আর মনে মনে টাকা পাবে কি পাবে না সে চিন্তায় আছে।
হিরণ ধীরে ধীরে মায়ের কক্ষে যায়।মা সকালতক পরিশ্রম করে দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানার সাথে দেহের একাত্মতায় ঘুমুচ্ছে। হিরণ মায়ের পানেরকৌটার দিকে চোখ বাড়িয়ে দ্যাখলো একটা ১০টাকার নোট চিৎ হয়ে আছে।ডান হাত বাড়িয়ে এমনভাবে টাকাটা নিলো হিরণ, মা তো দূরের কথা,পানেরকৌটা ও টের পায়নি।

হিরণ হুওওওয়া…..করে পেছন থেকে এসে বাবলাকে ভয় পাইয়ে দিলো।বাবলা তো বেহুশ হবার উপক্রম, সে তো ভয়েই ছিলো দিদির। দিদি টাকা পেয়েছিস?
এটা কটার নোট বলতো?
১০টাকা? ইয়াহু……….
টাকা হাতে পেয়ে বাবলার সে কি সুখ।তারপর দুজন কালুর দোকান থেকে ঘুড়ির সরঞ্জাম কিনে পৌঁছলো হরিলালের মাঠে…….খোলা মাঠে বিশাল আকাশ! ঘুড়িতে ঘুড়িতে আকাশ ঘুড়িময় হয়ে গেলো। শুরু হলো ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা।ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে কারো রশি ছিঁড়ে যাচ্ছে,কারো ঘুড়ি বেঁকে যাচ্ছে ,কারো কারো ঘুড়ি উড়ছেই না আকাশে।

দিদি দিদি…ধর ধর,এ দিকটা একটু ধর..আমি একটু ঘুড়ির চারপাশ ঠিক করে নি

  • তাড়াতাড়ি কর রে বাবলা, মা জেগে গেলে কিন্তু আমাকে খুঁজবে।

এইতো শেষ হলো……আরেকটু শুধু
ঘুড়ি উড়ছে আকাশে।
দিদি,দ্যাখ দ্যাখ,আমার ঘুড়ি সবারটার উপরে চলে যাচ্ছে…..এই দিদি দ্যাখ না, ওই যে উড়ে যাচ্ছে গাঙচিল,ওগুলো কি পাখি রে, দল বেঁধে যাচ্ছে? টিয়ে পাখি মনেহয়, দ্যাখ দ্যাখ প্যালন খেতে কতো কবুতর নেমেছে। আমার ঘুড়িটা এখন কোথায় জানিস? শাদূল্য দির বাড়ির উপর।।

  • এই বাবলা,আমাকে একটু দে না নাটাই
  • আয়, এদিকে আয় ধর….
  • বাহ্ববা, কতো উপরে………..

এই হাবু তোরটা এদিকে ফেরাচ্ছিস কেনো? প্যাঁচ লেগে যাবে, বললো বাবলা

  • প্যাঁচ লাগলে লাগুক,আকাশটা কি তোর বাপের?
  • দ্যাখছিস দিদি দ্যাখছিস,কেমন ঝগড়াটে ছেলে।
  • বাদ দে তো,ওর যেদিকে ইচ্ছে উড়াক।

ঘুড়ি উড়াতে উড়াতে,তারাও উড়তে থাকলো আকাশে-মনঘুড়ি।আহা! সে কি আনন্দের মুহূর্ত। চারদিকে দৌড়াদৌড়ি। হাসাহাসি,খুনসুটি, ঝগড়াও চলছে মাঝেমধ্যে।
আনন্দের সময় দীর্ঘস্থায়ী হয় না। খুউউব তাড়াতে শেষ হয়ে যায়।
পাখিরা নীড়ে ফিরে আসতে থাকে। সূর্য নামতে থাকে পশ্চিমাকাশে।বেলা বয়ে যায় ধীরে ধীরে।

(হিরণ কিছুটা চিন্তায়)
বাবলা, এবার চল,সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। দেরি হলে মা বকবে।
ঘুড়িটাকে নামাবো না?
আরে নামাতে নামাতে দেরি হয়ে যাবে।উড়িয়ে দে। উড়ুক ঘুড়ি।

সন্ধ্যার দিকে বাবলা আর হিরণ বাড়ি ফিরলো।মা তখন ভীষণ রেগে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

  • ফিরেছিস,কোথায় গিয়েছিলি দু অকর্মা?
    বাবলা উত্তর দিলো না।সে মাকে খুউউব ভয় পায়। হিরণ জবাব দিলো
  • সাকিদের বাড়ি গিয়েছিলাম।
  • এএএএইইই….এইইই মিথ্যে বলবি না একদম, সাকি কিছুক্ষণ আগেই তোকে খুঁজে গেলো। ( বাবলা আর হিরণ একে অপরের দিকে তাকালো)
    পানেরকৌটার টাকা কে নিলো?
    বাবলা সহসা উত্তর দিলো
  • আমি নিছি মা
    হিরণ বললো
  • না মা,টাকা আমি নিছি। বাবলা ঘুড়ি উড়াতে চেয়েছিল তাই
  • না মা আমি নিছি

বলার আগেই মা দৌঁড়ে এসে হিরণের চুলের ঝুটকি ধরে হেঁচড়াতে থাকলো এবং মারতে মারতে বললো

  • ভায়ের জন্য দরদ না, সারাদিন কি কাজ করিস? একটা কাজ বললে তো মুখ মুছড়ে চলে যাস, সারাটাদিন টঅটঅ করে থাকিস,আবার টাকা চোখে পড়লেই লোভ সামলাতে পারিস না………..

অনেক মার খেয়েছে সেদিন হিরণ। বাবলার জন্য মাঝেমধ্যে এরকম মার তাকে খেতে হয়।তবে আজকেরটা বেশি হয়েছে।রাতে খাবার দেয়নি হিরণকে।বোন খেলোনা তাই বাবলাও খেতে চায়নি। বাবলাকে মা গালমুখ টিপে খাইয়ে দিয়েছে।এবং বলেছে,হিরণের পেটে যদি ১দানা খাবার ও যায়,তোর খবর আছে। হিরণ সব কথা শুনছে এবং কাঁদছে আড়ালে। যাতে অন্তত ছোট ভাইটা টের না পায়। বাবলা বোনের পাশে অনেক্ষণ বসে ছিলো। মার বকুনি খেয়ে সে পাশটাও ছাড়তে হলো।

বাবলাকে আজ বোনের সাথে ঘুমাতে দেয়নি। মার সাথে ঘুমাতে হলো। রাত বাড়তে থাকে। হিরণের কান্নার শেষ হয়না। মায়ের মৃত্যু এখনো চোখে ভাসে তার। কি নির্মম মৃত্যু! চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দ্যাখেছে হিরণ। বাবা তার এতো নিষ্ঠুর ছিলো। মানুষ মানুষকে কিভাবে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে,তা স্বচক্ষে দ্যাখেছে হিরণ। বাবা তার কতো নির্লজ্জ, মায়ের মৃত্যু সপ্তাহ পার হয়নি,আরেকটা বিয়ে করেছে।
বেড়ার ফাঁক দিয়ে শোঁ শোঁ করে বাতাস ঢুকছে।
সে বাতাস হিরণের গায়ে লাগেনা।কষ্টের রাত শেষ ও হয় না।
মা আমাকে নিয়ে যাও,তোমার তারার দেশে,মা হীন এ পৃথিবী নরকের সমতুল্যা।এ নরকে থাকতে চাই না মা,আমাকে নিয়ে যাও, বলতে বলতে হিরণ কাঁদছে।

ভোর হলে,বাবলা তাড়াতাড়ি বোনের কক্ষে যায়। দ্যাখে বিছানা খালি। তার প্রিয় দিদি নেই।মার খেতে খেতে হয়তো মায়ের মতো তাকেও একদিন মরতে হতো,তা ভেবেই হিরণ হয়তো ছেড়ে গেছে ভায়ের বন্ধন।
সারাদিন অনেক খুঁজে ও হিরণের দ্যাখা পেলোনা বাবলা। ভাইকে এভাবে ছেড়ে যাবে হিরণ,বাবলা কোনোদিন ভাবেনি কিন্তু নিয়তি তাকে আজ ভাবিয়েছে।

বাবলা একা হয়ে গেছে,খুউউউব একা…………
আকাশে এখনো ঘুড়ি আছে,ঘুড়ি উড়ে……যে ঘুড়ি উড়তো চার হাতে তা এখন উড়ে দু’হাতে,তাতে আনন্দ নেই।কেবল আকাশ চেয়ে থাকা।গাঙচিলের মতো সে ও ঘুড়ির সাথে একা একা উড়ে। মাঠ ভরা লোক,অথচ বাবলা খেলার সাথী খুঁজে পায় না।

শিশির মোরশেদ