জন্ম-মৃত্যুর রণাঙ্গণে কবিতার তিরন্দাজি

 Hornby এর অভিধান অনুযায়ী; সাহিত্য হচ্ছে একটি দেশ বা কাল- এর ঐসব রচনাবলী, যেগুলোর সুন্দর অবয়ব ও আকৃতির জন্য স্থায়ী মূল্যমান ও মর্যাদা রয়েছে।

মানবজাতীর জীবন বাস্তবতা ও অস্তিত্বের প্রধান একটি অংশ হচ্ছে সাহিত্য- সংস্কৃতি। যা জীবনের অপরাপর বোধের সংবহন। সাহিত্য বলতে বিশেষ একটি তাৎপর্য বুঝায়। “Hornby এর অভিধান অনুযায়ী; সাহিত্য হচ্ছে একটি দেশ বা কাল- এর ঐসব রচনাবলী, যেগুলোর সুন্দর অবয়ব ও আকৃতির জন্য স্থায়ী মূল্যমান ও মর্যাদা রয়েছে।” আর সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্থানটি দখল করে আছে কবিতা। কেননা কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের বাজুবন্ধন, ভাব এবং ভাষাকে যতটা গভীরে নিয়ে যায়, গদ্য তা পারে না। তাই কবিতার যেই সম্মোহন ও আবেদন তা নেই অন্যত্র। কবিতা প্রেমিকার মুখের মতো;  পাঠককে কাছে টানে প্রেমিকের মতো এবং জীবনীশক্তি দান করে। অর্থাৎ কবিতায় যতটা আছে মোহন-শক্তি, সৌন্দর্য তারও বেশি বোধের সরঞ্জাম। যার ফলে পরিপ্রেক্ষিত তৈরী হয় মনোস্ফীতির। কবি মুসা আল হাফিজের কবিতা পাঠে এমন এক কবিকে চেনা যায়- যার কবিতা আসে মুক্তির আনন্দে হাসতে হাসতে মৃত্যুর জন্মদিনে। রমণীর ডায়েরী দিয়ে যে কবিকে চিনতে শুরু করি। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতাগ্রন্থ মৃত্যুর জন্মদিন আজ আমার হাতে। কবিতায় কী বলতে চেয়েছেন কবি? মৃত্যুর জন্ম ঘটানো কি পরাবাস্তবতার কোন প্রয়াস? নাকী শুধু মাত্র দর্শনের ছাপচিত্র? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে হবে গ্রন্থনাম থেকে।

আদিকাল থেকে এই যে আমাদের বিশ্ব, এ আসলে বিবর্তনের প্রতিফলন। এবং এই বিবর্তনে অঙ্গাঙ্গিভাবে মিশে আছে কবিতা। কবিরা হয়ে থাকেন সর্বকালের যোগী, সাধক এবং নিজ সত্ত্বার আপন স্রষ্টা; যে সত্ত্বা বসবাস করে নিসর্গের প্রতিটা স্তরে। এটি যেমন এক ধরনের মেডিটেশন তেমনি অভিযানও। কবি সত্ত্বা মানেই ধ্যানের নিকেতন সাধনারূপ প্রস্রবণ। কেননা ধ্যানের মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র, জীবনের সংগতি-অসংগতি কাব্যে ধারণ করে কবি নিরাময়ের যে চেষ্টা প্রচেষ্টা করেন তাই সাধনা বা মেডিটেশন। আর এই অর্থে অভিযান যে কবিরা সত্ত্বার আবেদনকে নিসর্গের ধ্বমনিয়তায় রাখতে চান কাল থেকে কালান্তরে। মৃত্যুর জন্মদিনে কবি মুসা আল হাফিজ এ কাজটিই করতে চেয়েছেন তার কাব্যিব উপমেয়তায়। মৃত্যুর জন্মদিন- এ কোনো মৃত্যু নয়। একটি সীমা- যেখানে পৃথিবী তার সীমানা হারিয়েছে। একটি গতিবিধি- বাতাস যেখানে থমকে আছে বহনিয়তায়। একটি স্রোত- নদী তার ধারাকে হারিয়েছে যেখানে। বিশাল এক ঢেউ- অনুচ্ছ্বাসিত সমুদ্র যেখানে মরুকাঠ। যেখানে অসহায়, অবোধ মানুষ ঠিক সেখান থেকেই উচ্চারিত হয়েছে মৃত্যুর জন্মদিন। তার প্রতিপাদ্য হিসেবে কবিকে আমরা তখনই উপস্থাপিত করতে পারি- যখন কবি জড় পৃথিবী পার হয়ে উচ্চারণ করেন—

ব্যক্তির আয়তন কত?
জান বিশ্বগ্রাম!
(সীমা)

এবং মৃত্যুর ভেতর জন্মের স্বতঃস্ফূর্ততা বুঝতে পারি- কবি যখন মৃত্যুর বুকে ঝাঁপ মেরে বেপরোয়া ভাষ্যে উচ্চারণ করেন-
মৃত্যুকে মানতে পারি
জীবন থেকে বিরতি মানি না
(মানা না মানা)
.
মৃত্যুর জন্মদিন কাব্যগ্রন্থে পরাবাস্তবতার আদলে কিছু কবিতা এলেও দর্শনের স্থানটি বিশেষ ভাবে দৃশ্যমান। তবে শুধু দর্শন দিয়ে কবিতা হয় না- তেমনি দর্শনহীন কবিতাও পূর্ণাঙ্গ কবিতা নয়। অনেক কবিতায় দেখা যায় কবিতা শুধু কবির দর্শনের কথা বলছে, আবার কবি দশর্নের কথা বলছেন না ঠিক, কিন্তু কবিতার খণ্ড খণ্ড অংশগুলো একেকটা দর্শন হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতাটি। দর্শনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এমন কবিতার কথা বললে বলা যায় আল্লামা ইকবালের কবিতার কথা। ফরহাদ মজহারের এবাদতনামার কথা। দর্শনপ্রধান সাম্প্রতিক কবিতার এক সবল উদাহরণ কবি মুসা আল হাফিজের পরম সাঁতার কাব্যগ্রন্থের আরেক পৃথিবী কবিতাটি। এতে কবি এবং দার্শনিকের মেলবন্ধন রচিত হয়েছে। এটা সত্য যে, কবি এবং দার্শনিকের মাঝে আছে যোজন দূরত্ব। কবির কাজ হৃদয়ে আর দার্শনিকের বুদ্ধির। কবি সৃষ্টি করেন সৌন্দর্য আর দার্শনিক পৃথিবীর ভাবগত সৌন্দর্যের রহস্য উদঘাটন করেন। এ নিয়ে শীশচন্দ্র দারুণ কথা বলেছেন- “লেখকের ভাব-কল্পনা যেখানে অপরূপ ও অমূর্ত সত্য নির্দেশ করে সেখানে তিনি দার্শনিক; আবার উহায় যখন সীমায়ীত রূপ রসে নিবেদিত হয় তখন তিনি কবি। লেখকের ভাব-কল্পনার ধূপ যেখানে গন্ধ হইয়া অদেহীরূপে ব্যঞ্জিত হইয়া উঠে- সেখানে তিনি দার্শনিক। আবার ধূপ সুরভি যেখানে জমাট হইয়া বস্তুপুঞ্জরূপে ইন্দ্রিগ্রাহ্যরূপে রূপময় হইয়া উঠে তখন তিনি কবি। একজন কবিকে পাঠের পাশাপাশি পাঠকরে সব’চে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো; কবির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি লক্ষ্যরাখা।- তিনি সমাজ, রাষ্ট্র, জীবনকে কোন চোখে দেখছেন এবং তার অর্থ কী? এ প্রেক্ষিতে কবি মুসা আল হাফিজের মৃত্যুর জন্মদিন কাব্যগ্রন্থের চিঠি কবিতাটি দেখা যাক-

অপরূপ তার হাতের লিখন
সেই চিঠি এই মন করেছে হরণ
(চিঠি)

এখানে কবি পরাবাস্তবতার মাধ্যমে মৃত্যুকে দেখেছেন অনুরাগী হিসেবে। যে মৃত্যু প্রেমে, মহীমায় উজ্জ্বল। যার তারুণ্য কবিকে মাতিয়ে যায়। বোশেখি ঝঞ্ঝাার মতো অলিক চুম্বন লাগে কবিসত্ত্বায়। কবি মুসা আল হাফিজ তাঁর কবিতায় এমন কিছু কাজ করেন যা তার কবিসত্ত্বার দৃঢ়তার সাক্ষ্য বহন করে। এই পরাবাস্তবতা প্রবণ কবিতাটির পরাবাস্তবতা Parsonification এর মাধ্যমে কবি একজন প্রেমিক এবং মৃত্যু ঐ নারী যে স্বয়ং কবির প্রেমিকা হিসেবে ব্যঞ্জিত হয়েছে। যে কি-না কবিকে একটা চিঠি লিখেছে মন হরনের হস্তাক্ষরে। কবি ঐ গায়ক প্রেমিকের মতো যে একদা স্ত্রীর চিঠি পেয়ে গান ধরেছিল- চিঠি লিখেছে বউ আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা হাতে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে- যে কবিতার শুরুটাই পরাবাস্তবতা দিয়ে, দ্বিতীয় ছত্রে তা রূপ নিয়েছে দর্শনে। সেখানে চিঠির কথ্যভাষায় বলা আছে-

কিছুই লিখেনি তেমন
শুভেচ্ছা জানিয়েছে আর
বলেছে- আমাকে তোমার
জন্মের অধিক প্রয়োজন
(চিঠি)

আর এই প্রয়োজনীয়তাই একটি দর্শন। বস্তুলোকে- মানুষ তার আকাঙ্খার প্রতি লোভার্ত হয়। সে যা চায়- তার আবেদন পূর্ণ করতেই একনিষ্ঠ হয় তার কর্মে, সাধনায়, দৃঢ়তায়। কিন্তু কবি এখানে বিরোদাভাসের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন মৃত্যুর অনিবার্যনিয়তা যা অর্থব্যঞ্জনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে; জন্মকে ধারণ করেছে। যার কারণে কবির বর্ণনা মূল হচ্ছে- এ মৃত্যু ফলত মৃত্যু নয়। কেননা যেই মৃত্যুর সূচনা জন্মসূত্রে গাঁথা- তা মূলত মৃত্যু ফলত জীবন। যে মৃত্যুকে মনসুর হাল্লাজ, আল্লামা ইকবালের মতো ব্যক্তিবর্গ অনুধাবন করতে পারেন। কবির এই মৃত্যু পিপাসার কথা আগেই বলেছি যে- মৃত্যু কবির প্রেমিকা যার বুকে প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, অনুরাগ কবিকে চুম্বকের মতো টানছে চুম্বনের মহিমায়। যার বর্ণনাকারী কবি নিজেই—

কেন? কেন? বলে যেই
প্রশ্ন করি তারে
মৃত্যু তার বুক খুলে দেখায় আমারে!
আমি তো অবাক!
আহা এ কোন মরণ?
বুকে তার জীবনেরও বেশি আয়োজন
(চিঠি)

এই চিঠি কবিতার মাধ্যমে কবি মুসা আল হাফিজ নিজেকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করেছেন। কেননা ইতিপূর্বে কবিকে কেবল অর্থালংকার, শব্দালংকার, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আবিষ্কার করা গেছে কিন্তু এই কবিতাটি শুধু আধ্যাত্মিকতা দর্শন বা পরাবাস্তবতার মাধ্যমে হৃদয়াঙ্গম করা সম্ভব নয়। কারণ তার ভেতর লুকিয়ে আছে আরেক রহস্য যা কেবল অনুভূতির মাধ্যমেই হৃদয়াঙ্গম করা যায়। এ কবিতার শেষ ছত্রটি- ‘বুকে তার জীবনেরও বেশি আয়োজন’ যা একটি দর্শন। এটি বক্রোক্তি প্রবণতার সাথে পাঠককে মোহমুগ্ধ করে এবং মৃত্যুর মহিমা বর্ণনা করে।

দুই.
কিন্তু এ কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলোর ব্যাপ্তি হলো আধুনিকোত্তর কবিতায়। বর্তমান কালের যে সকল কবিদের চয়ন করা যায়- তাদের স্বর্ণযুগ হলো তিরিশের কবিরা। কেননা তিরিশের কবিরা আধুনিকতার যেই জোয়ার তোলে ছিলেন- আধুনিকোত্তর কবিতা তারই রূপ এখানে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। চল্লিশের কবিদের মাঝে কিছু অংশক থাকলেও অধিকাংশ কবিই আটকে যান নগরকেন্দ্রিক আবদ্ধতায়। আবার পঞ্চাশের কবিরা কবিতায় তত্ত্বকে বাদ দিয়ে তত্ত্বহীন এক তত্ত্বের প্রচার করছিলেন হয়ত অভিনবত্বের প্রয়াসেই। ১৯৭০ থেকে যে ভূমি অভিমুখী যে সাহিত্য প্রবাহের সৃষ্টি। ঔপনিবেশিক আধুনিকতার বাইরে সে সাহিত্যের প্রয়াস তার কারণ পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলন। রাজনৈতিকভাবে তা ব্যর্থ হলেও চেতনায় আঘাত করতে পেরেছিল আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বাংলাদেশে নতুন সাহিত্যচিন্তার-সচেতনার সূচনা করতে পেরেছিল। এখানেই আধুনিকতা থেকে উত্তরণ উত্তরাধুনিকতার সূত্রপাত। উত্তরাধুনিক কবিতার একটি বৈশিষ্ট্য লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সর্ম্পক। তিরিশ ও পরবর্তী আধুনিক বাংলা কবিতায় এ সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসছিল, যদিও কিছু কিছু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়- এ ক্ষেত্রে আল মাহমুদ ব্যতিক্রম। তৎসম- তদ্ভব শব্দের চর্চায় এবং নাগরিক কথ্যভাষার সঞ্চালনে সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছিল আধুনিক কাব্যভাষা তখন কবি আল মাহমুদ বাংলা সংস্কৃতির সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে বাংলা কাব্যভাষাকে নিরব পর্যবেক্ষণ করেন। যার ফলে তাঁর আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতাকে করে বিস্তৃত এবং ফলপ্রসূ। কিন্তু উত্তরাধুনিক কবিতার প্রধান লক্ষ্যটি দেশজ অর্থাৎ স্বদেশ ভ্রমণ। যা ১৯৭০ এবং তার পরবর্তী কবিদের মাঝে ব্যাপকতা পায় এবং তা প্রযুক্তি হিসেবে কবিতার তত্ত্বে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক স্থাপন করে। কবি মুসা আল হাফিজের কবিতায় উত্তরাধুনিকতা অথবা স্বদেশ ভ্রমণ-

মায়ের বুকে আগুন জ্বলে উঠলো
মা বলতে কেউ আর রইলো না
আগুনের দেহটাও পুড়তে থাকলো আগুনে!
আমরা আপন তেজে জ্বলে উঠা আগুনকে
অভিনন্দিত করতে করতে আগুনের পাশে বসে শরীর শুকালাম!
এবং
গতকাল শুনলাম জার্সি আর ফুল বলের কানাকানি
জার্সি ফুটবলকে বললো-
Ô তুই ডিজিটাল না এনালগ’
ফুটবল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো-
Ô আমি বাংলাদেশ!’
কেউ ডিজিটাল পায়ে
কেউ এনালগ পায়ে
আমাকে উষ্ঠায়!!
(ফুটবল)

আগুনের মা কবিতাটি পড়লে প্রথমে ভাবনা জাগে কবিতার ফর্ম কী? কিভাবে নির্মিত হয়েছে কবিতার প্লট? একি Parsonification এর কাজ না-কি পরাবাস্তবতা? প্রকৃতির গুণাগুণ হিসেবে অগুণ নিসর্গে একটি অংশ বটে। তবুও – Parsonification থেকে পরাবাস্তবতা প্রাধান্য পায় বেশি। আর এই পরাবাস্তবাদিতার কারণেই এটি উত্তরাধুনিক কবিতা- কেননা পরাবাস্তববাদীদের সাথে উত্তরাধুনিকবাদ কবিদের মিল হলো তারাও বিশ্বাস করেন- কবির নৈতিক, রাজনৈতিক- সামাজিক দায়িত্ব আছে। কিন্তু উত্তরাধুনিক কবিরা পরাবাস্তবাতাকে বাস্তবায়িত করার পরিবর্তে কল্পনা এবং বাস্তবতার দ্বন্দ্ব উপস্থাপনা করে থাকেন। আগুনের মা কবিতায় পরাবাস্তবতা এসেছে প্রতীক ধরে এবং কবিতাটি পূর্ণতা পেয়েছে রূপতত্ত্বে। বলতে পারেন রূপ তো দৃশ্যমান আবার এও বলতে পারেন প্রকৃতির দান কিম্বা বলতে পারেন রূপ তো আলোচনা-পর্যালোচনার শর্ত সাপেক্ষে প্রকাশ পায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো- রূপ কল্পনার সাথে সম্পর্ক যুক্ত। ভাবের পরিস্ফূটন যতই বিমূর্ত হোক না কেন তা কোন না কোন ভাবে মূর্তিত যা কল্পনার সাথে সংবলিত তা ভাবের প্রকাশে মূর্তিত রূপ ধারণ করে। ১৯৭০ ও তার পরবর্তী কবিরা রাজনৈতিক বা স্বদেশিয় চিন্তার যে উদ্ভব ঘটিয়েছেন তার অনেকটাই নজরুলিয় উচ্ছ্বাস বা বলিষ্ঠতায় সংমিশ্রণ হয়েছে। কিন্তু নব্বই ও তার পরবর্তী কবিরা যে নতুনত্ব আনতে চেয়েছেন যা এনেছেন তা উত্তরাধুনিকতার জন্য শুভনিয় এবং এই যাত্রা অবধারিত ভাবে চলছে। তার ধারাবাহিকতায় মৃত্যুর জন্মদিন ভিন্ন একটি প্রয়াস কবিতার নানান প্রযুক্তির মিশেলে। আগুনের মা কবিতাটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর দারুণ একটি পর্যালোচনা। রাষ্ট্রের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এবং শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকে সামাজিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে। কিন্তু দেখা গেলো- আমাদের নগরায়নকেই আমরা উন্নতমানের জীবন ব্যবস্থা হিসেবে ধারণ করেছি যার কারণে প্রতিদিন কোন না কোন বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। নগরায়নের নামে আমাদের সমাজে একদল শিল্পপতি চষে খাচ্ছে শ্রমজীবি মানুষকে কিন্তু আমরা একেই উন্নয়ন এবং সুফল ভেবে গ্রহণ করে নিয়েছি। দেখা যাচ্ছে একদিক দিয়ে যেমন প্রাকৃতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে মানুষ তেমনি কৃত্রিম ভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই নগরায়ন এবং সামাজিক উন্নয়ন এই দুটিকে কবি দেখেছেন আলো (সামাজিক উন্নয়ন) আগুন (নগরায়ন) হিসেবে। আর আমরা নগরায়নকে গ্রহণ করে নিয়ে বহন করে বেড়াচ্ছি যা কবি তাঁর কবিতায় উদ্ধৃত করেছেন—

আমরা আপন তেজে জ্বলে উঠা আগুনকে
অভিনন্দিত করতে করতে আগুনের পাশে বসে শরীর শুকালাম
(আগুনের মা)
.
তিন.
কবি মুসা আল হাফিজের ঈভের হ্রদের মাছ কাব্যগ্রন্থটি ছিল প্রকৃতি সংলগ্ন কাব্যসম্ভার এবং পরম সাঁতার কাব্যগ্রন্থটি ছিল আকাশ এবং পৃথিবী ভ্রমণ কিন্তু মৃত্যুর জন্মদিন স্বদেশ থেকে বিদেশ ভ্রমণ করেছে মানবতার জাগরণ নিয়ে, সভ্যতার আলোড়ন নিয়ে।

বর্ণবাদের বিজ্ঞাপিত এই সব দুধ নাসিকায় নিয়ে আসে নরবলির ঘ্রাণ!
যান্ত্রিক খামারে যদি শ্বেত এই গাভীর ওলান থেকে
আরো নামে উদ্বেল দুধ, আমি তার ফেনায় দেখি নিগ্রোর মুখ!
(নরবলির দুধ)

কবিতাটির আলোচনার পূর্বে কবিসত্ত্বা নিয়ে মহাত্মা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের দুটি কথা স্মরনে রাখা যাক যার সথে এই কবিতা এবং কবি একাত্মাভূক্ত— এক. ‘প্রাত্যহিক জীবনের ভেতর ‘জীবনের অধিক জীবনের’ অপার্থিব আবির্ভাবে শিউরে ওঠার মতো একটা হৃদয়’। দুই. ‘সেই ছাপিয়ে ওঠা হৃদয়কে কবিতার সম্পন্নতায় ফুটিয়ে তোলার মত কমবেশি লাবণ্য।’ যারাই কবিতা লিখে, সবার কবিতায়ই কিছু না কিছু লাবণ্য দিয়ে হাজির হয়। প্রশ্ন হতে পারে যারাই কবিতায় কিছু না কিছু বর্ণিল ছটা দেখাবেন, আমাদের চেতনায় সুবাস ছড়াবেন, তারা সকলেই কি কবি? সত্যিকার কবি? বস্তুত সামান্য কিছু ছটা আর বর্ণিলতা দিয়ে মনে দাগ রাখলেই কবিতা হয় না; বরং কবিতার কিছু উপাদান বা প্রযুক্তি দিয়েই তা করা যায়। তবে দু’একটা প্রযুক্তির ব্যবহার কবিতা নয়। তাহলে সত্যিকারের কবি কে? সত্যিকারের কবিকে চেনা যায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর ভাষায়- তিনি বলেন; ‘যিনি সত্যিকার কবি, তাকে একটি আলাদা জগতের ছবি উপহার দিতেই হবে পাঠককে।’  হ্যাঁ, সত্যিকার কবি অন্যের রাজ্যের প্রজা না হয়ে শব্দে, চিত্রে, রূপকল্পে নিজের জগত তৈরী করেন। কবি মুসা আল হাফিজ কী পেরেছেন পাঠকের কাছে উপহার দিতে আপন জগত? হ্যাঁ, পেরেছেন সার্থকতার সাথেই নিজেকে চেনাতে পেরেছেন নরবলির দুধ কবিতায়। তৈরী করেছেন নিজস্ব রোড, রচনা করেছেন নিজস্ব পটভূমি। যেখানে পাঠক দেখতে পান এমন এক কবিকে, যে অজানার গহীন সমুদ্রে মুক্তো কুড়োতে জানে। নরবলি কবিতায় কবি ঘাড়ভাঙা দিন দেখে করেছেন অনুতাপ; তাই বর্তমানের এই মরু ভাস্কর্যের চেয়েও ভালোছিল ঘাড়ত্যাড়া রাত। অর্থাৎ সেই বিপ্লবী সময় যখন ছিলো অগ্নিদগ্ধ পরিবেশ। যেখানে ছিলো ব্যক্তি জীবনের উচ্ছ্বাস । তার ভেতর ছিলো একটি সমাজের উত্থান,একটি রাষ্ট্রের উত্থান, স্বাধীনচেতা মানুষের হুংকার। যেখানে মৃত্যুভয় করেছে জীবনকে। যেখানে ছিলো সমাজ, রাষ্ট্র পালটে দেবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সৈনিক। এখন এক ঘরে হয়ে গেছে বর্তমান। হারিয়ে গেছে স্বাধীনচেতা মানুষ গুলো- যার কারণে বৈষম্য, বর্ণবাদ পাহাড়সম মাথা তুলে দাঁড়িয়ে—

বর্ণবাদের বিজ্ঞাপিত এই সব দুধ নাসিকায় নিয়ে আসে নরবলির ঘ্রাণ!
যান্ত্রিক খামারে যদি শ্বেত এই গাভীর ওলান থেকে
আরো নামে উদ্বেল দুধ, আমি তার ফেনায় দেখি নিগ্রোর মুখ!
(নরবলির দুধ)

কিন্তু এই বর্ণবাদ বৈষম্যের প্রতিবাদে এই কবিতা একজন সৈনিক। যে শতকের পাতায় পাতায় দেখেছে বিপ্লব, অসাম্য, শোষণ, হারানো ঐতিহ্য।
যার বর্ণনা দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন-
করুণ শতকগুলো দেশে দেশে কেঁপে উঠে দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসে!
(নরবলির দুধ)
.
এই যে করুণ শতকগুলোর কান্না, কেঁপে ওঠা আর দুধের ফেণায় ভেসে ওঠা নিগ্রোর মুখের আদল কিংবা রেসিজমের বিজ্ঞাপিত দুধে নরবলির ঘ্রাণ, – এই তো আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা, এই তো ইতিহাস। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের প্রতিনিধি হয়ে সময় ও বাস্তবতাকে এভাবে ছিনে দলামলা করে মানবিক হাত দিয়ে তাকে প্রতিনির্মাণের বাণীভাষ্য, এটাই মুসা আল হাফিজের কবিতা। প্রেম, প্রকৃতি, দর্শন, ইতিহাস, জীবনভেদ ও জীবনবাদ সব প্রবণতা নিয়ে তাঁর কবিতা আবির্ভূত হয়েছে মানবতার মৃত্যুদৃশ্যকে জন্মদৃশ্যে রূপান্তরিত করার তুমুল রণাঙ্গণে। এই রণাঙ্গণে কালো, ধলো, শক-হুন, দ্রাবিড়-নিষাদ সহ পৃথিবীর গোটা মানব পরিবারের প্রেম ও বেদনার তিনি তীরন্দাজ। কবিতা তার সেই তীরন্দাজির নিপুণ শিল্পকলা।

জাকারিয়া প্রীণন