উত্তর-করোনা : আগামী

সেই কবে লেখা হয়েছে ‘রক্তকরবী’, সেই যক্ষপুরীর কথা, সেই ফসল পাকার গান। আর কয়েক বছর পরেই তার শতবর্ষ হবে। তার আগে কবি ইউরোপ-আমেরিকার ধনতান্ত্রিক সভ্যতাকে অনুভব করেছিলেন অন্তর দিয়ে। এই ‘টাইটানিক ওয়েলথ’ ভালোও লাগেনি তাঁর। অথচ দেশে ফিরে এসে দেখলেন মানুষ ছুটছে সেদিকেই! ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় গ্রাম বিপন্ন, সব ছুটছে চটকলের দিকে। তারপর তারাশঙ্করও দেখিয়েছেন কিভাবে করালী-রা সব কৃষিকাজ ছেড়ে ছুটছে রেললাইনে কাজ করতে। সেই শুরু। ধীরে ধীরে আরো প্রকট হতে থাকে তা।

এই করোনাকালীন কঠিন সময়ে এসবই ঘুরছে মাথার মধ্যে কয়েকদিন ধরে। অবশ্য তার কারণও আছে।

‘একটু সাবধানে থাকিস, খুব দরকার ছাড়া গ্রামের বাইরে এখন আর যাবার দরকার নেই, একটু চিন্তার ব্যাপার তো বটেই!’ – ভাগ্নের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, এই কিছুদিন আগেই যাদের বাড়িতে, মানে গ্রামে গেছিলাম। ও আমাকে অবাক করে বলল ‘আপনাদের কথাই তো আমরা চিন্তা করছি, মাও বলছিল। আমাদের আর কি! আমরা দু-চার মাস, এমনকি ছ’মাস বাজারে না গেলেও কোন সমস্যাই নেই! এক জামাকাপড় ছাড়া, চাল-ডাল- শাকসবজি-মাছ-মাংস-দুধ সবই তো এখানেই’। সত্যি তাই, ধান ভাঙা, গম ভাঙা এমন কি তেল কল – ঘানি যাকে বলে, গ্রামেই আছে।

তারপর শুধু ভাবছি, সত্যিই তো সব গ্রামগুলো যদি এখন লক ডাউন হয়ে যায়? অনির্দিষ্ট কালের জন্য! জীবনধারণের প্রাথমিক ব্যাপারে গ্রাম তো স্বয়ংসম্পূর্ণ! সাধারণভাবে বেঁচে থাকার জন্য ওদের অন্তত কোনদিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না! আর চিকিৎসা এখন এমনিতেই পাওয়া কঠিন, ও গ্রামে থাকলেও যা শহরেও তাই!

কথাপ্রসঙ্গে জানতে পেরেছি ওর কাছ থেকে- মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, কেরল প্রভৃতি শহরে যারা সব কাজের জন্য গিয়েছিল তারা ফিরেছে। ফিরেছে অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়েই! এসব নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেক লেখালেখিও দেখা যাচ্ছে। এই সেদিন দেখলাম, মুর্শিদাবাদের গ্রামের এক যুবক উড়িষ্যার সম্বলপুর থেকে মাত্র ২১ টাকা পকেটে নিয়ে হেঁটে ফিরছে গ্রামে। ফেরার সময় মালিক তার বকেয়া টাকাও দেয়নি। অবশেষে ক্লান্ত-অবসন্ন অবস্থায় উলুবেরিয়ার কাছে সে নজরে এলে স্থানীয় বাসিন্দারা এবং এক সহৃদয় সাংবাদিক তাকে খাইয়ে-দাইয়ে কিছু টাকা দিয়ে বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে দেয়। এরকম ঘটনা হাজার হাজার ঘটেছে, সোশ্যাল মিডিয়াতেই বোঝা যায়। আর দিল্লিতে কীটপতঙ্গের মতো যেভাবে স্প্রে করা হয়েছে তাদের ওপর, তাও অনুভূতিতে অনুরণন তুলেছে অনেকের, সুতরাং তাদেরও কিছুটা অন্তত- এটা হয়তো কষ্টকল্পিত নয়।

কৃষিকাজে লেবার ক্রাইসিসের একটা বড় কারণ ছিল এরাই। গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে প্রকট হয়ে ওঠে গ্রাম্য যুবকের এই শহর যাত্রা। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার বাইরের চাকচিক্যে মুগ্ধ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। লুঙ্গি পরে তো আর মাঠে যেতে হয় না! পেন্টুলুন পরে, স্যুটেড-বুটেড হয়ে কাজ করা যায়! সে হোক না রাত দশটা বারোটা অবধি! আর মাইনে যাই হোক, বাস ট্রাম, বড় বড় হোর্ডিং এ সুন্দর সুন্দর ছবি, একবারে হই হই কাণ্ড। কে না মুগ্ধ হবে! হ্যাঁ, মাইনের প্রসঙ্গ বলছি এজন্যই যে তুল্যমূল্য বিচারে শ্রমের পরিমাণ এবং মজুরি এর হিসেব করলে, শহরের তুলনায় গ্রাম অনেক ভালো। কেননা ধনতান্ত্রিক বা পণ্য কাঠামোয় শোষণটা বড় ইন্টেলেকচুয়াল, বোঝা খুব কঠিন! আর একসঙ্গে বেশ কিছু টাকা হাতে পাওয়া আপাতভাবে খুব ভালো লাগলেও তারজন্য সব ছেড়ে এসে যে জীবন তাদের যাপন করতে হয় সে বিষয়টা তারা ভাবে না কখনোই। ভাবার কথাও না। কেননা নাগরিক নিয়ন আলো আর কৃত্রিম সৌন্দর্যের ভুলভুলাইয়া এমন চোখ ধাঁধানো যে সে হিসেব মাথায় আসার কথাই না। আর তাই এইসব সন্তান, নিজেরই বড় করে তোলা এই উৎপাদন, শহরে চলে গেলে গ্রামগুলি ভুগতে থাকে রক্তাল্পতায়।

আবার আজকের কৃষিব্যবস্থায় যে যান্ত্রিক প্রয়োগ (ট্রাক্টর, ফসল কাটার মেশিন বা ঝাড়াই মেশিন প্রভৃতি) যার লভ্যাংশের অধিকাংশই যায় শিল্পপতিদের ঘরে, তাও আসলে এই লেবার ক্রাইসিসের ফলে। এমনকি যে রাসায়নিকের অত্যাধিক ব্যবহার পরিবেশকে ক্রমাগত দূষিত করে তুলেছে, তাও যুক্ত এই লেবার ক্রাইসিসের সঙ্গেই। কেননা গোবর সার বা জৈব সার যা তৈরি হয় গ্রামেই, তাও যথেষ্ট মজুর সাপেক্ষ। তাই নিরুপায় কৃষকরা এখন সেই ঝামেলায় না গিয়ে রাসায়নিক ব্যবহার করে। ফলে ক্রমশ বন্ধ্যা হয়ে ওঠে গ্রামের মাটি আর ফুলে-ফেঁপে ওঠে শিল্পপতি। চারদিকে শোনা যায় গ্রামপতনের শব্দ।

কৃষিনির্ভর গ্রামগুলির ধুঁকতে থাকার আরেকটি বড় কারণ কৃষিজ পণ্যের দাম। এটা অবশ্যই ভাবার। কারণ উৎপাদনের খরচ যে অনেক সময় ওঠে না -এ কথার সত্যতা অবশ্যই আছে। তা তো হবারই কথা! কারণ রাসায়নিক সার, এবং যন্ত্রের ব্যবহারে তেলের দাম ইত্যাদির যা খরচ -যার অধিকাংশই যায় বড় শিল্পপতিদের ঘরে, তার ফলে চাষের খরচ তো বাড়বেই! এটাও নাকি গ্রাম্য যুবকদের শহরমুখী হওয়ার একটা বড় কারণ। সরকার কর্তৃক এদিকটার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা হলে অবশ্যই ভালো হবে।

তবে, বিষয়টা অন্যদিক থেকেও ভাবার আছে। ব্যাপারটা লেবার ক্রাইসিসের সঙ্গেও জড়িত। কেননা মজুরের সংকট যদি দূর হয় তাহলে যেমন জৈব সার উৎপাদন এবং ব্যবহার সহজ হবে তেমনি যন্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাও কমবে এবং তার ফলে অবশ্যই খরচ কমবে উৎপাদনের। শুধু তাই নয় জৈব সার ব্যবহার বাড়লে এবং কৃষিকাজে যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা কমলে বাঁচবে পরিবেশ, রক্ষা পাবে জীব-বৈচিত্র্য। রাসায়নিক সার বা পেস্টিসাইডের ব্যবহার কমলে জমিতে কেঁচো বৃদ্ধি পাবে আর জমির উর্বরতা বাড়বে এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই! এরকম আরো অনেক কিছুই ঘটবে। আমাদের এই ধরিত্রী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠবে। অন্যদিকে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ কমে যাওয়ায় কৃষকদের লভ্যাংশ কিছুটা বাড়বে তাতেও সন্দেহ নেই।

যাই হোক, ঘরের ছেলেরা ফিরেছে আবার ঘরে, এই করোনার কারণে। এবং ফিরেছে নাকি একটু ‘বড়’ হয়েই! ধনতান্ত্রিক পণ্য সভ্যতার বাইরের চাকচিক্যে ভুলেছিল তারা, মুগ্ধ হয়েছিল বড়ো বড়ো মলময় জগতের জৌলুসে। এখন অনুভব করেছে তার নির্মমতা এবং দুর্গন্ধময় দিক, অন্তত কিছুটা হলেও, এবং তা হয়েছে এই করোনার করুণায়। মাঠে ঘাটেও যাচ্ছে সব। কী আর করার আছে! ফেরার ব্যাপারে তো কিছুই বলেনি মালিকেরা। খুব স্বাভাবিক। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে গোটা বিশ্ব দিশেহারা। এই ভাঙাচোরা অর্থনীতি কীভাবে, কবে আবার জোড়াতালি দেওয়া হবে, কে থাকবে আর কে ছাঁটাই হবে এসব কিছুই বলা যায় না এখন। সুতরাং আপাতত গ্রামেই। আর গ্রামে অন্তত না খেতে পেয়ে কেউ মরবে না আজো, এটা নিশ্চিত বলা যায়।

এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই দেখলাম, এই ক’দিন আগেই, সরকার কৃষিকাজকে নাকি অত্যাবশ্যক কাজের মধ্যেই ফেলেছে! আবার হাবিজাবি চিন্তা মাথার মধ্যে শুধু কাটাকুটি খেলছে! একেবারে প্রাচীন যুগ থেকে মধ্যযুগ-আধুনিক যুগ হয়ে উত্তরাধুনিক পর্যন্ত নানান চিন্তা। একেবারে রাজা-প্রজা, সামন্ত-জমিদার, ধণতন্ত্র-পণ্যায়ন -সব একেবারে ঘোল হয়ে গেল। একসময় ভাবতাম উত্তরাধুনিকের পর আর কীভাবে যুগ বিভাগ হবে, কী নাম হবে তার! হয়তো হবে উত্তর-করোনা যুগ এবং তা সামগ্রিক বিচারেই।

আর উত্তর-করোনা পৃথিবীতে যে একটা পরিবর্তন আসবে সেটা বোঝাই যাচ্ছে। কিছুদিন পরে আরো বোঝা যাবে। প্রকৃতি মাতাও যথেষ্টই ক্রুদ্ধ। তাহলে কি কৃষি-কৃষক-গ্রাম -এইসব আবার…
মানে, কাগজওয়ালারা লিখবে, উল্টে দেখুন পাল্টে গেছে! কয়েক বছর পরেই, ‘রক্তকরবী’র শতবর্ষে সত্যিসত্যিই কৃষকদের কণ্ঠেই শোনা যাবে ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয় রে চলে আয়’!

অধ্যাপক উৎপল মন্ডল
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ, ইন্ডিয়া।