না ।। বাদল সৈয়দ

প্রথম স্টাফ মিটিংটাই মেজাজ খারাপ করে দিলো।
আমাদের ব্যাংক হঠাৎ করে চট্টগ্রামে মার্কেট শেয়ার হারাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের ব্যবসাতে এ শহরটির গুরুত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অতি নামকরা বেশ কিছু শিল্প গ্রুপের হেড অফিস এখানে। তাঁরা এতোদিন বেশিরভাগ লেনদেন আমাদের সাথে করতেন। কিন্তু গত কয়েকমাসে চেহারা বদলে গেছে। বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট অন্যান্য ব্যাংকে চলে গেছেন। হেড অফিস থেকে কয়েকবার তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে, কিন্তু কোন সদুত্তর মেলেনি। তাই পাবলিক রিলেশন হেড হিসেবে আমাকে পাঠানো হয়েছে সরেজমিনে ব্যাপারটি পরীক্ষা করার জন্য। সমস্যা কোথায় তা বের করাই আমার মূল কাজ।
চট্টগ্রাম এলাকার সব ব্রাঞ্চ ম্যানেজাররা এসেছেন। বিশেষ করে কর্পোরেট রিলেশন ম্যানেজারদের এ সভায় অবশ্যই উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সবার সাথে কথা বলে মনে হলো, এরা নিজেরাই হতাশ। সংকট থেকে বের হয়ে আসার ব্যাপারে কারো কোনো প্ল্যান নেই। কোন বুদ্ধিমত্তাও দেখা যাচ্ছে না।
সবার এক কথা, আমাদের ব্যাংক কিছু সুবিধা ক্লায়েন্টদের দেয় না, যা অন্যরা দেয়। তাই হেড অফিসকে এ ব্যাপারে নমনীয় হতে হবে।
মেজাজ গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা হতে দেয়া যাবে না। আমি হচ্ছি পাবলিক রিলেশন বিশেষজ্ঞ। প্রথম যে বিদ্যাটি আমাদের শেখানো হয়, তাহলো রাগ গুণনাশিনী। রাগারাগি করে কোনো কিছু উদ্ধার হয় না, দিন শেষে নিজের রক্তচাপ বাড়ে মাত্র।
আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘অন্যরা যে সুবিধা দিচ্ছেন তা কি ব্যাংকিং আইন কভার করে?’।
কারো কোন উত্তর নেই।
‘আপনাদের নিরুত্তর থাকা বলে দিচ্ছে, কভার করে না এবং দয়া করে এটা মনে রাখবেন, কোন বেআইনি সুবিধা আমাদের ব্যাংক দেবে না। এটা দয়া করে ক্লায়েন্টদের বোঝান। সাথে এটাও বোঝান এ ধরনের বেআইনি কাজ শুধু ব্যাংকারদের নয় তাদেরও ডোবাবে। দরকার হলে গত একমাসে চায়না থেকে কয়টি কন্টেইনারে প্রকৃত পণ্যের বদলে বালু আর ইট এসেছে তার পরিসংখ্যান আমার কাছ থেকে নিয়ে তাঁদের দেখাতে পারেন এন্ড লেট দেম নো হাউ ম্যানি অব ইউর ফেলো ব্যাংকার্স আর বিহাইন্ড দা বার নাও। কজন ব্যাংকার জেলে গেছেন সেটাও বলবেন, এবং এটাও মনে করিয়ে দেবেন তাঁরা একা যাননি, সাথে ব্যবসায়ীরাও সঙ্গী হয়েছেন।’
এরপরই মিটিং শেষ করে দিলাম। এরপর দেখা হবে ওরা কতোটা ক্লায়েন্ট কনভিন্স করতে পারে।
সবাই চলে যাচ্ছে, এমন সময় এরিয়া ম্যানেজারকে বললাম, ‘শামীম তুমি একটু থাকো, কিছু কথা আছে’।
ও দরজার বাইরে পা বাড়িয়েও ফিরে এলো।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমাদের ব্রাঞ্চগুলোতে এসি কতো ডিগ্রি তাপমাত্রায় চালানোর নির্দেশ আছে?’।
অদ্ভুত প্রশ্নে শামীম একটু অবাক হয়ে উত্তর দিলো, ‘সারা বছর ২৫ ডিগ্রি, স্যার। কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন—-’
আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘এ নির্দেশটি কেন হেড অফিস জারি করেছে জানো?’।
‘জ্বি, স্যার। আমাদের ড্রেস কোড মেইনটেইন করার স্বার্থে। এতে বলা আছে আমাদের সারা বছর সাদা বা নীল শার্টের সাথে স্যুট পরতে হবে, সাথে টাই। যাতে গরমে অস্বস্তি না লাগে তাই এ ব্যবস্থা।’
‘কারেক্ট। কিন্তু এক ভদ্রলোক দেখলাম চক্রাবক্রা কালারের ফুল হাতা সুয়েটার পরে মিটিংয়ে এসেছেন। সেই সোয়েটারের ঠিক মাঝ বরাবর আবার ফুটো। এ ডাফারটা কে?’
‘স্যার, ভদ্রলোক আমাদের আগ্রাবাদ ব্রাঞ্চের কর্পোরেট রিলেশনস ম্যানেজার— নাম জমির আহমদ।’
এবার পুরোপুরি রাগ দমানো গেলো না, প্রায় হিসহিস করে বললাম, ‘তোমার সবচে ইমপর্ট্যান্ট ব্রাঞ্চের কর্পোরেট হেড দুনিয়ার সব রঙ মাখানো সোয়েটার পরে অফিসে আসবে, আর চোখে পট্টি বেঁধে তুমি তা সহ্য করবে? তোমার ক্লায়েন্টরা তো ওর সাথে কথা বলতেই চাইবে না। আই আম সরি, ইউ পিপল অল আর ডিসগাস্টিং। এই লোককে তুমি সাবধান করোনি? হেড অফিসে জানাওনি? দিস ইজ কমপ্লিট ব্রিচ অব ড্রেস কোড’।
শামীমের মুখে অপমানের রক্ত উঠে এলো, তারপরও সে তা সামলে নিয়ে বললো, ‘স্যার, আমি ওনাকে কয়েকবার সাবধান করেছি, কিন্তু স্যরি, স্যার, আমি হেড অফিসকে জানাইনি’।
‘হোয়াই?’
‘স্যার, ভদ্রলোক অফিসার হিসেবে খুবই ভালো। উনার মতো কর্পোরেট ফাংশান বুঝেন এমন আর কোন অফিসার অন্তত এ চট্টগ্রামে নেই। তাই আমি চেয়েছিলাম, হেড অফিসে না জানিয়ে নিজেই ব্যাপারটা সামলে নিতে। আপনাদের জানালে ওকে উইথড্র করে নিলে আমারই ক্ষতি। কারণ দেখতে যত আনইম্প্রেসিভই হোন না কেন, এখন পর্যন্ত যেসব ক্লায়েন্ট আমাদের ছেড়ে যাননি, তাঁরা ওনার কারণেই যাননি। সব মিলিয়ে আমি চেয়েছি স্থানীয়ভাবে এটার সমাধান করতে।’
‘তাই! ইন্টেরেস্টিং! তুমি তাঁর কাজে সন্তুষ্ট?’
‘হ্যাঁ, স্যার। ভেরি মাচ।’
‘গুড, কিন্তু শামীম, ড্রেসকোড না মেনে এ উদ্ভট পোশাকে অফিসে আসা খুব একটা মানসিক সুস্থতার লক্ষণ নয়, এবং যত ভাল কর্মীই হোন না কেন, উই কান্ট এফোর্ড টু হ্যাভ আ লুনাটিক অ্যারাউন্ড আস। আমরা আধাপাগল কাউকে ব্যাংকের মতো সেনসেটিভ জায়গায় অ্যালাউ করতে পারি না।’
‘ঠিক আছে স্যার, আমি ওনাকে সন্ধ্যায় আপনার হোটেলে পাঠিয়ে দেবো।’
‘শার্প এট সেভেন।’
‘ওকে স্যার।’
শামীম বিদায় নিচ্ছে, তাঁর চেহারার অপমানিতভাব এখনো পুরো যায়নি। আমি পেছন থেকে ডাকলাম, ‘শামীম’।
‘জ্বি, স্যার।’ ও ঘুরে দাঁড়ালো।
‘আই আম সরি, ইয়াং ম্যান।’
ওর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
‘থ্যাংকিউ, স্যার।’
সন্ধ্যা সাতটায় হোটেলের সুইমিং পুল লাউঞ্জে বসে আছি। জায়গাটি প্রায় পুরো খালি। হোটেলে বোর্ডারও তেমন দেখিনি। এদেরও কি পি আর প্রবলেম? কাস্টমার টানতে পারছে না? নিজের মনে হাসছি, কে যেন বলেছিলেন ‘পি আর ইজ ডেড’, পাবলিক রিলেশনের যুগ শেষ? সম্ভবত রবার্ট ফিলিপস। কথাটা ঠিক নয়। পাবলিক রিলেশন যদি মারাই যেতো, তাহলে আমি এ হোটেলের মৃত ব্যবসা নিয়ে ভাবছি কেন? আ পি আর গাই ইজ অলওয়েজ পি আর গাই— হাহাহাহা।
আমার চিন্তার ভুবন খানখান হয়ে গেল জমির আহমদের মৃদু ডাকে, ‘স্যার——’
আমি ফিরে তাকালাম। ভদ্রলোক সেই সোয়েটার পরে আছেন। চেহারায় কাঁচুমাচু ভাব, নার্ভাস ভঙ্গিতে হাত কচলাচ্ছেন। সম্ভবত তাঁর আমার মতো সিনিয়র কারো সাথে এর আগে মুখোমুখি হতে হয়নি। এই নার্ভাস, পোশাকআশাকে তীব্র অমনোযোগী মানুষটি আমাদের মতো হাই প্রোফাইল ব্যাংকে কীভাবে চাকুরি পেলেন সেটা রীতিমতো গবেষণার ব্যাপার। আমাকে ঢাকায় গিয়ে পুরো রিক্রুটমেন্ট সেটটা নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবা উচিত, কারণ এ ব্যাংকে জনসংযোগে কেউ আগে কান্ট্রি হেড হননি, আমিই প্রথম। আমার প্রথম কাজ হবে রিক্রুটমেন্টে পাবলিক রিলেশন অ্যাবিলিটির ব্যাপারটি ঢুকানো।
তবে শামীম বলেছে, ভদ্রলোক কাজে খুবই ভালো, তাঁর কারণেই অনেক ক্লায়েন্ট এখনো আমাদের ছেড়ে যাননি, তার মানে তাঁদের সাথে এর ভালো সম্পর্ক আছে। তাহলে তাঁকে একদম উড়িয়েও দেয়া যাচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে তাঁর আচরণ আর পোশাক। এটা ঠিক করা গেলে সমস্যা থাকে না। তবে এ লাল নীল ফুটা সোয়েটার পরা কর্মীর খোঁজ পেলে গ্লোবাল হেড অফিস আমারও বারোটা বাজাবে সন্দেহ নেই। আমাদের ড্রেসকোড প্রতিটি ব্রাঞ্চের ব্যাক অফিসে টাঙ্গানো আছে, সেটাও বলা হচ্ছে খুব শিল্পিত ভঙ্গিতে । মার্টি রবিনসের একটি গান সামান্য বদলে দিয়ে বলা হচ্ছে—
A black coat and a white shirt
I’m in a blue, blue mood
I’m all dressed up for the dance
I’m all alone in romance

যারা জানেন তাঁরা বুঝবেন এখানে কী রঙ এর কী পোশাক পরতে হবে তা পরিষ্কার বলা আছে, কালো কোট, সাদা শার্ট কিংবা নীল- এগুলো পরেই রোমান্সে যেতে হবে, তবে ফিঁয়াসের সাথে নয়, ক্লায়েন্টের সাথে। মার্টি রবিনস মূল গানে বলেছিলেন সাদা কোট আর গোলাপি কারনেশন ফুল নিয়ে প্রেমিকার সাথে নাচতে যাওয়ার কথা- আর আমাদের গ্লোবাল হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট সেখানে বসিয়ে দিয়েছে কালো কোট আর সাদা কিংবা নীল শার্টের কথা- ব্যাপারটি খুবই ইনোভেটিভ। এরা এমনিতেই আর সাত ডিজিটের বেতন পায় না।
জমির সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বললাম, ‘বসুন, প্লিজ’।
তিনি বসলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘চা না কফি?’।
তিনি উত্তর দিচ্ছেন না, পায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে আছেন। ভঙ্গিতে তীব্র অস্বস্তি।
আমি বললাম, ‘জমির সাহেব আমার দিকে একটু তাকাবেন?’।
তিনি অবাক হয়ে চোখ তুললেন।
‘শুনেন, ভাই, আমি আপনাকে এখানে আমার সহকর্মী হিসেবে ডাকিনি। সেটা হলে অফিসেই কথা বলতে পারতাম। আমি আপনাকে ডেকেছি অনেকটা বড় ভাই হিসেবে। আমার মনে হচ্ছে আপনি কোন না কোনভাবে তীব্র মানসিক চাপের মধ্যে যাচ্ছেন, তাই আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই।’
‘স্যার!’ তাঁর মৃদু কণ্ঠে বিস্ময়।
‘হ্যাঁ, ইউ আর আন্ডার সাম স্ট্রেস। ভাবছেন, আমি কীভাবে বুঝলাম? আমি সাইক্রিয়াটিস্ট না, তবে এদেশের পাবলিক রিলেশন এক্সপার্টদের তালিকা করা হলে আমার ধারণা আমি প্রথমদিকেই থাকবো। মানুষ নিয়েই আমার কাজ, তাই আমি অনেক কিছুই বুঝি, যা অন্যরা পারেন না। এ কারণেই আমি আপনাকে সাহায্য করতে চাই, কিন্তু তার জন্য আপনাকেও এগিয়ে আসতে হবে। যাক, বাদ দেন, চা না কফি?’
‘চা, স্যার, তবে আমি চিনি খাই না, সুগারের সমস্যা আছে।’
‘গুড, এই তো আপনি সহজ হতে শুরু করেছেন। এটা বজায় রাখুন। আমরা দাবা খেলতে বসিনি যে টানটান উত্তেজনায় থাকবো, তাই না?’
‘জ্বি, স্যার।’ এবার তাঁর ঠোঁটে হালকা হাসি।
আসলে দাবার চাল চলছে। আমি এগিয়ে আছি। এই মাত্র ভদ্রলোককে আড়াল করে রাখা একটি সৈনিককে ফেলে দিলাম। কারণ তিনি হাসছেন। সহজ হচ্ছেন। আস্তে আস্তে তাঁর সব সৈনিককে ফেলে দেয়া হবে এবং সব প্রতিরক্ষা ভেঙে তাঁর ভেতরে ঢুকতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
আমি হচ্ছি কথার গ্রান্ডমাস্টার। ক্যাসপারভ। এ অজেয় দাবাড়ুর মতো আমিও মানুষের রক্ষাবু্হ্য ভেঙেচুরে দিতে পারি।
চা এলো, সাথে কুকি। আমরা চায়ের কাপ হাতে কথা বলছি, ‘ছেলেমেয়ে?’।
তিনি বললেন, ‘দু’টো মেয়ে, স্যার। ওরা কিন্তু আমার রঙ পায়নি, মায়ের রঙ পেয়েছে। গোলাপের মতো সুন্দর’।
‘হা হা হা। আপনি ভাগ্যবান। মেয়ের বাবা হয়ে গাছতলায় জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়।’
‘ঠিক বলেছেন, স্যার।’
‘ভাবি কিছু করেন?’
‘একটা স্কুলে ছিলো, কিন্তু ছেড়ে দিয়েছে স্যার। ছোট মেয়েটা সারাদিন কান্নাকাটি করে, মা ছাড়া থাকতে চায় না।’
‘আমাদের ব্যাংকে কতদিন?’
‘সাত বছর, স্যার। এর আগে অন্য আরেকটিতে ছিলাম।’
‘গুড। এর মধ্যে কোনো প্রমোশন পেয়েছেন?’
‘না, স্যার।’
‘কেন?’
‘আমি জানি না, হেড অফিস জানে।’
‘ওকে, আমি ব্যাপারটা দেখবো। আপনার জোনাল হেড তো আপনার ওপর খুশি। তাহলে তো তাঁর রেকমেন্ড করার কথা।’
‘আগেরজন খুশি ছিলেন না, স্যার।’ তিনি ম্লান গলায় উত্তর দিলেন।
‘কেন?’
‘ঠিক জানি না।’
‘আরেক কাপ চা দেই?’
‘আমি নিয়ে নিচ্ছি স্যার, ধন্যবাদ।’
একে একে ভদ্রলোকের সব সৈনিক ভূপাতিত হচ্ছে। তাঁর ভেতরটা আস্তে আস্তে খুলছে। তিনি সহজ হচ্ছেন। এখন আচমকা রাজা আক্রমণ করতে হবে। এটাও এক ধরনের যুদ্ধ। প্রতিপক্ষকে হতবুদ্ধি অবস্থায় ফাঁদে ফেলতে হয়। এভাবেই ভেতরের কথা টেনে বের করা হয়।
আমি হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টালাম।
‘আচ্ছা বলুন তো আপনার সমস্যা কী? বাড়িতে ফুটফুটে দু’টো বাচ্চা, যদ্দুর বুঝেছি চমৎকার একজন স্ত্রী, তাহলে কী সমস্যা? আপনার চাপটা কোথায়?’
অকস্মাৎ নীরবতা ভিড় করলো তাঁর চেহারায়। একটু আগের সহজভাব উধাও হয়ে গেছে।
তিনি চুপ করে দ্রুত দু’হাঁটু দোলাতে লাগলেন, চোখ আবার ফিরে গেছে পায়ের দিকে।
আমি জানতাম এরকম ঘটতে পারে। তাই তাঁর কাঁধে হাত রাখলাম, ‘এ মুহূর্তে আমি আপনার বস নই, বন্ধু কিংবা ভাই, বলুন কী সমস্যা? কারো না কারো কাছে সেটা বলে হালকা হতে হয়। প্লিজ টক’- বলতে বলতে আমি সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিই, ‘চলবে?’
‘না, স্যার।’
‘ওকে, আমি ধরালে সমস্যা হবে?’
‘না, স্যার। তবে না খাওয়াই ভাল।’
আবার তিনি নিস্তব্ধতার অতল থেকে ভেসে উঠছেন। সহজভাবটা ফিরে আসছে।
আমি সিগারেট প্যাকেটে ঢুকিয়ে বললাম, ‘আপনার অনারে ধরালাম না’। মনে মনে ভাবছি, ভালোই হলো, আমি এমনিতেই ধূমপান করি না, এটা ছিলো ভদ্রলোককে উম্মুক্ত করার একটি কৌশল। আমার অভিজ্ঞতা বলে সিগারেট ভাগাভাগি যেকোন মানুষকে খুব দ্রুত কাছে টানে।
‘ধন্যবাদ, স্যার।’
‘নাউ ইউ অনার মি। দয়া করে মন খুলে কথা বলুন। আমার ব্যাংকে একজন কর্মী তীব্র মানসিক চাপে আছেন তা আমি মেনে নিতে পারি না।’
‘স্যার, আপনার বাবার নাম কী?’
আচমকা তাঁর প্রশ্নে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। পাগল নাকি? আমার বাবার নাম জিজ্ঞেস করছে?
তারপরও সামলে নিয়ে বললাম, ‘আবু তাহের। তিনি পনের বছর আগে মারা গেছেন। কিন্তু কেন তাঁর নাম প্রয়োজন?’।
‘স্যার, আমার বাবার কোনো নাম নেই।’
‘মানে?’
‘স্যার, আপনারা যেকোন ফরম ফিলাপ করার সময় বাবার নাম লিখেন। আমার সেটা ফিলাপ করার মতো কোন নাম নেই, যেটা আছে সেটা স্কুলের কেরানি স্যারের দেয়া কল্পিত নাম।’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনি কী বলতে চাইছেন?’
আমার কণ্ঠে তীব্র বিস্ময়। ভদ্রলোক তো উল্টো আমার সব সৈন্য ফেলে দিয়ে দাবার বাজি জিতে নিচ্ছেন!
জমির সাহেব চোখ তুললেন, সেখানে রাজ্যের নির্লিপ্ততা, ‘স্যার, আপনি কি জানেন চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকা এক সময় কেন বিখ্যাত ছিলো?’।
‘না, কেন বিখ্যাত ছিল? এটা তো একটি নৌ বন্দর তাই না?’
‘স্যার, ওয়ান্স ইট ওয়াজ আ রেড লাইট ডিস্ট্রিক্ট। ব্রোথেল—’
‘ব্রোথেল’ শব্দটি তাঁর মুখ থেকে বুলেটের মতো ছিটকে বেরিয়ে এলো, বুলেটটি ঘৃণায় ঠাসা।
‘আমি আপনার কথা কিছুই বুঝছি না, জমির সাহেব।’
যেন অনেকদূর থেকে তাঁর কণ্ঠে ভেসে আসছে, ‘স্যার, মাই মাদার ওয়াজ দেয়ার’।
‘মানে?’ আমি প্রায় আঁতকে উঠি।
‘জ্বি স্যার, আমার মা, তাঁর বাড়ি ছিলো চাঁদপুরে। শাহরাস্তি উপজেলা, গ্রামের নাম, ভড়ুয়া। চুয়াত্তর সালে বাসায় কাজ দেয়ার কথা বলে তাঁকে সদরঘাটে পাচার করা হয়।’
তাঁর কণ্ঠ শোনাচ্ছে যন্ত্রের মতো, যেন কোন মানুষ নয়, মেশিন কথা বলছে।
আমি চুপচাপ তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি। কী নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তিনি কথা বলছেন! কিন্তু প্রতিটি শব্দ অসম্ভব ভারী, বেদনায় স্তব্ধ করে দেয়।
তিনি বলেই চলেছেন, যেন রেকর্ড বাজছে। ‘সদরঘাটের ওই জায়গাটা, স্যার, দুনিয়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর একটি জায়গা ছিল। এগুলোর পরিবেশ কেমন হয় তা হয়তো আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।’
আমার আর শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমি জমির সাহেবের কাঁধে হাত রেখে বললাম, ‘ভাই, এটা আর না বললে হয় না?’।
‘না—’ তাঁর কণ্ঠ থেকে ছিটকে এলো দলাপাকানো রাগ। ‘আপনি আমাকে শুরু করিয়েছেন, তাই আপনাকে পুরোটা শুনতে হবে, স্যার। ইউ হ্যাভ ওপেন্ড ইট—’।
‘ঠিক আছে, বলুন।’ আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তারপরও মনে হলো, ঠিক আছে বলুক, বলে যদি তাঁর জমে থাকা বেদনা কিছুটা কমে!
‘আমার মায়ের কাজ ছিলো প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটি নির্দিষ্ট রুমে নাচা। তাঁকে নাচ শেখানো হয়েছিল। নাচ শেষে আগ্রহী দর্শকদের মাঝে তাঁকে নিলামে তোলা হতো। সে রাতের জন্য। সে নিলামে মোটামুটি মারামারি হতো, স্যার। মাই মাদার ওয়াজ আ বিউটি।
একদিন আমার মা অসুস্থ বোধ করছিলেন। কিন্তু তাঁর মালিক নাচ বন্ধ করলেন না। করার কথা না। অনেক টাকার ব্যাপার। তাঁকে জোর করে নাচানো হলো। তিনি খুব ক্লান্ত, শরীর খারাপ তাই নাচতে গিয়ে বারবার ছন্দপতন হচ্ছিল। সদরঘাট পল্লীতে মেয়েরা নাচ বন্ধ করতে পারে না, স্যার, এটা ক্যাপিটাল অফেন্স। অনেক টাকার ব্যাপার, শুধু নির্ধারিত ‘মেহমান’রাই এখানে আসতেন, স্যার। তাই ছন্দপতনের অপরাধে আমার মাকে সবার সামনে ততক্ষণ পর্যন্ত চাবুক মারা হলো যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর জ্ঞান ছিলো। পরে শুনেছি, তিনি নাকি প্রতিটি চাবুকের সাথে ‘ভদ্রলোক’দের আনন্দ শীৎকার শুনতে পাচ্ছিলেন। ও ভালো কথা, স্যার, চাবুক মারার আগে তাঁর কাপড় খুলে নেয়া হয়েছিল। ভদ্রলোকদের তাতে উত্তেজনা আরো বেড়েছিলো। শীৎকার দেয়ারই কথা।’
‘ভদ্রলোক’ শব্দটি তাঁর ঠোঁটে উচ্চারিত হলো যেন পেপার ওয়েট চাপা দিয়ে তেলাপোকা মারা হচ্ছে। শুধু শব্দ দিয়েই যেন তিনি তাবৎ ভদ্রলোকদের চেপে মারছেন।
আমি প্রায় হাত জোড় করে বললাম, ‘প্লিজ, স্টপ—’
‘নো ওয়ে, স্যার, একজন মা তাঁর বাচ্চাকে জীবনের সবচে অপমানের কথা বলে গেছেন, আপনি সেটার মুখ খুলে দিয়েছেন, আপনাকে তা শুনতে হবে।’
আমি পরাজিত ভঙ্গিতে অনেকটা কুঁকড়ে গিয়ে বসে থাকি।
তাঁর শরীর কাঠের মতো শক্ত হয়ে আছে, যেন পাথরের মূর্তি। সে মূর্তি থেকে বের হয়ে আসছে চাপা আর্তনাদ,
‘অনেকক্ষণ পর জ্ঞান ফিরে এলে আমার মা দেখেন রুমে কেউ নেই। অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে ফেলে রেখে সবাই মনে হয় অন্য কারো কাছে ফুর্তি করতে চলে গেছে। তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন, কারণ গা ঢাকতে হবে, চাবুক মারার আগে তাঁর কাপড় খুলে নেয়া হয়েছিল। উঠতে গিয়ে তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন তাঁর দিকে কেউ একজন তাকিয়ে আছেন। দাড়ি গোঁফে ঢাকা একটি মুখ, দু’টো বিষণ্ণ চোখ। তিনি আবিষ্কার করলেন একটি শাল দিয়ে তাঁর গা ঢেকে দেয়া হয়েছে। তিনি আবার উঠে বসার চেষ্টা করলেন। এবার ঝুঁকে থাকা মানুষটি নরম গলায় বললেন, “আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকো মা, ভয় নেই, আমার নাম রহমত। আমি এখানে গায়কের সাথে তবলা বাজাই। ওরা কেউ নেই। তুমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর আরেক রুমে মচ্ছব বসিয়েছে। আমি শরীর খারাপ লাগছে বলে যাইনি, তোমার জ্ঞান ফেরার জন্য অপেক্ষা করছি”। বলতে বলতে তিনি পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু টাকা বের করে বললেন, “মা, আমি দরিদ্র ও অক্ষম মানুষ। আমার কিছু করার ক্ষমতা নেই। তাই আমি সামান্য এ টাকা তোমাকে দিচ্ছি। এ বিষাক্ত পাড়া এখন উৎসবে মত্ত। এ সুযোগে তুমি পালাও মা। দরজা খোলা আছে। ওরা ওটাতে তালা মারতে ভুলে গেছে, আমি সে সুযোগ নিয়েছি, তুমি পালাও”। বলতে বলতে তিনি টাকাগুলো আমার মায়ের মাথার পাশে রেখে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলেন, যাওয়ার সময় বললেন, “আমি যাই মা, তোমার গায়েব হয়ে যাওয়ার সাথে আমার সম্পর্ক আছে জানলে ওরা আমাকে জানে মেরে ফেলবে, তুমি পালাও মা, ভগবান তোমাকে দেখবেন। অসহায়ের তিনিই সহায়”। কথা শেষ করে তিনি দ্রুত মিলিয়ে গেলেন।’
‘তারপর—’ বলতে বলতে হঠাৎ পাথরের মূর্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একজন মানুষ, তিনি আমার দিকে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করতে লাগলেন, ‘তারপর আমার মা কীভাবে যেন পথ চিনে চাঁদপুরের শাহরাস্তি থানার ভড়ুয়া গ্রামে ঠিকই পৌঁছেছিলেন। তারপরই আবিষ্কৃত হয় কয়েকদিন আগের ‘নৃত্যসন্ধ্যায়’ তাঁর অসুস্থতার কারণ। সেটি হচ্ছি আমি। তিনি গর্ভধারণ করেছেন। তাঁর ভেতরে তৈরি হয়েছে আমার অস্তিত্ব এবং এ অস্তিত্ব আমার অবিবাহিত মায়ের গর্ভে কীভাবে তৈরি হয়েছিল তা নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না, স্যার’।
তিনি একটু দম নিলেন, মনে হচ্ছে তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি হতবুদ্ধি অবস্থায় তাঁর দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম। তিনি এক ঢোকে তা শেষ করলেন। তারপর আবার মূর্তির খোলসে ফিরে গেলেন এবং স্থির মূর্তিটির ঠোঁট নড়ে উঠলো, ‘এটি ধরা পড়ার পর আমার মাকে সমাজচ্যুত করা হলো’।
‘সমাজ’ শব্দটি যেন কফ মেশানো থুথুর মতো থপ করে মাটিতে পড়লো। এতো রাগী কোন শব্দ উচ্চারণ আমি আগে কখনোই শুনিনি।
‘কয়েক মাস পর আমার জন্ম হয় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে।
সুস্থ হয়ে উঠার পর সে হাসপাতালের একজন নার্স মাকে আশ্রয় দেন। আমার মা তাঁর ছোট্ট সরকারি কোয়ার্টারে কাজের বুয়া হিসেবেই বাকি জীবন কাটান। তারপরও আমি বলবো সে নার্স ভদ্রমহিলা ছিলেন আমাদের ত্রাতা। তিনি তাঁকে আশ্রয় না দিলে আমাদের কী হতো আমি জানি না। সবচেয়ে বড় যে কাজটি তিনি করেছিলেন তা হলো আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়া। মজার ব্যাপার হলো, স্কুলেই আবিস্কৃত হয় আমার মাথা খুব ভালো। তাই সারাজীবন সরকারি বৃত্তি নিয়ে পড়াশুনা শেষ করতে আমার কোন সমস্যা হয়নি।’
আবার তিনি থামলেন, মূর্তির খোলস ভেঙে সামান্য সময়ের জন্য নড়ে উঠলেন, তারপর বললেন, ‘আমার মা সামান্য সুঁই-সুতোর কাজ জানতেন। অবসর সময়ে তিনি একটি সোয়েটার বুনেছিলেন। একসাথে দরকারি উল কেনার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। তাই তিনি যখন যে রকম উল কিনতে পারতেন তাই দিয়ে সোয়েটারটি বুনেন। এ কারণেই এটি হয়েছিল লাল-নীল-হলুদ-কমলা রঙ এর এক অদ্ভুত জিনিস’।
বলতে বলতে তিনি সামনে ঝুঁকে এলেন, তাঁর চোখে কোন অনুভূতি নেই, কোন আবেগ নেই, শুধুই অসীম শূন্যতা, সে শূন্যতা থেকে গা শিরশির করা এক অনুভূতিহীন নির্লিপ্ত কণ্ঠ জিজ্ঞেস করলো, ‘আমার চিরদুখী মা তাঁর অতি অল্প জানা সূচিকর্মে কার জন্য সোয়েটার বুনেছিলেন আপনি জানেন, স্যার?’।
‘না’ আমার কণ্ঠ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। শব্দের দাবা খেলায় তিনি আমাকে চরম মার দিয়েছেন।
মুহূর্তের মধ্যে তিনি মূর্তির খোলসে ডুব মারলেন। সোজা টানটান হয়ে বসে আছেন, তাকিয়ে আছেন সুইমিং পুলের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বলছেন, ‘সোয়েটারটি আমার মা তাঁর নিরক্ত হাতে বুনেছিলেন সেই তবলাবাদকের জন্য, যিনি জীবনের সবচে অপমানিত রাতে মমতা নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। সেই প্রথম মানুষের চোখে তাঁর প্রথম মায়া দেখা, সেই শেষ, এরপর আর কারো চোখে তিনি মমতা দেখেননি। সেই অচেনা ভদ্রলোককে তিনি বাবা ডাকতেন। জীবনে কতবার যে তিনি সোয়েটারটি নিয়ে কপালে ছুঁয়েছেন তার কোন হিসেব নেই। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল আমাকে নিয়ে তিনি চাঁটগা আসবেন, সেই মানুষটিকে খুঁজে বের করে অন্তত একবার সামনাসামনি উচ্চারণ করবেন, ‘বাবা,’ তারপর তাঁর অসহায় আঙুলে বোনা সোয়েটার তাঁকে পরিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছে পূরণ হয়নি—’
আমি অসহায়ের মতো তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি, আমার ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পারছি না।
তিনি এক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন, কেবল নড়ছে তাঁর ঠোঁট, ‘আমি যখন কলেজে পড়ি তখন তিনি মারা যান। কয়েকদিন থেকে শরীর বেশ খারাপ ছিল। তাঁকে ভর্তি করা হয় সদর হাসপাতালে। ছোট্ট একটি ওয়ার্ডের এক কোণায় তাঁর জায়গা হয়। সেই রাতে আমি টিউশনির টাকায় কেনা পাউরুটি দুধে গুলে তাঁকে খাওয়াচ্ছি। মাঝে মাঝে তা তাঁর মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, আমি পরিষ্কার করে আবার খাওয়াচ্ছি। হঠাৎ তাঁর ক্ষীণ শরীর কেঁপে উঠলো, তিনি ঘোর লাগা চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে ডাকলেন, “বাবা—,” তারপর তাঁর ঠোঁট বেঁকে গেল, তিনি বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমানি কণ্ঠে বললেন, “বাবা, ওরা আমারে মারছে, অনেক মারছে, আপনি এতো দেরি করলেন ক্যান, বাবা, ওরা আপনি থাকলে আমারে মারতে পারতো না, আপনার কন্যারে মারে এমন সাহস কার?” বলতে বলতে তাঁর দু’চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা জল নেমে এলো, তিনি হাত বাড়িয়ে আবার ডাকলেন, “বাবা, ও বাবা, বাবা—” এরপরই তিনি স্থির হয়ে গেলেন।

আমি এবার তাঁর কাঁধে হাত রাখলাম, সাথে সাথে মূর্তির খোলস থেকে বের হয়ে এলো দু’টো রাগী হাত, সেগুলো এক ঝটকায় আমাকে সরিয়ে দিল। কানের কাছে হিসহিস করে উচ্চারিত হলো, ‘আপনারা যাই বলেন, এ সোয়েটার আমি পরবোই—’
বলেই তিনি দু’হাতে মুখ ঢাকলেন, তারপর তীব্র হুইসেলের মতো বেরিয়ে এলো আর্তনাদ, ‘নাআআআআ–’
প্রথম শোনায় মনে হলো তিনি বলছেন, ‘মাআআআআ–’
কিন্তু দ্বিতীয় আর্তনাদে পরিষ্কার শোনা গেলো, ‘নাআআআআ—’
জবাই করা পশুর মতো জান্তব শব্দে যে পুরো দুনিয়াকে নাকচ করে দেয়া যায় তা আমার জানা ছিল না।

বাদল সৈয়দ