জন্মের পাপ

শিমন শারমিন

কয়েক বছর আগে রমজান মাসে পুলিশের ভ্যান থেকে এক কিশোরকে টেনে নামিয়ে বীর জনতা পিটিয়ে মেরে ফেলল। এবং সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিওতে ছেয়ে গেল ইউটিউব আর আন্তর্জাল। প্রথমে সাহস না হলেও পরে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। একেকটা মানুষ কী বিপুল বিক্রমে লাথি ঝাড়ছে মাথা বরাবর কিংবা আধলা ইট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিদারুণ আক্রোশে!

ছোটবেলায় আমাকে ডাকা হতো “মায়ের লেজ”। মা যেখানে যাবেন অবধারিতভাবে আমিও সেখানে যাবো। হয় মা ইচ্ছে করেই নেবেন, নয়তো আমার কান্নাকাটিতে বাধ্য হবেন। ব্যতিক্রম যে একেবারেই হতো না তা না। তবে ৯০% সময়ে মায়ের সঙ্গে আমি আছিই! সেই নিয়মেই একদিন মায়ের হাত ধরে কাছেই এক পরিচিতের বাড়ি গেলাম। তখন বয়স ঠিক কতো তাও মনে নেই। শুধু যাবার কারণটাই মনে গেঁথে আছে। হঠাৎ মায়ের কাছে খবর এল সেখানে এক চোর ধরা পড়েছে। গিয়ে যেন দেখে আসেন। কাজ শেষে তিনি চললেন। সাথে লেজ আমি! কৌতুহলে রীতিমতো ফেটে যাচ্ছি। না জানি ‘চোর’ কী এক বস্তু!

সেখানে অসংখ্য মানুষ। তাদের বেশিরভাগের ভীড় একটি বিশেষ ঘরে। বাকিরা ছড়ানো ছিটানো। চা চলছে সবখানে। প্রবল ঔৎসুক্যে সেই বিশেষ ঘরে গিয়ে দেখি এক মহিলা- ইচ্ছাকৃত কর্কশ হাতে কাটা তার চুলগুলো এবড়োখেবড়ো, খাড়া খাড়া। চোখদু’টো প্রচণ্ড লাল এবং গাল বেয়ে এমন রং হবার কারণগুলো দর দর করে নামছে। সম্ভবত এর কিছু আগেই তাকে চড়-থাপ্পড় মারার পর্ব চলেছে। তবে সেই দৃশ্যটা আমাকে বেশিক্ষণ দেখতে হয় নি। মা সেখানে না থেকে পাশের ঘরে চলে গেলেন কথা বলতে। আজ অবশ্য সেই কারণে মায়ের কাছে আমি এখনো কৃতজ্ঞ। আমার পিচ্চিবেলার স্মৃতিতে এর বেশি কিছু তিনি ঢুকতে দেন নি।

সময় বদলে গেছে। এখন শুধু প্রমাণিত চোর না, যে কোনো কেউ ‘ধরা’ পড়ামাত্রই প্রমাণ হোক বা ভুল হোক, শুধু চুল কাটা আর দুই-চারটা চড়-থাপ্পড়ে তা আর সীমাবদ্ধ থাকে না। এইতো, বছর কয়েক আগে ডিআইটি রোড দিয়ে ভাইয়ার সঙ্গে রিকশায়। ওয়াপদার কিছু আগে স্বভাবসুলভ প্রচন্ড জ্যাম। হঠাৎ দেখা গেল এক ছেলে উর্ধ্বনিঃশ্বাসে দৌড়। তার পেছনে আরো কিছু লোক হৈ হৈ করতে করতে ধাওয়া করছে। কয়েক গজ পরেই সে জ্যামে আর ভীড়ে পা হড়কে পড়ল। নিমেষেই ধাওয়ারত এবং আশেপাশের অন্যান্য সব বীর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর। ফুটপাতের এক চা-বিক্রেতা তার ব্যবসা ফেলে দৌড়াল কয়টা লাথি-ঘুষি ঝেড়ে আসতে। উত্তেজনায় টগবগ করে সবাই ফুটছে। সারাদিনের গ্লানি ঝেড়ে ফেলার জন্য এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ কি আর পাওয়া যাবে?

কয়েক বছর আগে রমজান মাসে পুলিশের ভ্যান থেকে এক কিশোরকে টেনে নামিয়ে বীর জনতা পিটিয়ে মেরে ফেলল। এবং সেই হত্যাকাণ্ডের ভিডিওতে ছেয়ে গেল ইউটিউব আর আন্তর্জাল। প্রথমে সাহস না হলেও পরে দেখার চেষ্টা করেছিলাম। একেকটা মানুষ কী বিপুল বিক্রমে লাথি ঝাড়ছে মাথা বরাবর কিংবা আধলা ইট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিদারুণ আক্রোশে! কয়েকজনের বেশভূষা দেখে বোঝা যাচ্ছিল তারা সেই পবিত্র মাসটিতে নিয়মিত রোজাদার ও পরহেজগার। তবু তেড়ে এসেছেন হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তাই নিয়ে। কিশোরের গায়ে-মাথায় সর্বশক্তি দিয়ে একটি বাড়ি কষিয়ে কিছু পরেই হয়তো সর্বশক্তিমানের কাছে মাফ চেয়ে পবিত্র হয়ে যাবেন তিনি! সেই ঘটনায় প্রতিবাদ হয়েছিল। লেখালেখি হয়েছিল। শাস্তি কি হয়েছিল? জানা হয় নি। তারও কিছুদিনের মধ্যে বাচ্চা দুই মেয়ে ধরা পড়ল ভাত বা রুটি চুরি করতে গিয়ে। তাদের খিদের জ্বালা মেটে নি কিন্তু কিছু মানুষের হাতের জ্বালা ঠিকই মিটল তাদের পিটিয়ে। আমরা দেখেছি। আমরা চোখ বন্ধ করেছি। কিছুদূর লিখে মনের জ্বালা মিটিয়েছি। ব্যস! তবে বীর জনতার মনের জ্বালা উত্তরোত্তর যে বেড়েই যাচ্ছে সে আলামত এখন স্পষ্ট।

প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর, শিশু বেয়ে জনতার সেই জ্বালা প্রতিবন্ধীদের ছুঁতেও বাকি রাখে নি। তবে তাদের মৃত্যু আমাদের ছোঁয় কি? ২০১৩ জানুয়ারিতে কালিয়াকৈরে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মর্জিনাকে শত শত মানুষ পুলিশের সামনেই পিটিয়ে মেরে ফেলে। তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। নাম-ঠিকানাও তেমন করে মনে থাকতো না তার। মাঝে মধ্যে ভিক্ষা করতে যেতেন এর-ওর বাড়ি। সেই অভ্যাসেই এক বাড়িতে ঢুকেছিলেন তিনি। প্রতিবন্ধী রূপ দেখে কোনো এক বাচ্চা তাকে দেখে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠেছিল। আর  শুধুমাত্র ছেলেধরা ‘সন্দেহ’  করে তাকে গ্রামবাসী পিটিয়ে মেরে ফেলে মনের ঝাল ঝাড়ে। আধা-বোবা ওই ‘পশুটির’ আধা-চিৎকার বা গোঙানি কারো কানেই পৌছায় নি। কারো আত্মায় বিন্দুমাত্র আঁচড় ফেলা তো অনেক দূর! আর পুলিশের কিছুই করার থাকে না।

এর দু’দিন পরেই গাজীপুরে গানের জলসায় আসা কোনো এক ‘পাগলকে’ আবারো ছেলেধরা ’সন্দেহ’  করে স্থানীয় লোকজন। সন্দেহ হলে আর অপেক্ষা কীসের? ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে তাকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে ও পরে চাকু দিয়ে জবাই করে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে দেয় জনতা। আমাদের তাতে চোখের পলকটাও পড়ে না। কিংবা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো যে নাম-না-জানা মহিলাটা? গাজীপুরের জবাই করার ঘটনার আধাঘণ্টা পরে এক কিলোমিটার দূরেই মানসিক প্রতিবন্ধী এই মহিলাকে পিটিয়ে মেরে ফেলেও ক্ষান্ত হয় নি কেউ। সাথে আগুন জ্বেলে দেয়া হয়েছিল তার শরীরে। সেই আগুনে আমাদের জ্বালা আদৌ মিটেছে কি এখনো? আমরা বরং ভুলে গেছি খুব সহজে। কিংবা দেখিই নি কিছু। এইসব খবর কয়েক লাইন পড়েই ভেবেছি- যেখানে স্বাভাবিক মানুষদেরই বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেখানে এসব প্রতিবন্ধী পশুগুলোকে নিয়ে চিন্তা করার সময় কোথায়? এমন কয়েজন কমলেই বরং আমাদের মতো ’স্বাভাবিকদের’ জন্য ভালো। তাই না?

আমাদের দৈনন্দিন জ্বালা-যন্ত্রণা শুধু বেড়ে যায়। নিজ নিজ  জন্মের ক্ষোভ আর সারাটা দিনের পাপের বোঝা নিয়ে আমরা শুধুই তক্কে তক্কে থাকি। আমাদের শিরায় শিরায় আদিম পশুত্ব খেলা করতে থাকে। সমস্ত আক্রোশ ঢেলে দেবার জন্য আমরা সারাক্ষণ খুঁজে বেড়াই একটা ‘কিছু’। একটা যেকোনো কিছু! সেই ‘কিছু’টা যদি একটা মানুষের জীবনও হয় তাতেও আমাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে যেই হোক। আমাদের নিষ্ঠুরতা বোঝার শক্তি সৌভাগ্যবশত যাদের নেই, সেই শিশুরা কিংবা প্রতিবন্ধীরা যখন ফ্যাল ফ্যাল করে আমাদের পশুত্বের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাতে আমাদের উল্লাস বরং বেড়ে যায়! আমরা আমাদের সামনের ওইসব অবুঝ প্রাণগুলোকেই বরং জানোয়ার-সম ভেবে নিয়ে উৎসবে মেতে উঠি। রক্তের। নিজেদের পাপ স্খালনের এমন সুবর্ণ সুযোগের সামনে সামান্য রুটি চুরি করা কিংবা ছেলেধরা হবার ‘সন্দেহ’টাই রূপ নেয় ক্ষমার অযোগ্য কোনো মহাপাপে! আর আমরা নির্দ্বিধায় একটা অসহায় জীবন ছিনিয়ে নিয়ে আসি। আমাদের জান্তব আনন্দ দ্যাখে কে?!

আমাদের এইসব শৌর্য-বীর্য দেখাতে পারার সুযোগ করে দেবার জন্য স্যালুট দেয়া দরকার পুলিশ বাহিনীকেও। তারা যদি সেই কিশোরকে ভ্যান থেকে নামাতে না দিতেন তাহলে কি আমরা তার মাথাটা ইট দিয়ে থেঁতলে দিতে পারতাম? তারা যদি মর্জিনাকে রক্ষা করতে অপারগতা প্রকাশ না করতেন আমরা কি সেই অবুঝ-বোবা ‘পশু’টাকে বিবস্ত্র করে শতশত জনে মিলে খুন করতে পারতাম? আমাদের মতো বীর জনতার জন্য এমনই তো হবার দরকার ছিল তাদের! তাদের জন্যেও লাল সালাম একটু থাকুক। রক্তমাখা।

এই সময়ে, এই সমাজে আমার মা কী করতেন আমি জানি না। কিন্তু প্রচণ্ড ভয়ে, শঙ্কায় আমাকে ভাবতে হয়  আমার বাচ্চাদের কখনো নিজের ‘লেজ’ বানাবো না। সবকিছু থেকে আগলে রাখবার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে হয়। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা যেন ওদের ছুঁতে না পারে সেই চেষ্টায় নিজেই নিষ্ঠুর হবো ওদের সঙ্গে। তবু এইসব পঙ্কিলতাকে ওদের স্পর্শ করতে দেবো না। এমন কতো কতো অসম্ভব সিদ্ধান্ত নিজের মনেই ভাবতে হয়।

কিংবা কে জানে, এমন সব প্রতিশ্রুতি আর সিদ্ধান্ত ভুলে যাবো হয়তো কখনো আমিও। কোনোদিন আমারও কোনো পাপ আমাকে চালিত করবে। সেই তাড়নায় আমিও হয়তো কোথাও কখনো আমার পাপ স্খালনে নেমে পড়বো!