কচি রেজার কবিতাগুচ্ছ

“বৃষ্টি এসেছে কখন জানি না, দেখি, চোখ ভিজে গেছে।”

বাংলা কবিতায় দীর্ঘকাল ধরেই নিভৃতে লেখালেখি করে আসছেন যারা, কচি রেজা তাদের মাঝে অন্যতম। নব্বইয়ের দশকের উল্লেখযোগ্য এই কবি গৎ বাঁধা কবিতার ধারণাকে পাশ কাটিয়েই লিখে চলেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে, রচনা করেছেন পনেরোটির অধিক গ্রন্থ। অকালবোধন অনলাইন সংস্করণের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ‘তূণীর’-এ প্রকাশিত হলো কবির একগুচ্ছ কবিতা।


কোয়ারেন্টাইন—১


এটা একটি সমস্যা হিসেবে নাও

ভাবো, হঠাৎ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরা তোমার পছন্দের হলেও

আর হবে না

দেখছি তো জুতো খুলে মুছছো বারবার

 

কাট গেলাসের আভার মতন সন্ধ্যা

বাদাম কিনে খেতে খেতে তোমার কাঁধ জড়িয়ে

নিচ্ছি সন্ধীপ নুনের ঝাঁজ

তখন হাওয়া ছিল

বোতাম খুলে বুকটাও ফুলিয়ে নিতাম

 

কবে কতদিন আগে যেন আমরা মাঠ আর খেলাধুলা পেয়েছিলাম

সন্ধ্যে পর্যন্ত

আয় আয় বলে চিৎকার করত মা

 

মাঝে মাঝে আমরা ঘর পালাতাম আবার ফিরেও আসতাম

 

এখন ধারাবাহিক পালিয়ে আবার ফিরে আসবার

আঙুলসম মমতাও নেই

সন্ধ্যার খোঁজ নিয়ে কোথাও শুধু বেজে ওঠে রুগ্ন শাঁখ

 

ইতিহাসের অনেক মঠ—পুরান—মন্দির—মসজিদ পেরিয়ে

বার বার যুদ্ধের পর তুমিই তো জিতে গেছ

ফিরে এসেছি তোমার কাছেই

 

তুমি কি তোমার সিঁড়ি তুলে নিয়েছ?

বুকের জ্যোৎস্না দিয়ে যোগাযোগের যে একটা সেতু

বানিয়েছিলাম আমরা

 

এখন আমি লিফটের বোতামে চাপ দিয়ে

আবার টিস্যু পেপারে মুছে নিচ্ছি আঙুল!

 

 


কোয়ারেন্টাইন—২


ব্যর্থ হই তবু ফিরে আসি, জীবন যেন এক পৌনঃপুনিক আত্মহত্যা!

ফিরে আসবার পর মানুষ কি আবার পুরোনো বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ায়? ঠিক করে দেয় কুঞ্জ লতার বাড়ন্ত ডগাগুলো। কেউ কি দোতলায় উপরের জানালার দিকে তাকিয়ে অনুভব করে কারুর ছায়া!

দরজা এড়িয়ে সে কি গোটা বাড়ি ঘুরে উঠোনের রয়াল গাছের কাছে এসে দেখে রান্নাঘরটি। শীতকালে বাইরেই চুলো বানিয়ে রান্না হয়। মায়ের খুন্তি ধরা হাত দেখা যায়?

এই ছবি মৃত মানুষের মনেও থাকে না। মনে থাকে না একটি অবাধ্য কিশোরির ঝুল ছেঁড়া ফ্রক। নীচু চিবুক। নদী ঝাঁপিয়ে যে একটু আগেই এসে দাঁড়িয়েছে ।

 


কোয়ারেন্টাইন—৩


 রোদে আতাফলের ঘন ক্ষীর বা উত্তাপ

আমার পাশে আর্মি জিপের অনবরত ঘোষণা, “রাস্তা ফাঁকা করুন,

বাসায় যান।”

 

ফলওয়ালাকে দেখি রঙিন ছাতা বন্ধ করে ডালা তোলার ভান করে

মুখে মাস্ক, আষ্টেপৃষ্ঠে নীল ক্রেপ

ওড়নায় মাথা ঢাকা

হাঁটছি।

 

পৃথিবীর প্রথম আগন্তুক

ব্যাংক এশিয়ার পাশ কাটাতে মনে পড়লো, এখানে স্বপ্ন নামের

ডিপার্টমেন্টাল ষ্টোরটা ছিল

অযথা জল এলো চোখে

জল এলে আরও জল আসবার আর কি কোনো কৌশল লাগে

রুমাল আনিনি

 

হঠাৎ এক ভিক্ষুকজন

ভাঙাচোরা চোয়াল ভাঙা এবং খোঁড়া।

ভিক্ষুকের নগ্ন ঠাণ্ডা হাতে বাসি রুটি

গিলতে গিলতে চলেছে

গিলে চলেছে স্বাধীনতা।

 


কোয়ারেন্টাইন—৪


যে ভিখিরিটাকে দেখে বিরক্ত হতাম তাকে দশটা টাকা দিতে ইচ্ছে করছে আজ। বারান্দার গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে চেয়ে আছি। দেখছি, শিউলি গাছে এবার ফুল ফোটেনি। হয়তো এখন শিউলি ফোটার সময়ই নয়। গত বছর কোন সময়টায় যেন মর্নিং ওয়াক করতাম। ফুল কুড়োতাম ।

একটি কবিতাও লিখেছিলাম, “কী ঘ্রাণ তোমার দু’হাতে! তুমি কি শিউলিতলা দিয়ে এসেছ?”

এবার ফুল নেই। কবিতা নেই।

সবসময় যেটা অনুভব করি, যে কোনো বিপদে বা বিপর্যয়ে অথবা মন খারাপের দিনে প্রকৃতিও বিষণ্ন হয়। কাঁদে। পাতা নড়ছে কি নড়ছে না। পাখিরা বিস্মিত আমাকে না দেখে। জানিতো, আমাকে গাছেরাই বেশি ভালোবাসে। পাখিরা স্নেহ দেয় কী অপার করুণায়।

হাঁটার সময় কুকুরগুলো সাথ দেয়। পাশাপাশি আমি আর কুকুর। কুকুরের চোখ দেখলে বোঝা যায় তাদের আনন্দ। একটা সময় কুকুর পুষেছি। একেবারে চোখ না ফোটা কুকুরের ছানা নিয়ে এসে কি অধ্যবসায় না বাঁচিয়ে মানুষ করেছি।।

বাজারে গিয়ে মাংসের ছাট কিনে নুন হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে খেতে দিয়েছি। নুন হলুদ কেন দিতাম জানি না। নিমন্ত্রণ খেতে গেলে পরিত্যক্ত হাড় মাংস নেয়ার জন্য কত পরিহাসবাক্য শুনেছি।

কেউ কি জানে, কুকুরের পায়ের নখে নেইল পলিশ লাগানো যায় না! মানে লাগেই না। সেটি পরীক্ষা করে দেখেছি। আর লাগানোর সময় কী যে হাত পা ছুঁড়ত! কোলে জাপটে ধরে তারপরে নেইল পলিশ লাগাতাম, কী যে কষ্ট হতো সামলাতে, তখন দেখছি কুকুরের নখে নেইল পলিশ বসে না।

একটি বেড়াল পুষতাম। এত্ত হিংসুটে যে আমার মেয়েকে দেখতে পারত না। মেয়ে এলেই আমার পায়ে পায়ে ঘুরে ঝগড়া করে কত কী বাজে কথা বলতো। আর কী হিংসুটে ভাবসাব!

সারাক্ষণ কিন্তু সোফায় আমার ম্যাক্সি জড়িয়ে ঘুমের ভান করে বা ঘুমায়। ও বাবা, মেয়ে এলে আর ঘুম কোথায়। শোয়া ঘুম আরাম বাদ দিয়ে আমাকে তার বলা চাইই, মেয়ে এসেছে আর ভুলে গেছ আমাকে, কেমন? কেমন মানুষ তুমি বাপু! আমাকে কোলে নিয়ে বস না! মাথায় গলায় হাত বুলাও না।”

গ্রিলে মুখ চেপে দাঁড়িয়ে বাইরেটাই দেখছি চেয়ে। এত বিষণ্ণ নীরব অথচ বাতাসে কী জানি ফিসফাস।

বৃষ্টি এসেছে কখন জানি না, দেখি, চোখ ভিজে গেছে।

 


কবি পরিচিতি :


 কচি রেজা ( নীরজা কামাল)

জন্মগ্রহণ করেন ১০ এপ্রিল, ১৯৬৮, গোপালগঞ্জে। ঢাকা ও নিউ ইয়র্কে বসবাস। প্রকাশিত কবিতার বই-

  • অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর
  • অন্ধ আয়নাযাত্রা
  • নাকছাবির কথকতা
  • মমিও কাচের গুঞ্জন
  • কফিনভর্তি কোলাহল
  • মনে করো এবং
  • নির্বাচিত কবিতা
error: Content is protected !!