তারুণ্যের তরঙ্গ ।। পর্ব-০১

কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ এবং কবি-গদ্যকার শুভনীল এসময়ের তরুণ দুই কবি। দশক বিচারে দ্বিতীয় দশকের প্রতিনিধিত্বকারী। অকালবোধনের অনুরোধে তারা দুজনই একটি অনলাইন আড্ডা-আলাপে যুক্ত হয়েছিলেন।

তারুণ্যের তরঙ্গ 

কবি শ্বেতা শতাব্দী এষ এবং কবি শুভনীলের আলাপচারিতা

শুভ নীল: জন্মেছেন ১৯ জুন, ১৯৮৯, সিলেটে। ফিন্যান্সে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে বেসরকারি সংস্থা ব্র‍্যাকে কর্মরত। প্রকাশিত বই: কাগজ ফুলের বাহাস (মুক্তগদ্য), জুন মাসের ডায়েরি, আল আকসা আবাসিক হোটেল (গল্পগ্রন্থ); ই-বুক: মায়ামুখো পথ (কবিতা)।

শ্বেতা শতাব্দী এষ: জন্মেছেন ১২ অক্টোবর, ১৯৯২, জামালপুরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ: অনুসূর্যের গান, রোদের পথে ফেরা, বিপরীত দুরবীনে, ফিরে যাচ্ছে ফুল।


“আমার কাছে বেঁচে থাকাটা একটা যুদ্ধ এবং আর্ট”

 

শ্বেতা- অনেকদিন পর তোমার সাথে আড্ডা দিতে যাচ্ছি। আগে আমরা ক্যাম্পাসে প্রচুর আড্ডা দিয়েছি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম এবং তারও কিছু পর পর্যন্ত। এখনতো আমরা জীবনের তাগিদে দুজন দুশহরের বাসিন্দা। সেইসব আড্ডাগুলো কি মিস করো?

শুভ- হ্যাঁ, মিস করি। আমার মনে হয়, যত সময় যায় তত প্রগাঢ় হয় অতীত। আসলে জীবনের তাগিদে কতকিছুই না করি আমরা। যখন কিছু সময় বাঁচে, তখন ঠিকই আমাদের আড্ডাগুলোকে আরও গভীরভাবে চোখের সামনে দেখতে পাই। তো এইভাবেই আসলে মিস করি। বিশেষ করে করোনার এই সময়টাতে অনেকেই তাদের পুরানা দিনের কাছে ফিরছে। এটা আমার বেলায় বললে সব সময়ই চলতে থাকে। মানে পুরাতনি গন্ধ আমাকে ছাড়ে না। কাউকেই ছাড়ে না বোধহয়।

করোনার এই সময়টাতে তুমি কীভাবে ভাবো অতীত নিয়ে?

শ্বেতা- এখন করোনা বলে নয়, আমার সত্তার একটা অংশ সবসময় অতীতেই থাকে, তাই করোনা সাময়িক একটা অনিশ্চয়তা ছাড়া আমার কাছে আলাদা কোনো বিষয় না। যদিও পৃথিবীতে করোনা এখন অনেক বড় একটা বিষয়, কিন্তু যেহেতু আমি বেশিরভাগ সময় ঘরে থেকেই এখন অভ্যস্ত তাই আমার অতীতবাস দৈনন্দিন জীবনেরই একটা রূপ!

শুভ- তোমার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে একটা প্রশ্ন করি। তোমার মনোবল নিয়ে প্রশ্ন করতে চাই না। এটার উত্তর জানি। কিন্তু এই যে একটা অসুখ নিয়ে এতগুলো বছর পার করলে বা করে যাচ্ছ, তোমার দেখা পৃথিবীটা বা বেঁচে থাকা ব্যাপারটাকে তুমি কীভাবে দেখো? তো এই যে দেখা আর তোমার লেখার সাথে এসবের সম্পর্কটাই বা কেমন?

শ্বেতা- যেহেতু আমার অসুখটা জন্মসুত্রে প্রাপ্ত তাই একে সাথে নিয়েই আমার বেড়ে ওঠা ও যাপন। অবশ্য একজন সুস্থ মানুষের যাপনটা কেমন তা আমি চোখে দেখলেও ফিল করতে পারি না যেমন। অনেকটা ভাইসভার্সা ব্যপার। কিন্তু ডিফারেন্সি হচ্ছে দৃষ্টিতে। আমার কাছে বেঁচে থাকাটা একটা যুদ্ধ এবং আর্ট, সেখানে অন্য সুস্থ মানুষের হয়তো নিজের সুস্থতা কেন্দ্রিক চিন্তার চেয়ে অন্য অনেক চিন্তা মূখ্য, যা আমারো মূখ্য, কিন্তু ভিন্নভাবে, আমি সেসব উপলব্ধি করি। তো আমার চিন্তার জগতটা এসব নিয়ে বরাবরই কিউরিয়াস, কিছুটা সার্কাস্টিক আর অনেকখানি আত্মোপলব্ধিগত। হয়তো আমিও নিৎসের মতোই অনেকটা জীবনকে দেখি!

আচ্ছা, এই যে আমাদের সামগ্রিক একাকীত্ব, অর্থহীনতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ তা কি আমাদের নিজস্ব উপলব্ধি নাকি এই উপলব্ধির পেছনেও রয়েছে শিল্প-সাহিত্য, বিশেষ করে পাশ্চাত্যের প্রভাব?

শুভ- আসলে প্রতিটা উপলব্ধিই ব্যক্তির নিজস্ব অবস্থান। হ্যাঁ, এটা ঠিক, প্রভাব তো থাকেই। একটা গ্লোবাল ভিলেজে তুমি-আমি আমরা সবাই বাস করছি। সমসাময়িক বা ঘুরেফিরে পুরাতনী থিওরি বা সেসবের মিল অমিল নিয়েই চলে সংসার। আমরা কেউই এর বাইরে নই। ধরো মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম কমে গেলে আমাদের এখানেও কিন্তু এর প্রভাব পড়ে। তো প্রভাবের কথা বললে সেটা কেউই মনে হয় না ঠিকঠাক এড়াতে পারে। তবে হ্যাঁ চোখে পড়ার একটা ব্যাপার তো থাকেই, তুমি হয়তো সে জায়গা থেকেই প্রশ্নটা করেছ। সেক্ষেত্রেও আমার উত্তর ওই যে ‘ব্যাক্তির নিজস্ব অবস্থান’।

আচ্ছা তোমার কী মনে হয় আর্ট কি তোমাকে বা আমাকে বা আমাদেরকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারছে? মানে এই যে বেঁচে থাকাটা যুদ্ধ এবং আর্ট একইসাথে, সেই প্রেক্ষিতেই প্রশ্নটা করলাম।

শ্বেতা- অবশ্যই আমরা আমাদের যাপন থেকে যে জীবনবোধ দ্বারা তাড়িত হই তার মাধ্যমে আমাদের ইনডিভিজুয়্যাল পার্সেপ্সন তৈরি হয়, এই পার্সেপ্সনটা আমরা আমাদের ভাবনায় এবং কাজে প্রতিফলিত করি যে কৌশলের মাধ্যমে তাই হচ্ছে যাপনের আর্ট! সেখানে আমি অন্ততপক্ষে মনে করি যতদূর সম্ভব জীবনের সমস্ত বাস্তবতার ভেতর থেকেও এই আর্ট আমাদেরকে রিপ্রেজেন্ট করছে , তা প্রত্যক্ষ বা সচেতনভাবেই হোক অথবা অবচেতনে।

আচ্ছা তোমার ভাবনানুসারে একজন লেখক কেন লিখেন? শুধু কি ব্যক্তিগত বিষয়েই লেখালেখি নাকি এর মাধ্যমে সমাজে সে কোনো ভূমিকা রাখতে চায়, তোমার কি মনে হয়, তুমি কেন লিখ?

শুভ- প্রশ্নটা আমিই তোমাকে করতে যাচ্ছিলাম। যাই হোক আমার দিকেই তেড়ে এসেছে যেহেতু তো আমার উত্তরটা দিতেই হচ্ছে।

সময়ের সাক্ষী মানুষ নানাভাবেই হয়। সেটা সুসময় বা দুঃসময়ও হতে পারে। একজন লেখককে এই জায়গা থেকে সবচেয়ে সচেতন ব্যক্তিই মনে হয় আমার। তাছাড়া টাইমল্যাপ্সের কথাও যদি বলি তুমি দেখবে একজন লেখক যেভাবে সময়কে জিইয়ে রাখেন চোখের সামনে সেটা অন্য কোনো পন্থায় অতটা সহজ ভাবে সম্ভব নয় কিন্তু। আর ব্যক্তিগত বিষয় যেকোনো ব্যক্তিরই থাকতে পারে। কিন্তু যখন ব্যক্তিই লিখছেন তখন কিন্তু ব্যাপারটা ব্যক্তিগত মোটেও থাকে না।  মানে বলতে চাইছি যখন আমি লিখছি তখন চারপাশও কিন্তু চলে আসে। আর এই চারপাশ নিয়ে আমার তিক্ততা বা আশা বা হতাশাও কিন্তু আসে। তো এই চারপাশ মানে কিন্তু চারটা দেয়ালই নয় কেবল। বিস্তৃত একটা ফ্রেম বুঝাতেই বলছি। আর সমাজে ভূমিকা রাখার বিষয়টা এমনিতেই চলে আসে। এটা মনে হয় না আলাদা করে প্রকাশ করার দরকার আছে। তবে হ্যাঁ লিখতে যেয়ে কখনো ম্যাডনেস কখনো ঘটনা বা সামান্য একটা চিত্রে ডুবে যাওয়াটাকে যখন কন্সাসলি লিখছি তখন একরকমের তৃপ্ত হই। আবার যখন সাবকন্সাসলি লিখছি এবং পরে আবার সেটাও বুঝে ফেলি যে কী নিয়ে লিখেছি বা কেন লিখেছি সেটাও তৃপ্ত করে অন্যভাবে। আসলে আমি যা লিখছি, এটাই আমার ভাষা। ভাষা বলতে সেটা কবিতা বা গল্প বা গদ্য বা ডায়েরিও হতে পারে। কারণ আমি এক্সপ্রেস করতে পারি এইভাবে। আর এখানেই মনে হয় আমাদের তফাত অন্যান্যদের সাথে। এখন একজন পর্বতারোহী নিশ্চয় আমার ভাষায় এক্সপ্রেস করবেন না।

শ্বেতা- তোমার প্রথম বই ‘কাগজফুলের বাহাস’ প্রকাশের অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা কেমন?

শুভ- অনুভূতি বলতে কাগজে বের হওয়া প্রথম বই, তো সেই অর্থে অনুভূতি বেশ দারুণই ছিল। তবে আমার প্রথম বইটা নিয়ে পাব্লিশার রিলেটেড কিছু ইস্যু ছিল তুমি জানো মনে হয়। আর এই নিয়ে আমার চারপাশ থেকে বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও হয়েছিল। আবার এই নিয়েই চারপাশ থেকে কিছু ভালো মানুষও দেখেছি।

শ্বেতা- এরপর পরপর দুইটা বই প্রায় একই সাথে ‘জুন মাসের ডায়েরি’ আর ‘আল আকসা আবাসিক হোটেল’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করলে, পাঠকের কাছ থেকে কেমন রেসপন্স পেয়েছো? এখন তো মানুষ প্রিন্টেড বইয়ের চেয়ে ই-বুক’ই বেশি পড়ে, এক্ষেত্রে তুমি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিষয়টাকে কিভাবে দেখো?

শুভ- পরপর বলতে ‘জুন মাসের ডায়েরি’ বইটা বের করা অনেকটা ঘটা করেই। আমার প্ল্যানের বাইরে ছিল এই বই। বইটা বের করার দুইমাস আগেও আমি ভাবিনি যে ‘জুন মাসের ডায়েরি’ বের করব। তবে খেয়াল করেছি এই বইটা থেকেই বেশ ভালো রেসপন্স আমি পেয়েছি। ইনফ্যাক্ট এখনো পাচ্ছি। তো ‘জুন মাসের ডায়েরি’ সেই হিসেবে কিছু মানুষকে তৃপ্ত করতে পেরেছে বলতে পারি।

আর ‘আল আকসা আবাসিক হোটেল’ থেকেও বেশ ভালোই রেসপন্স পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি। এই বইটায় আমার লেখার প্যাটার্নে কিছু চেইঞ্জ এনেছি। সাধারণত আমি যখন গদ্য লিখি বা গল্পও লিখি খেয়াল করবে ন্যারেটিভ ফরম্যাটেই বেশিরভাগ লেখা। এই প্যাটার্নকেই একটু মডিফাই করেছি আল আকসায়।

আর ই-বুক বেশি পড়ছে, এটাকে আমি বেশ ভালোভাবেই নিচ্ছি। যুগের সাথে তাল মিলানো তো মন্দ নয় বলো। তবে প্রিন্টেড বইয়ের দরকার যে শেষ হয়ে গেছে সেটা বলব না। টাইম ইজ দ্য বেস্ট সেলার কিনা!

তোমার রিসেন্ট বইটা আমার পড়া হয়নি। ‘আলাহিয়ার আয়না’ ছিল বইটার নাম। আমার মনে হয় অনেকেই এই বইটার খোঁজ পায়নি। তো এই বইটা নিয়েই তোমার কিছু কথা শুনতে চাই।

শ্বেতা- ‘আলাহিয়ার আয়না’ নিয়ে সমস্যা হয়েছিল সেটা সবাই জানে কিন্তু পুরো ঘটনা আমি এর আগে কখনো বলিনি। তুমি জানো, ২০১৭ তে আমার ফান্ডরেজিংয়ের সময় ভারতে যাই ট্রিটমেন্টের জন্য। তো ঐ সময় নির্ঝরদারা আমার ফেসবুক পোস্টে দেওয়া কিছু কবিতা নিয়ে একটা বই বের করেন ‘ফেস্টুন’ থেকে, কিন্তু বর্ষাকাল থাকায় দুর্ভাগ্যবশত বইগুলোর গাম ভালো করে না লাগার কারণে ওগুলো খুলে যায়। তাই বইটা তখন মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে ধ্রুবদা (ধ্রুব এষ) বিভাস প্রকাশনা থেকে বইটা করতে চেয়েছিল কিন্তু বারবার ওদেরকে প্রুফরিড করে দেয়ার পরও ভুলে ভরা বই ছাপায়, তাই সিদ্ধান্ত নিই বইটি বাতিল করে দেবার। তবে শেষ বই ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’এ ‘আলাহিয়ার আয়না’র বেশকিছু কবিতা রেখেছি।

শুভ- তোমার লেখালেখি নিয়েই প্রশ্ন করি। কবিতা ছাড়া কথাসাহিত্য বা সাহিত্যের অন্যান্য ধারা নিয়ে তোমার ভাবনা কী? অদূর ভবিষ্যতে তোমার কাছে ফিকশন বা ননফিকশন নিয়ে বই আশা করতেই পারি?

শ্বেতা- ভাবনা বলতে সাহিত্যের প্রতিটা ঘরানাই আমার কাছে প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। কবিতার প্রতি অন্যরকম টান তো আছেই একইসাথে কথাসাহিত্য বিশেষ করে ফিকশান ছোটবেলা থেকেই প্রিয় আর এখন যোগ হয়েছে নন-ফিকশনও। আর যেহেতু সাহিত্যেই আমার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর তাই সাহিত্যের সমালোচনার ধারাও আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে কখনো উপন্যাস লিখার, তবে তা নিশ্চিতভাবেই আরো অনেক পরের ব্যাপার!

শুভ- প্রিন্টেড বইয়ের বাইরেও যে ফিল্ড আছে সাহিত্যের, সেসব নিয়ে তোমার কী ভাবনা? মানে তুমি কি মনে করো বইয়ের ব্যাপারে যুগের সাথে তাল মেলানো যৌক্তিক?

শ্বেতা- আমি মনে করি একটা বই প্রকাশের মাধ্যমে লেখক/কবি যদি কিছু উপার্জন করতে পারে সেক্ষেত্রে বইটা যে মিডিয়াতেই প্রকাশ হোক না কেন তাই সার্থক। আমাদের দেশে লেখাকে এখনো প্রধান পেশা হিসেবে অনেকেই চিন্তা করতে পারেন না, এটা একটা ক্ষুদ্রতা। লেখার জন্য যে শ্রমটা আমরা দিই তার মূল্য অবশ্যই হওয়া উচিৎ। প্রকৃত কবি/লেখকরা সময়ের চেয়ে বরাবর এগিয়েই থাকে আর যুগের সাথে তাল মেলানো তো সহজাত ব্যাপার!

শুভ- লেখালেখিকে আমাদের এখানে পেশা হিসেবে নিতে না পারার কারণ কী মনে হয় তোমার কাছে? অনেকেই ভালো লিখছেন, কিন্তু নানা কারণে তারা রিচ করতে পারছেন না। কেন পারছেন না, কী মনে হয় তোমার? আবার অনেকেই ভালো না লিখেও প্রচারে গা ভাসিয়ে বেশ ভালোই রিচ করছেন। তো তাদের এই রিচ করাটা কতটুকু অর্থ বহন করে সাহিত্যে? আমি এখন পর্যন্ত তিনটা বই বের করেছি। উপার্জন বলতে তেমন কিছুই হয়নি।  এই ক্ষেত্রে আমাকে বা আমার মত যারা আছেন তাদেরকে ‘পেশাদার’ হবার জন্য কী পরামর্শ দিতে চাও তুমি?

শ্বেতা- লেখালেখিকে প্রধান পেশা হিসেবে না নিতে পারার নির্দিষ্ট একটি বা দুটি নয় বরং মিশ্র কারণ রয়েছে। পারিবারিক-সামাজিক বাস্তবতা, নিজস্ব অনিশ্চয়তা, ডেডিকেশান, আত্মবিশ্বাস ও স্বীকৃতির অভাব এমন অজস্র কারণ! যেহেতু শুরুতেই কেউ নির্দিষ্ট পরিমানে রোজগার বা সাফল্য পায় না, তাকে জীবন চালনার জন্য অন্য পেশার আশ্রয় নিতে হয়! আর রিচ করার বিষয়ে আমার মনে হয় ক্ষণিক জনপ্রিয়তায় আত্মহারা না হয়ে লেখালেখির সাথে একটা দীর্ঘ গুনগত সময় কাটানোর পরে যারা তাদের কাজ দিয়ে টিকে থাকবে তখন তাদের মূল্যায়নটা হবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই পরামর্শ নয় আমার মত হলো, সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ‘ধৈর্য’কে আমাদের স্বভাবে পরিনত করতে হবে।

শুভ- লেখালেখির সাথে যে সামাজীক দায়বদ্ধতার কথা আমরা শুনি, সেই ব্যাপারে তোমার কি কিছু বলার আছে?

শ্বেতা- আসলে এই প্রশ্নটা আমার মাথাতেও ঘোরাফেরা করে, কেননা, অন্যান্য পেশার দায়বদ্ধতাটা অনেকটাই চোখে দেখা যায়, যেমন শিক্ষক, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের কাজ সম্পর্কে আমরা জানি কিন্তু যখনই তা লেখালেখির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যায়! আমি নিজেও লেখালেখির সামাজিক দায়বদ্ধতা না জেনেই কিন্তু লিখতে শুরু করি। আমার মনে হয় প্রকৃত সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত এবং আপাত দৃষ্টিতে সঠিক সব মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নতুন চিন্তার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে, মানুষকে জীবনের দিকে তাকানোর ভিন্ন দৃষ্টি শেখায়।

শুভ- শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তাঁরা তো সমাজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাই তাদের দায়বদ্ধতাও সেরকমই যা আমরা জানি। কিন্তু একজন লেখক কি ঐ অর্থে অতটা দায়বদ্ধ বা সমাজ ব্যবস্থায় সেও কি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত? আমার কিন্তু তা মনে হয় না। দায়বদ্ধতা এই ক্ষেত্রে লেখকের থাকতে পারে। তবে সেটা আরোপিত না হওয়াই ভালো। মানে যেভাবে আমরা দায়বদ্ধতা খুঁজি আর কি!

শ্বেতা- আরোপিত হবে কেন, অন্যান্য পেশার দায়বদ্ধতাটা আংশিক কিন্তু সাহিত্যের দায়বদ্ধতাটা সামগ্রিক; সমাজ,  মানবজীবন-মন সবত্র সে গুনগত (পজেটিভ বা নেগেটিভ) ক্ষেত্র তৈরি করে চলে।

আচ্ছা, তোমার কাছ থেকে কবিতার বিষয়ে জানতে চাই; কবিতার ভাব বা ফিলোসোফিক্যাল দিক নাকি মেটাফোরিক্যাল দিক অথবা আঙ্গিকের দিকটা (বিশেষত ছন্দ); তোমার কাছে কোনটা সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়?

শুভ- মেটাফোর আর দর্শনের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় দুটোই দরকার। ছন্দ অলংকার দিয়ে আমরা কবিতার ভিতরে প্রবেশ করি। আর প্রবেশ করাটাই নিশ্চয়ই শেষ কথা নয়। তাই দর্শনগত দিকটাও চলে আসে। মানে খুঁজি আমরা। আর কবিতার সব আঙ্গিকই সুন্দর। এখন কোন আঙ্গিকে একজন কবি লিখছেন বা আদৌ কি উনার বলাটা ওই আঙ্গিকে যাচ্ছে কিনা সেটাও একটা বিষয়। কবিতার কথা যদি বলি সমসাময়িক অনেক কবিতাই পড়ে কেন জানি মনে হয় আগেও পড়েছি কোথাও। এখন এটা কি আমার সমস্যা নাকি কী আসলে আমি জানি না। তবে এটা সমস্যাই আমার জন্য, যখন আমি পাঠক। এডাপটেশন প্রচুর হচ্ছে এখন, রিফরমেশন হলেও একটা কথা ছিল। যারা বেশি-বেশি পড়ছেন তাদের লেখায় ওই পড়াটার রেশ কনশাসে সাবকনশাসে থেকেই যাচ্ছে। তো এই বিষয়টা একটু গোলমেলেই মনে হয় আমার কাছে।

তোমাকে প্রশ্ন, বাংলা সাহিত্যের সীমাবদ্ধতা কোথায় বলে মনে হয় তোমার বা তোমার নিজের সীমাবদ্ধতা এই ক্ষেত্রে কী বলে মনে কর?

শ্বেতা- বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো অনুবাদ না-হওয়া; যে জন্য তা অন্যান্য দেশের সাহিত্যিক বা পাঠকের কাছে জায়গা পাচ্ছে না। অনেকটা এমন, আমরা যেন অলওয়েজ রিসিভার, গিভার না কখনো।

আমার নিজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা হলো আমার আলসেমি, যেটার কারণে আমার পড়া এবং লেখা দুটোর সংখ্যাই খুবই কম। কিন্তু ভালো লিখার জন্য প্রচুর পড়া দরকার, ক্লাসিক থেকে সমসাময়িক সবই গুরুত্ব দিয়ে।

শুভ- অনুবাদ নিয়ে তোমার সাথে আমিও একমত। এটা সত্যিই আমাদের সীমাবদ্ধতা। ইদানিং অনেকেই অনুবাদ নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু এখানেও ওই একই অবস্থা। মানে আমরা রিসিভার যে রিসিভারই থেকে যাচ্ছি। কোনোভাবেই গিভার হতে পারছি না। হয়তো এই নিয়ে আমাদের ভাবনার সংকীর্ণতাই প্রধানতম কারণ। অন্যান্য কারণ তো আছেই। পাশাপাশি আমাদের অনুবাদকদেরও এই বিষয়টা নিয়ে দূরদৃষ্টি দেয়ার দরকার আছে। ইভেন পাব্লিশারদেরও এই নিয়ে কাজ করা দরকার।

আচ্ছা, তোমার পাঁচটা কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’ কলকাতা থেকে পাব্লিশ হয়েছিল। তো ওপারে কেমন ফিডব্যাক পেয়েছিলে তুমি?

শ্বেতা- আমার বইগুলোর মধ্যে ‘বিপরীত দুরবিনে’ আর ‘ফিরে যাচ্ছে ফুল’ সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সেক্ষেত্রে কলকাতার এতোটা ফিডব্যাক আসবে আমি তা ভাবিনি! অনেকেই ছোট ছোট রিভিউ বা তাদের অনুভবের কথা লিখে জানিয়েছেন। পাঠকদের এই রেসপন্সটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আচ্ছা শুভ, একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাচ্ছি। তোমার কি মনে হয় নারী ও পুরুষের শিল্পবোধ আলাদা?

শুভ- ইট ডিপেন্ডস। তুমি জেন্ডার বাদ দিয়ে জাস্ট ভাবো আমরা লেখক, মানে শিল্পবোধের জায়গা থেকে আমি তুমি বা অন্যান্যরাও কি আলাদা নই! অবশ্যই আলাদা। তবে হ্যাঁ, শিল্পবোধের জায়গা থেকে নারী পুরুষ দুটো দুই মেরুর। কিন্তু তারা ঘুরছে একসাথেই।

শ্বেতা- দুই মেরুর বলতে কি বোঝালে এটা আরেকটু বিশদ বললে ভালো হয়!

শুভ- মানে তাদের চিন্তা ভাবনা বা বিকাশের জায়গাগুলো আমার কাছে মনে হয় ভিন্ন। আর এই ভিন্নতাটাই ভারসাম্য রাখে। মানে কেউ কাউকে ছাড়িয়া যাইতে পারে না টাইপ। তুমি বরং জেন্ডার ইস্যুটা বাদ দিয়ে লেখক ভাবো, দেখবে এই ভিন্নতা বা ভারসাম্যগুলো তোমার চোখে ঠিক ঠিক ধরা পড়বে।

শ্বেতা- নারী ও পুরুষের ভিন্নতার ভাবনাটা আমার না, বাংলাদেশি বেশিরভাগ সাহিত্যকদের মধ্যেই এই আলাদা ভাবার বিষয়টা খুব চোখে পড়ে। বিশেষভাবে যখন তারা কোনো নারীকে ভালো কাজ (লেখাকেই মিন করছি) করতে দেখে তখন সেটা স্বীকার করতেও তাদের মনে হয় অহংকারে বাধে! এইজন্যেই বিষয়টার অবতারণা করলাম আরকি!

শুভ- তাঁরা যে কারণে ভিন্ন বলেন সেটার কারণ যাই হোক, আমার ভাবনার সাথে মিলে না। ভালো লেখাকে স্বীকার না করাটা আমার কাছে অবান্তর ও বোকামি মনে হয়।

আচ্ছা ফেইবুক নির্ভর যে সাহিত্য গড়ে উঠছে, এই বিষয়টাকে তুমি কীভাবে দেখো?

শ্বেতা- ফেসবুক নির্ভর সাহিত্যকে আমি পজেটিভ ওয়েতে দেখি। এখানে লেখক অনেক স্বাধীন, কারো কাছে অনুরোধের বিষয় নেই। তবে লাইক নির্ভর কবি সাহিত্যিকদেরকে আমি পছন্দ করি না, এখানে প্রকৃত কবি অনেকেই আন্ডাররেটেড, আবার গ্রুপিং বা চেহারাকে পুঁজি করে অনেক বেশি ওভাররেটেড হচ্ছে অনেকেই। তবে সামগ্রিক ভাবে সোস্যালমিডিয়া আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ যেহেতু অনেকের সাথে শিল্পের মাধ্যমে কানেক্টেড হবার এটা সবচেয়ে উপযোগী টুল।

শুভ- সমসাময়িক বা জীবিত লেখকদের মধ্যে অনেকেই সংঘবদ্ধ হয়ে লেখালেখি করেন। মানে গ্রুপিং আর কি! মানে ক গ্রুপ খ গ্রুপ গঙ্গা গ্রুপ পদ্মা গ্রুপ ইত্যাদি। তুমি কি কোনো গ্রুপে আছো?

শ্বেতা- এই প্রশ্নের উত্তর আশাকরি তোমার ভালোই জানা আছে। আমি তো অনেক সময়ই নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই আর যেহেতু বাকপটুও নই তাই যেকোনো গ্রুপেই আমার পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। গ্রুপের জন্য ভিন্ন যোগ্যতার মানুষ হতে হয়।

এখন আবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাই, এই যে বৈশ্বিক মহামারী করোনা আপাতত দৃষ্টিতে অনেক কিছু শেখাচ্ছে, মৃত্যু ও শোকে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্যহীনতা, সহমর্মিতা… কিন্তু সত্যিই কি করোনা কোনো বদল আনতে পারবে মানুষের মনে-আচরণে? তোমার দূরদৃষ্টি কি বলে?

শুভ- কিছু মানুষের হয়তো বদল আনতে পারে। তবে সেটা সংখ্যার হিসেবে খুব নগণ্য। যতদিন যাচ্ছে খেয়াল করে দেখবে মানুষ তার স্বার্থের চিন্তাটা সর্বোচ্চই করে যাচ্ছে। এভাবে শুনতে একটু অড লাগবে তোমার। কিন্তু এটাই সত্যি। ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অনেক ভালো কাজ যেমন দেখি অনেক খারাপ কাজ বা ল্যাং মেরে নিচে নামিয়ে দেয়ার মত হিংসাত্মক কাজও দেখি। যাইহোক আশা করতে তো দোষ নেই। সেই সাথে যার যার জায়গা থেকে এটা ভাবতে হবে, ভাবনার প্রয়োগও ঘটাতে হবে। ভালো কাজকে সাপোর্ট করতে হবে।

শ্বেতা- আচ্ছা, তুমি কি মনে কর লেখকদের জীবনে ডিসিপ্লিন বা দৈনন্দিন কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিৎ, নাকি সে যে-কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে তার জীবন কাটাবে?

শুভ- আসলে উচিত শব্দটা স্টিক্ট শোনায়। ব্যক্তির নিজের অবস্থান বা সময়ই বলে দেবে তার কী করা উচিত আর কী নয়। তবে আমরা যেহেতু একটা সোসাইটি বা পরিবার মেন্টেইন করি, সেই ক্ষেত্রে অন্যান্যদের কথাও তো ভাবতে হবে। মানে নিদেনপক্ষে তোমার লাইফ স্টাইলের জন্য যেন কাছের কেউ অন্তত ক্ষতির মুখোমুখি না হয়। এই ক্ষেত্রে ক্ষতি বলতে অনেককিছুই তো বলা যায়।

শ্বেতা- আমাদের এই যে ‘আমি’ হয়ে ওঠা এর পেছনে অনেক ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থাকে, তোমার ক্ষেত্রে কি কোনো সাহিত্যিক বা সাহিত্যকর্মের প্রভাব রয়েছে?

শুভ- হ্যাঁ, পরোক্ষ একটা প্রভাব তো থাকেই কখনো না কখনো। যদিও লিখতে গেলে তখন আর কোনো প্রভাব অনুভূত হয় না খুব একটা। আর তুমি জিজ্ঞেস করছিলে কোনো সাহিত্যিক বা সাহিত্যকর্মের প্রভাব আছে কিনা। সেটার উত্তর নেই আসলে আমার কাছে। কারণ এইক্ষেত্রে আমার উত্তর জুড়ে থাকবে দ্বিধা। এই অসময়ে দ্বিধান্বিত হতে চাই না আর কি।

শ্বেতা- তুমি একবার বলেছিলে যে, তুমি সবসময়ই লেখার ভেতরেই থাকো, বাস্তবে চাকরি ও অন্যান্য কাজের পরে লেখার জন্য কতটা সময় পাও? প্রতিদিনই কি লিখ?

শুভ- হ্যাঁ, লেখার ভিতরে থাকার স্বভাব আমার। আর সময়ের কথা বললে আমি আসলে সময় বের করে নিই। আমার লেখার ব্যাপারটা অত আয়োজন করে হয় না। এমন অনেক লেখাই আছে অফিসের কাজের ফাঁকে লিখে ফেলেছি। বা জার্নিতে লিখে ফেলেছি। বা এমনও হয়েছে হুট করেই ঘুম ভেঙে কোনো কারণ ছাড়াই লিখতে বসে গেছি।

শ্বেতা- আর এটা খুবই অসাধারণ একটা ব্যাপার!

অনেকেই তো বলে আপনার লেখা বা কবিতা বুঝি না, পাঠকের এই যে না-বোঝা, এক্ষেত্রে একজন কবি/লেখকের কি ভূমিকা নেওয়া উচিৎ বলে মনে কর?

শুভ- না বুঝার ব্যাপারটা আমি নিজেও অনেক শুনেছি আমার লেখালেখি নিয়ে। একটা কথা বলা দরকার, এই প্রসঙ্গে, আমার বই যারা পড়েছেন তাদের অধিকাংশই নিতান্ত পাঠক। মানে সমসাময়িক যারা লিখছেন তাদের কেউ কেউ হয়তো আমার লেখা পড়েন। তো না বুঝার ব্যাপারটা আসে পাঠকদের থেকেই বেশি। তো এই ক্ষেত্রে একজন লেখকের ভূমিকার কথা বলাটা একটু টাফ। আমি ন্যারেটিভ ফরমেটে লিখি। তুমি ব্যাপারটা জানো। আর এই ফরম্যাটের কোনো লেখা পড়তে হলে যে কন্সেনট্রেসন দরকার হয় সেটা বোধয় এই সময়ে এসে একটু কঠিনই। সোসাইটিতে নানাবিধ কারণে মানুষ হাঁপিয়ে ওঠে। বই পড়ার ব্যাপারটা তখনই আসে যখন সে এই ব্যাপারটাকে রিক্রেশন হিসেবে দেখছে। মানে সময় পার করার জন্য বই পড়ে এরকম মানুষও আমি দেখেছি। তো সেক্ষেত্রে বিশদ মনোযোগ আসে না মনে হয়। তবে হ্যাঁ, লেখায় দূর্বোধ্যতার বিষয়টায়ও একটা ইম্পর্টেন্ট কারণ। আমি কিছু বলতে চাইছি অথচ বুঝাতে পারলাম না তো এটার কারণ দুটো হতে পারে। এক, লেখার টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো আমি ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারিনি। যে কারণে লেখাটা দূর্বোধ্য বা বুঝাতে অক্ষম। আর দুই, কোন শ্রেণীর পাঠকের সীমাবদ্ধতা।

শ্বেতা- আমার শেষ প্রশ্ন, একটা বিষয় আমাকে প্রায়ই কাতর করে, একজন কবি বা লেখক হিসেবে আমার বা তোমার কাছে বন্ধুদের তাৎপর্য কি? বন্ধুদের কি জীবনের অপরিহার্য কোনো অংশ বলে মনে কর তুমি?

শুভ- বন্ধুত্ব ব্যাপারটা অন্তত আমার কাছে অবশ্যই অপরিহার্য। আমার মনে হয় এই সম্পর্কটা থেকে যায়। হারায় না। কখনো কখনো মনে হয় হারিয়ে গেছে কিন্তু সত্যি এটা হারায় না। যতই বয়স বাড়ছে এটা খুব করেই বুঝতে পারছি।

তোমার নেক্সট কবিতার বই কবে আসছে? ইদানিং কী লিখছ বেশি?

শ্বেতা- নেক্সট কবিতার বই কবে আসবে সে ব্যাপারেও কিছু ঠিক করিনি। সিরিজ কবিতা লিখার চেষ্টা করছি ‘বন্ধুর জন্য এলিজি’ আপাতত এই নামে। এছাড়া অল্পবিস্তর কবিতা, মুক্তগদ্য তো লিখা হয়েই যায়। আমি চাই বই দেরিতেই হোক!

শুভ- অনুবাদ নিয়ে তোমার কি কোনো প্ল্যান আছে?

শ্বেতা- অনুবাদ নিয়ে প্ল্যান বলতে কিছু কবিতার অনুবাদ তো করতেই চাই। তবে আমার ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সবই সময় নিয়ে হোক, তবে এমন কিছু হোক যেন তা মানুষের সাথে কানেক্ট হতে পারে!

শুভ- সবাই সহজ মানুষ হবার বাসনা নিয়ে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। সহজ মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন আজকের দিনে। তোমার কী মনে হয়, তুমি কতটা সহজ হতে পেরেছ বা কতটাই কঠিন হয়ে যাচ্ছো?

শ্বেতা- আমি আমাকে খুবই কম বুঝতে পারি। আমার কাছে জীবন আর যাপনের অনেক অমীমাংসা আছে, তাই আমি কতটা সহজ বা দুর্বোধ্য তা আমার পক্ষে বলাটা মুস্কিল। মানুষ অনেক হিসাব করে নিজেকে গড়তে এবং রিপ্রেজেন্ট করতে চায়। ইগো’ও এখানে একটা ইস্যু বটে! কিন্তু হিসাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেলে না তাই তারা সবকিছু মিলিয়ে জটিল হয়ে যাচ্ছে।

শুভ- এটা ঠিক। ইগো অনেক কিছুই নষ্ট করে দিচ্ছে।

লেখা ছাপাছাপি নিয়ে বিশেষত ফেইসবুকে এই বিষয়টা নিয়ে প্রায়ই দেখি কাদা ছোঁড়াছুড়ি অবস্থা হয়। আমার এটা ফেইস করতে হয়নি কখনোই। কদাচিৎ কেউ লেখা চেয়েছে। আমিও কখনো লেখা দিয়েছি বা এমনও হয়েছে দেইনি। মানে সাইলেন্স থাকাটায় ভালো লাগে আমার। তো তুমি কি এরকম কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি অবস্থা কখনো ফেইস করেছ?

শ্বেতা- না, আমি এমন কোনো অবস্থা এখনো ফেস করিনি, এটা আমার সৌভাগ্য। লেখা ছাপার ব্যাপারেও আমার তেমন কোনো বাছবিচার নেই, দেখোই তো কেউ লেখা চাইলে আর আমার কাছে নতুন কিছু থাকলে তা নির্দ্বিধায় দিয়ে দিই।

শুভ- সাহিত্যের সমালোচনার ধারাটাতে তুমি কতটা এক্টিভ?

শ্বেতা- সমালোচনা যে সবসময় লিখেই করতে হবে আমি এমনটা মনে করি না। নিজস্ব পর্যালোচনার ভেতর দিয়েও বা অন্যকারো সাথে ডিসকাশনের মাধ্যমেও আমরা সাহিত্যের সমালোচনা করতে পারি৷ তবে রিটেন ক্রিটিক ওয়ার্কের গুরুত্ব সর্বাগ্রে। ইদানিং আমাদের দেশে ক্রিটিক বলতে তো শুধু উচ্চ প্রশংসায় ভাসিয়ে দেয়া হয় অথবা কট্টরভাবে নিচে নামিয়ে দেয়া। এটা সাহিত্যের প্রকৃত সমালোচনার ধারা নয় একেবারেই।

শুভ- তা ঠিক। আবার অনেক লেখকও আছেন যিনি সমালোচনা ব্যাপারটাকে রীতিমত এলার্জি হিসেবেই দেখেন। শ্বে.শ- একজন যেমনই লিখুক তার ব্যক্তিসত্তাকে আলাদা রেখে তার কাজ মূল্যায়ন করার জন্য সমালোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই যারা সমালোচনাকে এলার্জির মতো দেখে তারা আসলে তাদের দুর্বলতারই প্রকাশ ঘটায়।

শুভ- হ্যাঁ, এটা ঠিক।

শ্বেতা- অনেকদিন পর একটা দীর্ঘ আড্ডা। কেমন লাগলো এই আড্ডালোচনা?

শুভ- এইরকম সময়ে মন খুলে কথা বলাটার আনন্দ বলে বুঝাতে পারব না। আর নস্টালজিয়াও আরেকটা কারণ। সব ঠিক হয়ে গেলে আবার আমরা আড্ডা দেব। আপাতত সবাই সুস্থ থাকি।


সম্পাদনা: মন্দিরা এষ