রোদের নাক বরাবর । এনামুল রেজা

‘রোদের নাক বরাবর হেঁটে যাবেন। রাস্তার শেষ মাথায় ভুবন বিশ্বাসের ভাতের হোটেল আছে। ওখানে একবেলা খাবেন আমার নাম করে। টাকা লাগবে না।’

‘রোদের নাক বরাবর হেঁটে যাবেন। রাস্তার শেষ মাথায় ভুবন বিশ্বাসের ভাতের হোটেল আছে। ওখানে একবেলা খাবেন আমার নাম করে। টাকা লাগবে না।’

মগজে দিনরাত্রি জুড়ে কথাগুলো ঘুরতে থাকে ঠিক লাটিমের মত। বনবনবন, ভোঁওওও। নওশাদের মাথায় ব্যথা করে। গলার ভিতর কুটকুট করে। নড়েচড়ে ওঠে অদৃশ্য পোকারা। পোকা নিশ্চয় কিছু জন্মেছে মগজে নইলে এমন চুলকাবে কেন? রোদের কি নাক আছে যে সেই বরাবর হেঁটে পথের শেষ মাথায় যাবে সে? কিংবা এ বিহারিপট্টিতে ভুবন বিশ্বাস নামে কারও ভাতের দোকান কি আছে? এমনও নয় সে পয়সাহীন একবেলা ভাত খেতে চায়।

তার বসবাস দু’রুমের ছোট্ট এই ফ্ল্যাটে। একটা বেডরুম, ছোট্ট ড্রয়িং। অযত্নে নোংরা হয়ে ওঠা কিচেন আর টয়লেট। বারান্দা থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় জমজমাট বাজার। বাতাস চারতলাতেও বয়ে আনে বটের শিক কিংবা গরুর মাংসপোড়া ঘ্রাণ, অচেনা শিল্পীদের গাইতে থাকা কাওয়ালি।

বেলা দেড়টায় ঘুম ভেঙে নওশাদ যখন টয়লেটে যায়, ব্লাডার খালি করতে করতে সে তাকায় দেয়ালের এক কোণায় আশ্রয় নেওয়া মাকড়সাটির দিকে। এই কিম্ভূত পোকাটি তাকে রোজ অভিবাদন জানায়। হ্যাঁ, অভিবাদন যা থেকে নওশাদের মনে হয় কোন এক নামহীন বোধ তাকে অনবরত খোঁচা মারছে প্রতি মুহূর্তে। উদাহরণ দরকার? ঠিক আছে, আমরা এই গল্পটা শুরু করছি। যদিও, গল্প জীবনের মতই। শুরুটা আমরা নিজেদের মত করতে পারি না, শেষটা নিয়েও এমনকি কোন অনুমান আমাদের পক্ষে হয়ে দাঁড়ায় অসম্ভব।

সপ্তাখানিক আগের এক রাতে নওশাদ ছিল নুরুলদিনের বাড়িতে।

নুরুলদিন সরকারি কেরানী। নতুন চাকুরি হবার কারণে এখনও অবিবাহিত। যদ্দিন না বিয়ে করছে, বন্ধুমহলে লোকটার কদর থাকবে তুলনারহিত। কারও মদ্যপানের আসর দরকার? চলে যাওয়া যায় নুরুলদিনের কল্যাণপুরের ফ্ল্যাটে। সেখানে সপ্তাহান্তে মদের জমাট আসর বসে। নেশা চড়ে গেলে নুরুলদিন আবার হয়ে ওঠে শতাব্দীসেরা দার্শনিক এবং ভয়ানক রকম নষ্টালজিক। নেশার ঘোরে তার সে দর্শন সবার মাঝে তৈরি করে অস্পর্শনীয় মেঘের ধোঁয়া ধোঁয়া আবেশ। ..বুঝলে নাকি, পৃথিবীতে কেউ আজন্ম ঝুলে থাকে না, এমনকি ফাঁসির আসামিও.. এ কথার আবিষ্কার বেকারত্বের দিনগুলোতে.. এ তো জানা উচিত সবার, বেকারত্ব পয়দা করে গণ্ডা গণ্ডা দর্শন..

নারীজনিত ব্যাপারেও লোকটা উদার। বন্ধুমহলের কেউ তার বান্ধবী নিয়ে হাজির হলে হরহামেশা নিজের তিন-কামরা ফ্ল্যাটের যে কোন একটা ছেড়ে দেবে, এই ব্যাপারে তার নিজস্ব দর্শন ঐশ্বরিক। বিজবিজ করে তখন সে আউড়ে যাবে, ‘এই দেখো তো, আমি কেমন ঈশ্বর হয়ে উঠছি। বেচারা আবু দাউদ, বান্ধবীর সাথে ঘুমানোর জন্য হন্যে হয়ে ফিরছে একুল ওকুল, আমি তাকে বকশে দিলাম, উদ্ধার করলাম। এ কি ঈশ্বরের কাজ নয়?’

নওশাদ সেই রাতটায় অন্য আর সকল সময়ের অনুকরণে বেছে নিয়েছিল দেয়াল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সে তাকিয়ে ছিল ধোঁয়ার কুণ্ডলীর দিকে। তার ফুসফুস নিঃসৃত ধোঁয়া, এই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর অবলোকনের জন্য মারিজুয়ানা মোড়া স্টিকে দম দিতে হয়; একটানা মনোটোনাস দম, যতক্ষণ না ফুসফুস ক্লান্ত হয়ে ওঠে এবং ফুসফুস ক্লান্ত হবার কিছুক্ষণ পর সে ক্লান্তি পৌছে যায় মস্তিষ্কে। নওশাদের মস্তিষ্ক ক্লান্তির চুড়ায় উঠে বুঝতে পারছিলো, এই যে একটা দেহ সে বয়ে বেড়ায় মিরপুর টু ঝিগাতলা টু ফকিরাপুল টু বাংলা একাডেমির পুকুরঘাটা, সে দেহ হঠাৎ যেন হয়ে পড়েছে মস্তকহীন।

দৃশ্যটা প্রথম খেয়াল করেছিল মতিঝিলের বদরুদ্দোজা। নিকটবর্তি সঙ্গি খোকনকে ডেকে সে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, ‘দেখেছেন ব্যাপারটা? নওশাদের মাথাটা কেমন ঘুরছে?’

কোন একটা বেসরকারি কোম্পানীর মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ খোকন, আসছে বসন্তে যার বয়স হবে তেত্রিশ, গাল হাঁ করে নওশাদের দিকে তাকালো। ‘হ্যাঁ তাইতো, লোকটার মাথা তো ঘুরছে, বনবন ফ্যানের মত, গাড়ির চাকার মত, ইঞ্জিন লাগানো তেলের ঘানির মত অথবা শ্যালো ইঞ্জিনের হুইলের মত? একটা মানুষের মাথা এইভাবে কি ঘোরে?’

যেহেতু এরা দুজনই দেখতে মানুষের মত, মানুষের স্বভাব তারা ধারণ করবেই। নওশাদের মস্তকের এই ঘূর্ণন তাদের করে তুললো স্মৃতিকাতর। ‘আহা, লোকটা এই দু’মাস আগেও তো কত সুখে ছিল, বউ ছিল, ছিমছাম যাকে বলে একটা শান্তিময় সংসার।’

ছিল বটে। বিয়ের আগে ছিল দীর্ঘদিনের প্রেম।

সংসার ভেঙে যাবার পর থেকেই লোকটা কেমন উদাস রকমের হয়ে গিয়েছে। ‘আগে উদাস ছিল না আপনাকে কে বললো?’

না কেউ বলেনি, অনুমান করে নিতে কষ্ট হয় নাকি? এইসব কত দেখলাম।

কী দেখলেন?

মতিঝিলের বদরুদ্দোজা কী দেখেছে বলার আগেই কক্ষে প্রবেশ করলো নুরুলদিন। তার হাতে শিভাস রিগালের একটা ভরাট বোতল। খোশ মেজাজি কণ্ঠে সে ঘোষণা করলো, ‘আজকের বোতল নওশাদের হারিয়ে যাওয়া বউয়ের উদ্দেশ্যে। এই নারী, আমি দাবি করতে পারি এখন অন্য কোন পুরুষের সাথে বিছানা ভাগ করছে, তার শোকে আমাদের নওশাদের মাথাটা কেমন ঘুরছে দেখেছেন? এমন মহৎ নারীর সম্মানে আমরা পান করবো অমৃত। যতক্ষণ আমাদের স্টক থাকে আরকি।’

 

শাদা মেঝের উপর মনে হলো কোন সিফিলিসে আক্রান্ত রোগী করে দিয়েছে পেশাব।

 

‘বাহবা, বাহবা। কী মহৎ উদযাপন’, উচ্চস্বরে ফোড়ন কাটলো প্রাক্তন সৈনিক খুরশিদ আলম, ঘুষি মেরে ডিউটি অফিসারের নাক থেঁতলে দেবার অপরাধে কিছুদিন আগে যে সেনাবাহিনী থেকে চাকরি খুইয়েছে। ঘুষি মারবে না তো কী? ডিউটি অফিসার তাকে মাঝরাত্তিরের দাওয়াত দিয়েছিল, বলেছিল তার কাছে দামি লুব্রিকেন্ট আছে, ব্যথা লাগবে না!

কে না জানে, পৃথিবীর নিয়ম আর মানুষের নিয়ম আলাদা। কোন ঘটনা ঘটাবার আগে পৃথিবী নিজেকে প্রস্তুত করে, ঝড়ের আগে সমুদ্র শান্ত হয়ে যায়, বসন্তে নতুন পাতা গজাবে এই আশ্বাসে শীত সমস্ত গাছের যা রস, শুষে নেয়, ঝরিয়ে দেয় সমস্ত পাতা। পৃথিবীর অংশ হয়েও মানুষ কখনও কখনও প্রস্তুতি ছাড়াও বিচিত্র কাজ করে বসে। সেসব কাজের বর্ণনা দেওয়ার আগে আমরা বলি বিষয়টা আঁতকা ঘটলো, অকস্মাৎ জায়গা করে নিল জীবনে, মুহূর্তে ঘটে গেল অঘটন, ইত্যাদি।

সে হিসেবেই ঘটনাটা এমন আঁতকা ঘটেছিল নুরুলদিনের ফ্ল্যাটে, সময় পেল না কেউ। মতিঝিলের বদরুদ্দোজা, আসছে বসন্তে তেত্রিশে পড়ার সম্ভাবনায় থাকা খোকন, প্রাক্তন সৈনিক খুরশিদ আলম কেউ না। নওশাদ প্রায় উড়ে এসে একটা লাথি চালালো নুরুলদিনের তলপেট বরাবর। শিভাস রিগালের বোতলটা শূন্যে খানিক ভেসে খানখান ভেঙে পড়লো টাইলস করা মেঝেতে। শাদা মেঝের উপর মনে হলো কোন সিফিলিসে আক্রান্ত রোগী করে দিয়েছে পেশাব। কাঁচের কণা ছুটে এসে ঢুকে গেল খোকনের বাঁ’ চোখে। দু’হাতে চোখ ধরে মুহূর্তের গড়াগড়িতে একটা ভাঙা কাঁচের বড় টুকরো ঢুকে গেল তার গর্দানের নরম মাংসেও। আর নিজেকে ঈশ্বর দাবি করতে থাকা দার্শনিক নুরুলদিনের কী হয়েছিল? তলপেটের লাথিটা সম্ভবত ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল তার কিডনি নাকি লিভার নাকি জননেন্দ্রিয়? সেসব পরিষ্কার হবার আগেই লোকটা ঢলে পড়লো মেঝেতে।

নওশাদ ডানে বামে না তাকিয়ে দরজার খুলে বেরিয়ে এসেছিল নুরুলদিনের ফ্ল্যাট থেকে সে রাত্তিরে। সম্ভবত তাকে অনুসরণ করেছিল মতিঝিলের বদরুদ্দোজা আর প্রাক্তন সৈনিক খুরশিদ আলমের দৃষ্টি। বদরুদ্দোজা ভয়ার্ত কণ্ঠে নওশাদকে ডেকেছিল পেছন থেকে, ‘তুই পালাচ্ছিস নাকি রে নশা? আমাদেরও নিয়ে চল।’ কিন্তু কোন রকমের পিছুডাক শুনবার অবস্থায় সে ছিল না।

অতঃপর দু’সপ্তাহ কেটে গিয়েছে। নওশাদের  আশ্রয় হিসেবে দাঁড়িয়েছে তার চিরচেনা দু’কামরার এ ফ্ল্যাট। দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা নামছে রোজ, কাওয়ালির গুঞ্জন ছুঁয়ে দিচ্ছে সন্ধ্যার ঘোরলাগা আকাশ, বৈশাখের মেঘমালা। কেউ তার খোঁজে আসেনি, আসছে না। পুলিশের সাইরেন শুনবার জন্য আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠ অপেক্ষায় আছে দু’কান। কিন্তু সে সাইরেনের সম্ভাবনাও কি শূন্যের কোঠায়? জীবন ঠিক কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় আমাদের? নওশাদের প্রধানতম সমস্যা এখন ক্ষুধা। তার ব্যাংক একাউন্টে অর্থ আছে, ভাল একটা চাকুরি করতো সে একসময়, কিন্তু তাকে এ দু’কামরার ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরোবার সাহস দেবে, এমন কেউ নেই। খাদ্য আসবে কোত্থেকে?

সুতরাং নওশাদের মাথায় বেজে চলেছে সেই বিচিত্র দুটো লাইন। কোথায় পেয়েছিল এই আশ্বাস কিংবা বহু আগে পড়া কোন সাজানো গুছানো গল্পের লাইন কিনা ওসব, স্মরণ হয় না কিছুই। শুধু তারা বাজতে থাকে চারপাশ থেকে। ‘রোদের নাক বরাবর হেঁটে যাবেন। রাস্তার শেষ মাথায় ভুবন বিশ্বাসের ভাতের হোটেল আছে, ওখানে একবেলা খাবেন আমার নাম করে। টাকা লাগবে না।’


এনামুল রেজা

উপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। প্রথম উপন্যাস কোলাহলে প্রকাশ পেয়েছে ২০১৬ সনে। অনিয়মিতভাবে পত্র-পত্রিকায় লিখে থাকেন।