সজল সমুদ্র-এর একগুচ্ছ কবিতা

সজল সমুদ্র শূন্য দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। তাঁর কবিতার সংখ্যা কিংবা বইয়ের সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটি হলেও নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও টেক্সটের শক্তিতে সহজেই মনোযোগ অধিকার করে নিয়েছেন পাঠকদের। অকালবোধন জৈষ্ঠ সংখ্যার অনলাইন সংস্করণ তূণীরে প্রকাশিত হলো কবির একগুচ্ছ কবিতা।

একা বাড়ি


একা বাড়ি আজ আবার এসে আমাকে ঘুরে গেছে।

ভেতরে কেউ ছিল না; বাগানবাড়ির দিকে মুখ রাখা
দুটো-একটা পায়রার গুনগুন, আর উড়োচিঠির আড়ালে
পড়ে থাকা তোমার প্রেরিত শান্ত হ্রেষাগুলো—
উঁকি দিয়ে দেখেছিল তাকে, ওরা কেউ বসতে দেয় নি।

আমি বসে ছিলাম একযুগ আগের উল্টানো সমুদ্রের উপর…

 


নিঃশব্দে


নিজেকে একবার লোহা ভেবে দেখলাম, দূর কামারশালায়—
গনগনে আগুনে পুড়িয়ে সকাল-সন্ধ্যা আমাকে চারজন পেটালো।

খণ্ড খণ্ড করলো। ছুরি বানালো, দা বানালো কেউ; কুড়াল, চাপাতিও।
তারপর বহুখুন, বহুরক্তগঙ্গার পরে, হাতে হাতে ঘোরাচ্ছে এখন।

পনের বছর, হৃদয়ে তুমি যা নিঃশব্দে করে চলেছো…

 


না


না-লেখা শিখছি। না-ভাবা, না-বোঝা, না-দেখার আলোকে—
লোকচক্ষুর অন্তরালে এইমাত্র যে উঁইপোকাটি দেহ-ভিক্ষায় বেরুলো,
যেসব ফুল ফুটলো, পাখি ডাকলো—তার সবই এঁকে রাখছি।

দেখেবুঝে লেখার দিনে বৃষ্টি ভিজিয়েছে; রৌদ্র পুড়িয়েছে,
একা পেয়ে একদিন বেসিন ও হ্যান্ডওয়াশ দুজনই আমাকে
অনভ্যাসে, ঠাট্টায় হাসতে হাসতে ধুয়েছে।

সে জীবন পল্লবিত, তুমিও কি কিছু অবশিষ্ট রেখেছিলে?

 


অন্তর্লীন


একটা ঠাণ্ডা হাহাকারকে গোপনে শীতকালের দিকে ঠেলে দিয়েছিলাম।

ফিরে বলে—’আমি তো আড়াল থেকে তোমার ভেতর
কোকিলের গলা আর টিয়াপাখির ঠোঁটের রহস্য ভেদ করে এলাম!
দেখলাম, এই আকাশ মূলত অতিপেখম ছড়ানো একটা ময়ূরের দীর্ঘশ্বাস।’

করোনা আসার আগে, স্বপ্নে কিংবা তন্দ্রায়— আড্ডায়, হাসি-ঠাট্টায়,
আমাদের দেখা হওয়া—বলো, আমরা কি এতখানি অসম্ভব ভেবেছিলাম?

 


পেঁপে দিবসের কবিতা


সাত-সাতটি চশমা হারানোর পরে, যে কোন স্থান থেকে
আজকাল পেঁপের ভেতর দিয়ে তোমাকে দেখা সহজ লাগে।

দুনিয়া একটা নীলনক্সা। তোমার চুল আর কাপড় শুকানোর জন্য
চাঁদ তাই সিঁড়ি রাখে নি। আমাদের এই মরে থাকা, বেঁচে যাওয়া—
একটা ময়ূরের পেখম ছড়িয়ে নাচা কিংবা না-নাচার সমান।
পাহাড় থেকে নেমে আমি তাই ঠাণ্ডা একটা দীর্ঘশ্বাসের ছবি আঁকি।
এত হৈ এত হুল্লোড়—এত অকল্পন বাঁক-ঝোঁক কিছুই তোমাকে
পেঁপের ভেতর দিয়ে দেখা থেকে আড়াল করতে পারে না।

আর পেঁপে! চালাক পেঁপে বোকা পেঁপে সত্য পেঁপে মিথ্যা পেঁপে
পূর্ব পেঁপে পশ্চিম পেঁপে টিনের পেঁপে লোহার পেঁপে
স্বচ্ছ পেঁপে ঝাপসা পেঁপে খোলস পেঁপে বদল পেঁপে—
আরো কত কত রকমের পেঁপের ভেতর দিয়ে আজকাল তোমাকে দেখি!


কবি পরিচিতি :

সজল সমুদ্র

জন্ম ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৮২; নাগেশ্বরী, কুড়িগ্রাম, বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা, একটি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।

প্রকাশিত বই—
পত্রে রচিত ভোর [কবিতা, চিহ্ন, ২০০৫]
ডালিম যেভাবে ফোটে [কবিতা, চিত্রকল্প, ২০১৪]
মীন, মকর ও মনোটোনাস [কবিতা, শব্দলোক, ২০১৭]

error: Content is protected !!