সুশান্ত সিং রাজপুত ও আমার কিছু কথা

মানুষ যখন জীবনের সব অর্থ হারিয়ে ফেলে, প্রতিটি মুহূর্তকে স্রেফ যন্ত্রণা মনে হয় এবং নিজেকে সর্বোচ্চ কষ্টটুকু দেওয়ার সাহস অর্জন করে ফেলে তখনই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

মাত্র ৩৪ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত। তুমুল প্রতিযোগিতার বলিউডে তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময়দের একজন। তরুণ বিশেষ করে এমন সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পির মৃত্যু অনাকাঙ্খিত। যদিও আমি সুশান্তের মৃত্যুতে সুইসাইড ব্যতীত অন্যকিছুর সম্ভাবনা অদ্যাবধি দেখি। ততটুকু সন্দেহ, যতটুকু অনুসন্ধিৎসু মনের থাকা প্রয়োজন। হত্যা কিংবা আত্মহত্যা যা-ই হোক অনাকাঙ্খিতভাবে মারা গেছেন তিনি।

আমার চোখে আত্মহননও সমাজ এবং পারিপার্শ্বিক সংঘটিত এক প্রকার পরোক্ষ হত্যাকাণ্ড। পার্থক্য হলো, এখানে খুনীদের দায় নিতে হয় না। ধরুন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষকরা আমার মতো লাখো তরুণের ক্যারিয়ার নষ্ট করেছে; আমরা ফ্রাস্ট্রেট্রেড হয়ে আত্মহত্যা করলে তাদের দায় নিতে হতো না। তারা মুচকি মুচকি হেসেই যেত।

বলিউডের একজন অভিনেতার অস্বাভাবিক মৃত্যু আলোচনার বিষয় হবে খুবই স্বাভাবিকভাবে। আচ্ছা বলুন তো, কী ছিল না সুশান্তের? অর্থ-যশ-সম্মান-গাড়ি-বাড়ি? কোনটা? তবুও তিনি চলে গেলেন অভিমান করে। আত্মহত্যা করে থাকলে তিনি কেবল একজন উদাহরণ মাত্র।

অভিমানের এই সুরটা আমার চেনা। এই অভিজ্ঞতা আমার পরিচিত। যখন বুক ভেঙে কান্না আসে, প্রচণ্ড কষ্টে ঘুম ভেঙে যায়, রাতের পর রাত ঘুম আসে না, কিচ্ছু খেতে ভাল লাগে না, সারাক্ষণ হতাশা-বেদনা-অপ্রাপ্তিরা তাড়িয়ে বেড়ায় তখন কেবলই এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চায় মানুষ। মুক্তি!

হৃদয়ের জখম থেকে মুক্তির আশায় সে দ্বারস্থ হয় অন্য ধরনের জখমের। নিজেকে আঘাত করতে শুরু করে শারীরিকভাবে। মনে হতে থাকে, হয়ত শরীরের আঘাত মনকে প্রশমিত করবে। কিন্তু না! আদতে তা হয় না।

না পাওয়ার হতাশা, প্রিয়তম বলে দাবি করে আসা মানুষের দুর্বোধ্য দূরাচার, যোগ্যতা সত্ত্বেও বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ, বডি শেমিং ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত যন্ত্রণা কেবল ভুক্তভোগীই অনুভব করতে পারেন। কারও পক্ষে অন্যের কষ্টের গভীরতার পরিমাপ সম্ভব না হলেও ধরণগুলো সম্ভবত একই ঘরানার হয়ে থাকে। এসব কষ্টের কাছে হেরে যায় ক্ষুরধার যুক্তি, হেরে যায় পিছুটান অথবা রঙিন জীবনের হাতছানি।

চারদিক থেকে ধেয়ে আসা একরাশ বিভীষিকাময় দিন পার করে এসেছি বলেই জানি কতটা নির্মম যন্ত্রণা থাকে বুকজুড়ে। কতটা অসহায় লাগে নিজেকে। লাখ-কোটি মিষ্টবাক্য স্রেফ অর্থহীন লাগে। আত্মহত্যার নেশা পেয়ে বসলে মানুষ স্রেফ পন্থা খোঁজে।

মৃত্যু পথযাত্রী মানুষটা নিজের নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জানার পরেও আর দু-দণ্ড বাঁচতে চায়। হয়ত শেষবেলায় সে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে থাকে। অতদূরে যাচ্ছি কেন? হাঁটাচলার সময় সবচেয়ে মসৃণ পথটা বেছে নিতে চাই আমরা। কেন? নিজেকে ভালোবাসি বলেই।

একবার আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলার পরেও মানুষ বাঁচার কারণ খুঁজতে চায়, অবলম্বন চায়। সুশান্ত একদিনের সিদ্ধান্তে হুট করে আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হলে আপনি ভুল ভাবছেন। মাসের পর মাস নানা পরিকল্পনা নিয়েও কেবল সাহসের অভাবে মরা হয়নি।

নিজেকে খুন করার দুঃসাহসের মাত্রা যে কত বড় তা বলে বোঝানো সম্ভব না। তবে আমি মনে করি বেঁচে না থাকতে চাওয়ার অধিকার মানুষের আছে। আমার জীবন আমি কতদূর বয়ে বেড়াব সে কেবলই আমার সিদ্ধান্ত। মানুষের রাষ্ট্র হলে সরকারের কাছে ‘শান্তিতে’ স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন হয়ত আমিও করতাম। হয়ত বলতাম, আমার দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় একটা ইঞ্জেকশন কিনে ঘুমের ভেতরে পুশ করে আমাকে চিরশান্তির রাজ্যে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। এখনও মাঝে মাঝে ছাদ থেকে বাসা লাগোয়া কবরস্থানে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা করে, পারি না সাহসের অভাবে।

জ্ঞান, বিরোধী মত কিংবা মোটিভেশন এসব ক্ষেত্রে কাজ করে না। যে জিনিসটা কাজ করে সেটা হলো মানুষের সঙ্গ। প্রচুর হৃদ্যতাপূর্ণ-আন্তরিক মানুষের সঙ্গ। যা পেয়েছি বলেই এতদিন ধরে বেঁচে আছি। “দেখব তুই কতদিন বাঁকা হয়ে থাকিস,” বলার মতো বন্ধু-শুভাকাঙ্খীরা আছে বলেই বেঁচে আছি। রাত ২টার সময় ফোন করে আবোল-তাবোলো শোনানোর মতো পিচ্চিটা আছে বলেই বেঁচে আছি। আর নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছি কাজে। জোর করে, সেধে নিয়ে কাজ করেছি। দায়িত্বের বাইরে কাজ করেছি, সবচেয়ে বঞ্চিত জেনেও নিজের সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছি কর্মস্থলকে। কেন? কেবল যন্ত্রণা ভুলে থাকতে।

তবুও চোখ ভিজে আসতো ডেস্কে বসে কাজ করতে করতেই। সেসব দেখে কেউ কাঁধে হাত রেখেছেন, কেউবা মুখ টিপে হেসে পৈশাচিক উল্লাসে সখীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। সে যাকগে, পরনিন্দা করতে বসিনি।

মোদ্দাকথা হলো- মানুষ যখন জীবনের সব অর্থ হারিয়ে ফেলে, প্রতিটি মুহূর্তকে স্রেফ যন্ত্রণা মনে হয় এবং নিজেকে সর্বোচ্চ কষ্টটুকু দেওয়ার সাহস অর্জন করে ফেলে তখনই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কে বলেছে আত্মহত্যা সমাধান না? আত্মহত্যাই যন্ত্রণামুক্তির সর্বোচ্চ সমাধান।

আপনারা যদি আমার শুভাকাঙ্খীদের মতো মহৎ হয়ে থাকেন, যদি কারও জীবন আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে তবে তার পাশে থাকুন। ভালো থাকুন, ভালো রাখুন।


লেখক :

আহমেদ সার্জিন শরীফ, সাংবাদিক

error: Content is protected !!