আত্মহত্যা, রাজপুতের বিষাদ ও মিডিয়া

তিনি গত ছ’মাস যাবৎ ডিপ্রেশনের ওষুধ খাচ্ছিলেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পাওয়া গেছে। তাতেও কী প্রমাণ হয়, সিনেমা জগতে তাঁর খারাপ সময়ের জন্যেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন?

কাটতি বাড়ানোর জন্যে মিডিয়া কখনো কখনো বিচারক হয়ে ওঠে। যেটাকে আমরা ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বলি। কোনো শোবিজ তারকার যখন অকাল মৃত্যু হয়, সেই মৃত্যুটা যদি রহস্যজনক কিংবা আত্মহত্যা হয়, তখন কিছু-কিছু মিডিয়া ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাদের টার্গেট পাঠক, দর্শক থাকে তারাই, যাদের মনে অতি দ্রুত প্রভাব ফেলা যায়। একই সঙ্গে যারা ইমোশনালি ব্রোকেন; যারা যেকোনো বিষয়েই গসিপ কিংবা রমরমা কিছুর গন্ধ খোঁজেন এবং আলাপে ঝড় তোলেন। এসব শ্রেণির দর্শক-পাঠক যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ে, ব্যবসা বাড়িয়ে নেবার ধান্ধায় কিছু মিডিয়া নিজেরাই ট্রায়াল বসায়। ওই সংক্রান্ত সকল খবরেই এমন সাসপেন্স আর থ্রিল ঢোকায় যেন তারা ঘটনার সময় সশরীরে ছিলো, মানুষটার ভেতরের সব খবরই তারা জানে।
সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর আনন্দবাজার পত্রিকার তিনটা রিপোর্ট পড়লাম। তাদের বিশ্লেষণে এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে রাজপুত আত্মহত্যাই করেছেন। এবং সেই আত্মহত্যার পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সিনেমাগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোর টানাপোড়েনই দায়ী। ঘুরে-ফিরে কার-কার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিলো, সাম্প্রতিক সময়ে কার সঙ্গে রিউমার ছিল ইত্যাদি।

ধরলাম, রাজপুত আত্মহত্যাই করেছেন। বিবিসির রিপোর্ট থেকে জানলাম, তিনি গত ছ’মাস যাবৎ ডিপ্রেশনের ওষুধ খাচ্ছিলেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন পাওয়া গেছে। তাতেও কী প্রমাণ হয়, সিনেমা জগতে তাঁর খারাপ সময়ের জন্যেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন? হ্যাঁ, তাঁর শেষ তিনটি ছবির দুটিই ফ্লপ। রাবতা এবং সঞ্চিরিয়া প্রযোজকের লগ্নি ফেরত আনতে পারেনি। কিন্তু সবশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিচ্চোরে বানাতে এবং প্রচারে খরচ হয়েছে ৪৫-৫৮ কোটি রুপি। আর বক্স অফিস থেকে তুলেছে ২১৫.৪১ কোটি রুপি। তার মানে ছবিটা যথেষ্ট হিট। বাংলাদেশের প্রথম আলো-ও আনন্দবাজারের তথ্যগুলিই দিয়েছে। তারাও লিখেছে ছিচ্চোরে বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ক্রমাগত ব্যর্থতায় বিষাদগ্রস্ততায় ভুগছিলেন।

মুক্তি প্রতীক্ষায় থাকা দিল বেচারা হলিউড হিট Fault in Our Stars এর রিমেক। যারা ছবিটা দেখেছেন, জানেন কতটা আবেগি একটা গল্পের ছবি। এবং সেই ছবির নায়ক চরিত্রে কতটা অভিনয়ের সুযোগ আছে। অবশ্যই ছবিটাকে সম্ভাব্য হিট ধরা যায়। দেখা যাক, রাজপুতের বাকী ছবিগুলো কেমন ব্যবসা করেছিল:

Kai Po Che
বাজেট ছিল ২৫ কোটি রুপি। বক্স অফিস থেকে তুলে এনেছে ৯২ কোটি রুপি।

Shudh Desi Romance
বাজেট ছিল ২২ কোটি রুপি। বক্স অফিস থেকে এনেছে ৭৬ কোটি রুপি।

Detective Byomkesh Bakshy
৩৫ কোটিতে নির্মিত ছবিটি ফিরিয়ে এনেছে ৩৬ কোটি রুপি।

MS Dhoni: The Untold Story
ছবিটি বানাতে খরচ হয়েছে ১০৪ কোটি রুপি। আর বক্স অফিস রিটার্ন দিয়েছে ২১৬ কোটি রুপি।

Kedarnath
৬৮ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ছবিটি এনেছে ৯৬.৬ কোটি রুপি।

পিকে’র কথা বললাম না। কারন ওটা আমির খানের ছবি। এতে দেখা গেলো পিকে বাদে রাজপুত অভিনীত ৮টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। আটটির মধ্যে মাত্র দুটি ছবি ফ্লপ। ব্যোমকেশ বক্সী হিট না হলেও প্রযোজকের লগ্নি উঠিয়ে এনে এক কোটি রুপি লাভ করেছে। বাকী পাঁচটা ছবি হিট। ধোনি ব্লকবাস্টার। বলিউডে প্রতিষ্ঠিত ফ্যামিলি ব্যাকাপ ছাড়া, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকায় সারা ভারতে ৭ম হয়ে মেকানিক্যালে পড়তে থাকা একটা ছেলে যে কিনা একসময় নাসার বিজ্ঞানী হতে চাইতো, নাচ আর অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যে কিনা থার্ড ইয়ারে ইউনিভার্সটি ড্রপআউট হয়ে মুম্বাই চলে এসেছে, টিকে থাকতে ক্যারিয়ারের প্রথম পাঁচ বছর টেলিভিশনের সিরিয়ালে কাজ করেছে, যার গল্পটা কিনা মোটেই এলাম দেখলাম জয় করলাম নয়, সে কিনা দুটি ছবি ফ্লপ করেছে দেখে আত্মহত্যা করবে!?! বিশ্বাস্য এটা? রাজপুতের হাতে লোভনীয় একটা প্রজেক্ট ছিলো। যেটা আসলে যে কোনো অভিনেতার জন্যেই লোভনীয় প্রজেক্ট। একটা সিরিজে ভারতের বিখ্যাত ১২ জন ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিলো। চরিত্রগুলোর তিনটির নাম বলি⁠—চাণক্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এপিজে আব্দুল কালাম।
একটা ভিডিওতে দেখলাম তিনি বলছেন, “অভিনয় করতে পারলেই তিনি ভালো থাকবেন।” যিনি একথা বলতে পারেন, এবং ওরকম কিংবদন্তীদের চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিলো, তিনি দুটি ছবি ফ্লপ হয়েছে বলে আত্মহত্যা করবেন!?! বিশ্বাস হয়?
এবার ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে আসি। অঙ্কিতা লাখোন্ডে, দিশা পাটানি, কৃতি স্যানন, সারা আলী খান, রিয়া চক্রবর্তী যার সঙ্গেই তিনি বিভিন্ন সময়ে রোমান্স করেন না কেন, সেটা ব্যক্তিগত বিষয়। রাজপুতের প্রেমিকারা যেমন তাঁকে ছাড়া সামনে এগিয়ে গেছে, রাজপুতও এগিয়েছেন। না হলে তো অঙ্কিতার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর বিভিন্ন সময়ে আরও চার জনের সঙ্গে নাম জড়াতো না। আর রাজপুত এতটাই হ্যান্ডসাম ছিলেন যে, ভবিষ্যতেও তাঁর জীবনে নারীর অভাব হতো না।

জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে তাঁর মহা আগ্রহ, অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা ছিল। অবসর সময়টা কাটতো পড়াশোনা করে, বইয়ের সঙ্গে। এতকিছুর পরেও এটা সত্য। সুশান্ত সিং রাজপুতের হাসিমুখের আড়ালে ‘বিষাদগ্রস্ততা’ নামের একটা ঘাতক বসে ছিল। যে নাকি ধীরে-ধীরে তাঁকে খুন করেছে। বলিউডের এত গ্ল্যামার, বিলাসী জীবন, এত-এত প্রেমিকাও সেই বিষাদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতে পারেন নি। বন্ধু হয়েও কেউ বলতে পারেন নি, ওহে ঘাতক⁠—আমি তোর চেয়ে শক্তিশালী। এ কারণেই কী ১৭ বছর আগে মারা যাওয়া মায়ের ছবির কাছে নিজের বিষণ্ণতা নিয়ে কেঁদেছেন? তাঁর সবশেষ ইন্সটাগ্রাম পোস্টে সেই ইঙ্গিতটিই আছে।

একজন মানুষ যত বড় তারকাই হোন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আছে। রূপালি পর্দার জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা এবং প্রেম-টেমের বাইরেও দুঃখবোধ জাগার, বিষাদগ্রস্ত হবার অনেক জায়গা আছে। করোনা মহামারীতে তিন মাস ধরে তিনি বাড়িতে একা ছিলেন। তার তিন মাস আগে থেকেই ডিপ্রেসনের ওষুধ খাচ্ছিলেন। কিছুদিন আগেই খুব কাছের এক বন্ধু ১৫ তলা বিল্ডিং থেকে পড়ে মারা গেছেন। কত-কত দিক দিয়েই না রাজপুতকে নিঃসঙ্গতা আঁকড়ে ধরেছিল! ক্রনিক ডিপ্রেশনে থাকা একজন সেন্সিটিভ মানুষ তিনটি মাস ধরে একা-একা ছিলেন, যখন সময়টাই ভয়াবহ মিস্টিক। ভাবা যায়, তাঁর বিষাদের চূড়া কোথায় গিয়ে ঠেকেছিল? নাহলে অত সংগ্রামী, দৃঢ়চেতা একজন মানুষ আত্মহত্যা করেন!

ক্যারিয়ার ভিত্তিক সাফল্য-ব্যর্থতার বাইরেও প্রত্যেক মানুষের বিরাট একটা জীবন থাকে গো, মিডিয়া! জীবনের সেই জায়গাটা ফাঁকা হয়ে গেলে মানুষ আর বেঁচে থেকে আনন্দ পায় না। ও কারণেই হয়তো রাজপুত তাঁর মায়ের কাছে চলে গেছেন।


লেখক :

রুহুল মাহফুজ জয়

কবি, সাংবাদিক

জন্ম : ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই : আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য], কালো বরফের পিস্তল  [কবিতা, ২০১৮, জেব্রাক্রসিং]


error: Content is protected !!