ক্যাপারনিয়াম এবং নাদাইন লাবাকি’র চলচ্চিত্র যাত্রা

লেবানন এর চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী এবং সাংস্কৃতিককর্মী নাদাইন লাবাকি’র সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন র‍্যাচেল কোক। সাক্ষাৎকারটি অকালবোধন এর জন্য বাংলায় অনুবাদ করেছেন জুয়েইরিযাহ মউ।

  • ‘ক্যাপারনিয়াম’-এর ভাবনা কী করে এসেছিল প্রথম?
  • আমার লেবাননের সেসব এলাকায় যাওয়া হতো যেখানে শিশুরা দীর্ঘদিন ধরে এক যন্ত্রণাময় জীবন যাপন করে। রাস্তায় থাকে সবসময়, চুইংগাম বা ফুল বিক্রি করে কিংবা গ্যাস ট্যাংকের মতোন ভারী মালপত্র বহন করে। মাঝে মাঝেতো সহ্য করতে না পেরে রাস্তাতেই শুয়ে পড়ে। তো একটা বাচ্চাকে একদিন দেখলাম রাস্তার সিমেন্টের পাথরের উপর সকালবেলা শুয়ে আছে।

ঘুমানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু সেখানে তখন ঘুমানো সম্ভব ছিল না। এই ঘটনাই বাচ্চাটার কন্ঠ হয়ে ওঠার তাগিদ জন্ম দেয় আমার মাঝে।
আমার মনে হচ্ছিলো যদি চুপ থাকি তাহলে এই অন্যায়ের সাথে থাকা হয়। আর এসমস্ত কিছু মেনে নেওয়াও তো একটা অন্যায়!
জানিনা, কীভাবে এসব জেনেও আমরা নিজেদের জীবন যাপন করে যাই প্রতি মুহূর্তে!

আমার মনে হতে থাকে এই বাচ্চাগুলো খুব বিপদের মধ্যে আছে। আমার সহলেখকের সাথে আমি সবচে বিপজ্জনক জায়গাগুলোয় যেতে শুরু করি – বস্তিতে, কোর্টে, সংশোধনাগারে। সমস্তকিছু নিজের চোখে দেখার জন্য।

নাদাইন লাবাকি (Nadine Labaki)
  • চলচ্চিত্রটির প্রধান চরিত্র, জেইন তার মা-বাবার বিরুদ্ধে মামলা করে, এই ভাবনা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?
  • আমি প্রতিটা বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করতাম যাদের সাথেই কথা বলেছি যে তারা কি সুখী বেঁচে থেকে। প্রতিবার উত্তর আসে – না। একবার একজন আমাকে বলে – ‘আমি জানি না কেন আমাকে জন্ম দেওয়া হল যদি আমাকে কেউ ভালোই না বাসে। যদি আমাকে কেউ ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার চুমুও না খায়। আমাকে যদি প্রতিদিন মার খেতে হয় তাহলে আমার জন্ম হল কেন?’

এই কথাগুলো আমাকে খুব নাড়া দেয়। আমার মনে হতে থাকে এটা এরকম একটা ছেলের কাহিনি হতে পারে যে বলছে – ব্যস! আর না।

জেইন-এর মায়ের চরিত্র ভাবতে গিয়ে একজন মহিলার কথা মনে পড়ে আমার যার ষোল জন সন্তান ছিল যার মধ্যে সাত জন অবহেলার কারণে মরে গিয়েছিল।

  • জেইন আল রাফি – ছেলেটিকে কী ভাবে খুঁজে পেয়েছিলেন যে ‘জেইন’ চরিত্রটিতে অভিনয় করলো। দুর্দান্ত অভিনয় ক্ষমতা ওর।
  • আমরা রাস্তা থেকেই অভিনয়শিল্পী খুঁজছিলাম, আমাদের কাস্টিং টিম ওকে খুঁজে পায়। সিরিয়ান উদ্বাস্তু ও। খুব রাগী কিন্তু তুখোড়। সে কখনোই স্কুলে যায়নি। অপুষ্টিতে ভোগার কারণে দেখতে ছোটখাটো আর রোগা। এখন ও নরওয়েতে ওর পরিবারের সাথে আছে, এটার উপরও আমরা একটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করছি। দারুণ ব্যাপার হল এই চলচ্চিত্রের কত ঘটনা যে সত্যি ঘটনা হয়ে উঠলো শেষমেশ!

যখন রাহিলকে গ্রেফতার করা হল চলচ্চিত্রে, আমরা সেই দৃশ্য ধারণ করলাম শ্যুটিং এ আর তার দুই দিন পরেই ইয়োরদানস সিফেরাও , যে রাহিলের চরিত্রে অভিনয় করলো সে গ্রেফতার হল। একদম তার চরিত্রের মতোই  কাগজপত্র না থাকার কারণে!

  • লেবাননে কেমন সাড়া পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পরে?
  • দুইভাবেই সাড়া পেয়েছিলাম। কেউ কেউ খুব লজ্জিত হল। তারা জানতেন এইসমস্ত ঘটছে কিন্তু এতোটা বিস্তৃত ধারণা ছিল না তাদের। স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল মানুষজন, প্রচুর আলোচনা হল এসব নিয়ে। পরিবর্তনের জন্য একটা মুভমেন্টের প্রয়োজন তারা সেটাও উপলব্ধি করলেন। আর অন্যরকম প্রতিক্রিয়াও ছিল, কেউ কেউ বলে এসব কিছুই সত্যি না, এটা তাদের দেশের গল্প নয়। তারা আয়নায় নিজেদের দেখতেই চাইছিলেন না।
  • লেবাননে একটা চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুভূতি কেমন? চলচ্চিত্র নির্মাণের অর্থ কী ভাবে জোগাড় করেছিলেন প্রাথমিক অবস্থায় ?
  • আমার সঙ্গী এই চলচ্চিত্রের প্রযোজক (সঙ্গীত পরিচালক খালেদ মোজনার)। কাহিনিটি লেখার ব্যাপারেও সে সাহায্য করেছে। আমাকে না জানিয়ে সে আমাদের বাসা বন্ধক রেখেছিল এই চলচ্চিত্রের জন্য। ছয় মাস আমরা শ্যুটিং করি। এটা এরকম শ্যুটিং না যে রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে, অনেক বড় দলবল নিয়ে করা, একেবারে নিজেদের অদৃশ্য করে শ্যুটিং করতে হয়েছিল চলচ্চিত্রের স্বার্থে।
  • বৈরুত-এ নারী হিসেবে এই চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?
  • সেভাবে কখনোই ভাবিনি। লেবাননে যেকোনভাবেই হোক চলচ্চিত্র নির্মাণ করাই কষ্টসাধ্য কাজ, কোনো ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি নেই এখানে। আর তাছাড়া ক্ষত থেকেই আমাদের এ চলচ্চিত্রযাত্রার শুরু। পুরুষের পৃথিবীতে আমরা প্রবেশই করিনি কখনো। অন্য দিকে এটাও লক্ষ্য করার মতো বিষয় যে লেবাননে চলচ্চিত্র নির্মাণে পুরুষের চেয়ে নারীর অংশগ্রহণই বেশি।
  • চলচ্চিত্রে আগ্রহের শুরুটা কী করে?
  • আমার দাদার একটা মুভি থিয়েটার (সিনেমা হল) ছিল গ্রামে যেখানে আমার বাবার জন্ম। সিনেমা প্যারাডিসো-র মতোন ছোট্ট একটা মুভি থিয়েটার। আমার এখনো মনে আছে বাবা আমাকে কীভাবে প্রজেকশন রুমটা দেখাচ্ছিলেন আর বলে যাচ্ছিলেন কতটা ভালোবাসতেন তিনি রিল-এর ঘ্রাণ! সেই সময়টাকে আমি আজও ধন্যবাদ জানাই, অন্যরকম একটা জীবনের স্বপ্ন বাবা দেখেছিলেন, কিন্তু বাবার দরিদ্রতা বাবাকে চলচ্চিত্র নির্মাতা হতে দেয়নি, তিনি একজন বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হয়েছিলেন। সেই থেকে সেই স্বপ্নটা আমার মধ্যে থেকে গেল।

আরেকটা ঘটনা হচ্ছে লেবাননের যুদ্ধ। যুদ্ধের সময় শৈশবে আমি আর আমার বোন, যিনি কি না নিজেও এখন একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, আমরা সীমাবদ্ধ একটা জায়গায় নিজেদের জীবনকে খুঁজে পেলাম। বালির বস্তার পেছনে আমরা থাকতাম। কিন্তু আমরা খুব ভাগ্যবান ছিলাম যে আমরা একটা ভিডিও স্টোরের উপরেই থাকতাম। অপেক্ষায় করতাম কখন বিদ্যুৎ আসবে, আর বিদ্যুৎ এলে একই ভিএইচএস টেপ বার বার দেখতাম। নিজেদের বাস্তবতা থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেতো এইভাবে!

  • লেবাননের জন্য এখন আবার দুশ্চিন্তা হয় আপনার?
  • হ্যাঁ, নিশ্চয়। উদ্বাস্তুরাই (যারা সিরিয়ার যুদ্ধের ফলে এসেছে) এখন এ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক। একটা ধ্বসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা যেন! এই বিধ্বস্ততা! এটাই ক্যাপারনিয়াম, ঠিক আমার চলচ্চিত্রের মতোন! তবু আমি এখানে কারণ আমাকে বলতেই হবে এ কথাগুলো!
  • কোথায় ছিলেন যখন প্রথম শুনলেন যে ‘ক্যাপারনিয়াম’ অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে?
  • আমার দলের সাথে বাসাতেই ছিলাম। আমরা উচ্ছ্বাসে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। জেইনকে ফোন করলাম, ও তখন ওর ক্লাসরুমে ওর শিক্ষক আর বন্ধুদের সাথে ঠিক একই সময়ে খবরটা শুনেছিল।
  • আপনার কি তখন একবারের জন্যও মনে হয়েছিল যে লস এঞ্জেলেস-এ গিয়ে যদি হারিয়ে ফেলেন লেবাননকে?
  • না। হ্যাঁ আমি অনেক চিত্রনাট্য পেয়েছি সেখানকার কিন্তু আমি তাই বানাতে চাই যা লক্ষ্যনীয়। চলচ্চিত্র নির্মাণ কিন্তু অনেক পরিশ্রমের কাজ,‘ক্যাপারনিয়াম’ নির্মাণ করার পর শারীরিকভাবেও আমার মধ্যে অনেক পরিবর্তন আসে। আমার মনে হয় আমার তখনই এটা করা উচিৎ যখন আমি কিছু বলতে চাই।

আর অস্কারেও আমি পুরস্কার জিততে চেয়েছিলাম শুধুমাত্র এজন্যই যে ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য কিছু বলার সুযোগ পাবো সেখানে। আমি এই ব্যাপারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। আমার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং এক্টিভিজম একই জিনিস! আমি বিশ্বাস করি চলচ্চিত্র সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে!


লেখক :

জুয়েইরিযাহ মউ

লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা


 

error: Content is protected !!