বেলা তার এর সাক্ষাৎকার – ১ম পর্ব

“গল্প শুধু মুভির একটা অংশ মাত্র কেন না এখানে আরও অনেক বিষয় আছে, সময়, ছন্দ, কোলাহল এবং সঙ্গীত” – বেলা তার

 

তরুণ বেলা তার

“সাত ঘন্টার প্রতিটি মিনিট বিধ্বংসী, মনোমুগ্ধকর। আমি আমার জীবনের বাকি দিনগুলোয় প্রতি বছর এটি দেখতে চাই।” – ‘সাতানত্যাঙ্গো’ দেখে সুসান সনটাগ এর মন্তব্য

“তার (Bela Tarr) এর ফিল্মগুলো একাধারে কমিউনিস্ট পৃথিবীর বিচ্ছিন্নতা এবং বর্তমান সময়ের প্রামাণ্যীকরণ – ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দুই দিককেই খেয়াল করে, যা শুধু মহান শিল্পই পারে।” – পিয়ারস হ্যান্ডলিং

হাঙ্গেরীয় নির্মাতা বেলা তার পৃথিবীর সিনেমার অন্যতম আলোচিত অত্যুরদের একজন। ২০০০ সালের অক্টোবরে তিনি তার সর্বশেষ ফিল্ম ‘ওয়ের্কমেইস্তার হারমোনিজ’ (Werckmeister Harmonies) নিয়ে আসেন কর্ক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, যেখানে ফারগস দালি (Fergus Daly) ও ম্যাক্সিমিলিয়ান লে কেইন (Maximilian Le Cain) তার সাথে দেখা করেন।

একজন ফোর্ড কিংবা একজন হাসটন কিংবা একজন ল্যাং এর মতো পৃথিবীর প্রখ্যাত নির্মাতাদের মধ্যে যেসব গুণ অর্জনের প্রবণতা দেখা যায় বেলা তারের মধ্যে সেসব গুণই আছে – একরোখা, স্বল্পভাষী, আড়ালে থাকার প্রবণতা প্রভৃতি। অবশ্য কর্ক-এ তার সঙ্গী ও সম্পাদক এগনেস রানিজকির (Agnes Hranitzsky) সঙ্গে মিলে সপ্তাহব্যপী থাকাকালীন স্থানীয়দের সাথে মিশে যেতে ঐসব স্বভাবের কোনটিই ছিল না। ‘ওয়ের্কমেইস্তার হারমোনিজ’ যদিও বেলা তারের সপ্তম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্মাণ, তবে এই ফিল্ম এবং এর আগের দু’টি ফিল্ম (ড্যামনেশন (’৮৭) ও সাতানত্যাঙ্গো (’৯৪)) দিয়েই তিনি সুপরিচিত হন। তার শুরুর দিকের সামাজিক সমস্যার ভাবনা নিয়ে করা কাজগুলো অনেকটা সিনেমা ভেরিতে’র শৈলীর সাথে সম্পৃক্ত। বেলা তার বর্তমানে আরও বেশি আধ্যাত্মিক (metaphysical) সমস্যাগুলো নিয়ে জড়িয়ে আছেন, যেমন বর্বরতার উৎস (souce of evil) সন্ধান। তারের ডেমনোলোজিতে এই বিশ্বজগত বিশৃঙ্খল। তার সর্বশেষ ফিল্মগুলো বিশৃঙ্খল অসীমে (cosmos) মানুষের অবস্থান প্রকৃতি তুলে ধরেছে।

 

দালি ও কেইনঃ আপনি একবার বলেছিলেন আপনি দার্শনিক হতে চেয়েছিলেন। আপনি কি মনে করেন আপনি সিনেমার মাধ্যমে দর্শনেরই চর্চা করেন?

বেলা তারঃ না। আমি যখন দার্শনিক হতে চেয়েছিলাম তখন আমার বয়স ছিল ষোল, আর আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম তখন আমার বয়স বিশ। কিন্তু তারা আমাকে ভর্তি হতে বাধা দিল, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে। কারণ এর আগে আমরা হাঙ্গেরির একদল জিপসি শ্রমিকের উপর একটা ৮ মিমি এর মুভি বানাই, যারা কমিউনিস্ট পার্টির নেতার কাছে একটা চিঠি লিখেছিল এই বলে যে- “দয়া করুন, আমরা এই দেশ থেকে নিস্তার চাই। আমরা অস্ট্রিয়া চলে যেতে চাই। এখানে আমরা থাকতে পারছি, এখানে না আছে চাকরি, না আছে খাবার, কিছুই নাই।” এটা অনেকটা রাশিয়ার জারকে লেখা সেই মুঝিক (Mouzhik) এর চিঠির মতোই। আমি এদের উপরে মুভিটা বানাই ষোল বছর বয়সে, এরপর আমি ভর্তির আবেদন করি।

দালি ও কেইনঃ ফিল্ম স্কুলে?

বেলা তারঃ না। বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি দার্শনিক হতে চেয়েছিলাম। এবং তারা সঙ্গে সঙ্গে জানালো- “না। কারণ তুমি অদ্ভুত সব কাজকর্ম করো।” এটা আসলে পুরোপুরি রাজনৈতিক ব্যাপার ছিল। এরপর আমি আরেকটি শর্ট ফিল্মের কাজ শুরু করি, এক ছোট্ট ঘরের এক শ্রমিকের পরিবার নিয়ে। পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যায়। তারা খুবই নিষ্ঠুর ও আক্রমণাত্মক ছিল। আমি এটা ৮ মিমি এ শ্যুট করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি, কারণ পুলিশ আমাকে ধরে হাজতে পুরেছিল। পরে আমি বেইলা বালাজস স্টুডিওতে (Béla Balász Studio) কিছু টাকার জন্য আবেদন করি। ওটা হাঙ্গেরিতে ছোট স্বাধীন একটা ফিল্ম স্টুডিও। সেসময় একদল তরুণ ফিল্মমেকার ছিল, যাদের হাতে কিছু টাকা ছিল কিছু নিরীক্ষামূলক কাজ করার জন্য। আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম আমি এই শ্রমিক পরিবারটার উপরে একটা মুভি বানাতে চাই, যাদের ছোট এক ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। তারা সব শুনে বললেন, “আচ্ছা, আমরা প্রথমে তোমাকে অল্প কিছু টাকা দিবো, যা দিয়ে তুমি ২ দিন শ্যুট করতে পারবে। এরপর আমরা সেটা দেখবো। দেখে যদি আমাদের ভালো লাগে তবে আমরা এই মুভি শেষ করতে বাকি টাকা দিবো।” এটাই ছিল আমার প্রথম মুভি। এরপর আমি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করিনি, দর্শন নিয়ে ভাবিনি। আমি দার্শনিক নই এবং মুভিতেও আমি দর্শনচর্চা করতে চাই না।

দালি ও কেইনঃ তাহলে সমালোকেরা যখন আপনার কাজকে দর্শনশাস্ত্রীয় (metaphysical) বলে সেটা আপনার ভালো লাগে?

বেলা তারঃ না, না না। আমি কাজের সময় কখনোই তত্ত্ব মাথায় রাখি না।

দালি ও কেইনঃ কিন্তু আপনার ফিল্মগুলোতে অসীমত্বের (cosmic) ভাবনা আছে এবং আপনিও এক জায়গায় বলেছিলেন যে আপনি “একটা অসীমতা (cosmic dimension) থেকে বিষয়গুলোকে দেখার চেষ্টা” করেছেন।

বেলা তারঃ দেখুন, এটা কিভাবে ঘটে যে, আমরা যখন শুরু করেছিলাম আমাদের একটা বড় সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল, যা এখনও আছে আমি মনে করি। সেসময় আমি ভেবেছিলাম, “ঠিক আছে, আমাদের অনেক সামাজিক সমস্যা আছে এই রাজনৈতিক পরিকাঠামোতে। হতে পারে যে আমরা শুধু সামাজিক সমস্যাগুলো নিয়েই কাজ করবো।” এরপর আমরা যখন দ্বিতীয় মুভিটা বানালাম, এরপর তৃতীয়টা, আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে এখানে শুধু সামাজিক সমস্যাই নাই। আমাদের সত্তাতত্ত্বীয় (ontological) কিছু সমস্যাও আছে, আর এখন আমার মনে হয় বিরাট স্তূপ সমান জঘন্য জিনিস (shit) আসছে অসীম (cosmos) থেকে। আর সেটার কারণও আছে। আপনি জানেন কিভাবে আমরা মুক্ত হয়েছি প্রতি পদক্ষেপে, একের পর এক ফিল্মে। আধ্যাত্মিকতা (metaphysical) আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলাটা খুব মুশকিল। না, এটা আসলে সবসময় জীবনকেই অনুসরণ করা। আর আমরা আমাদের চারপাশে কি ঘটছে তাই নিয়ে ভাবছি।

দালি ও কেইনঃ আপনার কাছে এই জঘন্য জিনিসগুলো আসলে কি যা অসীম থেকে আসছে?

বেলা তারঃ আমি শুধু মানুষের জীবনবোধ নিয়ে ভাবি। আমি যখন ‘নিকৃষ্টতা’ (shit) বলি আমি এর কাছাকাছিই বুঝাই।

দালি ও কেইনঃ কিন্তু অসীমের সাপেক্ষে এই আলাপের মিল কোথায়? যদি এই নিষ্ঠুরতার জন্য মানুষই দায়ী হয় তবে অসীমের সাথে এর সম্পর্ক কি?

বেলা তারঃ এই বিশ্ব সৃষ্টি মানুষের থেকে অনেক বৃহৎ। আর মানুষ সেই অসীমের মধ্যে একটা ক্ষুদ্র অংশ বলে আমার মনে হয়।

দালি ও কেইনঃ এই যে বর্বরতা (evil) নিষ্ঠুরতা সে কি অন্য জগত থেকে এসেছে বলে আপনার মনে হয়?

বেলা তারঃ না। আমার মনে হয় মানুষের দায়িত্ব অনেক বেশি, বিশাল তার পরিধি। হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় উপাদান। শুনুন, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। এটা আমার সমস্যা। যদি আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি তবে এসবের জন্য সেও দায়ী, ঠিক আছে, কিন্তু আমি তা জানি না। দেখেন, আপনি যেকোন গণমানুষকে শুনে দেখুন, আপনার মনে হবে দুইটা কুকুর, যারা পরষ্পরের উপর এই মুহুর্তেই ঝাপিয়ে পড়বে। আর সবসময় আমি শুধু ভেবে যাই কী হচ্ছে এখন।

ওয়ের্কমেইস্তার হারমোনিজ’ এর একটি দৃশ্য

দালি ও কেইনঃ তো এই ফিল্মের প্রধান চরিত্র যে বলে “ঈশ্বর এই তিমির মধ্যে একটা সুন্দর জিনিস সৃষ্টি করেছেন”, সেটা কার দৃষ্টি?

বেলা তারঃ না। সে বিশ্বাস করে।

দালি ও কেইনঃ ঈশ্বরে?

বেলা তারঃ না। সে বিশ্বাস করে এটা একটা বিরাট বিষয়, মানবতার চেয়েও বিরাট। আর এই সময়ে সে কিন্তু বলে ‘হয়তো’। হয়তো ঈশ্বর আছেন, ব্যস এটুকুই। সে শুধু বলে সবকিছুই অপূর্ব। ঈশ্বর এই বিরাট তিমিটি সৃষ্টি করেছেন।

দালি ও কেইনঃ আপনি কি ক্রাসনাহোরকাই (Krasznahorkai) এর উপন্যাস ‘The Melancholy of Resistance’ থেকে ‘ওয়ের্কমেইস্তার হারমোনিজ’ (Werckmeister Harmonies) সিনেমাটা কিভাবে করলেন সেটা সম্পর্কে একটু বিশদভাবে বলবেন?

বেলা তারঃ উপন্যাসটি লিখেছে আমাদের বন্ধু লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (Laszlo Krasznahorkai), যার সাথে আমরা ১২ বছর যাবত কাজ করছি। আমরা তার ‘সাতানত্যাঙ্গো’ (Satantango) বইটি পড়ার পর তার সাথে সাক্ষাৎ করি। এটা তার প্রথম উপন্যাস। আমরা তার পান্ডুলিপি পড়ি এবং তৎক্ষণাত সিদ্ধান্ত নেই এটা নিয়ে কাজ করার। এটা ছিল ১৯৮৫ সালের ঘটনা। আমরা সেই সময়ই ‘সাতানত্যাঙ্গো’ বানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমরা তখন এটা করতে পারি নাই সেসময়ের রাজনৈতিক সমস্যার কারণে। আর আমরা বেশ কয়েকজন ফিল্মমেকার তখন একসাথে একটা স্টুডিওতে কাজ করতাম এবং সেটা স্বাধীন ছিল – কিন্তু এটাকে হাঙ্গেরির সরকার বন্ধ করে দেয়। এটা ’৮৫ সালের শেষের দিকের ঘটনা। এরপর হাঙ্গেরিতে কাজ করার আমাদের আর কোন সুযোগই থাকলো না। ফলে আমরা ‘সাতানত্যাঙ্গো’ করতে পারি নাই, তবে আমরা একটা ছোট প্রচারকাজের স্টুডিওর সন্ধান পাই যেটা কিছু বাণিজ্যিক ধারার কাজ করেছিল। আমরা তাদের বলেছিলাম আমরা একটা ছোট মুভি তৈরী করতে চাই, ‘সাতানত্যাঙ্গো’-র মতো এত বড় নয়। তো আমরা আমাদের লেখককে ফোন করে জানাই – ‘সাতানত্যাঙ্গো’র ভাবনা আপাতত বন্ধ, আমরা এটা করতে পারবোনা, তবে আমাদের আরেকটা আইডিয়া এসেছে একটা মেয়েকে নিয়ে, যে এই বারে কাজ করে, আর কিছু বাজে ব্যাপার এখানে ঘটেছে। দয়া করে আপনিও আসুন আর একসাথে কাজ করি আবারও। তবে আপনার গল্পে নয়, আমাদের ভাবনার উপরে। এবং এইভাবে তৈরী হলো ‘ড্যামনেশন’ (Damnation)। ওটা আমরা একটা ছোট প্রচার স্টুডিও থেকে করেছিলাম এবং খুব সফল হয়েছিল।

‘ড্যামনেশন’ এর একটি দৃশ্য

এরপর আমরা হাঙ্গেরি ছেড়ে বার্লিনে চলে যাই, আমরা পশ্চিম বার্লিনে থাকতাম এবং এরপরেই বার্লিন ওয়াল ভেঙ্গে গেলো। কয়েকজন আমাদেরকে হাঙ্গেরিতে ফিরে আসতে আমন্ত্রণ জানালো এবং আমরা বললাম, “ঠিক আছে, আমরা হাঙ্গেরিতে ফিরে যাব যদি হাঙ্গেরির নতুন সরকার আমাদেরকে ‘ড্যামনেশন’ বানাতে টাকা দেয়।” এসব আলাপের ঠিক ১০ বছর পর আমরা অবশেষে ‘ড্যামনেশন’ বানাই। তবে পরবর্তীতে আমরা আরেকজন লেখক পাই এবং একই সময়ে লাসলো তার পরবর্তী উপন্যাস ‘The Melancholy of Resistance’ লেখে। আমরা বইটা পড়ি এবং ভীষণ ভালো লাগে, তবে আমরা তাকে জানাই “আমরা আসলে এই উপন্যাস থেকে মুভি বানাবো না।” এর বহু বছর পর বার্লিনে আমরা আমাদের প্রধান চরিত্রকে খুঁজে পাই। তার নাম লা রুদলফ (Lars Rudolph)। আমরা যখনই তার সাথে পরিচিত হই, সঙ্গে সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নেই – “আমরা ভালুসকা (Valushka) পেয়ে গেছি”, এবং আমরা আমাদের লেখককে ফোন করে জানাই – “এবার চলো সামনে আগাই, কারণ আমরা ভালুসকা চরিত্রের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে পেয়ে গেছি। আমরা এর উপরে একটা মুভি বানাতে চাই এবং আমরা তোমার উপন্যাসটা নিয়ে কাজ করতে চাই।” তবে মুভিটা কিন্তু উপন্যাসটা থেকে ভিন্ন এবং সেজন্যই মুভিটার নাম ভিন্ন।

দালি ও কেইনঃ আপনি নিজে প্রকৃত অর্থে কতটুকু লেখেন?

বেলা তারঃ চিত্রনাট্যটা খুব দ্রুত হয়ে গিয়েছিলো। আমার মনে হয় এটা দুই সপ্তাহের মতো লেগেছিলো। আপনি জেনে থাকবেন আমরা কখনোই চিত্রনাট্যকে ব্যবহার করি না।

দালি ও কেইনঃ আপনি কি স্টোরিবোর্ড ব্যবহার করেন?

বেলা তারঃ না। স্টোরিবোর্ড একটা ফালতু জিনিস। না, আমরা কখনোই স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করি না। আমরা এটা লিখি শুধুমাত্র ভাবনার একটা ভিত্তির জন্য এবং প্রযোজকেরা এবং যখন আমরা টাকা খুঁজি তখন কাজে লাগে। আমার প্রি-প্রোডাকশন খুবই সহজ। এটা করতে সবসময়ই এক বছর সময় নেয়। আমরা পুরো এক বছর ধরে চারপাশকে দেখি এবং আমরা সবকিছুইই দেখি। আমাদের একটা গল্প থাকে কিন্তু আমার মনে হয় গল্পটা পুরো মুভির খুবই ছোট একটা অংশ। আমি আপনাকে বলতে চাই থিয়েটারে যেসব  দেখতে পাই সেসব মুভি আমি ঘৃণা করি।  ওগুলো আসলে রম্য / কমিক্স। তারা সবসময় একই গল্প বলে। আমরা এইসব গল্প মোটেও  পছন্দ করি না, কেননা (আমাদের জন্য) এইসব গল্প সেই ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকেই  এসেছে। ওল্ড টেস্টামেন্ট এর পর আমাদের আর নতুন কোন গল্প নাই। আমাদের জন্য আর কোন সংবাদ নেই। আপনার যদি সংবাদের প্রয়োজন পড়ে আপনি টিভিতেই পাবেন কিংবা পত্রিকা পড়েন। কিন্তু মুভির গল্প আর নতুন কিছু নেই এবং এই কারণেই আমারা সিদ্ধান্ত নেই যে, “গল্প শুধু মুভির একটা অংশ মাত্র কেননা এখানে আরও অনেক বিষয় আছে, সময়, ছন্দ, কোলাহল এবং।”

দালি ও কেইনঃ সঙ্গীত?

বেলা তারঃ অবশ্যই সঙ্গীত। এবং আমরা খুঁজতে চেষ্টা করছি জটিল কিছু অথবা পুরো মুভিটাই, কিন্তু যা শুধুমাত্র গল্প নয়। এ কারণে আমরা লোকেশন খোঁজার জন্য চষে বেড়াই এবং খোঁজার পেছনে এতদিন সময় দেই। কারণ আমাদের অবশ্যই কিছু প্রধান চরিত্র আছে, তবে লোকেশনটাও আরেকটি প্রধান চরিত্র, ‘টাইম’ যেমন।

দালি ও কেইনঃ তো আপনি কি একটা (পছন্দের) স্থান খুঁজে বের করে সেই স্থানের আশেপাশে দৃশ্য নির্মাণ করেন?

বেলা তারঃ আমরা অনুভূতিকে গভীরভাবে প্রাধান্য দেই। এ কারণেই আমাদের এ অবস্থানে আসা, আমাদের শুধু কিছু অভিনেতা আছে এবং আমরা লোকেশন খোঁজার আগে স্ক্রিপ্টে হাত দেই নাই। লোকেশনের যে নিজস্ব চরিত্র আছে সেটা আমার প্রয়োজন পড়ে। এরপর সঙ্গীতের যে নিজস্ব চরিত্র আছে সেটাও, যা অবশ্যই আমরা কাজ শুরু করার আগেই কম্পোজ করা হয়। এবং যখন সবগুলা উপাদান প্রস্তুত থাকে তখনই আমরা হাত দেই মূল স্ক্রিপ্ট লেখায়। কেননা এখন আমরা সবকিছু জানি। ঠিক এ কারণে আমরা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করি না, কারণ আমরা তো সবই জানি। আমরা লোকেশন সম্পর্কে জানি। শ্যুটিং এর সময় হয়তো কিছু বিষয় পরিবর্তিত হয়, অবশ্যই তা ঘটে কিছু আর্থিক সমস্যা কিংবা কিছু ব্যবহারিক সমস্যার কারণে। কিংবা অনেক সময় অনেক আদর্শগত ভাবনার সাথে মিল না হওয়ার ফলেও ঘটে থাকে এসব। তবে শ্যুটিং এর আগে আমি সত্যিই জানি না আমরা কি করতে পারি। আমাদের তো সবসময়ই তত্ত্ব আছে। এবং আমাদের একটা নির্মাণশৈলী আছে। অভিনেতারা ঠিক এইখানটায় আসবেন, এরপর ঐখানটায় যাবেন, অতঃপর (ফ্রেমের বাইরে) চলে যাবেন। এবং আমাদের তাত্ত্বিক ক্যামেরা মুভমেন্ট আছে। আমরা পরিকল্পনা করে রাখি, কিন্তু যখনই অভিনেতা চলে আসে বাস্তবে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি এটা ভুল হচ্ছে – এগনেস সবকিছু দেখতে থাকে মনিটরে যেমনটা আমি দেখি – এবং আমরা দেখি যে আমাদের আসলে সবকিছুই পরিবর্তন করতে হবে।

‘সাতানত্যাঙ্গো’র একটি দৃশ্য

দালি ও কেইনঃ একটা শট কতক্ষণ ধরে রাখতে হবে এই সিদ্ধান্ত আপনি কিভাবে নেন? যেমন ধরুন হেলিকপ্টার শট।

বেলা তারঃ যদি আপনি পুরো মুভিটার ছন্দ অনুভব করতে পারেন, তাহলে আপনি জানবেন। শ্যুটিং এর পর সম্ভবত আমাদের দুই মাস বন্ধ থাকে। তবে আপনি যদি জানেন আপনি কি চান, আপনি সবসময়ই মুভিটা অনুভব করবেন।

দালি ও কেইনঃ যেভাবে আপনি কাজ করছেন?

বেলা তারঃ হ্যা। আমরা ফুটেজ দেখি। এগনেস বারংবার বলতে থাকে “আরেকটু দ্রুত” অথবা “আরেকটু দীর্ঘ করো” এবং দৈর্ঘ্যের ব্যাপারে প্রায়ই সে সিদ্ধান্ত নেয়। আপনি জেনে অবাক হবেন যে ফাইনাল কাট হতে মাত্র অর্ধেক বেলা সময় লেগেছিল!


মূল সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ফারগস দালি ও ম্যাক্সিমিলিয়ান লে কেইন

 

ভাষান্তরঃ রুদ্র কাওসার 

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক

তাঁর পরিচালিত সিনেমাঃ ‘স্ব চ ২’, ‘জনপদ’, ‘প্রকৃতি, রঙ ও কবিতা’ এবং ‘দিগন্তের মাঠের পথে উন্মাদ চাঁদ’। তার একাডেমিক শর্ট ফিল্ম ‘জনপদ’ ৩টি দেশের ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়।


error: Content is protected !!