ওসমান সেমবেন এবং ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার

“আমার নেগ্রেচুড ধাঁধা, অবহেলার গহ্বরে; 

প্রশংসনীয় ধৈর্য্যের ঘন দুর্ভোগ।”

– এমে সেজায়ার

 

ওসমান সেমবেন (০৮ জানুয়ারি ১৯২৩ – ০৯ জুন ২০০৭) একজন সামাজিক পরিবর্তনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ লেখক, দার্শনিক এবং সিনেয়াস্ট। আমাদের আলোচনার পরিসর তাঁর চলচ্চিত্র। তাঁর সমস্ত চলচ্চিত্রে আত্মসমালোচনা, নেগ্রেচুড সাংস্কৃতিক আন্দোলন, আফ্রিকার উপনিবেশ এবং বর্ণবাদবিরোধী লড়াই বহুতলে নিখুঁতভাবে চিত্রিত হয়েছে । ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ওসমান সেমবেন এর সিনেমা খুব বেশি পরিসর দেয় না , কিন্তু তা দর্শককে নবজনম দিতে পারে। তিনি আফ্রিকা মহাদেশের সেনেগালের চলচ্চিত্র নির্মাতা কিন্তু তিনি যেন বিশ্বশান্তি এবং মানবতার বার্তাবাহক । যেমন, ফরাসী উপনিবেশ কিভবে সেনেগালের একটি গ্রামের ফসল লুট করে আর পুরুষদের গুলি করে হত্যা করে তার চিত্রায়ন হচ্ছে EMITAI (1971) চলচ্চিত্রটি । ১৯৭১ সালে ওসমান সেমবেন নির্মিত এই সিনেমাটি যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তনি বর্বর গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। তাঁর ছবিতে ব্যক্তি প্রাসঙ্গিকভাবে, কিন্তু সমষ্টির প্রতিনিধি হিসেবে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে । প্রচলিত আইকন বা মূল্যবোধ, তথাকথিত আধুনিকতা বা ইউরোপীয়দের নজর এর মধ্যে ওসমান সেমবেন ধরা পরেন না। একইসাথে তিনি এথনোগ্রাফি বা এক্সোটিকাকেও সমর্থন করেন না।

তিনি বলেন “৪০ বছর বয়সে আমি গোটা আফ্রিকা ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি লুবুম্বার সময় কঙ্গোতে। আমার বয়স যখন ৪০ বছর তখন আমি সিনেমার সম্ভাবনা এবং প্রভাব বুঝতে পারি। সিনেমা হচ্ছে কালেক্টিভ মিথ। সিনেমা হলে ক্যাথলিক , মুসলিম , গ্যলযোদ্ধা , কম্যুনিস্ট সকল ধরনের মানুষই থাকবে। যদি সিনেমাটি সিনেমার মত হয়, যে যা খোঁজে তাই সে দেখতে পায় ।  আমি সিনেমার প্রতি আকৃষ্ট হলাম কারণ তা আমার এক্টিভিজমের জন্য কার্যকর অনুষঙ্গ । যদিও আমি সাহিত্য অনুরাগী কিন্তু বর্তমানকালে তা আমাদের জন্য বিলাসিতা। আমাদের ওরাল ট্র্যাডিশনকে ব্যবহার করে আমাদের ইতিহাসের সার সংকলন করতে সিনেমা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ । সকল শিল্প মাধ্যমের চেয়ে সিনেমা অভিব্যক্তি হিসেবে বৃহত্তর দর্শকের কাছে অধিক আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য।

কিন্তু দুর্ভাগ্য , সিনেমা বেশ ব্যয়সাপেক্ষও, অর্থ এবং শ্রম উভয়ক্ষেত্রেই।”

ওসমান সেমবেন দুটি পারস্পরিক একচেটিয়া প্রতীককে -সিস্টেমের সংঘর্ষ হিসেবে দেখান। যেমন, CEDDO (1977) চলচ্চিত্রে তিনি একটি ঐতিহাসিক সময়কে বিচার করেন প্রান্তিক গ্রাম সমাজের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এর মধ্য দিয়ে । উপনিবেশের মধ্যে আফ্রিকার যে আইসোলেশন এই সিনেমা তার উদাহরণ।

BAROM SARRET (1963), BLACK GIRL (1966) এবং MANDABI(1968) এই সিনেমাগুলো বিভিন্ন ব্যক্তিদের আফ্রিকা থেকে বিচ্ছিন্নতার , দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব এবং সমসাময়িক উপনিবেশের আর বর্ণবাদী সংস্কৃতির ফলে ব্যক্তির যে মুমূর্ষু পরিস্থিতি হয় তার গল্প , যেন তারা বলছে – আই কান্ট ব্রিথ।

 প্রাক্তন প্রভুদের ফেলে যাওয়া জুতায় পা গলিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করা নুপুংসক পোস্ট কলোনিয়াল ব্ল্যাক স্কিন,হোয়াইট মাস্কদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন XALA (1975) সিনেমায় । ওসমান সেমবেন এর এই সিনেমাটি নিউ কলোনিয়ালিজম পাঠের বলিষ্ঠ এবং বিরল উদাহরন ।

 

“নিউ কলোনিয়ালিজম এর দখলে থাকা একটি রাষ্ট্র তার নিজের ভাগ্যের মালিক নয়। এই কারণে নিউ কলোনিয়ালিজম বিশ্ব শান্তির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।”

– কোয়ামে নক্রউমা

 

Camp de Thiaroye(1988) ফিল্মটিতে Thiaroye গণহত্যা চিত্রিত হয়েছে, যা ১৯৪৪ সালে Thiaroye তে সংগঠিত হয়েছিল।  ছবিটি ৩০ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর ১৯৪৪ সালে  সেনাদের বিদ্রোহ এবং ফরাসি বাহিনীর দ্বারা গণহত্যা সম্পর্কিত। ছবিটিতে ফরাসী উপনিবেশ এর সমালোচনা, Thiaroye গণহত্যার আগের ঘটনাবলী এবং সেইসাথে গণহত্যা পর্যন্ত নথিভুক্ত করা হয়েছে। ছবিটি Thiaroye গণহত্যার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল।

Guelwaar (1992) চলচ্চিত্রটিতে  একজন ক্যাথলিক এবং একজন মুসলমান একই দিন মারা যান।মুসলিম  গ্রামবাসীরা মুসলমানের লাশ দাবি করে একজনকে কবর দেয়। আসলে তারা ক্যাথলিকের মৃতদেহ সমাধিস্থ করে । সত্য গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মিত -বিদেশী সহায়তা গ্রহণ বিষয়ে বিতর্ক, আফ্রিকান ধর্ম এবং আফ্রিকান গর্ব বিষয়ে এই সিনেমা।

Faat Kine (2000)সিনেমাটি তথাকথিত আধুনিক, উপনিবেশিক সেনেগাল এবং সেই সমাজে নারীদের অবস্থান সম্পর্কে একটি সমালোচনা। এটি সেনেগালের মধ্যবিত্তের জীবনের একটি সুস্পষ্ট ধারণা দেয় এবং বর্তমান Dakar এর দারিদ্র্য এবং সম্পদ, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার বৈপরীত্ব উপস্থাপন করে।

Moolaade (2004)  ফিল্মটি বুর্কিনা ফাসোর বাম্বারা গ্রামে নির্মিত হয়েছে, গ্রামটি যেন  সবুজ আফ্রিকার প্রতীক,কিন্তু তা তথাকথিত আধুনিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। আবার এই গ্রামের অধিকাংশ মহিলারা female genital cutting এর প্রয়োজনীয়তায় বিশ্বাসী, যাকে তারা “শুদ্ধি” বলে থাকেন । সেই গ্রামের একজন নারী এই  female genital cutting এর বিরোধিতা করেন যিনি মেয়েদের সুরক্ষার জন্য Moolaade (যাদুকরী সুরক্ষা) ব্যবহার করেন।

 

“আমি কৃষ্ণ,তা কোন অভিশাপের জন্য নয়,কারণ আমার ত্বক সমস্ত মহাজাগতিক বিষবাস্প ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে । সত্যই আমি মর্ত্যলোকে এক খণ্ড নক্ষত্র।”

– ফ্রানজ ফানো

 

যেহেতু ওসমান সেমবেন উপনিবেশ এবং বর্ণবাদের রাজনৈতিক স্বরূপ বুঝতে পেরেছিলেন , আমরা লক্ষ্য করেছি যে কোনও রাজনৈতিক দল বা আফ্রিকার ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে তাঁর অনেক বেশি অনুগামী রয়েছে। তবে এটি ওসমান সেমবেন এর পক্ষে যথেষ্ট ছিল না, কারণ জনসাধারণ – যার সত্যই কোন একক চেহারা নেই, যা একটি বিমূর্ততা – জনগণ ওসমান সেমবেনকে তাদের প্রয়োজনেই সমর্থন করেছে। ওসমান সেমবেন আমাদেরকে ভাষার জাতিগত সমস্যা ছাড়িয়ে যেতে সহায়তা করেছেন এবং দুনিয়ার লাঞ্চিত- নিপীড়িতের  মিত্র হয়ে উঠেছেন । আমরা জনসাধারণ ওসমান সেমবেনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কারণ তিনি আমাদের দিকে এসেছেন। ওসমান সেমবেন এর নির্বাচিত হওয়ার জন্য কোন ইউরোপীয় স্বীকৃতির প্রয়োজন ছিল না, ওসমান সেমবেনকে যারা স্বীকৃতি জানাতে পেরেছিল তারা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং নিজস্ব ভাষাগুলির মধ্যে অন্য সংস্কৃতির মতোই যে অন্তর্নিহিত সংস্কৃতি রয়েছে তাকে সমর্থন করতে পেরেছিল । এবং ওসমান সেমবেন এর সিনেমা নিজেই একটা ঐতিহ্য এর আধার । গল্প বলার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, ঐতিহ্য আর কিংবদন্তীদের প্রতিস্থাপন করতে পারার কারণে ওসমান সেমবেন নিজেই মহৎ গল্পকার থেকে  মহৎ চলচ্চিত্র নির্মাতা হয়ে ওঠেন। আজকের দিনের নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতার উপর দায়িত্ব বর্তায় তাঁর কাজ যথাসম্ভব উপলব্ধি এবং ব্যাখ্যা করার। তবে একবার তিনি কাজটি শেষ করার পরে, কাজটি তার বাইরে চলে যায় এবং হয়ত সে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং, আমাদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাতার ভূমিকা খুব সুস্পষ্ট, ওসমান সেমবেন এর হাত ধরে তা খুব স্পষ্ট বলে মনে হচ্ছে।


লেখক :

হাবিবুর রহমান

ফিল্মমেকার, লেখক।
আহমদ ছফার উপন্যাস অবলম্বনে তার নির্মিত চলচ্চিত্র অলাতচক্র (3D), বাংলাভাষায় প্রথম থ্রিডি সিনেমা।


error: Content is protected !!