প্রামাণ্যচিত্রের বর্তমান, সংকট ও সম্ভাবনা

চলচ্চিত্রের শুরুটা ছিল প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। এ বিষয়টা কারও অজানা নয়। একশ বছর পেরিয়ে প্রামাণ্যচিত্র মাধ্যমটি চলচ্চিত্রের একটি বেগবান শৈল্পিক ধারা হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেলেও এদেশে তার ছাপ কতটুকু পড়েছে তা নিয়ে রয়েছে আমাদের মতপার্থক্য। মজার ব্যাপার হলো, দেশভাগের পর পূর্ববাংলায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুটাও কিন্তু প্রামাণ্যচিত্রের মধ্য দিয়েই। স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুটা আলোড়ন সৃষ্টি ও সুনাম অর্জনের বাহক হলেও পরবর্তীকালে তার ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই না প্রায় দেড় দশক।

৮০’র দশকের মাঝামাঝি এ অঞ্চলের চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের হাত ধরে প্রামাণ্যচিত্রের প্রচার ও প্রসার গতি পায়। যার মূল কারণ ছিল স্বাধীন চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁদের নিখাদ আগ্রহ আর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র যে একটি সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম তা সকলের কাছে তুলে ধরবার চেষ্টা। যদিও এই তুলে ধরবার কাজটুকু করতে গিয়ে তাঁদের পথচলার রাস্তা যে সহজ ছিল তা কিন্তু নয়। এর কারণ প্রামাণ্যচিত্র সম্পর্কে দর্শক অজ্ঞতা, গণমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকতা, সরকারের অনাগ্রহ, দলীয়করণ, সস্তা বিনোদন আসক্তি, শিল্পের দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি। কিন্তু শিল্পের প্রতি দায়িত্ববোধ সে সকল প্রবীণ চলচ্চিত্র সংসদকর্মীকে তাঁদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে সাহায্য করেছে; যার ফলশ্রুতিতে তরুণ নির্মাতারা আজ স্বল্প পরিসরে হলেও প্রামাণ্যচিত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে সৃজনশীল ও সামাজিকভাবে কার্যকর একটি বলিষ্ঠ ধারা হিসেবে এবং পরিচিত করে তুলতে পেরেছে বিনোদন মাধ্যম হিসেবে। পাশাপাশি কাজ করতে পারছে এ ধারার জনপ্রিয়তা সৃষ্টি ও সৃজনশীল প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে এবং নিতে পারছে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের প্রচার, প্রসার ও উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ। যেখানে পূর্বে একজন চলচ্চিত্র সংসদকর্মী অথবা শিক্ষানবীশ নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মান করবার জন্য একটি ভাল কাহিনি অথবা গল্প নির্বাচন করতেন, সেখানে আজ তাদের বড় একটি অংশকে প্রমাণ্যচিত্রের জন্য ভাল বিষয়বস্তু খুঁজতে দেখা যায়। এটাকে আমি বলব এ ধারার প্রচার-প্রসারের আন্দোলনের সাথে জড়িত সকল স্তরের সকল কর্মীর এক বিরাট অর্জন। আজ প্রামাণ্যচিত্রের দর্শক শ্রেণী তৈরি হয়েছে, তৈরি হয়েছে নতুন নির্মাতা, বোদ্ধা, সমালোচক ও লেখক। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হচ্ছে আমাদের তরুণ নির্মাতাদের প্রমাণ্য চলচ্চিত্র।

বিগত বছরগুলোতে আমার বেশকিছু চলচ্চিত্র সম্পর্কিত সেমিনারে অংশগ্রহণ করবার সুযোগ হয়েছিল। সেমিনারগুলোতে যখন “ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রমাণ্যচিত্রের প্রচার/ প্রদর্শন” বিষয়ে কথা উঠত সেখানে উপস্থিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কর্তাব্যক্তিরা একই কথা বলতেন যে, “আগে প্রমাণ্যচিত্রের দর্শক তৈরি করুন তারপর আসুন”। আবার তাঁদের অনেককে বলতে শুনেছি, “কে বলেছে আমরা প্রামাণ্যচিত্র দেখাচ্ছি না, আমরা তো প্রতি সপ্তাহেই প্রামাণ্যচিত্রের অনুষ্ঠান প্রচার করছি”। আমার তখন মনে হয়েছে, হয়তো তাঁরা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র কী সেটাই বুঝতেন না, নয়তো প্রচারের বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইছেন। তা না হলে প্রতিবেদনমূলক অনুষ্ঠানগুলোকে তাঁরা কেন প্রামাণ্যচিত্রের অনুষ্ঠান বলবেন? অথচ বিশ্বব্যাপী প্রামাণ্যচিত্র প্রচারের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে টিভি চ্যানেল, শুধু তাই নয় এ ধারার চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নীর ক্ষেত্রে বহির্বিশ্বে টিভি চ্যানেলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যাইহোক প্রামাণ্যচিত্র আন্দোলনের মধ্যদিয়ে দর্শক আগ্রহ তৈরি হওয়ার বিষয়টি মনে হয় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্তাব্যক্তিদের একটু হলেও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র প্রচারের আগ্রহ যুগিয়েছে, এটিই বা কম কিসের। আমরা দেখেছি, দেশীয় টিভি চ্যানেলগুলো অনিয়মিতভাবে হলেও প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করতে শুরু করেছে। এমনকি একাত্তর টিভি, যমুনা টিভি প্রতিষ্ঠালগ্নেই প্রামাণ্যচিত্রের জন্য আলাদা বিভাগ খুলেছিল, যেখান থেকে বেশকিছু দর্শকনন্দিত প্রামাণ্যচিত্র নির্মান এবং প্রচার হয়েছে, তাঁদের এই কার্যক্রম প্রশংসার দাবী রাখে। পরবর্তীকালে আরও কিছু টিভি চ্যানেল নিজস্ব নির্মানে নিয়মিতভাবে/অনিয়মিতভাবে প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করেছে এবং করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই যে আমরা প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্ভর একটি টিভি চ্যানেল দেখতে পাব তা আশা করা নিশ্চয়ই বোকামী হবে না। কারণ যে দেশ “টেলিভিশন ব্রডকাস্ট স্টেশন” সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে ২৬ নম্বরে অবস্থান করছে, সে দেশের কাছে একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্ভর টিভি চ্যানেল আশা করা যেতেই পারে। যদিও কথাটা “গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল”-এর মত শোনায়, তবুও আশা করতে দোষ কী? কিন্তু আমার মনে হয় এখনই এই আশা করাটা ঠিক নয়। একটি পূর্ণাঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র নির্ভর টিভি চ্যানেল আশা করবার আগে যদি একটু খেয়াল করি তবে দেখব, তরুণ নির্মাতারা তাদের কষ্টার্জিত গাঁটের টাকা খরচ করে অথবা কোন একাডেমিক কোর্সের অভ্যন্তরে স্বল্প খরচে যে শৈল্পিক প্রামাণ্যচিত্রগুলো নির্মান করছেন সেগুলোর আমরা কী করতে পেরেছি, তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। আসলে আমাদের এখন কী আশা করা উচিৎ আর কী নয়। যেখানে এখনো একজন নির্মাতার গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্যচিত্র দু’একটি উৎসব ছাড়া আর কোথাও প্রদর্শিত হয় না অথবা সংরক্ষণের কিংবা অন্য কোথাও প্রচারের ব্যবস্থা করা যায় না, যার মধ্যদিয়ে সেই নির্মাতাটি উপকৃত হবেন সেখানে সত্যিকার অর্থে আমরা প্রমাণ্যচিত্রের কতটুকু প্রসার ঘটাতে পেরেছি তাও ভেবে দেখা দরকার। এ কথা সত্য যে বর্তমানে আমরা প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকে সৃজনশীল ও সমাজিকভাবে কার্যকর একটি চলিষ্ণু ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, কিন্তু আমি আগেও একবার বলেছি যে এটা স্বল্প পরিসরে। তাই আমাদের এখনই উদ্যোগ নেয়া উচিৎ এ ধারার পরিসরটাকে আরও বিস্তৃত করবার। আর এর জন্য নিতে হবে বেশকিছু পদক্ষেপ, প্রথমত আমাদের একটি আর্কাইভ গোড়ে তোলা উচিৎ যেখানে শুধুমাত্র প্রামাণ্যচিত্র সংরক্ষিত থাকবে। নামমাত্র আর্কাইভ নয়, গবেষণার জন্য দেশের ও দেশের বাইরের যে কোন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এই আর্কাইভ থেকে যেন সহজেই সাহায্য নিতে পারে তেমন। দ্বিতীয়ত তরুণ নির্মাতাদের ভাল চলচ্চিত্রগুলো নিয়মিত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, বাছাইকৃত চলচ্চিত্রসমূহ নানা মাধ্যমে প্রকাশ করার পাশাপাশি দর্শকদের জন্য সহজলভ্য করে তোলা। এতে করে আমাদের দর্শক সংখ্যা বাড়বে এবং তার সাথে দর্শক চাহিদাও। যে কোন কিছুর আগ্রহ বাড়াতে হলে সেটাকে সকলের হাতের নাগালে পৌঁছে দিতে হবে, ছবি প্রদর্শন শুধুমাত্র উৎসব কিংবা হলকেন্দ্রিক হলেই চলবে না।

বিগত বছরগুলোতে চলচ্চিত্র উৎসব ও উৎসবের বাইরে অনেক সাধারণ দর্শককে বলতে শুনেছি, “আমরা আপনাদের প্রামাণ্যচিত্রগুলো কোথায় পাব? সব ছবিই তো বাজারে কিনতে পাওয়া যায় কিন্তু প্রামাণ্য চলচ্চিত্রগুলো তো খুঁজে পাই না”। সাধারণ দর্শকদের এই “কোথায় পাব” কথাগুলো যেন আর শুনতে না হয়, সেজন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্মাতা ও চলচ্চিত্র সংসদকর্মীদের প্রয়োজনে নিজেদেরই এগিয়ে আসা উচিৎ। “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে…!” এ উক্তিটি বলার উদ্দেশ্য, কারও অপেক্ষায় বসে না থেকে এই ধারাকে সত্যিকার অর্থে অনেকের কাছে তুলে ধরতে নিজেদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে, তা না হলে যতটুকু দর্শক চাহিদা আমরা অর্জন করেছি তা হয়তো হারাতে বসবো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্মাতা তৈরির চাইতে প্রদর্শন প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রয়াস আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। কারণ যে পরিমাণ নির্মাতা আমাদের রয়েছে সে পরিমাণ দর্শক আমরা এখনো তৈরি করতে পারিনি। তাছাড়া বিশ্বায়নের যুগে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের সহজলভ্য, নির্ভরশীল ও নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি না হওয়ায় দর্শকের সাথে নিয়মিত সংযোগের শূন্যতাও বাড়ছে।

একজন দর্শক যখন একটি ভাল প্রামাণ্য ছবির নাম শোনার পর সেটি সংগ্রহ করতে গিয়ে শহরের প্রায় সকল ডিভিডি’র দোকান ঘুরে ছবিটি পাবেন না কিংবা ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করে ব্যার্থ হবেন, তখন তিনি ছবিটির প্রতি আগ্রহ হারাবেন। এটাই স্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, একজন নির্মাতা যখন তার নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটিকে আর্থিক দিক দিয়ে একটি অলাভজনক প্রোজেক্ট হিসেবে ভাববেন তখন তিনিও এ ধারার প্রতি আগ্রহ হারাবেন। এমন অনেক নির্মাতা রয়েছেন যিনি প্রথমবার একটি ভাল প্রামাণ্য ছবি নির্মান করবার পর দ্বিতীয়বার আর নির্মানের চিন্তা করেননি। কারণ তার ধারণা জন্মেছে প্রামাণ্য ছবির মাধ্যমে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হওয়া সম্ভব নয়। যদি তিনি তার ছবিটি অনেকের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ পেতেন এবং লাভ না হলেও নির্মানের খরচটা অন্তত তুলে আনতে পারতেন তবে আমি নিশ্চিত তার দ্বিতীয় ছবিটিও এ ধারার হতো। যাই হোক ফুল ফুটবার আগেই ঝরে যাবার মত না হয়ে তরুণ নির্মাতা/চলচ্চিত্রকর্মীদের বর্তমান ধারণাগুলো ভাঙতে হবে এবং ধরে রাখতে হবে দর্শক আগ্রহ। যেহেতু অপ্রজ্জ্বলিত মশাল নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে নবীণ কর্মীদের নেতৃত্ব প্রবীণরা দিয়েছেন, সেহেতু এখন নবীণদের দায়িত্ব সেই অপ্রজ্জ্বলিত মশালকে প্রজ্জ্বলন করবার। আজ এ ধারার চলচ্চিত্রের যে সুবাতাস বইছে এবং তরুণ কর্মীরা যে স্পৃহা ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করছেন তা ভবিষ্যতে ধরে রাখবার জন্য এবং এ ধারাকে আরও বেগবান করবার জন্য দ্রুত কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ, যে সকল পদক্ষেপ গুলো দর্শকদের হাতের নাগালে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র পৌঁছে দিতে এবং নিজেদের এ ধারায় কাজ করতে বার বার আগ্রহ যোগাবে।

তাই বলতে চাই, প্রামাণ্যচিত্রকর্মীরা পদক্ষেপ গ্রহণ করুন এবং এই পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বে অনেক বিষয়ই মাথায় আসতে পারে। কিন্তু যেহেতু এখনো আমাদের প্রামাণ্যচিত্রের জন্য নিয়মিত দর্শক তৈরি করবার বিষয়টি মূখ্য, সেহেতু এদিকটাতেই বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। বাছাইকৃত প্রামাণ্য ছবিগুলো নিয়মিত প্রদর্শনের এবং সেগুলো ডিভিডি/ব্লু-রে আকারে বাজারে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যদিও অনলাইন স্ট্রিমিং এর যুগে ডিভিডি/ব্লু-রের চাহিদা ইতোমধ্যে হ্রাস পেয়েছে। মিলনায়তনে নিয়মিত প্রদর্শনের বিষয়টি যদি এখনই সম্ভব না হয় তবে চিন্তিত না হয়ে অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্মগুলোর কথা ভাবতে হবে, আর এক্ষেত্রে নির্মাতারা সম্মিলিতভাবে কিংবা একক উদ্যোগে প্রামাণ্য ছবিগুলোর অনলাইন প্রদর্শন/বাজারজাত করতে পারেন। নানাভাবে এ কাজটা করার সুযোগ থাকলেও যেটা সবচাইতে সহজ হবে, সেটি হচ্ছে প্রামাণ্য ছবিগুলো একত্রিত করে যে কোন দেশী-বিদেশী ভি.ও.ডি (ভিডিও অন ডিমান্ড) প্ল্যাটফর্ম এর সাথে আলোচনা সাপেক্ষে প্রদর্শন/বাজারজাত করার ব্যবস্থা নেয়া। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো বসেই থাকে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও প্রডাকশন তাদের প্ল্যাটফর্মে প্রচারের আশায়, এক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের মান সন্তোষজনক হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর যখন গ্রহণযোগ্য প্রামাণ্যচিত্র তুলনামূলক কমমূল্যে কিংবা আলোচনাসাপেক্ষে প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের হাতের কাছে পেয়ে যাবে তখন তা লুফে নেবে এটাই স্বাভাবিক। যদিও যতটা সহজে কথাগুলো লিখে ফেলা গেল বিষয়টি ঠিক ততটা সহজ নয়, কারণ এ ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আলোচনায় টিকে থাকাটা কঠিন। সেক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, সেটি হচ্ছে বর্তমান যুগ ইন্টারনেট এর যুগ, বিশ্বের অনেক অডিও ভিজ্যুয়াল প্ল্যাটফর্ম অফলাইন থেকে অনলাইনে চলে এসেছে এবং ভবিষ্যতে এটা বাড়তেই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই এখন থেকেই অনলাইন মাধ্যমটিকে নিজেদের চলচ্চিত্র প্রচারের অন্যতম সহজ ও দ্রুত পদক্ষেপযোগ্য মাধ্যম হিসেবে আমরা ব্যবহার করতে পারি। শুধু তাই নয়, ডিভিডি/ব্লু-রে প্রকাশের চাইতে এটি অনেক সাশ্রয়ী, যুগোপযোগী এবং কার্যকরী। বর্তমানে স্বল্পমুল্যে অনেক ভালো মানের ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়। চলচ্চিত্রকর্মীদের উচিত নিজেদের উদ্যোগে ওয়েবসাইট প্রকাশ করা, যেখানে তাঁদের চলচ্চিত্রগুলো আপলোড করে রাখতে পারেন এবং একই সাথে সাইটটির ঠিকানা বিভিন্ন মিডিয়া/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাহায্যে অনেকের দৃষ্টিগোচরে আনতে পারেন। এর ফলে একজন দর্শক অতি সহজেই ওয়েবসাইট থেকে তার পছন্দমত প্রামাণ্যচিত্র দর্শনীর বিনিময়ে দেখে নিতে কিংবা সাইটটির ব্যাক্তিগত প্রোফাইলে ডাউনলোড করে রাখতে পারবেন। আর এ ধরনের সাইট তৈরীতে অভিজ্ঞ/বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নেয়া শ্রেয়; অন্যথায় চলচ্চিত্রগুলোর মূলকপি সংরক্ষণ অথবা কপিরাইট জাতীয় সমস্যায় পড়তে হতে পারে। প্রচারের এই মাধ্যমটিকে চলচ্চিত্রকর্মীরা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তবে প্রমাণ্য চলচ্চিত্রগুলো সাধারণ দর্শকের শুধু দোরগোড়ায় নয়, একদম সরাসরি বেডরুমে পৌঁছে যাবে। কিন্তু এর জন্য চাই সদিচ্ছা আর সঠিক উদ্যোগ, শুধু তাই নয় নিজেদের মধ্য থেকেই এমন দু’একজনকে বের হয়ে আসতে হবে যারা এই গুরুদায়িত্বের ভার স্ব-উদ্যোগে গ্রহণ করবেন।

প্রতি বছরের আলোচিত বা দর্শকনন্দিত পাঁচটি বা দশটি ছবি নিয়ে একটি ওয়েবসিরিজ বের করা যেতে পারে, যার নাম হতে পারে “বেস্ট ডকুমেন্টারি ফিল্মস অব দ্যা ইয়ার” অথবা হতে পারে পাঁচজন তরুণ নির্মাতার বেশ কিছু ছবি নিয়ে “ফিল্মস ফ্রম ফাইভ ডকুমেন্টারি মেকার” ইত্যাদি নানা রকম নামে। নাম যাই হোক না কেন আমরা যদি আমাদের প্রামাণ্য চলচ্চিত্রগুলো সাধারণ এবং নিয়মিত দর্শকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সঠিক মাত্রায় সফল হতে পারি, সেক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপগুলোতেও সফলতার স্বাক্ষর রাখব নিশ্চয়ই। আর তবেই আমি সাহস নিয়ে বলতে পারি সেদিন খুব বেশি দূরে থাকবে না যেদিন আমরা একটি প্রামাণ্য চলচ্চিত্রনির্ভর টিভি চ্যানেল দেখতে পাব। শুধু তাই নয় সেইদিন হয়তো নতুন নির্মাতাদের প্রামাণ্যচিত্র কোন এক মিলনায়তনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে চলবে। আর আমরা তখন আগ্রহ ভরে দেখবো অসাধারণ সব প্রামাণ্য চলচ্চিত্র।


লেখক: 

মৃদুল মামুন

স্বাধীন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী

(সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রামাণ্যচিত্র পর্ষদ ও বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম)


error: Content is protected !!