প্রামাণ্য চলচ্চিত্র: মুক্ত কাঠামোয় গল্প বলা

কাঠামো

কাঠামোকে তুলনা করা যায় অন্ধকার ঘরে একখণ্ড আলোর সাথে; যার প্রকাশ আছে, বিস্তার আছে, বিলয় আছে। কাঠামো হলো ফ্রেম যার ভিতরে গল্প প্রকাশিত হয়। কাঠামো হলো রবীন্দ্রনাথের সীমার মাঝে অসীমের সন্ধানের মতো। কাঠামো হলো জাপানি হাইকুর মত- ‘দেয়াল তুললেই ঘর, ভেঙে ফেললেই পৃথিবী’। কাঠামোর বাইরে ঘর নেই, গল্পও নেই। কাঠামো ছাড়া সবই বাহির, সবই গল্পহীন-অপার সম্ভাবনাময় এক অখণ্ড প্রকৃতি। অখণ্ডকে খণ্ড খণ্ড করলেই উঁকি দেয় গল্প, তৈরি হয় কাঠামো।

তাহলে কাঠামো কী করে? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার মতো কাঠামো আমাদের ছেড়ে দিয়ে বাঁধে এবং বেঁধে রেখে ছাড়ে। গল্পের উপাদানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে সাজায়। কাঠামো একইসাথে গল্পকে প্রকাশ করে আবার নিয়ন্ত্রণও করে। গল্পের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সুরে-ছন্দে বাঁধে। কাঠামো এবং গল্প আলাদাভাবেও তৈরি হতে পারে আবার একসাথেও জন্ম নিতে পারে। কাঠামো হলো এমন কিছু যার মধ্য দিয়ে গল্পের শুরু এবং শেষ চেনা যায়। বেশীরভাগ স্বপ্নেই কাঠামো থাকে না বলে স্বপ্নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে না। ফলে  আমরা স্বপ্ন মনে রাখতে পারি না। গল্পের মনে রাখার কাজটাও এই কাঠামোর কারণেই। কাঠামো ছাড়া শুরু করা যায়। কিন্তু শেষ আর হয় না।

চলচ্চিত্রের কাঠামো

চলচ্চিত্রের সুবিধা হলো এটি মুখের ভাষার মত ভাবনার কাঠামোবন্দী প্রকাশ না। মুখের ভাষাকে কাঠামো এতটাই নিয়ন্ত্রণ করে যে, কাঠামোর কারণে ভাব প্রকাশের ধরণ পাল্টে যায়। শব্দের আশ্রয়ে ভাব সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিংবা বাক্য সম্পূর্ণ করতে গিয়ে ভাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

চলচ্চিত্রকেও কাঠামোতে বাঁধার চেষ্টা চালু আছে। আমরা তিন অঙ্কের কাঠামোর কথা জানি। পৃথিবীর বেশীরভাগ চলচ্চিত্র এই কাঠামোতেই তৈরি। এই কাঠামোর প্রথম অঙ্কে থাকে শুরু বা সেটিং যেখানে একটা স্থিত-স্বাভাবিক অবস্থা বজায় থাকে। দ্বিতীয় অঙ্ক হলো মধ্যভাগ যেখানে এসে আগের স্থিত-স্বাভাবিক অবস্থাটি ভেঙে যায়। দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। তৃতীয় বা শেষ অঙ্কে এসে নতুন আরেকটা স্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হয় যে অবস্থাটা চলচ্চিত্রের শুরুতে ছিল না। তিন, চার বা পাঁচ- যত অঙ্কেই গল্প সাজাই না কেন কাঠামো একটা থাকতেই হয়। কারণ কাঠামোর মাধ্যমে চলচ্চিত্রের উপাদানগুলোকে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে সাজানো হয়। ফলে ঘটনাগুলো পরস্পর যৌক্তিক এবং অর্থপূর্ণ সম্পর্কে যুক্ত হয়। পরম্পরা তৈরি হয়। ঘটনার ঘেরাটোপে গল্প হারিয়ে যায় না। সেইসাথে চলচ্চিত্রে গল্পবলার উপাদানগুলোর মধ্যে নতুন ভারসাম্যও তৈরি করে দেয় কাঠামো।  চলচ্চিত্রের কাঠামো যত সরল হয়,  ভেতরে গল্পের চলাচল তত সহজ ও সাবলীল থাকে। অনেক চলচ্চিত্রে কাঠামো এত প্রবল থাকে যে মনে হয় যেন কাঠামোই গল্প বলছে।

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কাঠামো

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের নির্মাণ প্রক্রিয়া কাহিনিচিত্র থেকে ভিন্নই নয়, অনেকক্ষেত্রে বিপরীতও। কাহিনিচিত্রকে বলা যায় শূন্য প্রাসাদকে কল্পিত উপাদান দিয়ে সাজানো। আর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র সাজানো হয় পূর্ণ প্রাসাদকে শূন্য করতে করতে; প্রয়োজনীয় উপাদান রেখে বাকিসব বাদ দিয়ে দিয়ে। কিংবা বলা যায় কাহিনিচিত্র হলো এক খণ্ড কাঁদামাটি, শিল্পীর কল্পনার আদলে যা অবয়ব পায়। আর প্রামাণ্য চলচ্চিত্র হলো একখণ্ড পাথর; কাটতে কাটতে ভেতর থেকে অবয়ব বের হয়ে আসে। এরকম নানা পার্থক্য করা যেতে পারে। মোট কথা হলো কাহিনিচিত্রের কাঠামো চিত্রনাট্য পর্যায়েই তৈরি হয়ে যায়। কারণ বাস্তবতা নির্মাতার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে পূর্ব নির্ধারিত কাঠামোকে অনুসরণ করে এখানে গল্পবলার সুযোগ নেই। কারণ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে বাস্তবতা প্রায় ক্ষেত্রেই নির্মাতার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। থাকে বাস্তব চরিত্রের নিয়ন্ত্রণে, প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে বাস্তবতাকে নির্মাতা যেভাবে ধারণ করার পরিকল্পনা করেন আর যেভাবে বাস্তবতা ধরা পড়ে; এ দুইয়ের মধ্যে নানা মাত্রায় পার্থক্য থেকেই যায়। বাস্তবতা ক্যামেরার সামনে এমনভাবে হাজির হয় যা নির্মাতার ভাবনায় ছিল না। আবার নির্মাতার ভাবনায় যা ছিল তা হয়তো বাস্তবে ঘটেনি, ঘটলেও ক্যামেরার সামনে ঘটেনি। ফলে নির্মাণের শেষ ধাপ পর্যন্ত প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়া চলতে থাকে। আর নির্মাতাকে এমনভাবে কাঠামো তৈরি করে নিতে হয় যা দিয়ে নির্মাতা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বাস্তবতাকে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ধারণ করতে পারেন, ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করতে পারেন। কাঠামোটি হবে এমন যা বিষয় ও বাস্তবতার পার্থক্যের কারণে ভেঙে পড়বে না, যা গল্পকে কাঠামোর ছাঁচে ফেলে দেবে না কিংবা গল্পবলার প্রক্রিয়ায় যা মূখ্য হয়ে উঠবে না। বরং এটি নির্মাণ প্রক্রিয়ার যে কোন পরিবর্তণের সাথে খাপ খাইয়ে চলবে, গল্পের অনুগামী হবে।

বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে গল্পবলার কৌশল খুঁজে বের করতে হয় বলে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে এক ধরণের মুক্ত কাঠামো বহাল থাকে, যে কাঠামোটি বাস্তবতার মতোই জীবন্ত।

মুক্ত কাঠামো

মুক্ত কাঠামো হলো এমন একটি কাঠামো যেটি গল্পবলার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তৈরি হয়। প্রামান্য চলচ্চিত্রে গল্পবলার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাস্তবতাকে ধারণ করার পর, বাস্তবতার নতুন নতুন অর্থ তৈরি করার মাধ্যমে। সুতরাং মুক্ত কাঠামো প্রতিনিয়ত গল্পের গতিকে অনুসরণ করে। গল্পবলার ছন্দে তাল মিলিয়ে চলে।

মুক্ত কাঠামো হলো জীবন্ত কাঠামো যা নির্মাতার শ্বাস-প্রশ্বাসের মত; গল্পবলার সাথে সাথে সংকুচিত প্রসারিত হয়। বাস্তবতা যতই অভিনব এবং গল্পময় হোক না কেন, বাস্তবে যা ঘটছে তা দেখানোয় কোন গল্প থাকে না। গল্প তৈরি করতে হয়। আর এটি তৈরি হয় নির্মাতার বয়ানে, নির্মাতার দৃষ্টিতে-ভঙ্গিতে। নির্মাতা বাস্তবতার কোন অংশ থেকে গল্প শুরু করছেন, কিভাবে এগুচ্ছেন, কোথায় থামছেন-এ সবই গল্পবলার কৌশল। মুক্ত কাঠামো গল্পবলার এই কৌশলকে অনুসরণ করে। গল্পের কৌশল পাল্টানোর সাথেসাথে কাঠামোও পাল্টায়। চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায় পর্যন্ত গল্পবলার সাথে কাঠামোর এই খাপ খাইয়ে চলা চলতে থাকে। কিন্তু কোন অবস্থায়ই কাঠামো গল্পের চলনকে বদলে দেয় না। গল্পের হয়ে ওঠার সাথেসাথে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কাঠামোও তৈরি হতে থাকে। শেষপর্যন্ত কাঠামো বা গল্প; কোনটাই প্রকট থাকে না, যুগলবন্দী হয়ে মিলিয়ে যায় চলচ্চিত্রে।

মুক্ত কাঠামোয় গল্পবলা

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে মুক্ত কাঠামো কয়েকটি ধাপে সম্পূর্ণতা পায়। এই ধাপগুলো আবার চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ারও অংশ।

০১) আইডিয়া বা ভাবনা পর্যায় :

যে কোন শিল্পপ্রক্রিয়া শুরু হয় আইডিয়া বা ভাবনা থেকে। আইডিয়াকে বলা যায় ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’। এই ঝলকানিতে হঠাৎ এমন কিছু দেখে ফেলা যা জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতার মতো; আঁকড়ে ধরে,  প্রশ্নবিদ্ধ করে, একা আর আলাদা করে দেয়। ফরাসি দার্শনিক দেলুজ তাই আইডিয়াকে বলেছেন অভিনব ঘটনা। তাঁর মতে আইডিয়া তৈরি হওয়ার জন্য দুটো বিষয় জরুরি। একটি হলো প্রকাশের ধরণ (গল্প, কবিতা, চলচ্চিত্র) ঠিক করা এবং আরেকটি হলো সেই ধরণ সম্পর্কিত কলাকৌশল জানা। কারণ একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা; যিনি চলচ্চিত্র মাধ্যমে কাজ করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের কলাকৌশল জানেন- তার আইডিয়া চলচ্চিত্রকে ঘিরেই তৈরি হয়। ঠিক যেমন কবির আইডিয়া কবিতাকে ঘিরে, স্থপতির আইডিয়া স্থাপত্য নিয়ে।

আইডিয়া হলো হঠাৎ দেখায় চমকে ওঠার মত ঘটনা। এই দেখাটা প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে বিষয় আকারে দানা বাঁধতে থাকে, কোন ঘটনাকে অনুসরণ করে এগোতে থাকে কিংবা কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ঘিরে বেড়ে উঠতে থাকে। আইডিয়াটি দানা বাঁধতে বাঁধতে কিংবা বেড়ে উঠতে উঠতে একদিকে বিস্তৃত হতে থাকে, অন্যদিকে সংক্ষিপ্ত হতে থাকে। তখন থেকেই প্রয়োজন হয় একটি কাঠামো যার ভেতরে বাদ পড়তে পড়তে জায়গা করে নিতে পারে আইডিয়া। এই কাঠামোকে ঘিরেই জন্ম নেয় আইডিয়ার গল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা, সামর্থ্য এবং ক্ষমতা। আইডিয়া হলো চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রথম স্তর। কিন্তু প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিটি ধাপে এই আইডিয়া সক্রিয় থাকে।

০২) ট্রিটমেন্ট পর্যায় :

ট্রিটমেন্ট হলো আইডিয়াকে একটি সম্ভাব্য কাঠামোয় ফেলে গল্প বলা। প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের যেহেতু কোন চিত্রনাট্য থাকে না, নির্মাতাকে তাই ট্রিটমেন্টের মাধ্যমেই গল্পের বিষয়, গতি প্রকৃতি, অগ্রগতি, সম্ভাব্য পরিনতি প্রভৃতি তুলে ধরতে হয়। এই পর্যায়ে গল্প বলার শৈলী বা স্টাইল ঠিক করা হয়, গল্পের সম্ভাব্য বাঁকগুলো ধরিয়ে দেয়া হয়, গল্পের উপকরণগুলো গল্পবলায় কী ভূমিকা রাখবে সেটা ঠিক করা হয়, গল্পের চরিত্র ঠিক করা হয়, গল্পবলায় চরিত্রের ভূমিকা ঠিক করা হয় এবং নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি নির্দিষ্ট করা হয়।

ট্রিটমেন্ট পর্যায়ে কাঠামোর গঠন চূড়ান্ত না হলেও কাঠামোর ধরণ চূড়ান্ত হয়ে যায়। অর্থ্যাৎ কাঠামোটি কোন ধরণের হতে পারে, কাঠামো কি বৃত্তাকার হবে যেখানে চরিত্রগণ জীবনের একই বৃত্তে বারবার ঘুরপাক খাবে? কাঠামোটা কি ত্রিভূজের মতো হবে-যার একপাশ দিয়ে গল্পের চরিত্র তরতর করে উঠবে, আর আরেকপাশ দিয়ে হঠাৎ নেমে যাবে? নাকি চতুর্ভূজের মতো-জীবনের চারদিক ঘুরেঘুরে দেখা। নাকি খাঁজ কাটা- পদে পদে যার বাধা? কাঠামোটা কি সিঁড়ির মতো ছন্দময় হবে, নাকি পেন্ডুলামের মত দোদুল্যমান থাকবে? নাকি রেলের বগির মতো-একে একে জোড়া লেগে লেগে লম্বা ট্রেন হয়ে ছুটে চলবে অনেক ভোরের পৃথিবীতে?

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের কাঠামো ঠিক হয় গল্পবলার প্রয়োজনে। এই কাঠামোকে মাথায় নিয়েই প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের গল্পবলার উপকরণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

০৩) উপকরণ সংগ্রহ পর্যায় :

ট্রিটমেন্ট পর্যায়ে যে কাঠামো ঠিক করা হয়েছে, সেই কাঠামো অনুসরণ করেই এ পর্যায়ে বিষয়বস্তু অনুযায়ী চলচ্চিত্রে গল্পবলার উপকরণ সংগ্রহ শুরু হয়। গল্পবলার কাঙ্খিত উপাদানের খোঁজে কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা, কখনো দিনের পর দিন দৃশ্য ধারণ বা উপকরণ সংগ্রহ চলতে থাকে। এ সময় কাঠামোর কাজ হলো উপকরণ সংগ্রহ এবং দৃশ্য ধারণ প্রক্রিয়াকে গল্পমুখী এবং সুনির্দিষ্ট রাখা, যেন ঘটনার স্রোতে গল্প হারিয়ে না যায় । কারণ বাস্তবতাকে নির্মাতা যেভাবে ভাবেন আর বাস্তবতা যেভাবে ধরা পড়ে; এই দুই এর মধ্যে পার্থক্য থেকেই যায়। ফলে বাস্তবতা থেকে উপকরণ সংগ্রহের সময় গল্পবলার গতি পাল্টে যেতে পারে, চরিত্রও পাল্টে যেতে পারে অথবা নতুন কোন চরিত্র প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে। কিংবা নতুন কোন ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তখন এই নতুন বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে গল্পবলার জন্য কাঠামোকে পুনঃবিন্যাস করতে হয়। কাঠামোর সাথে নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গিও জড়িত থাকে। কাঠামো তাই এসময় নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গিকেও সক্রিয় রাখে।

০৪) সম্পাদনা পর্যায়:

সম্পাদনা পর্যায়কে বলা যায় চলচ্চিত্রের দেহ ও প্রাণ প্রতিষ্ঠার পর্ব।

এ পর্যায়ের কাজ শুরু হয় ফুটেজ বা সংগৃহীত উপকরণ থেকে গল্পবলার উপাদানগুলোকে আলাদা করার মধ্য দিয়ে। আলাদা করা উপাদানগুলোর মধ্যে পরস্পর সংযোগ তৈরি করে গল্পকে একটি কাঠামো ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এগিয়ে যেতে যেতে কখনো গল্প কাঠামোর ওপর ভর করে বসে, আবার কখনো গল্পবলার গতির ছন্দে এবং সম্পাদনার কৌশলের কারণে কাঠামোটি পুনঃবিন্যস্ত হতে থাকে। অন্যদিকে যা যা উপকরণ পাওয়া গেল, গল্পবলার জন্য সেগুলো যথেষ্ট থাকে না। তখন চলচ্চিত্রের কাঠামোর ভেতর নানা যায়গায় শূন্যস্থান তৈরি হয়। এই শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন করে গল্পবলার উপকরণ সংগ্রহ কিংবা তৈরি করা হয়।

গল্পবলার উপকরণগুলো যুক্ত হতেহতে একপর্যায়ে চলচ্চিত্রের কাঠামো পরিপূর্ণতা পায়। গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রের শরীর। এই শরীরের ভিতর দিয়ে তখন গল্প প্রবাহিত হতে হতে নানা মুড ধারণ করতে থাকে; মাথা নাড়ে, তাকায়।

আর গল্পের মুড যেখানে বাধা পায়, সেখানে কাঠামো পুনঃবিন্যস্ত হতে থাকে। এই মুডই হলো চলচ্চিত্রের প্রাণ। সম্পাদনার কৌশল ব্যবহার করে গল্পের মুডকে জাগিয়ে দেয়া যায়, বাড়িয়ে দেয়া যায়। এমনকি নতুন নতুন মুডও তৈরি করা যায় যা চলচ্চিত্রের গল্পবলার উপকরণে হয়তো আলাদাভাবে ছিল না। মুডের প্রবাহের মাধ্যমে গল্পটি চলচ্চিত্রের শরীরে গতির সঞ্চার করে। গল্পের এই গতি যখন চলচ্চিত্রের গতির বাইরে এসে দর্শককেও স্পর্শ করে, তখনই চলচ্চিত্রটি প্রাণ পায়, জেগে ওঠে।

প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে প্রাণ দেয়ার আরেকটি অনুষঙ্গ হলো সিচুয়েশন বা নতুন বাস্তবতা তৈরি করা। যে বাস্তবতায় প্রামাণ্যচলচ্চিত্রের চরিত্রগণ বিচরণ করেন, সেটা ঐ নির্দিষ্ট চরিত্রের বাস্তবতা। চরিত্রের এই বাস্তবতাকে যখন নির্মাতা তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে সাজান, ব্যাখ্যা করেন এবং চরিত্রের বাস্তবতার সাথে যখন বাস্তবতার অন্যান্য উপাদানের সম্পর্ক তৈরি করেন তখন এক নতু্ন বাস্তবতার জন্ম হয়। এই বাস্তবতা একইসাথে চরিত্রের বাস্তবতা হয়েও বেশি কিছু হয়ে ওঠে।

তিন অঙ্কের যৌক্তিক কাঠামো নয়, বরং যুক্তির বাইরে থাকা বাসনায় গড়া মুক্ত কাঠামোই পারে চলচ্চিত্রকে এই নতুন বাস্তবতায় পৌছে দিতে।

গল্পশেষে

মুক্ত কাঠামো চলচ্চিত্রের নতুন নতুন সম্ভাবনাকে কাঠামোর সূত্রে আটকে ফেলে না। মুক্তভাবে গল্পবলার প্রয়োজনে কাঠামোর ভেতরে নতুন নতুন স্পেস তৈরি করে দেয়, নির্মাতাকে প্রতি মুহুর্তে নির্মাণের স্বাধীনতা দেয়। সেইসাথে চলচ্চিত্রের হয়ে ওঠার আনন্দ দেয়।


লেখক : 

ফরিদ আহমদ

চলচ্চিত্র নির্মাতা


 

error: Content is protected !!