বিদ্রোহী শিশু : ক্রুফো – দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

শ্রেণিকক্ষে বাচ্চাদের হট্টগোল আর তা নিয়ন্ত্রনের চেষ্টায় ব্যর্থ শিক্ষকের হাল ছেড়ে  হতাশায় স্বগতোক্তি  “কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ফ্রান্স আগামি দশ বছরে?” -চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম একটি দৈববাণী। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ চলচ্চিত্রের এই দৃশ্যটি ধারণের সময়ের প্রায় দশ বছর পর, ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থানটি ঘটে।  সমাজের চলমান সকল নিয়ম-নীতি পরিবর্তনের দাবি নিয়ে স্টুডেন্টরা রাস্তায় নেমে আসে, অধিকাংশই বুর্জোয়া শ্রেণীর অবাধ্য অসন্তুষ্ট সন্তান, যারা দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজের ঐ ক্লাসরুমে চিত্রিত হয়েছিল।

 

The four hundred blows
দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য

এই সময়ে এসে দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না ১৯৬৮ সালের অভ্যুত্থানের শুরুটা হয়েছিলো দশ বছর আগে পর্দার ঐ শ্রেণীকক্ষে। এ চলচ্চিত্রের শিশুগুলো ডিকেন্সের উপন্যাসের সুবিধাবঞ্চিত এতিম শিশুদের মতো নয়। বরং তারা এমন একটা হৃদয়হীন শাসনব্যবস্থার শিকার যা প্রত্যেককে একেকটা আদর্শ নাগরিক তৈরির ছাঁচে গড়তে ক্রমাগত শক্তি প্রয়োগ করতে থাকে যে ছাঁচের প্রোডাক্ট হয়ে ওঠার কোন ইচ্ছা তাদের ছিল না। চলচ্চিত্রটিতে জ্য পিয়ের লিও অভিনিত ১৩ বছর বয়সী আন্তোয়ান দোয়ানেলই শুধু বিদ্রোহী ছিল না। বরং সকল বিদ্রোহীর মধ্যে সে বলির পাঠার মত, যার বিদ্রোহ-অবাধ্যকতা ধরা পড়তো এবং  সেজন্য শাস্তি পেতে হতো, যা তাকে আরো  আরো তীব্র বিদ্রোহের দিকে নিয়ে যায়। আরলেন ক্রস যথার্থ বলেছিলেন “দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ চলচ্চিত্রটি সর্বার্থেই স্বাধীনতা নিয়ে”

চলচ্চিত্রটির চরিত্র ও ঘটনাবলি গড়ে উঠেছে নির্মাতার প্রথম জীবনের উপর ভিত্তি করে। দোয়ানেলের মতো ক্রফোও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবেশে বড় হয়েছেন, দোয়ানেলের মতই একজন সৎ বাবা ছিল তাঁর, আর দুরত্ব ছিল মায়ের সাথে। দুরন্ত ক্রুফো স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখে সময় কাটাতেন। ১৯৪৮ সালে ক্রুফোকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়, এবং সেনাবাহিনী পরিত্যাগের পর ১৯৫১ সালে তাঁকে পাঠানো হয় মিলিটারি কারাগারে। সেখান থেকে ছাড়িয়ে এনে আদ্রে বাজা, ক্রুফোকে চলচ্চিত্র সমালোচনা ও নির্মানের পথে এগোতে সহায়তা করেন। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ অনিবার্যভাবেই ক্রুফোর পরিবারের প্রতি ভালবাসা ও তিক্ততার প্রকাশ।  ক্রুফো নিজেই একসময় বলেছেন ‘আমি আমার মা  এবং আমার বাবাকে সবসময়ই ভালোবেসেছি, কিন্তু আমার পিতামাতাকে নয়’।

দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ -এ কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনেতা নির্বাচনের জন্যে ক্রুফো ফ্রান্স-সোয়ের পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেন।  প্রায় চারশ’ আবেদনকারীর মধ্য থেকে জ্য পিয়ের লিও সবার মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে উঠে আসেন।  অভিনেত্রী চিত্রনাট্যকার দম্পতির সন্তান জ্য পিয়েররের  স্কুলজীবনও ছিল ক্রুফোর মতই গণ্ডগোলের।  এমন অবাধ্য-উচ্ছৃঙ্খল ছেলেকে কাজে নেয়া পুরোপুরি বৃথা লিখে ক্রফোকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন লিও’র স্কুলের হেডমাস্টার।  কিন্তু এ ত্রুটিগুলিই দোয়ানেল চরিত্রটির জন্যে জ্য পিয়ের লিও একেবারে নিখুত হয়ে দাঁড়ান। লিও পরবর্তীতে আরো চারটি ছবিতে ক্রফোর অল্টার ইগো দোয়ানেল চরিত্রে অভিনয় করেন।  লাভ অ্যাট টোয়েন্টি (১৯৬২), স্টোলেন কিসেস (১৯৬৮), বেড অ্যান্ড বোর্ড (১৯৭০) ,  লাভ অন দ্য রান (১৯৭৯)।  নোভেল ভাগের অন্যতম অভিনেতা হয়ে ওঠা  লিও শুধু ক্রফোর অল্টার ইগোই থাকেননি, তিনি ১৯৬৮ এর সমগ্র জেনারেশনের অল্টার ইগো হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

লিও শুধু চরিত্রটিতে রূপায়নে অভিনয়ই করেননি, চরিত্রটি পূর্ণাঙ্গরূপে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।  ক্রুফো স্মরণ করতে গিয়ে বলেন ‘আমার প্রাথমিক চিত্রনাট্যে আন্তোয়ান আরও ভঙুর ছিল, আরও বন্য কিন্তু কম আক্রমনাত্বক। লিও চরিত্রটিকে আরো সবল-সাহসী-ডানপিটে রূপ দিয়েছে’। সংশোধনাগারের সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে শিশু মনোরোগবীদের জেরার সম্মুখীন হয় দোয়ানেল, সেই দৃশ্যের অনেকাংশই ছিল লিওর ইমপ্রোভাইজেশন। কিছু ধারাবাহিক শটে টাইমল্যাপ্স আকারে ক্যামেরা সারাক্ষণ আন্তোয়ানের দিকে স্থির, কোন রিয়্যাকশন শট, কোন প্রশ্ন বা ভয়েসওভার ছিল না। (বলা হয়ে থাকে যে দৃশ্যটির জন্য যে অভিনেত্রী নির্ধারণ করা ছিল শুটিং এর দিন তিনি আসেননি।)। জেরার একপর্যায়ে আন্তোয়ান জানায় তার মা আন্তোয়ানকে অ্যাবর্শন করে ফেলতে চেয়েছিল কিন্তু শুধু তার নানীর জন্য পারেনি। রিচার্ড নোপার জবানে,

“আন্তোয়ান অবশ্যই তার জন্মসম্পর্কিত ঘটনার জটিলতা ও তার মায়ের স্বার্থপতার দ্বারা এফেক্টেড ছিল, কিন্তু অ্যাবর্শনের ঘটনা বলার পরই আন্তোয়ান জানায় তার যে বৃদ্ধা নানী তার জীবন বাঁচিয়েছিল সে তার টাকা   চুরি করেছে। এই বলে যুক্তিও দেওয়ার চেষ্টা করে, সে বৃদ্ধ, তার  টাকার খুব একটা প্রয়োজন নেই।  হঠাৎ দর্শকের সহানুভূতি দ্বিধার সম্মুখে পড়ে যায়, যে নানী তার জীবন বাঁচিয়েছে তার টাকাই চুরি করেছে এই অকৃতজ্ঞ ছেলেটি”।

চরিত্রটিকে শুধু অসহায়ত্বের শিকার সহানুভূতিযোগ্য হিসেবে না দেখানোয় একেবারে চূড়ান্ত বাস্তব একটি চরিত্র হয়ে উঠেছে। ক্রুফো, দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজকে সর্বেসর্বা একটা প্রতিবাদ হিসেবে নির্মাণ করেছেন।  চলচ্চিত্রটিতে যে শুধু আন্তোয়ান বিদ্রোহ করে নানা শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে, তা নয়। এ চলচ্চিত্রের পুরো প্রাকাশভঙ্গি-নির্মাণ সবকিছুই তৎকালীন  ফ্রান্সে প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্ররীতির বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ।

আর্টস এবং কায়ে দো সিনেমা’র  একজন সমালোচক হিসেবে ক্রুফো ত্রিশ-চল্লিশের দশকের মানসস্মত ঐতিহ্যপূর্ণ ধারায় নির্মিত সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্রগুলিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও কুখ্যাত সমালোচনাটি ছিল জ্য ডেলানয়ের লস্ট ডগস উইদাউট কলার (১৯৫৬) যা শিশু অপরাধিদের নিয়ে নির্মিত। ক্রুফো লিখেছেন “যদিও চলচ্চিত্রটি কোনভাবে ব্যর্থ নয়। নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম অনুযায়ী নির্মিত… কিছু ধারণকৃত দৃশ্য- এমন ব্যক্তির দ্বারা, যার স্পষ্টবাদী হওয়ার জন্যে পর্যাপ্ত মেধা নেই, আন্তরিক হওয়ার মত সততা নেই, যার ভান তাকে সরল হতে দেয় না, সেই ব্যক্তি জ্য ডেলানয় ।

এই সমালোচনার জন্য ক্রুফো এ চলচ্চচিত্রের নির্মাতার  থেকে আইনি নোটিশ পান।  ডেলানয় ফ্রান্সের তৎকালীন সময়ের অন্যতম সফল ও বিখ্যাত নির্মাতা ছিলেন।

ডেলানয়ের চলচ্চিত্রটি যারা দেখেছেন তাদের কাছে ক্রুফোর আক্রমণ অনেকটা অতিরঞ্জিত ও অপ্রয়োজনে নিষ্ঠুর মনে হতে পারে।  লস্ট ডগস উইদাউট কলার মানবিক ও বুদ্ধিদিপ্ত একটি কাজ, যা দক্ষভাবে লেখা, ভাল অভিনয়  ও সুন্দর দৃশ্যাবলিতে নির্মাণ করা হয়েছে।  চলচ্চিত্রের শুরুর দৃশ্যে একটি ছেলে দুর্ঘটনাক্রমে একটি শস্যাগারে  আগুন লাগিয়ে ফেলে , তার পাশাপাশি দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ এ দেখা যায় দোয়ানেল বালজাকের পোট্রেটের সামনে মোমবাতি জ্বালালে সেখান থেকে আগুন লেগে যায়।  দুটি একই বিষয় হলেও দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ এর তুলনায় ডেলানয়ের ছবির দৃশ্যধারণ ও সম্পাদনা অনেক অভিনব।  চলচ্চিত্র দুটি দেখলে আমাদের এটাও মনে হতে পারে ক্রুফো তার মেধার থেকে প্রতিহিংসা বেশি ছিল।

লস্ট ডগস উইদাউট কলার
দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ

কিন্তু সবকিছুর পরও একটি অপরাধ লস্ট ডগস উইদাউট কলার করেছে যা দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ করেনি।   শিশু অপরাধ ও পরিণতি অতিকরুণ আবেগে প্রকাশ করেছে যা প্রায় ডিকেন্সের চরিত্রগুলোর মতো।  চলচ্চিত্রটি শুধু একজন উচ্ছ্বন্নে যাওয়া শিশুর গল্প বলেনি, অনেকগুলো শিশুর আলাদা গল্প যাদের সকলকে বিখ্যাত তারকা জ্য গেবিন অভিনিত চরিত্র দয়ালু বিচারকের মাধ্যমে মিলিত করা হয়েছে, যে কিনা সম্পূর্নরূপে বুর্জোয়া শাসকের দয়ালু প্রতিনিধি।  লস্ট ডগস উইদাউট কলার হচ্ছে থার্ড পার্সনে নির্মিত একটি চলচ্চিত্র, যদিও বেশ উচ্চস্তরেরই। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ ফার্স্ট পার্সনে নির্মিত সর্বোৎকৃষ্ট একটি চলচ্চিত্র।

কায়ে দো সিনেমা যে চরম রূঢ় সমালোচনা শুরু করেছিল ৫০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে ক্রুফো এবং ডেলানয় উভয়ের চলচ্চিত্রকেই তার স্ব স্ব মেধার প্রেক্ষিতে বিচার করা সম্ভব। যদিও অই লেখাগুলো কিছুটা অস্বস্তিকর বটে, কিন্তু তৎকালীন চলচ্চিত্রে “মানের ঐতিহ্য” নিয়ে ক্রুফো যে বিতর্ক শুরু করেছিলেন তার সেখানেই সমাপ্তি ঘটেনি।  সিনেমার নতুন নির্মাণ কৌশল উদ্ভাবনে তা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ তার পূর্বসূরিদের চলচ্চিত্রের তুলনায় পেশাদার ও টেকনিক্যাল জায়গায় হয়তো ঘাটতি ছিল, ১৯৬২ তে রবার্ট বেনাওন বলেছেন  ‘ফরাসি নবতরঙ্গে একদল সমালোচক নিজের হাতে চলচ্চিত্র নির্মানের সাহস করেছিলেন, যেন অনেকটা চলচ্চিত্র নির্মান করতে পারে কিনা তা দেখার জন্যে চলচ্চিত্র নির্মাণ। তথাপি ক্রুফো নতুনভাবে সিনেমা নির্মানের জন্যে লড়াই করেছিলেন, ঠিক আন্তোয়ান যেমন করেছিলো নতুনভাবে বাঁচার জন্যে। এভাবেই দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ  আন্তোয়ান চরিত্রটির মতোই জটিল ও জীবন্ত হয়ে উঠে’।

১৯৫৯ সালের মে মাসে দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র নির্মাতা  হিসবে পুরস্কার লাভ করে, যে উৎসবে তার আগের বছরই ক্রুফোকে নিষিদ্ধ (সমালোচক হিসেবে)  করা  হয়েছিল। এই  বিজয় ক্রুফো, লিও ও নবতরঙ্গকে বিশ্বদরবারের সামনে নিয়ে আসে। ১৯৬৮ সালের মে মাসে ক্রুফো সেই একই চলচ্চিত্র উৎসব বন্ধে ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই কাবিক্য কিন্তু বিনষ্ট ছাত্র-আন্দোলনকে সংহতি প্রকাশের জন্য।

তার বন্ধু জর্জ কিয়েমান লিখেছেন, ‘আমি ক্রুফোকে দেখতে পাই, আলবার্ত দে মান এভিন্যুতে যারা পুলিশের হাতে মার খাচ্ছে তাদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য খরগোশের মতো দৌঁড়ে গিয়ে গাড়ির সাথে ধাক্কা খাচ্ছে । যখন তাকে আমার সামনে দৌড়াতে দেখেছি, দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজের সেই ছেলেগুলোর একজন মনে হয়েছে তাকে।  তখনই আমি বুঝে ফেলি, যত বয়স পর্যন্তই বেঁচে থাকুক মানুষটি সবসময় শিশুই থেকে যাবে’।


লেখাটি ডেভিড মেভিলে ২০১৪ সালে মেলবোর্ন  ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টভ্যালের ডোসিয়ারের জন্যে লিখেছেন।


অনুবাদকঃ জাহিদ হাসান

চলচ্চিত্র নির্মাতা


error: Content is protected !!