মৃত্যুর ওপারে জীবনের সন্ধান: ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য

এ কথা বলে খানিক নিরাপদে শুরু করা যায়, আব্বাস কিয়ারস্তামির চলচ্চিত্রজীবনে ‘টেস্ট অফ চেরি’র (১৯৯৭) শেষ দৃশ্য খানিক ব্যতিক্রম। তাঁর গোটা জীবনের কাজে বারবার বৃহত্তর ক্ষেত্রে সিনেমার সামগ্রিক শৈলী বদলে ফেললেও (যেমন ‘দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস’ (১৯৯৯) থেকে পরের ফিচার ফিল্ম, ‘টেন’ (২০০২), ‘শিরিন’ (২০০৮) থেকে পরের ফিচার ফিল্ম ‘সার্টিফায়েড কপি’ (২০১০) ইত্যাদি) একটি ফিল্মের মধ্যে আলাদা করে ‘চমক’ জিনিসটা তিনি প্রায় এড়িয়েই গেছেন। মেইন্সট্রিম ছবির শেষ দৃশ্যে টুইস্ট দেখায় অভ্যস্ত চোখে আমাদের খানিক অসুবিধে হয় ‘লাইফ অ্যান্ড নাথিং মোর’-এ আহমাদকে খুঁজে না পাওয়া দেখতে, ‘উইন্ড উইল ক্যারি আস’-এর শেষে গোটা ছবি যে কারণে অপেক্ষা করছে, সেই অথর্ব বৃদ্ধার মৃত্যুর পরেই হঠাৎ করে তাঁকে ছেড়ে ক্যামেরা (এবং আমাদের) চলে আসতে। কিয়ারস্তামি যে ধীর গতিতে ছবির ছন্দ ঠিক করেন, সেভাবেই প্রায় অমোঘ নিয়মে ছবির শেষ দৃশ্যে নিয়ে আসেন আমাদের – যেন দীর্ঘ কোনো কবিতা ক্রমশঃ ক্ষীণ হয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার, অথবা বিরাট কোনো সাম্রাজ্য-সভ্যতা ক্রমশঃ কালের নিয়মে ফুরিয়ে যাওয়ার অনুভব হয়।

টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য এ নজিরে উল্লেখযোগ্য একটি ব্যতিক্রম। শুধু কিয়ারস্তামির সিনেমা-জীবনেই নয়, বরং বিশ্ব-চলচিত্রের ইতিহাসেও এই পরিসমাপ্তি বেশ ‘চমকপ্রদ’। গোটা ছবিতে যেখানে একবারও কোনো ইঙ্গিত থাকে না যে ছবির শেষে দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করে দেওয়া হবে, এতক্ষণ যা দেখছিলেন তা নিছকই একটি বানানো, নির্মিত, কৃত্রিম বাস্তব – ক্যামেরা, সাউন্ড রেকর্ডার, শ্যুটিং ক্রু ইত্যাদি দিয়ে এই জটিল বাস্তবকে আসলে তিলতিল করে নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ গোটা ছবির একঘন্টা পয়ত্রিশ মিনিট যে ‘বাস্তব’কে আমরা দেখতে পাই, সেই বাস্তবের বিপ্রতীপে ভিন্নতর, বিকল্প একটি নির্মাণের বাস্তবের সম্ভাবনা রাখা হয় ছবির একেবারে শেষ দৃশ্যে, যখন ছবি শেষ হতে মাত্র চার মিনিট আর বাকি আছে। বলাবাহুল্য, ‘চমক’ এখানে গল্পের স্তরে নয়, বরং চলচ্চিত্র মাধ্যমটির বস্তুগত অবস্থানের স্তরে – যেখানে জ্যালজ্যালে, ঘষা, ডিজিটাল ইমেজে এতক্ষণ মৃত্যুর দিকে ধাবমান মি. বাদিকে আমরা হঠাৎ করে সিগারেট ধরাতে ধরাতে তাঁর পরিচালক আব্বাসের দিকে এগিয়ে আসতে দেখি। শ্যুটিং ক্রু সাউন্ড রেকর্ড করতে থাকেন, অল্পবয়সী জাফর পানাহিকে ক্যামেরা হাতে দেখা যায়। আর এতক্ষণ ছবিতে প্যারেড করতে দেখা কুর্দ সৈন্যের দলকে হেসেখেলে ক্যামেরার দিকে ফুল নাড়িয়ে আমোদ নিতে দেখা যায়, পিছনে লুই আমস্ট্রং-র অপার্থিব ‘সেন্ট জেম’স ইনফ্যামরি’ বেজে ওঠে।

 

Figure 1  টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য থেকে একটি ইমেজ

’৯৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শনের সময় শেষের এই দৃশ্য মূহুর্তে দর্শক-সমালোচকদের মধ্যে তীব্র বিপরীত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অনেকেই গোটা ছবির এই শান্ত, ধ্যানী মেজাজের মধ্যে শেষ দৃশ্যের চমক দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন; এই দৃশ্য এডিট করে বাদ দিলে বাকি ছবি অনেক নিঁখুত হবে, এমন কথা বলেছিলেন। আবার জোনাথন রোজেনবামের মত কিছু সমালোচক শুরু থেকেই এই দৃশ্যের পক্ষে ছিলেন, এমনকি আমেরিকায় এই ছবির মুক্তির সময় রোজেনবাম গুজব শুনেছিলেন যে কিয়ারস্তামি এ দৃশ্য কেটে দিতে পারেন, তাই সন্ত্রস্ত হয়ে তিনি চিঠি লিখে কিয়ারস্তামিকে অনুরোধ পর্যন্ত করেছিলেন এ দৃশ্য না কাটতে। এমনকী কিয়ারস্তামি স্বয়ং, তাঁর স্বাভাবিক কৌতুকপূর্ণ মেজাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ইতালির কিছু থিয়েটারে শেষ দৃশ্য বাদ রেখে ‘এক্সপেরিমেন্ট’ করছিলেন, দর্শকের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা দেখার জন্য।

বোঝাই যায়, মুক্তির সময় থেকেই, ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য প্রায় এনিগম্যাটিক হয়ে আছে; পক্ষে বা বিপক্ষে অনেক মতামত থাকার মতই এ নিয়ে বহু আলোচনা, বহু লেখালেখি হয়েছে। ছবি’র প্রথম মুক্তির প্রায় ২৩ বছর পরে আজকে, আমার এ লেখায় আমি ভুলেও এমন দাবী করছি না যে সমস্ত আলোচনা ছাপিয়ে নতুন কোন কথা আমি এ বিষয়ে বলতে চাইব। কিন্তু কোভিড-১৯ আক্রান্ত লকডাউন-বদ্ধতার সময়ে, যখন জীবনের সমস্তকিছুর অভিজ্ঞতা আমাদের কাছে বাকি ‘স্বাভাবিক’ সময়ের থেকে অনেকটাই বদলে গেছে, তখন প্রচলিত, সিনেমাটিক অর্থের বাইরেও ‘টেস্ট অফ চেরি’র এই শেষ দৃশ্য আমার জন্য কিছু বিশেষ অর্থ বহন করে আনে – তাই আমি কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করব। কিন্তু ব্যক্তিগত সে আলাপে যাওয়ার আগে প্রয়োজন হবে সিনেমা নিয়ে কিছু আধাতাত্ত্বিক আলোচনা করা, কারণ সে ছাড়া ব্যক্তিগত এ সংলাপে যাওয়া এ দৃশ্যের সাপেক্ষে আমার পক্ষে খানিক অসম্ভব। আর দিনের শেষে তত্ত্বও তো ব্যক্তিগত, দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।

 ‘টেস্ট অফ চেরি’ গোটা ছবিটিই, আমি ধরে নিচ্ছি, সবাই দেখেছেন, অযথা গল্প বা দৃশ্য বর্ণণার দিকে আমি যাব না। মি. বাদি ইরানের তেহরান শহর থেকে একটু দূরে পাহাড়ী অঞ্চলে একজন মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন আত্মহত্যা করার পর তাঁর কবরে মাটি ফেলার জন্য – সামান্য এই তুচ্ছ গল্প থেকে কিয়ারস্তামি কী অসামান্য শিল্প নির্মাণ করেছেন, তা সবাই জানেন। ছবির শেষ দৃশ্যে বাদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে কবরে গিয়ে শুয়ে পড়ার পর পর্দা জুড়ে অপার্থিব সে অন্ধকার নেমে আসার কথাও আশা করি সবাই মনে করতে পারছেন, যে অন্ধকারের পরেই আমাদের আলোচ্য শেষ দৃশ্যটি শুরু হয়। এ লেখার শুরুতেই তার বর্ণণা দিয়েছি, তাই এখানে সরাসরি এ দৃশ্যের শৈল্পিক ঘরানা প্রসঙ্গে দু কথা বলার চেষ্টা করি।

 

Figure 2 পর্দা জুড়ে নেমে আসা সেই অপার্থিব অন্ধকার: বাদি কবরে শুয়ে আছেন

শিল্পে, সাধারণত ন্যারেটিভ শিল্পে (উপন্যাস, নাটক, সিনেমা; যেখানে প্রধাণত ‘গল্প’র একটা অবলম্বন থাকে) গল্প বলতে বলতে চকিতে, প্রকট বা প্রচ্ছন্নভাবে গল্পের বাস্তব থেকে গল্প বলার, গল্প তৈরী করার বাস্তবে চলে আসার রীতি ইতিহাসে দীর্ঘদিন থেকেই চলে আসছে। ভারতবর্ষের আদি কথকতার ধারা যেমন একইদিকে গল্প এবং গল্প বলার বাস্তব – এই দুইকেই ধরে রাখত, তেমনই কালিদাসের নাটকেও আমরা আধুনিক অর্থে ‘ফোর্থ ওয়াল’ ভেঙে দর্শককে সরাসরি সম্মোধন করে নাটক শুরু করার, নাটক চলতে চলতে দর্শকের সাথে কথা বলার অনেক উদাহরণ পাই। আসলে, আঠারো-উনিশ শতক থেকে পশ্চিম ইউরোপীয় বাস্তববাদের ধারণা যখন হেজিমনি হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে থেকে গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি আলাদা পৃথিবী বলে দেখতে থাকার অভিজ্ঞতা শুরু হয়। তখন থেকেই শিল্পের পৃথিবী আর পাঠক/দর্শকের পৃথিবীর মধ্যে প্রসেনিয়ামের উচ্চতা কিংবা ছাপা বইয়ের দূরত্ব সক্রিয়, স্পষ্ট দুটি আলাদা জগৎ তৈরী করে; তার আগের শিল্প জগতে এহেন দ্বিবিধ বাস্তবকে পাশাপাশি রাখার ঘটনা খুব একটা ব্যতিক্রম বলে গণ্য হত না। অর্থাৎ বিংশ শতকের আধুনিকতাবাদ (মডার্নিজম) পশ্চিম ইউরোপীয় বাস্তববাদের ‘বিভ্রম’ (ইলিউশন) সৃষ্টির যে ভূতের সঙ্গে লড়াই করে, বাস্তববাদ পূর্ব পৃথিবীতে সে ভূতের এমন কিছু অস্তিত্ব ছিল না, তখন একই সাথে কথকের গল্প বলার ঘটনা এবং গল্পের নিজস্ব ঘটনাকে দর্শক শ্রোতা সহজেই এক করে দেখতে পারতেন।

 

Figure 3 বের্টোর্ল্ড ব্রেখট

আঠারো-উনিশ শতক থেকে পশ্চিম ইউরোপীয় বাস্তববাদের যে হেজিমনির ধারণা তৈরী হয়, তাকে আক্রমণ করে শিল্প আর দর্শকের মাঝের ক্রমবর্দ্ধমান দূরত্বকে ঘুচিয়ে দেওয়ার কথা বিশ শতকের দোড়গোড়ায় যে কজন সবচেয়ে তীব্রভাবে বলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জার্মান শিল্পী বের্টোল্ড ব্রেখট অন্যতম উল্লেখযোগ্য। ব্রেখটের বাস্তববাদের বিভ্রমের প্রতি রাগের নানা কারণের অন্যতম ছিল, দর্শক থেকে বিচ্ছিন্ন প্রসেনিয়ামের উচ্চতায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘বাস্তব’জগৎ সৃষ্টিকারী নাট্যপ্রক্রিয়া আসলে দর্শকের চিন্তাভাবনার প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে শুধুই বিভ্রম, মায়াবাস্তব তৈরী করতে চায় যা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্য যথার্থ। মঞ্চের নাট্য স্বতন্ত্র জগৎ তৈরী করে আসলে শুধুই বিভ্রম তৈরী করতে চায়, যেখান থেকে তাকে বের করে আনার জন্য দরকার ‘ফোর্থ ওয়াল’ ভেঙে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা। (মঞ্চের তিনদিকে তিন দেওয়াল, আর সামনে দর্শক আর অভিনেতাদের মাঝে যেন অদৃশ্য চতুর্থ দেওয়াল) ব্রেখট একে বলতেন ‘ভারফ্রামদুং’ – জার্মান শব্দ, যা ইংরেজীতে ‘ডিসট্যান্স’ এবং ‘এলিয়েনেশন’ – এই দুই শব্দের মিলিত অর্থ বহন করে। অর্থাৎ মঞ্চের মায়াবাস্তবের বিভ্রমে ভুলে না থেকে দর্শককে মঞ্চ থেকে দূরত্ব তৈরী করে, শুধুই বিনোদনের পরিবর্তে মঞ্চের নাট্যের প্রতি সমালোচনামূলক চিন্তার জগৎ তৈরী করা, এই ছিল ব্রেখটের উদ্দেশ্য। ‘মাদার কারেজ’, ‘গ্যালিলিও’ ইত্যাদি নানান জগৎবিখ্যাত নাটকে নানান কৌশল ব্যবহার করে ‘ভারফ্রামদুং’ এফেক্ট সৃষ্টি করে ব্রেখট তৈরী করে গেছেন ‘সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি’; অর্থাৎ একটি শিল্প কর্মের নিজের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে আত্মসচেতনতা।

 

Figure 4 ক্যামেরার দিকে চেয়ে অভিবাদন করছেন জর্জ মেলিয়ে The Prince of Magicians (1901)

অন্যান্য শিল্পের মতই চলচ্চিত্রের জন্মকালেও কথকতা-সদৃশ দুই বাস্তবকে পাশাপাশি রেখে কাজ করার নিদর্শন আমরা শুরু থেকেই পাই। তাত্ত্বিক ভাষায় যাকে ‘আর্লি সিনেমা’ বলা হয়, অর্থাৎ ১৮৯৫’র ডিসেম্বরে লুমিয়ে ভাইদের প্রথম ব্যবসায়িক-পাবলিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের দশ-বারো বছর পরবর্তী সময়ে, এরকম অজস্র ছবি হয়েছে যা সরাসরি দর্শককে স্বীকার করে, তাঁকে সম্মোধন করে, ‘ফোর্থ ওয়াল’ ভেঙেই বানানো। ফরাসি জাদুকর এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্জ মেলিয়ে’র অজস্র কাজে আমরা এ নিদর্শন দেখতে পাই। বলা ভালো, আঠারো উনিশ শতকের বাস্তববাদের মতই সিনেমায় বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের আগে সক্রিয় ভাবে কোনো ‘বাস্তবজগৎ’ তৈরী করা যায়নি, যা কিনা পশ্চিম ইউরোপীয় বাস্তববাদী উপন্যাসের মত স্বয়ংক্রিয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ বাস্তবতার জগৎ তৈরী করবে। অর্থাৎ আপাতভাবে ১৯১৭ সালের সময় থেকে অ্যামেরিকান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যখন হলিউড নামে নিজেকে বেঁধে নিতে শুরু করে, তখন সিনেমার এই নির্দিষ্ট বাস্তববাদী ফর্মটাই হেজিমনি হয়ে যায়। তার আগে, চ্যাপলিনের ‘কিড অটো রেসেস অ্যাট ভেনিস’ (১৯১৪) ছবিতে আমরা ক্যামেরার অস্তিত্ব স্বীকার করে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে দর্শকের উদ্দেশ্যে মজা করতে দেখেছি, বাস্টার কীটন ‘ওয়ান উইক’ (১৯২০) ছবিতে নায়িকার স্নানের দৃশ্যে নগ্নতা আড়াল করতে ক্যামেরার সামনে হাত দিয়ে ঢেকে দিয়ে মজা করেছেন।

 

Figure 5  বারবার ক্যামেরার সামনে চলে এসে ক্যামেরাকে অভিবাদন জানাচ্ছেন চার্লি অভিনীত ট্র্যাম্পের চরিত্র
Figure 6 স্নানের দৃশ্যে নায়িকার নগ্নতা এড়াতে হাত এসে ঢেকে দিচ্ছে ক্যামেরা

 

ফোর্থওয়াল ভেঙে এহেন ছুটকো-ছাটকা মজা-হাসির মাঝেই ১৯২৯ সালে, সম্ভবত প্রথম, খানিক ব্রেখটের মতই ইলিউশন ভেঙে গল্প বলার বাস্তবতাকে সিনেমায় রাজনৈতিকভাবে তীব্র শক্তিতে ব্যবহার করেন ব্রেখটেরই সমকালীন, সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার জিগা ভের্তভ, তাঁর ‘ম্যান উইথ দ্য মুভি ক্যামেরা’ (১৯২৯) নামের ছবিতে। বারবার করে বাস্তব ছবি এবং ক্যামেরা দিয়ে সেই বাস্তবকে তোলার প্রক্রিয়া – ভের্তভ অসংখ্য বার এই দুই দান্দ্বিক প্রক্রিয়াকে পাশাপাশি দর্শকের সামনে নিয়ে আসেন – বলা যায় সিনেমার ইতিহাসে ফোর্থ ওয়াল ভেঙে এই ধরণের সেলফ রিফ্লেক্সিভিটির তীব্র রাজনৈতিক প্রয়োগ সেই প্রথম।

Figure 7  ইমেজ এবং তার নির্মাণ প্রক্রিয়া। পাশাপাশি এই দান্দ্বিক প্রক্রিয়া সারাক্ষণ ভের্তভের ছবি জুড়ে চলে।

 

পঞ্চাশ-ষাটের দশকে সারা বিশ্বে যখন ‘নতুন সিনেমা’র জন্ম হচ্ছে, ফ্রান্সের ‘নিউ ওয়েভ’র নামে নাম মিলিয়ে ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকার অজস্র দেশে যখন ‘নতুন সিনেমা’ তৈরী করছেন নতুন শিল্পীরা, তখন এই ফোর্থ ওয়াল ভেঙে সেলফ রিফ্লেক্সিভিটির ঘটনা সিনেমার ইতিহাসে নতুন এক মাত্রা পায়। ইউরোপে জঁ লুক গোদার একই সাথে ব্রেখট এবং জিগা ভের্তভকে আত্মীকরণ করে সিনেমার সেলফ রিফ্লেক্সিভিটিকে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দেন (‘ভিভরে সা ভি’ (১৯৬২), ‘লা মেপ্রি’ (১৯৬৩), ‘লা শিনোয়াজ’ (১৯৬৭), ‘তু ভা বিয়া’ (১৯৭২) সহ গোদারের মধ্যপর্বের প্রায় সব ছবি), ইঙ্গমার বার্গম্যানের কিছু ছবিতে (‘পার্সোনা’ (১৯৬৬), ‘আওয়ার অফ দ্য উলফ’ (১৯৬৮), ‘এন প্যাশন’ (১৯৬৯) ইত্যাদি), এশিয়ায় মৃণাল সেনের মধ্যপর্বের বিখ্যাত কলকাতা ত্রয়ী ইত্যাদি ছবিতে বারবার চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরে গল্পের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়াটিকেই চলচ্চিত্রের মূল বিষয় করে তোলা হয়। অনেকটা ব্রেখটের মতই এই প্রক্রিয়া অনেকটা রাজনৈতিক কারণে; যে রাজনীতি কখনও ষাটের দশকের উত্তাল বাস্তব পৃথিবী বদলে যাওয়ার রাজনীতিই হোক বা সিনেমার ফর্মে, অভিনেতা-ইমেজ ইত্যাদি সংক্রান্ত রাজনীতি বোঝাতেই হোক – সিনেমায় ফিরে ফিরে আসে।

Figure 8  জঁ লুক গোদারের লা মেপ্রিঃ দর্শকের মুখোমুখি ক্যামেরা

 

Figure 9 ম্যাক্স ভন সিডো তাঁর চরিত্র নিয়ে বার্গম্যানের সাথে কথা বলছেনঃ এন প্যাশন

কিয়ারস্তামি থেকে দীর্ঘ বাঁক নিয়েছিলাম আমরা – আবার কিয়ারস্তামিতে ফিরব। এত কথা বলার একটিই উদ্দেশ্য – ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্যের ফোর্থ ওয়াল ভেঙে সেলফ রিফ্লেক্সিভিটির এই নজির ঘরানার দিক থেকে ব্রেখট-গোদার ঘরানায় সহজেই ফেলা যায়। অর্থাৎ গল্প বলতে বলতে গল্পের বাস্তব ছাপিয়ে কিয়ারস্তামি শেষ মূহুর্তে গল্প বলার বাস্তবে চলে গেলেন, কিন্তু, এখানে প্রশ্ন আসে, ‘টেস্ট অফ চেরি’র গল্পে  এর ফলে কী বিশেষ মাত্রা যোগ হল, যে মাত্রা, ধরা যাক, মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭০) -র মধ্যপর্বের সেলফ রিফ্লেক্সিভিটিতে অর্জিত হয়।

Figure 10 রঞ্জিত মল্লিক ‘ইন্টারভিউ’ ছবিতে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন

ইন্টারভিউ’র সেই বিখ্যাত দৃশ্যের কথা সবাই জানেন, যেখানে রঞ্জিত মল্লিক ট্রামে চলতে চলতে সিনেমার ম্যাগাজিনে নিজের প্রকাশিত ছবি আর সেই সংক্রান্ত কিছু সহযাত্রীর তীব্র কৌতুহলে বিরক্ত হয়ে শেষমেশ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলে ফেলেন, তিনি রঞ্জিত মল্লিক, মৃণাল সেন নামের এক ভদ্রলোক ক্যামেরা নিয়ে যাঁর পিছনে তাড়া করেছেন। তাঁর মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা করুণা বন্দোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র ইমেজ দেখতে পাই আমরা, তার সাথে চিত্রগ্রাহক কে কে মহাজন ভিড় ট্রামে শ্যুট করছেন। আমরা বুঝতে পারি, ‘ইন্টারভিউ’ ছবিটি এতক্ষণ গল্পের অভ্যন্তরে, ‘ডায়জেটিক’ বিশ্বে যে নিজস্ব, স্বতন্ত্র জগৎ তৈরী করেছিল, রঞ্জিত মল্লিক ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা শুরু করতেই সে জগৎ ভেঙে যায়, আর তার বিপ্রতীপে প্রায় একস্ট্রা-ডায়জেটিক, দান্দ্বিক জগৎ তৈরী হয় যা আগের গল্পের সঙ্গে দন্দ্বের সম্পর্কে বেশ খানিকটা রাজনৈতিক বিপ্রতীপে অবস্থিত। অর্থাৎ, গল্পটি যদি ‘ফিকশন’ হয়, বানানো, তাহলে এই অংশটি সেই বানানোর প্রক্রিয়া, ‘নন-ফিকশন’ – দর্শকের সাথে এর সম্পর্ক সংযুক্তি, বিভ্রমের নয়, বরং ‘ভারফ্রামদুং’ – বিযুক্তি, ধাক্কার। ডায়জেটিক গল্প চলতে চলতে ধাক্কা খেয়ে আমরা যেন খানিক চমকে উঠি, গল্পের সাথে সংযুক্ত আবেগ ছিটকে উঠে বুদ্ধিমত্তা, ‘ইন্টেলেক্ট’ দিয়ে দর্শকের কাছে আবেদন রাখে। বানানো বাস্তবের কলকব্জা দেখিয়ে দিয়ে ব্রেখটিয়ান এই পদ্ধতি দর্শককে যেন হৃদয় থেকে মস্তিষ্কের পথে চালনা করে, এতক্ষণের গল্পের ‘সত্যি’র যে দাবী, তাকে ছিন্ন করে নির্মাণের কলকব্জার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বলা বাহুল্য, প্রতিটি আলাদা আলাদা ফিল্মের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির অভিঘাত এবং অর্থ বদলে বদলে যায় – তবুও, বহু সেলফ রিফ্লেক্সিভ ফিল্ম দেখে দেখে আমরা মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি – ফোর্থ ওয়াল ভাঙা অনেক অংশেই যেন গল্পের বাস্তবতা থেকে সেই বাস্তবতার কৃত্রিমতার দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরায়। অর্থাৎ, পর্দার ঘটমান বর্তমান যদি একটি বাস্তব হয় (ফিল্মের ইমেজ যে বাস্তবতার ‘ট্রুথ-ক্লেম’ করে) – তাহলে সেলফ রিফ্লেক্সিভ অংশ গুলো যেন সেই বাস্তবনির্মাণের প্রক্রিয়ার বর্ণণা, যা গল্পের ‘বাস্তব’ থেকে নির্মাণের ‘কৃত্রিমতা’য়, গল্পের ‘জীবন’ থেকে গল্প নির্মাণের কারখানায় আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। যে মূহুর্তে ইন্টারভিউয়ের রঞ্জিত গল্পের বাইরে নিজের পরিচয় দেন, গোদারের ‘টু অর ত্রি থিংস আই নো অ্যাবাউট হার’ বা ‘লা শিনোয়াজ’ ছবিতে অভিনেতারা অভিনীত চরিত্রের নাম বলে তারপরেই নিজের আসল নাম বলেন – তাতে করে বোঝা যায় আমরা পাশাপাশি এই বাস্তব আর কৃত্রিমতা দেখছি, নির্মিত জীবন আর নির্মাণের কারখানা দেখছি। ব্রেখটিয়ান সেলফ রিফ্লেক্সিভ চলাচল যেন তাই এক অর্থে বাস্তব থেকে কৃত্রিময়তার দিকে যাত্রা, যা দিনের শেষে ভিন্নতর, বৃহত্তর একটি ইন্টেলেকচুয়াল অভিজ্ঞতার দিকে আমাদের নিয়ে যায়।

 

Figure 11 ‘টু অর থ্রি থিঙস আই নো অ্যাবাউট হার’এ চরিত্র আর অভিনেতার নাম পাশাপাশি

 

এখানেই, ‘টেস্ট অফ চেরি’, আমার মতে ব্রেখটিয়ান সেলফ রিফ্লেক্সিভ শিল্পের ইতিহাসে একটি অনন্য, ব্যতিক্রমী এবং আশ্চর্য নিদর্শন – যেখানে ব্রেখটিয়ান ডিভাইসে আমাদের হৃদয় থেকে মস্তিষ্কে, আবেগ থেকে ইন্টেলেক্টে নিয়ে আসার পরিবর্তে; বাস্তব থেকে কৃত্রিমে, জীবন থেকে কারখানায় নিয়ে আসার পরিবর্তে – আরও বেশী জীবনে, আরও বেশী বাস্তবে এবং আরও বেশী আবেগের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ আন্দ্রে বাঁজা অরসন ওয়েলসের ‘সিটিজেন কেন’ (১৯৪১) সম্পর্কে যে কথা বলেছিলেন, – ‘The novelty of (cinematic) language, … must be understood from the point of view of style, not from the point of view of vocabulary or syntax.” – ‘টেস্ট অফ চেরি’র জন্য এ কথা যেন হাড়ে হাড়ে সত্যি। সিনেমার ভাষার একটি ‘ডিভাইস’ – ‘সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি’ – তা কিয়ারস্তামির হাতে পড়ে যেন পুনর্জন্ম নেয়, ‘ভোকাব্যুলারি’ এক থেকেও যেন ব্যবহারের দক্ষতায়, স্টাইলের নিরিখে প্রায় বৈপ্লবিক বদল ঘটে। যে ভোক্যাবুলারি সাধারণত বাস্তব থেকে কৃত্রিমতায় নিয়ে আসতে ব্যবহৃত হয়, কিয়ারস্তামি তাকেই যেন আরও বেশী বাস্তব, আরও বেশী জীবনের দিকে ঠেলে দেন। কিভাবে? তা নিয়ে কিছু কথা বলেই আমি এ লেখার ইতি টানব।

মনে রাখা দরকার, ‘টেস্ট অফ চেরি’ ছবিটি এক অর্থে মৃত্যু দ্বারা প্রায় ‘হন্টেড’। শিল্পের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত তাকেই ‘হন্ট’ করা বলি, যা সরাসরি গল্পের উপরিতলে নেই, অথচ উপরিতলের ঠিক তলায় ফল্গুধারার মত সর্বক্ষণ বয়ে গিয়ে উপরিতলকে সারাক্ষণ তার উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছে। উদাহরণস্বরূপ মাইকেল হ্যানেকের ‘ক্যাশে’ (২০০৫) ছবির নাম করা যায়, যেখানে সিন নদীর গণগত্যার ইতিহাস ছবির উপরিতলে আসার আগে গল্পের তলায় তলায় হন্ট করে গেছিল সর্বক্ষণ। একইরকম, আব্বাসের এ ছবির ইরান যুদ্ধ দ্বারা, মৃত্যু দ্বারা, ইতিহাস দ্বারা হন্টেড – যা তিনি প্রকাশ করেন তীব্র শৈল্পিকভাবে, ছবির নায়ক ‘বাদি’র আত্মহত্যা করার কোন কারণ দর্শককে জানতে না দিয়ে। অর্থাৎ ‘টেস্ট অফ চেরি’তে আমরা একটা গোটা ছবি দেখি যেখানে গল্পের নায়ক আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে – কিন্তু কেন যাচ্ছে সে কথা কিয়ারস্তামি আমাদের জানান না। এই অত্যন্ত জরুরি বিষয়টি আড়াল করে দেওয়াতেই নায়কের ব্যক্তিগত মৃত্যুচেতনা যেন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং মহাকাব্যিক হয়ে যায় – গল্পে উপরিতলে যে মৃত্যুর কোন কারণ থাকে না সেই মৃত্যু গোটা সময় হন্ট করতে থাকে আমাদের।

Figure 12 মৃত্যুর মুখোমুখি বসে আছেন বাদী

বাহমান ঘোবাদি, মহসেন মখমলবাফ, কেওয়ান কারিমি বা জাফর পানাহি’র ছবির ইরানে আমরা দেখেছি, ইরান কিভাবে মৃত্যুপুরী হয়ে উঠতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নিরন্তর শোষণ, সঙ্গে ধর্মকেন্দ্রিক প্রায় মৌলবাদী সমাজব্যবস্থার কঠোর নিয়মানুবর্তিতার ইরানে যেখানে ফিল্ম বানাবার জন্য শিল্পীকে চাবুক খেতে হয়, কাউকে নিজগৃহে নির্বাসনে থাকতে হয় কুড়ি বছর – আব্বাস কিয়ারস্তামি সেই ইরানের ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের সামনে দাঁড়িয়ে ‘বাদি’র মত এক নিউরোটিক ব্যক্তির কথা বলবেন, তা তো স্বাভাবিক। আর আরও স্বাভাবিক, তিনি বাদি’র মৃত্যুর কারণকে গল্পের উপরিতল থেকে সরিয়ে দেবেন, যাতে উপরিতলকে সর্বক্ষণ হন্ট করে যেতে পারে ফল্গুধারার এই রক্ত, হত্যা আর শোষণের ইতিহাস। একক ব্যক্তির গল্প সর্বজনীন হয়ে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং মহাকাব্যিক হয়ে যায় এভাবে, আগেই বলেছি।

এখানেই আসে ছবির শেষ দৃশ্য। এহেন হন্টেড গল্পের শেষে, আমরা দেখেছি সব আলো নিভে যায়, ‘থাকে শুধু অন্ধকার’ – ছবির শেষে প্রায় শূন্য়তায়, অন্ধকারে, সাবলাইম প্রায় একমিনিটের অন্ধকার আমরা দেখি যেখানে ক্রমশঃ বৃষ্টি আর মেঘের শব্দ ফিকে হয়ে আসে – অন্ধকার ভেদ করে জ্যালজ্যালে, ঘষা ইমেজ ফুটে ওঠে – ব্রেখটিয়ান সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি। ফোর্থ ওয়াল ভেঙে আমরা দেখি আব্বাস ছবি বানাচ্ছেন।

Figure 13 আব্বাস ছবি বানাচ্ছেন

কিন্তু, কী ম্যাজিকে, এতক্ষণের মৃত্যু ছাপিয়ে, আব্বাসের কন্ঠে সাউন্ড রেকর্ডিং-র ডাক শুনতে শুনতে, কুর্দ সৈন্যের পোশাকে যুবকদের হাসি, ফুল আর হাওয়ায় ভেসে যাওয়া গাছ দেখতে দেখতে, ঘষা ভিডিও ইমেজে চটুল হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা দেখতে দেখতে আমাদের মনে হয় – আরে, এতক্ষণ হন্ট করে যাওয়া মৃত্যু ছাপিয়ে, এতক্ষণ দম আটকে আসা বাদি’র কষ্টের না বলা ঐতিহাসিক দ্যোতনা ছাপিয়ে – এর চেয়ে বড় জীবন কী আর কোথাও আছে? আব্বাস যেন এই সেলফ রিফ্লেক্সিভ শটগুলোয় এতক্ষণের মৃত্যু ছাপিয়ে এই গভীর, সাবলাইম, প্রায় ইথারাল একটি জীবনের কথা বলেন, যে জীবনের কথা ইরানের মত মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়ে, এই প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা, ভায়োলেন্স আর শোষণের মাটিতে দাঁড়িয়েই একমাত্র বলা যায়।

অর্থাৎ এতোক্ষণের মৃত্যু দ্বারা হন্টেড ফিল্মের গল্প বলে তিনি যেই প্রক্রিয়াগত কৃত্রিমতার সেলফ রিফ্লেক্সিভ ছবি দেখালেন, সেইমাত্র যেন ব্রেখটিয়ান এই ডিভাইসটির অনন্য প্রয়োগে নতুনতর জীবনের স্বাদ পেলাম আমরা – যে স্বাদ বলে, এইখানে, এই মৃত্যুপুরীতেই জীবন রয়েছে – এই যে ছবি করতে পারছেন আব্বাস – এই তো জীবন। হাওয়ায় ভেসে চলেছে গাছ, ক্যামেরা শব্দযন্ত্রে কাজ চলছে কারখানার, লুই আমস্ট্রং-র প্রায় সেনসুয়াল স্যাক্সোফোনের সাথে সাথে সৈন্যপোশাকের কোন যুবক ক্যামেরার দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন একগোছা ফুল – জীবন কী এর চেয়েও সুন্দর হতে পারে? চলচ্চিত্রের এই কারখানাতেই কি জীবনের সন্ধান নেই? অর্থাৎ মূল চলচ্চিত্রের মৃত্যু দ্বারা হন্টেড বাস্তব ছাপিয়ে আমরা যেই নির্মাণের কারখানায় প্রবেশ করি, তখনই যেন জীবনের জন্ম হয় – ইরানের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিছক ছবি বানিয়ে যাওয়ার ঘটনাটিই জীবনের সবচেয়ে বড় দ্যোতক হিসেবে উঠে আসে।

আশা করি বোঝা যাচ্ছে, কেন ছবির এই শেষ দৃশ্যটি মূল ছবির খাতিরে এতখানি প্রয়োজনীয়। একে বাদ দিয়ে ফেলার অর্থ শুধুমাত্র ছবিটিকে বাস্তববাদী ঘরানায় স্বয়ংসম্পূর্ণতায় আবদ্ধ করে ফেলাই নয়; বরং মৃত্যু শেষে জীবনের পথে যাত্রাকে অস্বীকার করা। এই দৃশ্যটি ছাড়া ছবিটির এই সাবলাইম উচ্চতা সম্ভব হত না, যেখানে ইরানের মাটিতে দাঁড়িয়েই জীবন খুঁজে পাওয়ার এই অনন্য রাজনৈতিক স্টেটমেন্টটি কিয়ারস্তামি করতে পারেন। তাই ব্রেখটিয়ান ডিভাইস প্রয়োগের সাধারণ নিয়মের প্রায় ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে গিয়ে জীবনের এই সন্ধান করতে পারা, আমার কাছে শিল্প হিসেবে তুরীয়, বৈপ্লবিক এবং অনন্য একটি নজির রাখে। বিংশ শতক শুরুর সামান্য আগে জন্ম হয়েছিল সিনেমার – আর একবিংশ শতক শেষের ঠিক আগে ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য আমার কাছে ফিল্মের ভাষার সাপেক্ষে একটি মৌলিক স্টেটমেন্ট (ব্যাটলশিপ পোটেমকিন (১৯২৫), সিটিজেন কেন (১৯৮১), ব্রেথলেস (১৯৫৯), লাভেন্তুরা (১৯৬০) ইত্যাদি ছবির মত) – যা শিল্প ছাপিয়ে সবশেষে জীবনের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রায় ইথারাল সুন্দর একটি ডাক দেয়। সিনেমার ইতিহাসকে প্রায় এক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়েছে এই ডাক শোনার জন্য।

 

‘Digital was the definition of freedom (in the process of filmmaking) for me’
Abbas Kiarostami

চলচ্চিত্রে উৎসাহী অনেকেই জানেন, একবিংশ শতকের সূচনাতেই চলচ্চিত্র নির্মানের প্রযুক্তিগত দিকে বড়সড় একটি পরিবর্তন ঘটে, যেখানে সেলুলয়েডের বদলে প্রথম ডিজিটালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। চলচ্চিত্রে ইতিহাসে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নতুন কিছু না – কিন্তু সেলুলয়েড থেকে ডিজিটাল এক অর্থে সিনেমার মূলগত নির্মাণেরই যেন এক পরিবর্তন – যেখানে কাঁচামাল, অর্থাৎ র’স্টক ফিল্ম, যেখানে আলো খোদাই হয়ে ইমেজের জন্ম হয়; তা পরিবর্তিত হয়ে ডিজিটালে বাইনারি ল্যাঙ্গোয়েজের মাধ্যমে ভিন্ন প্রযুক্তিতে ইমেজ নির্মিত হয়। পৃথিবীখ্যাত নানান পরিচালক এই বদলকে অস্বীকার করেছেন, তার একটি কারণ যেমন সেলুলয়েড ইমেজের ডেপথ এবং গভীরতা ডিজিটালে আসে না, তেমনই সেলুলয়েডের প্রায় অর্গানিক, ইনডেক্সিকাল ধরণের ইমেজ দার্শনিকভাবে অনেক শিল্পীর জন্যই কাজ করার জরুরি একটি প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।

সেলুলয়েডের কুলীনতা এবং মানের বিপ্রতীপে ডিজিটালের পক্ষে একটিই বোধহয় বক্তব্য আছে – যা অত্যন্ত জরুরি – ডিজিটাল ইমেজ নির্মাণের সহজলভ্যতা। অর্থাৎ একটি সেলুলয়েড ক্যামেরায় ফিল্মে ইমেজ তুলে তাকে প্রসেস করে এডিটিং মেশিনে এডিট করে শব্দ যোগ করে যে দীর্ঘ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পদ্ধতিতে ছবি বানাতে হয়, তার বাইরে ডিজিটালে অনেক সহজে, প্রায় একা একা ছবি তুলে বাড়ীর কম্পিউটারে এডিট করে ছবি বানানো সম্ভব, যা ১৬মিমিতেও ততটা সম্ভব ছিল না।

আব্বাস কিয়ারস্তামি বোধহয় পৃথিবীবিখ্যাত চলচ্চিত্র শিল্পীদের মধ্যে সর্বপ্রথম, যিনি ডিজিটাল ক্যামেরাকে এত সাদরে বরণ করে নিয়েছিলেন। তথ্যচিত্র এবিসি আফ্রিকা (২০০১), ফিচার ফিল্ম টেন (২০০২), ফাইভ (২০০৫), শিরিন (২০০৮) এর মতো অসামান্য এক্সপেরিমেন্টাল চলচ্চিত্র তো আছেই, কিন্তু সর্বপ্রথম ডিজিটালে তিনি শ্যুট করেন ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্যের এই বিহাইন্ড দ্য সিন ফুটেজ গুলো – যা সেলুলয়েডের ঝকঝকে কোয়ালিটির পাশে প্রায় দাপটে, ইমেজ কোয়ালিটিকে অস্বীকার করে তিনি রেখে দেন। এবং এতক্ষণ আমরা জীবনে ফিরে যাওয়া সংক্রান্ত যা যা কথা বললাম – তার সাথে এই দৃশ্যে ডিজিটাল ইমেজ ব্যবহারের দীর্ঘ যোগাযোগ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুঁজির বাইরে ছবি বানিয়ে যে মুক্তির সন্ধান আছে, যে কথা আব্বাস এর পরে একের পর এক এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করতে করতে বারবার বলবেন, সেই কথাই যেন প্রথম ‘টেস্ট অফ চেরি’র এই শেষ দৃশ্যে আসে, যেখানে গল্প থেকে নির্মাণে, বাস্তব থেকে কারখানায়, মৃত্যু থেকে জীবনে যাত্রার পাশাপাশি সেলুলয়েড থেকে ডিজিটালে যাত্রার ডাক ও আছে। তিনি ডিজিটাল সিনেমায় স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছিলেন – যে স্বাধীনতা সেলুলয়েডের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুঁজির নির্মিত চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া তাকে দিচ্ছিল না।

Figure 14 সেলুলয়েডের ছবির পাশে দাপটে জ্যালজ্যালে, ঘষা ইমেজ রেখে দিচ্ছেন তিনি

 

কোভিড ১৯ এবং লকডাউনের এই মৃত্যুর পৃথিবীতে, যেখানে রোজ সারা বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ ভাইরাসের প্রকোপে মারা যাচ্ছেন – একবার ভাবুন তো, আমরা যারা শিল্প নিয়ে, সিনেমা নিয়ে, ইমেজ-সাউন্ড দেখে-বানিয়ে বেঁচে আছি – তাঁরা কোথায় যেতাম ডিজিটাল ইমেজ না থাকলে? চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বেশীরভাগ ছবিই যেখানে আমাদের ডিজিটাল স্ট্রিমিং বা ডাউনলোড করে দেখা, এখানে আমাদের বেঁচে থাকার মাধ্যম, আমাদের চলচ্চিত্রচর্চা, আমাদের অ্যামেচার ফিল্মমেকিং – সবকিছু নির্ভর করে আছে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহজলভ্যতার উপরে – সেখানে ‘টেস্ট অফ চেরি’র এই শেষ দৃশ্য আমার কাছে বাড়তি দ্যোতনা পায়। চার দেয়ালের বদ্ধতা ছাপিয়ে বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে ঘষা ইমেজে ছবি তোলা, ফিল্ম বানানো – জীবনের এর চেয়ে বড় স্বাদের কথা আমরা কী এইমূহুর্তে আর ভাবতে পারছি? আমাদের ঘষা ছবি, আমাদের রংহীন, ফিকে, ফ্যাকাসে ইমেজ যখন আমরা বাড়ির কম্পিউটারে এডিট করি, বন্ধুবান্ধবকে দেখাই – সিনেমাকে কেন্দ্র করে যে ‘জীবন’ যাপন করি আমরা; লকডাউনের এবং মৃত্যু দ্বারা হন্টেড এ পৃথিবীতে থাকতে থাকতে ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার শিহরণ হয়। মনে হয় ঐ তো আব্বাস বেঁচে আছেন, ছবি বানাচ্ছেন – জীবনের এর চেয়ে বড় সেলিব্রেশন আর কখনও দেখেছি কী? ঝকঝকে ইমেজে হন্টেড মৃত্যুর পৃথিবীর পরে ঘষা, জ্যালজ্যালে ইমেজের জীবন – আমার কাছে আব্বাসের সিনেমা-জীবনের শ্রেষ্ঠতম মূহুর্ত; যেখানে ছবির শেষে, মৃত্যুর ওপারে জীবন, শুধুই জীবন পড়ে থাকে।

Figure 15 ছবি শেষে পড়ে থাকা জীবন

লেখক :

সায়ন্তন দত্ত

চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়


 

One thought on “মৃত্যুর ওপারে জীবনের সন্ধান: ‘টেস্ট অফ চেরি’র শেষ দৃশ্য

Comments are closed.

error: Content is protected !!