সিনেমাটিক অটো রাইটিং ও নীরিক্ষাধর্মী নির্মাতা

“সবিনয়ে থাকো যত প্রখ্যাত নীতিকথা, ব্যাকরণ বই”

-কুত্রাপি, দ্রাবিড় সৈকত

প্রিয় কুত্রাপি ছন্দের অবতারণায় একটি ইশতেহারগন্ধী লেখার অবতারণা করছি।

ফিল্মমেকিং বা চলচ্চিত্র নির্মাণকে যাদের একটা কবিতা লেখার মতই কাজ বা একটা ছবি আঁকা কিংবা অর্থহীন আঁকিবুকি বলে ভাবতে বেগ পেতে হয় না তাদের উদ্দেশ্যেই এই লেখা। আমি চলচ্চিত্রকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে দেখি যেখানে নির্মাতা হিসেবে আমি সম্পূর্ণই আমার প্রবৃত্তি দ্বারা প্রলুব্ধ ও নিয়ন্ত্রিত।  সিনেমা একটা ডায়েরির মত হতে পারে, দেয়াল লিখনের মত, চিঠির মত কিংবা একটা অর্থহীন আঁকিবুকির মত হতে পারে, যখন আমাদের ডিজিটাল ডিভাইসে রেকর্ড বাটন চাপ দিলেই তা শব্দ ও দৃশ্য ধারণে লিপ্ত হচ্ছে। একটা মাধ্যম হিসেবে সিনেমার সবচেয়ে বেশি ঋণ প্রযুক্তির উপর। একেকটা নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবের সাথে সাথে সিনেমার ভাষা ও রীতিতে অধিকতর ও নব্যধারার স্বাধীনতা যোগ হয়েছে যা অনেক ক্ষেত্রেই নতুন ভাষারীতির আবির্ভাবে সহযোগিতা করেছে।

নতুন সময়ে নতুন প্রযুক্তি নিয়ে নতুন নির্মাতার পুরোনো রীতির প্রতি নমস্যির দিন শেষ। যেই নির্মাতার আরাধ্য একটা ‘নতুন’, সেই নতুন কখনো ধরা দেবে না পুরনো প্রথা বা রেওয়াজকে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে খতিয়ে না দেখলে।

একটা মাধ্যম কতটা দুর্বল বা সবল তা অবশ্যই মাধ্যমটির স্থিতিস্থাপকতা ও সময়োপযোগিতার ওপর নির্ভর করে। সিনেমা প্রতিনিয়ত তার সংজ্ঞা বদলে দিয়ে নতুন  নতুন ধারাকে আলিঙ্গন করেছে।

একটা ভবিষ্যতবাণী করাই যায়, আগামী দিনগুলোয় চলচ্চিত্র নির্মাণে ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’- একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠবেন বিশ্ব চলচ্চিত্র দুয়ারে।

সিনেমাটিক অটো-রাইটিং ও নীরিক্ষাধর্মী নির্মাতা

চলচ্চিত্র নির্মাণকে যদি আমরা একটা রাইটিং প্রসেসের সাথে তুলনা করি তবে সিনেমাটিক লাঙ্গুয়েজও বর্ণনামূলক, অবজারভেশনাল, ইনটুইটিভ, ফিক্টিশাস ও পোয়েটিক ধারার সন্ধান পাওয়া যায়।

‘অটো-রাইটিং’ এমন একটা প্রক্রিয়া যা নিজেতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং পরিপূর্ণতার বোধ বিবর্জিত। ব্যাপারটাকে সহজবোধ্য করতে উদাহরণ দেয়া প্রয়োজন। একজন কবি সচরাচর যে ঢং এ কবিতা লিখে থাকেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ‘অটো রাইটিং’ এর সামিল। শব্দ, ছন্দ, বাক্য, ছবি- যখন নিজে থেকেই ব্যক্তির ওপর ‘নাজিল’ হয় সেক্ষেত্রে শব্দ, ছন্দ, বাক্য বা ছবি নিজে থেকেই নিজেকে লিখিয়ে নিচ্ছে কবির ইনটুইশন (intuition) এর মাধ্যমে। এক ধরণের ভাবাবেশ তৈরি হয়। এটাই অটো রাইটিং এর আপাত ধারণা। শব্দ, ছন্দ, বাক্য, ছবি বা অন্য এমন ধারার জড় উপাদান তো নিজে থেকেই একটা রচনা বা কম্পোজিশনে পরিণত হতে পারে না কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্ববোধসম্পন্ন কোন কোড অথবা এজেন্সি ছাড়া। এক্ষেত্রে এই এজেন্সি প্রদান করে ব্যক্তির ইনটুইশন বা প্রবৃত্তি।

‘অটো রাইটিং’ এর অন্যতম মূলমন্ত্র হল ইনটুইশনকে অনুসরণের মাধ্যমে ‘নাজিল’ করার বাসনা।  তাই ‘অটো রাইটিং’ এর ক্ষেত্রে জরুরি হল প্রবৃত্তিপ্রবণ হওয়ার মনোভাবের আবির্ভাব এবং নিয়ন্ত্রণ করার মনোভাবের বিবর্জন।

চলচ্চিত্র নির্মাণে ‘অটো রাইটিং’ এর সময় এসেছে বলতে এমন একটা ধারাকে আলিঙ্গণের কথা বলা হচ্ছে যেখানে নির্মাতা ‘প্লট’ ও ‘সম্পূর্ণতা’ (a meaningful whole) বিবর্জিত একটা ধারার বাহক হয়ে উঠবেন। ‘স্ক্রিপ্ট’ নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ একটা পরিপূর্ণতার ধারাকে সামনে রেখে নির্মাণযজ্ঞ পরিচালনা করে। কী হবে, কখন হবে, কিভাবে হবে- এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে চায় ‘স্ক্রিপ্ট’।

যে নির্মাতার কাছে চলচ্চিত্র একটা আঁকিবুকি বা যেকোন ধরণের মনোভাব ব্যক্ত করার মাধ্যম, ‘স্ক্রিপ্ট’ নির্ভর ভাবনা তাকে বিপথগামী করতে বাধ্য। ‘স্ক্রিপ্ট’ গুরুত্বপূর্ণ ইন্ড্রাস্ট্রি ফরম্যাটের চলচ্চিত্রের জন্য।  অর্থনৈতিক মাপজোকের সাথে ফিল্মের ঘটনাপ্রবাহ ও আবর্তনের মাপজোক এর দরকার বাণিজ্যিক ধারায়। সিনেমার ভাষা রপ্ত বা নীরিক্ষায় যার মন, তাকে সিনেমার ভাষা রপ্ত করতে হবে মৌলিক ও নিজস্বধারার এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে।

নির্মাতার সিনেমাটিক বোঝাপড়া কখনোই সম্ভব নয় শুধু ক্যামেরার মাধ্যমে, কারণ ক্যামেরা একটা যান্ত্রিক টুল ছাড়া আর বেশি কিছু নয়। নিজের মত করে সিনেমার ভাষার ধারণা তৈরিতে প্রয়োজন অসংখ্য সৎ নীরিক্ষামূলক প্রচেষ্টা।

চলচ্চিত্র নির্মাণ এর চিরাচরিত তিনটি ধাপ এড়িয়ে একটি ধাপেই চলচ্চিত্রযজ্ঞ বা চলচ্চিত্র ভাষারীতি রপ্ত করার সময় এসেছে নতুন নির্মাতার জন্য। যখন সমস্ত ক্যামেরাতেই ‘পজ এন্ড প্লে’ টেকনোলজি চলে এসেছে।

‘পজ এন্ড প্লে’ প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণের সবচেয়ে আদিমতম প্রযুক্তি বললে ভুল হবে না। ডিজিটাল প্রযুক্তির পূর্বে ফিল্মস্ট্রিপ প্রযুক্তিতেও অটোমেটিকভাবে এই প্রসেস ছিল যা ব্যবহার করে একটা ম্যাজিক/ইল্যুশন তৈরি করতেন প্রথম যুগের চলচ্চিত্র নির্মাতারা। ফিল্মস্ট্রিপে একটা শট শেষ করলে পরবর্তী শট আবার যখন নেয়া হয় তখন ফিল্মস্ট্রিপের শরীরে আপনাতেই একটা কাট ইফেক্ট তৈরি হত।

পজ এন্ড প্লে প্রক্রিয়াটা খতিয়ে দেখলে আমরা পাইঃ

১) ‘Pause’ এবং ‘play’ বলতে যে কোন ডিজিটাল টেকনোলজির ক্যামেরা কিংবা ক্যামেরাসম্বলিত ডিভাইসের “Pause and Play” বাটন এর কথা বলা হচ্ছে। ‘Pause’ চাপলে ভিডিওধারণ অবস্থায় একটা বিরতি আসে। ‘Play’ চাপলে বিরতিতে ছেদ পড়ে। পরে একই ফাইলে নতুন করে ভিডিও রেকর্ডিং শুরু হয়।

২) একটা শটের পর যখন একটা Pause দিয়ে আবার Play বাটন চাপা হয় তখন একটা শটের সাথে আরেকটা শট জোড়া লেগে যায়। Pause বাটন এক্ষেত্রে সম্পাদনার ‘কাট’ এর মত কাজ করে।

সাধারণত এক ফাইলে এক শট নিয়ে নিয়ে যেভাবে ভিডিওধারণ করি আমরা তাতে আমাদের মস্তিষ্ক পুরো গুরুত্ব প্রদান করে থাকে একটা শটে কী হচ্ছে, কতটা সুন্দর ও নিখুঁতভাবে হচ্ছে তার দিকে। এই প্রক্রিয়ায় মস্তিষ্ক সচেতন থেকে একটা সম্পূর্ণতার বোধ তৈরিতে আমাদের সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকে।

 ‘Pause & Play’ এই নৈমিত্তিক ধারায় বিরতি নিয়ে আসে। এক শট নেয়ার পরে যখন নির্মাতা একটা পজ দিয়ে আরেকটা ছবি তোলার জন্য তার আশেপাশে মনোযোগী হন, তখন একই সাথে তিনি তার মস্তিষ্ককে লিপ্ত করেন একটা সচেতনতা-অবচেতনতার মিশেলে। এটা একটা লাইভ মন্তাজ প্রক্রিয়া।

‘Pause & play’ টেকনিকের ব্যবহারে ভিডিওধারণরত অবস্থাতেই একটা লাইভ সিনেমাটিক রাইটিং এর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পরিচিত বেশ ক’জন নির্মাতা ও উৎসাহীজন নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন এই টেকনিকে চলচ্চিত্র নির্মাণে। ‘পজ এন্ড প্লে এনড পজ এন্ড প্লে’ চেপে চেপে একটি ভিডিও ফাইলেই একটি ফিল্ম নির্মাণ এর এইযে ধারা বা ভাষারীতি, তার আয়ত্তের দ্বারা নির্মাতা এক অনন্য অ্যাপ্রিসিয়েশন অফ সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজ এর সন্ধান পাবেন, যা চলচ্চিত্র নির্মাণের দুটি গুরুত্বপুর্ণ ধাপ- প্রি-প্রোডাকশন ও পোস্ট-প্রোডাকশনকে অগ্রাহ্য করে। লেখার ক্ষেত্রে অবজারভেশনাল ও ইন্টুইটিভ দু’ধরণের রাইটিং এপ্রোচ এই কবি/লেখক লিখে আসছেন। একজন ভেবে নিচ্ছেন পুরোটা, কিভাবে শুরু করবেন, কোথায় কোন ধরণের ঘটনার অবতারণা করবেন, তারপর কোন ধরণের ভাবাবেশ তৈরি হবে, কিভাবে শেষ হবে, এসব। আরেকজন পূর্বেই কিছু ভেবে নিচ্ছেন না। সুক্ষ্ম সময়ের আবর্তে তার ‘সচেতন-অবচেতন’ নিজে থেকে তাড়িত হচ্ছেন তার প্রবৃত্তি দ্বারা।

এক ফাইলের ভিডিও ধরে ফিল্ম নির্মাণ এই টেকনিক এর মূল লক্ষ্যবস্তু নয়। আশেপাশের দৃশ্য, শব্দ কিংবা সংকেত দিয়ে সিনেমাটিক ‘সময়’ এর সম্যক, লাইভ ভাবধারা অনুসন্ধান- এর কাম্য।

এই প্রক্রিয়ায় নির্মাণ এর নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন: এই প্রক্রিয়া একটা নির্দিষ্ট স্থানের দৃশ্য ও শব্দ ধারণের জন্য বিশেষ উপযোগী।

দীর্ঘদিনের লালিত-পালিত ধারায় যখন বলা হত “সিনেমা নির্মাণ একার কাজ নয়”, সেই লালিত-পালিত ধারাই কিন্তু নতুন সময়ে এসে দেখিয়ে দিয়েছে, চাইলে একাও নির্মাণ সম্ভব। দলগত নির্মাণ অপেক্ষা একক নির্মাণ অধিকতর কাম্য এমন কোন যুক্তির অবতারণা করছি না।

দলগত নির্মাণ ও একক নির্মাণের মূলগত পার্থক্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, একক নির্মাণপ্রক্রিয়ায় এসে নির্মাতা একজন  কবি কি পেইন্টারের মত সাব্জেক্টিভ অনুভূতি ব্যক্ত করতে সমর্থ হন, যেটা দলগত নির্মাণ প্রক্রিয়ায় কখনোই সম্ভব নয়। এককভাবে নির্মাণ এর দিকে নির্মাতার যে ঝোঁক তা কিন্তু পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ই এসেছিল। ১৬ মিলিমিটার, ৮ মিলিমিটার ক্যামেরার আগমণে ফিল্ম বানানোর বা দৃশ্যধারণের একটা নতুন ঝোঁক নিয়ে আভা-গার্ডে নির্মাতারা মেতে উঠেছিলেন। বর্তমান সময়ে এসে যখন পকেটে থাকা ফোনের দ্বারাই কাঙ্খিত ধারার ছবি ও শব্দগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে, তখন তা এক নতুন আভা-গার্ডের সন্ধান করছে আপনাতেই। একজন তরুণ নির্মাতা হিসেবে আমরা যেই ঐতিহাসিক সময়ে এসে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবছি, তার আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবায়নের পেছনে সবচেয়ে অবদান রেখেছে ভিডিও ধারণের জন্য নতুনতর প্রযুক্তির আবির্ভাব। এ জায়গা থেকে বর্তমানের তরুণ নির্মাতার কাছে প্রযুক্তি নিজে থেকেই এক নব্য সিনেমাটিক আভা-গার্ডের চরম উৎকর্ষমণ্ডিত মুহুর্তের সাক্ষী হওয়ার জোড়ালো দাবি রাখে।

যেকোন ধরণের সিনেমাটিক অটোরাইটিং একজন নতুন নির্মাতাকে এক নব্য নীরিক্ষাধারায় পৌঁছে দেবেন যা তাকে ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ ধরণের নির্মাতাতে পরিণত করবেন। আগাগোড়া প্লট ভেবে চলচ্চিত্র নির্মাণ কখনোই একটি মৌলিক প্রক্রিয়া নয় এ সময়ে এসে। স্ক্রিপ্টভিত্তিক নির্মাণ সময়ের দাবি ছিল এককালে যেহেতু সিনেমার প্রযুক্তিগত ব্যয় একটা বড় বাধা ছিল। সময়ের আবর্তেই এই ধারাকে ছুঁড়ে ফেলার সময় এসেছে।

 ‘Learning in the process of making’ ধারার আলিংগণে একদল নতুন নির্মাতার সিনেমাটিক নীরিক্ষার সময় চলছে। নীরিক্ষণেই নতুনের জন্ম।


লেখক :

ফজলে হাসান শিশির 

চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী, যাদপুর বিশ্ববিদ্যালয়


error: Content is protected !!