সীমান্তরেখা: দেশভাগের বহুরূপদর্শন

“দু’বাংলা ভেঙে চুরমার করে দিল। এটা বদমাইশি। সমস্ত অর্থনীতি আর রাজনীতিতে যে ভাঙন শুরু হয়েছে, তার উৎস ওই বাংলাদেশ ভাগ। …আমি …চাই দু’বাংলার সংস্কৃতিকে এক ফ্রেমে আঁটতে। তাতে তোমরা মার্কসবাদীই বলো আর যাই বলো। প্রতিবাদটা করা দরকার—কিন্তু শালা বুঝল না কেউ।” –ঋত্বিক ঘটক

 

দেশভাগের যন্ত্রণার গভীরতা কলম বা ক্যামেরা-কলম দিয়ে পুরোপুরি ফুটিয়ে তোলা কখনোই সম্ভব নয়। তবে যতটুকু সম্ভব ইতিহাসের এই কলঙ্করেখাটির প্রতি প্রতিবাদ জানিয়ে গেছেন ঋত্বিক ঘটক, আর তাঁর পর বাংলাদেশের তানভীর মোকাম্মেল, সেই ‘চিত্রা নদীর পারে’ (১৯৯৯) ছবি থেকে সাম্প্রতিক সময়ের ‘সীমান্তরেখা” (২০১৭) পর্যন্ত, নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল প্রতিবাদ শুধু নয়, দেশভাগ, বিশেষ করে বাংলা ভাগের কারণ যেমন অনুসন্ধানে ব্রত হয়েছেন, তেমনি ভাগাভাগির ভাগফলে পড়ে যারা উন্মূল হয়েছেন তাদের কষ্টের রঙটাও ধরতে চেয়েছেন, কখনো কাহিনীচিত্রে, কখনো বা প্রামান্যচিত্রে।

‘সীমান্তরেখা’র প্রারম্ভেই দেখি মোকাম্মেল বলছেন, “ইতিহাসে আগেও বাংলা বিভক্ত থেকেছে— রাঢ়, বরেন্দ্র, সমতট, হরিকেল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের বিভাজনের মতো তা কখনোই এতটা নিয়ামক ও সুদূরপ্রসারী ছিল না। বাংলার দুই অংশের মাঝে কখনো টানা হয়নি কাঁটাতারের বেড়া। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হয়ে লাভ হলো কার? ক্ষতিই বা কী ঘটল? বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে আজ যে সীমান্তরেখা তা কি কেবলই ভারত ও বাংলাদেশের দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যেকার রাষ্ট্রীয় সীমান্ত? না কি তা হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মাঝের বিভাজনরেখা? না কি উভয় বঙ্গের বাঙ্গালীদের মনোজগতে বিভেদের এমন কোনো সীমান্তরেখা রয়েছে যা তাদেরকে মিলতে দেয় না। বাংলাভাগের ৭০তম বার্ষিকীতে সেই অদৃশ্য সীমান্তরেখাটিকে বুঝতে চেয়েছে এ প্রামাণ্যচিত্রটি।”

২০১৭ সাল ছিল দেশভাগের সাত দশক পূর্তির বছর। সেটিকে উপলক্ষ্য করে ‘সীমান্তরেখা’ মুক্তি পেলেও, বিভেদের যন্ত্রণা ও স্মৃতি থেকে যে দুই বাংলার মানুষ এখনো মুক্ত হয়নি, সেটিই যেন আল্পনার মত করে ঘুরে ঘুরে এসেছে মোকাম্মেলের কাজে। ছবিটিকে মোট আটটি ভাগে ভাগ করেছেন পরিচালক। এই আট ভাগে চারটি পরিবার ও ব্যক্তির নিজেদের ভিটামাটি ফিরে দেখা এবং রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, গায়ক ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গোটা কাজে একটি প্রশ্নই মূলত প্রতিধ্বনিত হয়েছে, বাংলা ভাগ কি আদৌ দরকার ছিলো? জবাবও এসেছে কমবেশী একটাই, দেশ ভাগ শুদ্ধ নয়, সবরকম ভাগাভাগিই অসুন্দর। এতে মানুষের জানমালের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। তবে এর ফাঁকে ছবিতে এটাও উঠে এসেছে, দেশভাগ হয় তো ঠেকানো যেতো না, সেজন্য অনেকাংশে দায়ী হিন্দু নেতারা হলেও, পরে এর সুফল ভোগ করেছে পূর্ববঙ্গের মুসলমানেরা। দেশভাগের পর কেমন আছে দুই ধর্মের মানুষ, দুই সীমান্তের মানুষ, তরুণদের প্রতিক্রিয়াই বা কি, এমন বিবিধ স্তর থেকে নির্মিত হয়েছে তানভীর মোকাম্মেলের প্রামাণ্যচিত্রটি। এটি নিয়ে আলোচনা উপলক্ষ্য, আর লক্ষ্য ইতিহাসের সেই দিনগুলোকে ফিরে দেখা।

১.

ছবির প্রথমভাগে দেখা যায় ভারতে চলে যাওয়া অপরাজিতা ঘোষাল ও অঞ্জলী চক্রবর্তীরা ফেলে যাওয়া ভিটামাটি দেখতে বাংলাদেশে এসেছেন। সঙ্গে আছেন পরিচালক। দাঙ্গার কারণে ১৯৫৮ সালে দেশ ছাড়েন তারা। জন্মভূমি রাজশাহীতে এসে যে দীর্ঘশ্বাস আর আবছা স্মৃতি ভেসে বেড়ায় তাদের চোখে সেটা ক্যামেরা দিয়ে ধরা যায় না। যারা পর্দার এপারে বসে থাকেন, তারাই শুধু অনুভব করতে পারেন, অনিচ্ছায় প্রস্থানের কি বেদনা।

মানুষের তৈরি করা এই ইতিহাস একদিকে লজ্জার, অন্যদিকে যন্ত্রণার। বাংলাকে অখণ্ড রাখার চেষ্টা শরৎ বোস, আবুল হাশেম, সোহরাওয়ার্দীরা করলেও সেটা অবশেষে ঠেকানো যায়নি। ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্টের মাধ্যমে চিত্তরঞ্জন দাশ চেষ্টা করেছিলেন বাংলাকে অবিভক্ত রাখার। কিন্তু ১৯২৫ সালে চিত্তরঞ্জনের অকাল প্রয়াণ সেই সম্ভাবনাকে গুড়িয়ে দেয়। ওপার থেকে আসা, বাংলাদেশের এখনকার জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও ছবিতে বলেন, চিত্তরঞ্জনের মৃত্যুর পর হিন্দু ও মুসলমানের একযোগে কাজ করার সুযোগ কমে আসে। ১৯৩৭ সালে কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ কে ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন পরিষদ নির্বাচনে জয় পেয়ে কংগ্রেসের সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা রাজি হননি। পরে মুসলীম লীগের সঙ্গে যুক্ত হন ফজলুল হক। এতে করে হিন্দু ও মুসলমানের দূরত্ব আরো বাড়ে।

১৯৪৬ সালের দাঙ্গার পর ভারত ভাগ যেন অনিবার্য হয়ে ওঠে। তারপরও সাতচল্লিশে কংগ্রেস নেতা শরৎ বোস ও তৎকালের পূর্ববঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী চেষ্টা করেছিলেন বাংলাকে অবিভক্ত রাখার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্ষীয়ান মুখ বদরুদ্দীন উমরের বাবা, মুসলীম লীগ নেতা আবুল হাশিমও ছিলেন এই দলে। তবে তাদের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হয় দাঙ্গা, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার কারণে। এই প্রামাণ্যচিত্রে বদরুদ্দীন উমর ও আনিসুজ্জামান দুজনই বলেছেন এসব কথা।

উনবিংশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে ব্রিটিশ শাসকদের মনে হচ্ছিল ১৮৯,০০০ বর্গমাইলের বিশাল বাংলার প্রায় ৭ কোটি ৯০ লাখ মানুষকে শাসন করা দুরুহ ব্যাপার, তাই একে খণ্ডখণ্ড করে প্রশাসনিক কাজ চালাতে হবে। অন্তত বঙ্গভঙ্গের আগে এমন তথ্যই প্রচার করা হয়। কিন্তু এই বিভাজনরেখা টানার পেছনে তলে তলে রাজনৈতিক অভিসন্ধিও ছিলো, কারণ ইংরেজ সরকার টের পাচ্ছিলো অভিন্ন ভাষাভাষি বাঙালিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ দানা বাঁধছে এবং সেটা মূলত মধ্যবিত্ত হিন্দু শিক্ষিত সমাজকে কেন্দ্র করে।

লর্ড কার্জন অন্যান্যদের সহায়তায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করলেন। তাতে সমর্থন পেলেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর। তবে এই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে শিক্ষিত হিন্দুরা স্বদেশী আন্দোলন শুরু করে তখন, শিক্ষিত মুসলমানদের অনেকেই ভাবল বঙ্গভঙ্গ হলেই ভালো, তাহলে পূর্ববঙ্গের অনেক সুযোগসুবিধা, যেমন চাকরিবাকরিতে তখন তারা বেশি সুযোগ পাবে। ইতিহাসের কি পরিহাস, সাতচল্লিশ সালে যখন সত্যি সত্যি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলা ভাগ হচ্ছে তখন মুসলমানরা চাইলো অবিভক্ত বাংলা, আর হিন্দুরা চাইলো বাংলা ভাগ।

“আসলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকেই হিন্দুরা— বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পেশাগত একচেটিয়া অধিকারের কায়েমি স্বার্থ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ববাঙলা ও আসামের কিয়দংশ মুসলমান প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সেখানে আইন ব্যবসা, ডাক্তারি, চা ও পাটের ব্যবসায়ে হিন্দুরা নিজেরাই অথবা ইংরেজি বণিক কোম্পানির প্রতিনিধি হয়ে পেশাগুলিতে একচেটিয়া কর্তৃত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। পূর্ব বাঙলা মুসলমানদের কর্তৃত্বাধীনে চলে গেলে সেই একচেটিয়া অধিকারে বাধা পড়বে বলেই প্রধানত হিন্দু সন্ত্রাসবাদীরা বঙ্গ-ভঙ্গ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল।”

অপরদিকে শিক্ষিত মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার্থে ১৯০৬ সালে গঠিত হলো মুসলীম লীগ। তবে তাদের নেতৃবৃন্দ ভারতের মূল জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামে সেভাবে সামিল হতে পারলো না। এর দায় মুসলমান নেতাদের আছে, তবে তার দ্বিগুণ দায় রয়েছে কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের। তারা ভেতরে ভেতরে ভীষণরকম সাম্প্রদায়িক মানসিকতার চর্চা করতেন। যেমন, কংগ্রেস নেতা “আবুল কালাম আজাদকে বিপ্লবী দলের সদস্য করা হয়নি, কারণ তিনি মুসলমান। বিপ্লবী দলের নিয়ম ছিল, গীতা হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণ করতে হত। একজন মুসলমানের হাতের স্পর্শে গীতা অপবিত্র হয়ে যাবে। এ কোনও মতেই হতে পারে না।”

অবস্থাদৃষ্টে ১৯২৯ সালেই মুসলীম লীগ মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি উত্থাপন করে। ত্রিশ ও চল্লিশের দশক জুড়ে হিন্দু ও মুসলমানের বিভেদকে ব্রিটিশ সরকার যেমন উস্কে দিয়েছে, তেমনি শিক্ষিত হিন্দু ও মুসলমান সমাজও পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষাবাদ করেছে। তবে উভয় সম্প্রদায়ের অনেকেই চেয়েছেন বাংলা অবিভক্ত থাকুক। তাঁদের কথা আমরা প্রামাণ্যচিত্রে উচ্চারিত হতে দেখি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য, ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে তাঁরা পরাজিত হন বিভাজনপন্থীদের কাছে। শেষ পর্যন্ত এক ইংরেজ আইনজীবী, সিরিল রেডক্লিফ তার নাম, মানচিত্র পড়তে জানতেন না, ভারতবর্ষেও কখনো আসেননি, তার হাতে ভাগ হলো ভারতবর্ষ, দুই টুকরো হলো বাংলা।

বলা হয়, জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছে। ‘সীমান্তরেখা’ দলিলচিত্রে নির্মাতা উল্লেখ করেন, জিন্নাহর অনমনীয়তা ও ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের চক্রান্তের কারণেই ভারত ভাগ হয়। জিন্নাহর তত্ত্ব যে ভুল ছিল, সেটা প্রমাণিত হয় ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে। নির্মাতার এই বক্তব্যে একপেশে ভাব রয়েছে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষকে ‘জাতি’ হিসেবে উল্লেখ করার কাজটি জিন্নাহ শুরু করেননি। পশ্চিম বাংলার “হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা ‘জাতি’ শব্দটি প্রয়োগ করেছে খুবই শিথিল ভাবে। জাতি বলতে তারা কখনও বুঝিয়েছে কাস্ট, কখনও রেস, কখনও বা কম্যুনিটি এবং জাতি অর্থেই হিন্দু শব্দটির নির্বিচার প্রয়োগ ঘটিয়ে তারা হিন্দু আশা-আকাঙ্ক্ষাকেই বলেছে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা; হিন্দুমেলাই তাদের কাছে হয়েছে জাতীয় মেলা। আর এভাবেই তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের বীজটি রোপন করে।”

আরো স্পষ্ট করে বললে হিন্দু নেতাদের জাতি নিয়ে বক্তব্যের পরই জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেন জনগণের সামনে। হিন্দু মহাসভার নেতা “বিনায়ক দামোদর সাভারকর উনিশশো আটত্রিশের ডিসেম্বরে হিন্দু মহাসভার নাগপুর অধিবেশনে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিলেন যে, ‘উই দি হিন্দুজ আর অ্যা নেশন বাই আওয়ার সেলভ্‌স্‌’। জিন্নাহ সাহেব সাভারকরের কথা যেনো লুফে নিলেন। দু’বছর পর ঊনিশশো চল্লিশে, মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, ‘ভারতীয় মুসলমানরা শুধু একটা সম্প্রদায় মাত্র নয়, তারাও একটা জাতি (নেশন) এবং ব্রিটিশ ভারতবর্ষে হিন্দু ও মুসলমান এই দুই জাতির বাস।”

শুধু যে হিন্দু নেতারা জাতি ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের পালে হাওয়া দিয়েছেন তা নয়, হিন্দু মতাদর্শে দীক্ষিত গণমাধ্যমের ভূমিকাও কম ছিল না। “উনিশশো চল্লিশের তেইশ মার্চ মুসলিম লীগের ‘লাহোর প্রস্তাবে’ পাকিস্তানের নামগন্ধও ছিলো না। অথচ এ প্রস্তাবটিই কী করে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ নামে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় তার বর্ণনা দিয়ে মুসলিম লীগ নেতা খালিকুজ্জামান জানিয়েছেন যে, ‘পরের দিন (অর্থাৎ চব্বিশে মার্চ) সকালে হিন্দু সংবাদপত্রসমূহে বড়ো বড়ো অক্ষরে প্রকাশিত হলো ‘পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত’, যদিও ওই নাম দুটি বক্তৃতার কোনোটিতেই উচ্চারিত হয়নি বা প্রস্তাবেও উল্লেখ হয়নি। …হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবের নাম ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ দিয়ে মুসলিম জনসাধারণের কাছে এর তাৎপর্য বোঝানোর জন্য নেতাদের যে বহু বছরের পরিশ্রমের প্রয়োজন পড়তো তার হাত থেকে তাদের রেহাই দিলো।”

হিন্দু নেতা ও সংবাদপত্রের এই প্রয়াসকে ধন্যবাদ জানিয়ে জিন্নাহ তথা মুসলিম লীগ ও মুসলমান বুদ্ধিজীবীরাও সানন্দে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’কে গ্রহণ করে নেয় এবং সেই মোতাবেক কাজে লেগে পড়ে। কাজেই বলা যায় হিন্দু ও মুসলমান রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীরা ধর্মকে সেসময় জাতি হিসেবে কেবল প্রতিষ্ঠাই করেনি, অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করে তিনটি রাষ্ট্রও তৈরি করে ফেলেন।

তবে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ‘জাতি’ হিসেবে চালানোর চেষ্টা পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রসববেদনার মধ্য দিয়ে দূরীভূত হয়। ভুলে গেলে চলবে না বাংলা ভাষায় ‘জাতি’ শব্দটি নানা কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। একই নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও হিন্দুদের জাতপাত তো বটেই, এমনকি সঙ্গীতে রাগের আরোহী ও অবরোহীতে ব্যবহৃত স্বরের সংজ্ঞা নিরূপন করাকেও জাতি বলে। ‘জাতি’ শব্দের এমন উদারতার কারণেই তৎকালে ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ‘জাতি’ হিসেবে চালানোর চেষ্টা হয়েছে এবং সেই চেষ্টা সফলও হয়েছে। সেখানে নিঃসন্দেহে ঘি ঢেলেছে ব্রিটিশ সরকার। এই সাফল্যের পরিণামে সাধারণ মানুষের জীবনে নরক নেমে আসে। রাষ্ট্রকল্পে ধর্মকে প্রাধান্য দেয়ার কারণেই পশ্চিম ও পূর্ব বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, লাখলাখ মানুষ হতাহত ও উদ্বাস্তু হয়।

২.

দুই নম্বর বিশ্বযুদ্ধের উপসংহারকাল থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত কয়েকটি পর্যায়ে, মানুষের দেশান্তর ঘটেছে। যে যেভাবে পেরেছে, পায়ে হেঁটে, রেলগাড়ি বা স্টিমারে চেপে কেউ গেছে পূবে আসাম বা ত্রিপুরায়, কেউবা পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গে। নির্মাতা কয়েক দশক পর যেন সেসব জায়গায় ইতিহাসের শুলুক সন্ধান করেছেন, উদ্বাস্তু হওয়া মানুষের স্মৃতিকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। ছবিতে আমরা কুপার্স, ধুবুলিয়া, ভাদ্রকালী প্রভৃতি ক্যাম্পের করুণ কাহিনী শুনি। বিশেষ করে ‘পার্মানেন্ট লায়াবিলিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত দুঃস্থ নারীদের কথা শুনে মনে হয়, মানুষের সর্বোচ্চ নিষ্ঠুরতার স্বাক্ষী হয়ে এরা এখনো বেঁচে আছেন, শুধু এটা বলার জন্য যে, দেখো, একটি শ্রেণির স্বার্থের কারণে আজ  আমাদের এই দুর্দশা।  নির্মাতা দণ্ডকারণ্য, নৈনিতাল ও আন্দামানে পাঠিয়ে দেয়া নিম্নবর্ণ হিন্দুদের সাক্ষাৎকারও নেন। তানভীর মোকাম্মেলের ক্যামেরা, প্রশংসা করেই বলতে হয়, এসব ক্যাম্প ও স্থানের সর্বত্র বিচরণ করেছে, আর তুলে এনেছে দেশভাগের বেদনা গাঁথা।

তবে নিম্নবর্ণের হিন্দু উদ্বাস্তু যারা পশ্চিমবঙ্গে ঠিকানা গড়তে পেরেছিলেন, তাদের অনেকেই শিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন বলে সাক্ষাৎকারে বলেন আটচল্লিশে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে যাওয়া কবি সত্য গুহ। সবাই তো আর ভাগ্যবান নয়। পূর্ববঙ্গ থেকে যাওয়া মানুষগুলোকে ভারতের ১৮টি রাজ্যে পাঠানো হয়। কোথাও তারা ঠাঁই পায় উদ্বাস্তু শিবিরে। কোথাও বা বিরাণ ভূমিতে গড়ে নিতে দেয়া হয় বসতভূমি। দুই তিন প্রজন্মের আত্মত্যাগ ও কষ্টের পর উদ্বাস্তু অনেক পরিবারে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। আবার কেউ কেউ এখনো দেশভাগের ক্ষত নিয়েই অপেক্ষা করছেন মৃত্যুর জন্য। তেমনি একজন কৃষ্ণপ্রসাদ মণ্ডল। তিনি যশোরে থাকতেন। পঞ্চাশ বছর ধরে ক্ল্যারিনেট বাজান। নির্মাতাকে বাজিয়ে শোনান বিষাদের সুর।

রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে নাগরিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের পথ ধরে, দাঙ্গার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র ও স্বাধীনতা অর্জন করেছিল ভারত ও পাকিস্তান তাতে গর্ব করার মতো কিছু নেই, কারণ সেই অর্জনে নিজেদের ভাইবোনের রক্ত লেগে আছে, শাসক ও শোষক ব্রিটিশদের নয়। রাষ্ট্র অর্জন হওয়ার পর আরো এক প্রস্থ দোজখ নেমে আসে এই উদ্বাস্তু মানুষগুলোর উপর। কোথায় যাবে, কোথায় থাকবে, কি খাবে, তার কোন ঠিকঠিকানা নেই। দলিলচিত্রে বলা হচ্ছে, পাঞ্জাবী উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি শতভাগ পালিত হলেও, বাঙালি উদ্বাস্তুদের বেলায় পনের ভাগ প্রতিশ্রুতিও পালন করা হয়নি। পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন সম্পন্ন হয় পাঁচ বছরের ভেতর, কিন্তু বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য তা হয়নি। তানভীর মোকাম্মেল জানাচ্ছেন, হয় তো নেহরু ভেবেছিলেন এই বাঙালিরা একদিন পূর্ববঙ্গে ফিরে যাবে। তাঁর অনুমান ভুল ছিলো।

আমরা শুনি দুই দেশের সম্পত্তি অদলবদল করা মানুষের কথা, তারা আবার যখন পৈতৃক ভিটা ভ্রমণে যান, নির্মাতার ক্যামেরাও তাদের অনুসরণ করে, আমরা দেখি তাদের সময় পরিভ্রমণ ও স্মৃতিকাতরতা। মাঝে আমরা শুনি সাহিত্যিক অমর মিত্র, রতনবসু মজুমদার ও শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কথা। তাঁরা প্রত্যেকেই বলেন বাংলাকে ভাগ করা ঠিক হয়নি। প্রতুল তো দুই লাইন শুনিয়েই দিলেন: দুই জনাই বাঙালি ছিলাম, দেখো দেখি কাণ্ডখান/ তুমি হলে বাংলাদেশী, আমারে কও ইন্ডিয়ান।

এই আক্ষেপ শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি ও সাধারণ মানুষের; বাস্তবতা হলো বাংলা ভাগের পেছনে অনেকাংশেই দায়ী রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকগোষ্ঠী। শরৎ বসু ও আবুল হাশিমের স্বাধীন বঙ্গ গঠনের বিরোধিতা করে জোরালো প্রতিবাদ আসে হিন্দু ব্যবসায়ী ও হিন্দু মতাদর্শের পত্রিকাগুলো থেকে। ব্রিটিশ পুঁজির উপর আধিপত্য শুধু নয়, কলকাতায় অবস্থিত চটকল, অন্য কলকারখানা, কয়লা শিল্প, জয়েন্ট স্টক কোম্পানিগুলো দখলে নেয়ার বাসনা থেকেই তারা বঙ্গভঙ্গ চাইছিলেন, ওসব লাভজনক জায়গা যেন মুসলমান ব্যবসায়ীদের হাতে না পরে। কৃষিপ্রধান পূর্ববঙ্গ শুধু কাঁচামালের যোগানদার হবে। একইরকম গোষ্ঠীস্বার্থ থেকে মুসলমান ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন যুক্ত বাংলায় হিন্দু ব্যবসায়ীদের সাথে তারা পেরে উঠবেন না, তাই আলাদা অঞ্চল হলে প্রতিযোগিতা কম হবে, অর্থনৈতিকভাবে তারা লাভবান হবেন। উভয় সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ প্রতিধ্বনিত হয় তাদের মদতপুষ্ট বা মালিকানধীন পত্রিকাগুলোতে, যেমন- মডার্ন রিভিউ, মর্নিং নিউজ, স্টার অব ইন্ডিয়া ইত্যাদি পত্রিকা দেশভাগের পক্ষেই কলম চালায়। শেষোক্ত দুটি পত্রিকা ছিলো ইস্পাহানি গোষ্ঠীর কাগজ।

ছবিতে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় একই যুক্তি তুলে ধরেন বদরুদ্দীন উমর। তিনি বলেন, দেশভাগ নিয়ে সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকের কোন লাভ লোকসানের ব্যাপার ছিলো না। চাকরির জন্য যারা প্রতিযোগিতা করছিলো, লাভলোকসান ছিলো তাদের জন্য। মুসলমানরা চাকরি পাচ্ছিল না। বড় পুঁজির নিয়ন্ত্রণ ছিলো হিন্দুদের হাতে। মুসলমানরা চাইছিল বড় পুঁজির জন্য ক্ষেত্র তৈরি করতে। এই দ্বন্দ্বটাই সংঘর্ষে গেল, এবং সেটাই দেশভাগে গড়ায় বলে মন্তব্য করেন উমর।

অর্থনৈতিক লাভালাভের কথা প্রসঙ্গে জিন্নাহ বলেছিলেন, কলকাতাকে না পেলে বাংলার কি লাভ? সোহরাওয়ার্দি আরো পরিষ্কার করেই উচ্চারণ করেন, তিনি বাংলা ভাগ চান না, কারণ এতে হিন্দুরা কলকাতা নামক লোভনীয় উপহারটি পেয়ে যাবে, আর ক্ষতি হবে মুসলমানদের। কংগ্রেস ও হিন্দু নেতাদের মনোভাব তো আগেই উল্লেখ করেছি। সেসময় মুসলমান কৃষকদের কাছে আসলে দেশভাগ মানে হয়ে উঠেছিল হিন্দু জমিদারদের পীড়ন থেকে মুক্তি। হিন্দু মধ্যবিত্ত চাইছিল জানমালের নিরাপত্তা, দাঙ্গার অবসান। আর যুদ্ধের চাপে দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটিশদের মনোভঙ্গি ছিলো, ভাগ করো আর জলদি ভাগো, দেশভাগের ব্যাপারে ভারতীয়রা নিজেদের ভেতর মেরেকেটে যা পারছে করুক, এ ব্যাপারে তারা আর সময় ও শ্রম ব্যয় করতে রাজি নয়।

দেশভাগের পরও কিন্তু দাঙ্গা থেমে থাকেনি, সাম্প্রদায়িক হামলাও বন্ধ হয়ে যায়নি। দেশভাগের আগে দুই বাংলায় যে অবিশ্বাস ও অনাস্থার জন্ম নিয়েছিল, সেটি যেন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এখনো অনুরণিত হয়। না ধর্মের বিষয়টি নেই সেই অনুরণনে, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। নির্মাতা আমাদের মনে করিয়ে দেন জীবনজীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে ছোটখাটো কারবার করতে গিয়ে বিএসএফের হাতে নির্মমভাবে খুন হয় ফেলানী। সীমান্তে ভারতের বড়ভাইসুলভ আচরণ কখনো কখনো যে সকল সীমাকে লঙ্ঘন করে তারই সাক্ষ্য দেয় এই মৃত্যু। শুধু সীমান্তে নয়, পানি বন্টন থেকে শুরু করে দুই দেশের বাণিজ্য সকল ক্ষেত্রেই ভারত কর্তৃত্ব ফলায় আর এতে বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতবিদ্বেষ আরো ঘনীভূত হয়।

একে তো ভারত হিন্দু প্রধান দেশ, ঐতিহাসিকভাবে মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের মানুষের সাথে তাদের মানসিক দূরত্ব আছে, সেই দূরত্ব আরো বাড়ে ভূরাজনৈতিক কারণে, সাম্প্রদায়িক কারণেও। ভারতে সাম্প্রদায়িক হামলা হলে, বাংলাদেশেও তার ছায়া পড়ে। সংখ্যালঘুরা কোন দেশেই ভালো নেই। বাংলাদেশ থেকে আমরা জানি সাম্প্রতিক সময়েও হামলা ও হুমকির শিকার হয়ে দেশ ছেড়েছে বহু হিন্দু জনগোষ্ঠী। তাদেরই মতো স্বপন ও ডলি লস্কর। ২০০৩ সালে তারা দেশ ছেড়ে চলে যায় ভারতে। রেল লাইনের ধারে তাদের টিকে থাকার লড়াই। দেখি আরো অনেক মানুষ সেই লড়াইতে সামলি। প্রতিদিনের রুজিরোজগারের চাপে বাংলাদেশকে এখন আর তাদের মনেই পড়ে না।

৩.

তানভীর মোকাম্মেলের এই ছবিতে সমান্তরালভাবে দুটি বিষয় এগিয়েছে। একদিকে যারা উদ্বাস্তু হয়েছিলেন, এপার ও ওপারের সাধারণ মানুষ, তাদের স্মৃতি, তাদের বংশধরদের প্রতিক্রিয়া এবং আরেকদিকে উদ্বাস্তু হওয়া বুদ্ধিজীবীদের বিচার ও বিশ্লেষণ।

যেমন কবি মনীন্দ্র গুপ্ত, তিনি মনে করেন, বরিশাল ছোট শহর ছিলো, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য কলকাতার মতো বড় শহরে আসতেই হতো। সাহিত্যিক অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, দেশভাগ আদতে সকলের জন্যই ভালো হয়েছে। এগারো বছর বয়সে পূর্ববঙ্গের সাভার ছেড়ে যাওয়া লেখক ও গবেষক পবিত্র সরকার অবশ্য মনে করেন, সামাজিকভাবে দুই সম্প্রদায়ের মানুষই চাইতো সম্প্রীতি। মুসলমান ছেলের সাথে সামাজিকভাবে ধুমধাম করে বন্ধুত্ব পাতানোর ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু আমরা তো জানি, কয়েকটি মহলের স্বার্থের কারণেই সেসব সম্প্রীতি টুটে গেছে। অবশ্য তাতে পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে পূর্ববঙ্গের লোকেদেরই লাভ হয়েছে বলে মনে করেন অনেক বুদ্ধিজীবী। যেমন অরুণ সেন ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। দেবেশ রায় বলেন, কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা বাংলা ভাগ করে পশ্চিমবঙ্গকে আলাদা করে নিতে চাইলো, তারা ভেবেছিল হিন্দুরা নিরাপত্তা পাবে। এতে করে বাঙালি মুসলমান সমাজেরই লাভ হয়েছে বলেই তাঁর মত।  তবে লেখক শান্তা সেন মনে করেন, দেশভাগ না হলেও পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের উন্নয়ন ঘটতো।

দেশভাগের ঘটনাটি ঋত্বিক ঘটক ধরতে চেয়েছেন ‘কোমল গান্ধার’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ও ‘সুবর্ণরেখা’ চলচ্চিত্র ত্রয়ীর মাধ্যমে। তিনি বলতেন, শেকড়টা একেবারে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এ কান্না কিভাবে থামাব? সাক্ষ্য দিয়ে বলছিলেন ঢাকায় থেকে যাওয়া ঋত্বিকের বোন প্রতীতি। দেশভাগ সংক্রান্ত স্মৃতি মেদুরতা নিয়ে যত সৃষ্টি আসলে দেখা যায় তার বেশির ভাগটাই পূর্ববঙ্গ থেকে ওপারে যাওয়া শিল্পীদের ভেতর। ওপার থেকে এপারে আসা বাঙালি মুসলমানের প্রাপ্তিযোগ বেশি বলেই কি দেশভাগ করুণ স্মৃতি হয়ে ধরা দেয়নি এপারে আসা সাহিত্যিকদের লেখায়? আনিসুজ্জামান বলেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যারা পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন তাদের তেমন কষ্ট করতে হয়নি। কষ্ট করেছে যারা বিহার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এখানে এসেছিল তারা। উদ্বাস্তু বাঙালি মুসলমানদের তেমন কঠিন পরিস্থিতির ভেতর পড়তে হয়নি। তাই তো বর্ধমান থেকে আসা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ভারতের জন্য এখন শুধু দুর্বল একটা টান অনুভব করেন মাত্র, আর কোন আফসোসও নেই। ছোটবেলার ছেড়ে আসা দেশ তাঁর কাছে ‘লস্ট ওয়ার্ল্ড’। তবে হাসান আজিজুল হকের কাছে এই বিভাজন, বিদারণ রেখা, কলঙ্করেখাও বটে।

দেশভাগ নিয়ে পূর্ববঙ্গের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে অনেক বেশি সাহিত্য রচিত হলেও, সেগুলোকে স্মৃতিমূলক, অগভীর বলে মনে করেন পাবনা জেলা থেকে কলকাতায় যাওয়া দেবেশ রায়। তাঁর অভিমত, সাহিত্যে দেশভাগের স্মৃতির তাড়নাটা বাস্তবের সঙ্গে মেশে না, গভীর প্রভাবটাও নেই।

আরো অনেক কিছুই দেশভাগ সংক্রান্ত সাহিত্য বা চলচ্চিত্রে অনুপস্থিত রয়েছে এখনো। যেমন সাতচল্লিশে শুধু বাঙালি নয়, গারো, হাজং, সাঁওতাল, খাসিয়া, মুন্ডা প্রভৃতি আদিবাসী গোষ্ঠীও দেশত্যাগ করেছিল। তাদের কথা আমরা সেভাবে কোথাও দেখি না। শুধু কি রাজনৈতিক কারণেই মানুষ দেশ ত্যাগ করে যায়? নদী ভাঙনের মতো প্রাকৃতিক কারণেও মানুষ দেশান্তরী হয়। এমন দুজন মানুষের সাক্ষাৎকারও আমরা দেখি ছবিতে। এদের মতো মানুষেরাও বাংলা সাহিত্যে তেমন মূল্য পায়নি।

৪.

দেশভাগ, উদ্বাস্তু ও ধর্মীয় সম্প্রদায়— এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আলোচ্য ছবিতে শুধু বিভেদ বা বিদ্বেষ নয়, মিথষ্ক্রিয়া ও মিলনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন নির্মাতা। যেমন যারা ত্রিপুরাতে চলে গিয়েছিলেন, তারা মনে করেন দেশ ভাগাভাগি বিষয়টি ভালো না হলেও, পূর্ববঙ্গের অনেক সংস্কৃতি এসে ত্রিপুরার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার পশ্চিমদিকে বেনাপোল সীমান্তে রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাতেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। বলা হয় দুই বাংলার মিলনমেলা, ২১ ফেব্রুয়ারির সেই দিনে সেখানে উদীচি শিল্পী গোষ্ঠী গান পরিবেশন করে। সামাজিক অনুষ্ঠানেও দুই পারের মানুষের দেখা হয় ইছামতী নদীতে, প্রতীমা বিসর্জনের দিন। এই যে দুই দেশের মানুষের মাঝে অবিশ্বাস, অনাস্থা, সীমান্তে গুলি, হত্যা, এসবের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান উদযাপনকে অন্ধকার টানেলের শেষ প্রান্তে আলোক বিন্দু বলেই মনে হয়।

দুই পাশের বাঙালির এমন অম্ল-মধুর সম্পর্ককে কলকাতার তরুণরা তুলনা দেন প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে। বাংলাদেশের তরুণরা অবশ্য সম্পর্কটিকে এতোটা রোমান্টিক দৃষ্টিতে দেখেন না। তারা দেশভাগের ফলে পূর্ববঙ্গের লাভ হয়েছে স্বীকার করলেও, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারকে সমালোচনা করেন।

যে দুই ধর্মকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিকে দুটুকরো করে ফেলা গেছে, তিনটি রাষ্ট্রকে জোরপূর্বক ভূমিষ্ঠ করা হয়েছে, সেই দুই ধর্মের মধ্যকার মানুষদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও দাম্পত্যকেও তানভীর মোকাম্মেল যত্নের সাথে আনেন ছবিতে। এবং মতামত দেন, আন্তঃধর্মীয় বন্ধুত্ব ও বিয়ে যত বেশি হবে, ততোই ধর্মীয় ভেদাভেদ কমবে। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাবে।

৫.

তানভীর মোকাম্মেলের মায়ের বাড়ি ছিলো পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাটে। কৃষ্ণনগরে ছিলো নানার কবর। পাকিস্তান আমলে ভারতে যাওয়া সহজ ব্যাপার ছিলো না। তানভীর মোকাম্মেরের মা খুব চাইতেন ভারতের বাবার কবর দেখতে যেতে, কিন্তু পারতেন না। মায়ের এই কষ্ট পরিচালক মনে রেখেছেন। শিল্পী হিসেবে তিনি সেই নিরব কান্নারই অনুবাদ করেছেন ‘সীমান্তরেখা’ নামে। নির্মাতা বলেন, “‘সীমান্তরেখা’ আমি আমার মায়ের স্মৃতির প্রতি এবং সেইসব নারীদের প্রতি উৎসর্গ করেছি ১৯৪৭-এর দেশভাগের ফলে যাদেরকে নিজেদের সংসার, ভিটেমাটি সবকিছু ত্যাগ করতে হয়েছিল।”১০

তানভীর মোকাম্মেল মনে করেন বাংলা ভাগের কারণে ‘বাঙালি জাতির অসীম ক্ষতি হয়েছে যা অপূরণীয়’।১১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তেমনটাই আশঙ্কা করেছিলেন। স্বদেশী আন্দোলন চলাকালে তিনি বলেছিলেন, “যদি বাংলাকে হিন্দুপ্রধান ও মুসলমানপ্রধান এই দুই অংশে একবার ভাগ করা যায় তবে ক্রমে ক্রমে হিন্দু-মুসলমানের সকল বন্ধনই শিথিল করিয়া দেওয়া সহজ হয়। …যে ভেদটা আছে রাজা যদি চেষ্টা করিয়া সেই ভেদটাকে বড়ো করিতে চান এবং দুই পক্ষকে যথাসম্ভব স্বতন্ত্র করিয়া তোলেন তবে কালক্রমে হিন্দুমুসলমানের দূরত্ব এবং পরস্পরের মধ্যে ঈর্ষাবিদ্বেষের তীব্রতা বাড়িয়া চলিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।”১২

ধর্মের ভিত্তিতে দেশ তো আলাদা হয়েছে, কিন্তু দেশের ভেতর যে ধর্মীয় ভেদাভেদ রয়ে গেছে সেটার সুরাহা এখনো পর্যন্ত হয়নি। হয়নি কারণ দেশভাগের মধ্য দিয়ে দুই দিকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সৃষ্টি করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ প্রজ্ঞাবান। দুই সম্প্রদায়ের ভেতর অশান্তির পেছনে আগে যেমন দোষী করা হতো ইংরেজদের, এখন অবশ্য আর তৃতীয়পক্ষ নেই, যাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেয়া যায়। ভোটের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান সকল দেশেই বেশ কার্যকর। সূত্রটি এই অঞ্চলের রাজনীতিবিদরা জানেন এবং সেই অনুযায়ীই তারা রাজনীতি করেন। পার্থক্য এই একসময় বিদেশী শক্তি ভাগ করে শাসন করার খেলাটা খেলেছে, এখন দেশের ভেতর একটি শ্রেণি খেলাটা অব্যাহত রেখেছে।

তানভীর মোকাম্মেলের ছবিতে ইংরেজ আমলের রাজনীতিতে ধর্মের বিষয়টি এলেও, পরবর্তী সময়ে ধর্মের নিকৃষ্ট ব্যবহার আসেনি, সেটি এই ছবির সূচি অন্তুর্ভুক্তও নয়, কিন্তু যেটা বলতে চাইছি, তা হলো, ইংরেজ আমলের চেয়েও নগ্নভাবে ধর্মের ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে এই ভারত উপমহাদেশের রাজনীতিতে। অনায়াসেই আমরা নিতে পারি পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাম। এসব অঞ্চলে ধর্ম বড় ধরনের তুরুপের তাস, শুধু ভোটের রাজনীতি নয়, জমিজমা দখল বা প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ক্ষেত্রেও ধর্ম বেশ কেজো জিনিস।

ব্রিটিশ আমল থেকে একাত্তর সাল পর্যন্ত ধর্ম নিয়ে বিপদজনক খেলার নমুনা দেখেই নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক করার স্বপ্ন দেখেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা, সেটা কিছুটা বাস্তবায়নও হয়েছিল। কিন্তু আবারো আমরা যেন ইতিহাসের উল্টো দিকে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলাম। তানভীর মোকাম্মেলের ছবিতে সেই পথ দেখানো হয়নি, আবারো বলছি, ‘সীমান্তরেখা’র সূচিতে সেটি নেইও, তারপরও কথাগুলো বললাম, কারণ এখনো আমাদের সমাজের মননে ধর্মের সীমান্তরেখা বিরাজ করছে, এর বড় একটি কারণ, আমি মনে করি, রাষ্ট্র ও সংবিধানে ধর্মের সিলমোহর দিয়ে রাখা। রাষ্ট্র যদি সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করে, তাহলে সমাজেও তার প্রতিফলন ঘটে।

ঋত্বিক ঘটকের কথায় ফিরে যাই, তিনি যে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, দেশভাগের মতো শয়তানির প্রতিবাদ করার প্রয়োজনিয়তা কেউ বুঝল না, তিনি বেঁচে থাকলে হয় তো দেখতেন, বাংলাদেশের তানভীর মোকাম্মেল প্রয়োজনটা বুঝেছেন। দেশভাগের নেপথ্যের চরিত্রদের সমালোচনা ও উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাকে কেবল তুলে ধরেছেন তা নয়, সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক বিষয়গুলোও তাঁর গোচরে এসেছে। তাই তো তিনি দুই ধর্মের মানুষকে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে বলেন। অর্থাৎ সংসার করতে বলেন। দুনিয়া তো এক অর্থে সংসারই। সেখানে মিলেমিশে থাকলেই সুখ ও শান্তি বর্ষিত হয়। ‘সীমান্তরেখা’ তাই ইতিহাসের আলোকে যেমন একসাথে সংসার করার পরামর্শ দেয়, তেমনি সংসার ভাঙার পেছনে যারা কাজ করেছে, এখনো করে চলেছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানিয়ে রাখে। ছবিটির একটি মহাফেজিয় মূল্যও রয়েছে। কারণ আমরা জানি এই ছবিতে কথা বলা মনীন্দ্র গুপ্ত ও নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আর বেঁচে নেই। অন্যরাও ধীরে ধীরে বিদায় নেবেন। কিন্তু রয়ে যাবে দেশভাগ নিয়ে তাঁদের ভাবনাচিন্তা ও বেদনার পাঁচালী। তানভীর মোকাম্মেল তাই ধন্যবাদার্হ।

 

[ লেখাটি বাংলা একাডামির পত্রিকায় পূর্ব প্রকাশিত ]


বিধান রিবেরু

লেখক, সাংবাদিক, সিনে-সমালোচক।

ঢাকা, বাংলাদেশ।

সিনে-গ্রন্থ : চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা; চলচ্চিত্র বিচার; বলিউড বাহাস; উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা


দোহাই

 

১. ঋত্বিক ঘটক, সাক্ষাৎকার, চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, (কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০০৭), পৃষ্ঠা-৩৩৫

২. পার্থ চ্যাটার্জি, দ্য সেকেন্ড পার্টিশন ইন বেঙ্গল, অর্জুন গোস্বামী সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বঙ্গভঙ্গ থেকে দেশভাগ’, (কলকাতা: গাঙচিল, ২০১৯), পৃষ্ঠা-২২৭

৩. বিমলানন্দ শাসমল, ভারত কী করে ভাগ হলো, (কলকাতা: হিন্দুস্তান বুক সার্ভিস, ১৯৯১), পৃষ্ঠা-২

৪. অমিতাভ চক্রবর্তী, বঙ্গভঙ্গ: ধর্ম থেকে রাজনীতি, অর্জুন গোস্বামী সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বঙ্গভঙ্গ থেকে দেশভাগ’, (কলকাতা: গাঙচিল, ২০১৯), পৃষ্ঠা-৭৯

৫. আশিস হীরা, উদ্বাস্তু: ইতিহাসে ও আখ্যানে, (কলকাতা: গাঙচিল, ২০১৯), পৃষ্ঠা-১৬

৬. যতীন সরকার, পাকিস্তানের জন্মমৃত্যু-দর্শন, (ঢাকা: জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ২০১৭), পৃষ্ঠা-১৮১-৮২

৭. যতীন সরকার,প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-১৮২

৮. সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইতিহাসের দিকে ফিরে: ছেচল্লিশের দাঙ্গা, (কলকাতা: র‍্যাডিক্যাল, ২০১৫), পৃষ্ঠা-৭৭-৭৯

৯. সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৭৮-৮৪

১০. তানভীর মোকাম্মেল, শিলাদিত্য সেনের নেয়া সাক্ষাৎকার, তানভীর মোকাম্মেল: কিছু কাজকর্ম কিছু বেঁচে থাকা, (কলকাতা: বৈ-চিত্র প্রকাশন, ২০১৮), পৃষ্ঠা-১৫-১৬

১১. তানভীর মোকাম্মেল, প্রাগুক্ত

১২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সদুপায়, কমল চৌধুরী সম্পাদিত ‘বঙ্গভঙ্গ ও সমকালীন বঙ্গসমাজ’, (কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ২০০৫) পৃষ্ঠা-১৬৯

error: Content is protected !!