সেন্সর বনাম স্বাধীন সিনেমা : কাজীর গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই

 বাংলাদেশে সিনেমা বানানোর চেয়ে সেন্সর পাওয়া বেশি কষ্টের!

আপনারা সবাই জানেন যে আমি ‘হরিবোল’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি। আমার নিজের প্রতিষ্ঠান ‘বলেশ্বর ফিল্মস’-এর ব্যানারে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে। মূলত ২০১৭ সালের পুরোটা সময় যায় ‘হরিবোল’-এর প্রি-প্রোডাকশন আর প্রোডাকশন কাজে। বাংলাদেশের ছয়টি ঋতু ধরার জন্য দীর্ঘ প্রায় এক বছর লাগে প্রোডাকশন শেষ করতে। তারপরেও ছবিতে আমরা চারটি ঋতু দেখতে পাব। শীতকাল এবং বর্ষাকাল ধরতে পারি নাই।

২০১৮ সাল পুরোটা গেছে ছবি এডিট করা আর ডাবিং করার কাজে। ২০১৯ সালের বাকি সময়টা ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, সাউন্ড এবং কালার করতে ব্যয় হয়। পোস্ট প্রোডাকশনের তিনটি অংশ- ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, সাউন্ড এবং কালার করেছি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। অবশেষে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে ‘হরিবোল’ ছবির কাজ শেষ হয়। তারপর আমি দেশে ফিরে সেন্সর বোর্ডে ছবিটি জমা দিতে কাগজপত্র তৈরি করতে আরো প্রায় দেড় মাস লেগে যায়। অবশেষে ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর আমি ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেই।

সেন্সর জটিলতা:

সাধারণত একটি ছবি’র সেন্সর হতে ৭ কর্মদিবস এর মত সময় লাগে। কিন্তু আমার জন্য এটি হয়ে গেল পথের কাঁটা। ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড থেকে (নং-১৫.৫৯.০০০০.০০৪.৩১.০৪৯.১৯-২৫২৩) চিঠির মাধ্যমে ‘হরিবোল’ পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ডিজিটাল চলচ্চিত্রের সেন্সর আবেদনপত্রের সাথে সংযুক্তি কাগজ হিসেবে বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। সেন্সর বোর্ডের সেই চিঠির জবাবে আমার (রেজা ঘটক, প্রযোজক, বলেশ্বর ফিল্মস) সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছিল নিম্নরূপ:

১. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের নির্ধারিত চলচ্চিত্র সেন্সর আবেদনপত্রের (পৃষ্ঠা-৩) সংযুক্ত কাগজপত্রের তালিকায় কোথাও বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র জমা দেওয়ার বিষয় উল্লেখ নাই। অতএব প্রাথমিকভাবে চলচ্চিত্র সেন্সর আবেদনপত্রের সাথে বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বা আমার জানার কথা নয়।

২. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখের ২৩২ সংখ্যক স্বারকে ঘোষিত বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র ব্যতিরেকে চলচ্চিত্রের সনদপত্র ইস্যু না করার নির্দেশনাটি বাংলাদেশে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি প্রধান প্রতিবন্ধক। বিএফডিসি থেকে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সাথে কোনো ধরনের লেনদেন হয়নি, বা ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো পর্যায়ে বিএফডিসি’র কোনো সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়নি। তাই বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করা এবং জমা দেওয়ার বিষয়টি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রযোজ্য নয়।

৩. বাংলাদেশে বিএফডিসি’র বাইরে আমরা যারা বিকল্পধারায় স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, এবং বিএফডিসি’র কোনো ধরনের সহযোগিতা গ্রহণ না করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করি, তাদের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখের ২৩২ সংখ্যক স্বারক প্রযোজ্য হবার কোনো সুযোগ নাই। এই স্বারক রীতিমত স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য প্রতিবন্ধক। আমি একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে উক্ত স্বারক সংশোধন করার জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে বিনীত অনুরোধ করছি। উক্ত স্বারকের ঘোষণা সংশোধন করা না হলে তা হবে বাংলাদেশে বিকল্পধারার স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য রীতিমত একটি প্রহসন। আমি এই প্রহসন বন্ধের জন্য বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে বিনীত অনুরোধ করছি।

৪. বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র পাওয়ার জন্য বিএফডিসি যে ধরনের জুজু’র ভয় দেখায়, সেখানে একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতার পক্ষে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার সুযোগ রীতিমত অন্ধের ঈশ্বর দর্শনের মত। একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি বিএফডিসি’র সেই অন্ধত্বকে কোনোভাবেই সমর্থন করি না।

৫. বিএফডিসি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র প্রদানের জন্য কিছু শর্ত আরোপ করে। প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সদস্যপদের সনদপত্র এবং পরিচালক সমিতির সদস্যপদের সনদপত্র জমা না দিলে বিএফডিসি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র প্রদান করে না। বিএফডিসি’র এই প্রচলিত শর্তকে আমি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করি এবং এই জুজু’র ভয়কে আমি কোনো ভাবেই সমর্থন করি না।

৬. প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সদস্যপদের সনদপত্র পেতে একজন প্রযোজককে এক লাখ তিন হাজার টাকা এবং পরিচালক সমিতির সদস্যপদের সনদপত্র পেতে একজন পরিচালককে পঞ্চান্ন হাজার সাতশত টাকা দেওয়ার যে বেসরকারি বিধান, সেই বিধানকে আমি সমর্থন করি না। বিএফডিসি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র প্রদানের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দুটি বেসরকারি সমিতির আজ্ঞাবহ হয়ে কোনো ধরনের শর্ত যুক্ত করতে পারে না। বিএফডিসি’র এসব শর্ত একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মতার জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা।

৭. একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে উক্ত দুই সমিতির সদস্যপদ আমার কোনো কাজে লাগবে না। কারণ উক্ত দুই সমিতির অরাজকতার ইতিহাস এবং চলচ্চিত্র নিয়ে করা রাজনীতির ইতিহাস আমি রীতিমত অবগত। বিএফডিসি কোনোভাবেই একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে কোনো বেসরকারি সমিতির সদপ‌্যপদের জন্য শর্ত জুড়ে দিতে পারে না। বিষয়টি পুরোপুরি ঐচ্ছিক। ঐচ্ছিক বিষয় নিয়ে বিএফডিসি শর্ত জুড়ে দিতে পারে না।

৮. একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমি বিএফডিসি’র এই শর্তের বরং তীব্র প্রতিবাদ করি। বাংলাদেশে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলনের আমি একজন সৈনিক। আমি আমার আদর্শ ও চেতনার পরিপন্থী কোনো শর্ত বা অনুরোধের প্রতি সমর্থন দিতে পারি না।

৯. বিএফডিসি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র নেওয়ার জন্য সরকারিভাবে যদি কোনো ফিস জমা দেবার নিয়ম থাকে আমি কেবলমাত্র সেই ফিস প্রদান করে বিএফডিসি ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র নিতে রাজী আছি। এর বাইরে বিএফডিসি’র কোনো অযৌক্তিক শর্তকে আমি সমর্থন করি না।

১০. ভালো চলচ্চিত্রের স্বার্থে চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সর পাওয়ার বিধানটি বরং সরকারিভাবে বন্ধ হওয়ার আইন করা জরুরী। বর্তমানে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইনের খসড়া সম্পর্কে আমি যতটুকু পড়েছি, এই আইন চালু হলে তা বাংলাদেশে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য আরো বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এদেশে চলচ্চিত্রের সুফল আনার জন্য সরকারকে বরং আরো উদার ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

১১. বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের জন্য এখন পর্যন্ত যেসব আইনের অযুহাত দেখানো হয়, তা ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলের আইনের কপি। যা স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য রীতিমত প্রহসন। স্বাধীন দেশের বয়স ৫০ পূর্ণ হতে চলেছে কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্র আইনের জটিলতার কারণে আমাদের চলচ্চিত্র বিগত নব্বই দশকের পর থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছে। চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচাতে বরং সরকারিভাবে আরো স্বচ্ছ ও উদার সহযোগিতা প্রয়োজন। নইলে এদেশের চলচ্চিত্র একসময় আরো ভয়ংকর বিপদের দিকে যাবে।

১২. বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এদেশের সংস্কৃতি বিকাশে আমি যে ভূমিকা পালন করছি, তা বিএফডিসি’র জুজু’র ভয়ের সাথে সাংঘর্ষিক। আমি আমার আদর্শ ও চেতনা বিসর্জন দিয়ে বিএফডিসি’র অন্ধের ঈশ্বর দর্শনের সাথে একমত নই।

১৩. বাংলাদেশে বিকল্পধারার স্বাধীন চলচ্চিত্র বিকাশের পথে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড উপরে উল্লিখিত আমার বক্তব্যের সাথে একমত হবে বলেই আমি মনে করি। নতুবা এদেশে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন কেবল কাগুজে বাঘের মত বুলি হিসেবে থাকবে। বাস্তবে এদেশে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের সকল পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

১৪. বিএফডিসি আমার নির্মিত ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সাথে কোনোভাবেই জড়িত নয়। তাই বিএফডিসি থেকে ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র নেওয়া এবং জমা দিতে আমি বাধ্য নই। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বরং বিএফডিসি-তে খোঁজ নিতে পারে যে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সাথে বিএফডিসিতে আমার কোনো লেনদেন বা বকেয়ার বিষয় রয়েছে কিনা। যার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, তার থেকে আমার ছাড়পত্র আনার ব্যাপারটি রীতিমত প্রহসন বলেই আমি মনে করি।

১৫. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে আমি বরং বিনীতভাবে অনুরোধ করব, আমার জমা দেওয়া ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রে দেশের প্রচলিত আইন, রাষ্ট্রবিরোধী বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো বিষয় রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা এবং সে বিষয়ে মতামত দেওয়া। একটি ভালো চলচ্চিত্রকে কথিত জুজু’র ভয় দেখিয়ে সেন্সর বোর্ডে আটকে রাখা এদেশের সংস্কৃতি বিকাশের জন্য কোনো শুভ লক্ষণ হতে পারে না।

উপরে বর্ণিত আমার যুক্তি’র সাথে প্রয়োজনে আরো শতশত যুক্তি আমি উপস্থাপন করতে পারব। আমি বরং বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র জমা দেওয়ার এই প্রক্রিয়াকেই বাংলাদেশে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্ণিত করি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড আমার উপস্থাপিত যুক্তিগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখবে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজনীয় যে কোন ফিস প্রদান করতে আমি রাজী আছি। কিন্তু কোনো অন্যায় ও অযৌক্তিক আবদারকে গলধকরণ করে আমি আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রকে কলুষিত করতে অপারগ। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড আমার বক্তব্য অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে শীঘ্রই আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রকে সেন্সর সনদপত্র প্রদান করবে।

শুরু হয় চিঠি চালাচালি:

আমার চিঠির জবাবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড থেকে আবারো আমাকে চিঠি দিয়ে বিএফডিসি’র ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র চাওয়া হয়। আমি তখন আবার বিএফডিসিতে যাই বিএফডিসি’র ছাড়পত্রের জন্য। তখন বিএফডিসি থেকে আমাকে একটি তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই তালিকায় সেই পুরানো কাসুন্দি। বিএফডিসিকে আগে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি ও চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সদস্যপদ দেখাতে হবে। তারপর তাদের ফান্ডে এক লাখ টাকা জমা দিতে হবে। তারপর আমি বিএফডিসি থেকে ছাড়পত্র পাব।

আমি তখন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে আবারো চিঠি লিখলাম। সেখানে আবারো উল্লেখ করলাম যে, আমার বলেশ্বর ফিল্মস প্রযোজিত ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ বলেশ্বর ফিল্মস-এর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্মিত হয়েছে। বিএফডিসিকে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের কোনো পর্যায়ে কোথায়ও কাজে লাগানো হয় নাই। বিএফডিসি’র কোনো ইকুইপমেন্টস যেমন ক্যামেরা, লাইট বা প্রোডাকশনের কিছুই ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয় নাই। এমনকি বিএফডিসি’র কোনো শুটিং লোকেশানেও ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের কোনো দৃশ্য ধারণ করা হয় নাই। তাই বিএফডিসি’র কথিত ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের জন্য মোটেও প্রযোজ্য নয়।

একজন লেখকের বইপ্রকাশের জন্য কোনো লেখকের যেমন বাংলা একাডেমি থেকে কোনো ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না, একজন চিত্রশিল্পীকে যেমন তার চিত্রকর্মের প্রদর্শনীর জন্য শিল্পকলা একাডেমি থেকে কোনো ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না, একজন কৃষকের কোনো ফসল তৈরির জন্য যেমন কৃষি মন্ত্রণালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয় না, তেমনি একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আমার নির্মিত ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের জন্য বিএফডিসি’র কোনো ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্রের প্রয়োজন থাকতে পারে না।

আমি বাংলাদেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ‘হরিবোল’ নামে যে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছি, সেখানে বিএফডিসি’র কোনো ধরনের কোনো যোগসূত্র ছিল না। তাই বিএফডিসি থেকে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের জন্য কোনো ছাড়পত্রের প্রয়োজন নাই। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের দায়িত্ব আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রে দেশবিরোধী বা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে এমন কোনো ঘটনা রয়েছে কিনা তা যাচাই-বাছাই করে সেন্সর প্রদান করা।

আমি ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে ঘোষণা করছি যে, ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ও পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পাশাপাশি এদেশের গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড নিজেদের মেধা ও যুক্তির পরিচয় দিয়ে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সেন্সর প্রদান করতে আগ্রহী হবে।

কিন্তু আমার চিঠির জবাবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড আর কোনো সাড়া দেয়নি। মৌখিকভাবে তারা আমাকে বলেছে, যদি বিএফডিসি’র কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে তারা সেন্সর দিতে পারে। তারপর দফায় দফায় আমি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান ও সচিবের সাথে দেখা করেছি। কিন্তু আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সেন্সর এখন পর্যন্ত পাই নাই। মোদ্দাকথা আমি এখন আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সেন্সর নিয়ে আটকে আছি।

চলচ্চিত্রে চাঁদাবাজির নতুন মডেল- কাজীর গরু কাগজে আছে গোয়ালে নেই:

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বিএফডিসি’র ছাড়পত্র ছাড়া আমার ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সেন্সর দেবে না। প্রথম কথা হলো যারা বিএফডিসি’র বাইরে স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তাদের কেন বিএফডিসি’র ছাড়পত্র লাগবে? যার সাথে কোনো কাজই হলো না, তার থেকে কীসের ছাড়পত্র নিতে হবে? আর বিএফডিসি’র ছাড়পত্র আনতে গেলেই সেখানে নানান কিসিমের সমিতির নামে প্রকাশ্যে চলছে যত চাঁদাবাজি। আর এই চাঁদাবাজিতে একজন স্বাধীন নির্মাতা/প্রযোজকের লাগবে মোটামুটি তিন লাখ টাকা। তিন লাখ টাকার একটা প্যাকেজ। আপনি সিনেমা বানানোর পর এই চতুষ্টয় সিন্ডিকেটকে তিন লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে তবেই পাবেন বিএফডিসি’র ছাড়পত্র। এই দুষ্টু সিন্ডিকেট চক্রের পারস্পরিক সম্পর্কটা আপনি বুঝতে না পারলে আপনার মত আহম্মক আর দুনিয়ায় নাই।

সরকারি নিয়মের দোহাই দিয়ে এই সিন্ডিকেট সরকারের চোখের সামনে চলচ্চিত্রের উপর প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। আর চাঁদাবাজির জন্য তারা টার্গেট করেছে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। অথচ আমাদের দেশে যারা বিকল্প ধারার স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা বলেন, তারা এই সিন্ডিকেটের এই সরকারি নিয়মের দোহাই দিয়ে চাঁদাবাজি নিয়ে কিছুই বলেন না। বলেন না কেন? কারণ এই চতুষ্টয় সিন্ডিকেটের তারা শত্রু হতে চায় না। এই সিন্ডিকেটের সকল অনিয়ম মেনে নিয়েই তারা নিজেদের চলচ্চিত্রের সেন্সর করিয়ে নেয়।

চতুষ্টয় সিন্ডিকেট কারা? বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি এবং চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। কী আপনি আকাশ থেকে পড়লেন নামগুলো শুনে? থামুন মশাই, আগে মন দিয়ে সবকিছু জানুন।

১. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চলচ্চিত্রের সেন্সরের জন্য যে সুনির্দিষ্ট আবেদনপত্র, সেই সেন্সর আবেদনপত্রের কোথাও বিএফডিসি থেকে ছাড়পত্র/অনাপত্তিপত্র নামক কোনো কাগজ চাওয়া হয় না। অর্থ্যাৎ সরকারি নিয়মে কোথাও বিএফডিসি’র ছাড়পত্র নেওয়ার কোনো নিয়ম নাই। এবার প্রশ্ন হলো তাহলে সেন্সর বোর্ড কীসের ভিত্তিতে এই ছাড়পত্র দাবি করে? তারা নিজেরা (এই দুষ্ট চক্র) একটা মিটিং করে সেই কপি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের একান্ত সচিবকে সিসি দিয়ে সেই স্মরকের দোহাই দিয়ে এই ছাড়পত্র চায়! সেন্সর বোর্ডে চলচ্চিত্র জমা দেবার পর সেন্সর বোর্ড থেকে চিঠি দিয়ে আপনাকে বিএফডিসি’র এই কথিত ছাড়পত্র জমা দিতে বলা হয়।

২. এবার স্বাভাবিক কারণেই আপনি ছুটে যাবেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনে। সেখানে তারা তাদের মত কিছু নিয়ম কানুন বানিয়ে রেখেছে। তার আগে আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করুন কী লেখা থাকে এই ছাড়পত্রে? এই ছাড়পত্রে লেখা থাকবে- ‘অমুক চলচ্চিত্রের জন্য বিএফডিসিতে কোনো দেনা পাওয়া নাই। অতএব অমুক চলচ্চিত্রে সেন্সরের জন্য বিএফডিসি’র কোনো আপত্তি নাই’। এই দুই লাইনের ছাড়পত্র পেতে এবার আপনার সত্যিকারের লড়াইটা শুরু হবে।

৩. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন থেকে ছাড়পত্রের জন্য একজন স্বাধীন নির্মাতা/প্রযোজককে দিতে হবে এক লাখ টাকা। কিন্তু যারা এফডিসিতে সিনেমা বানায় তারা বিনামূল্যে এই ছাড়পত্র পায়। এই টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে ট্রেজারি চালান হিসেবে জমা হয় না। এই টাকা জমা দিতে হবে বিএফডিসি’র ফান্ডে। গত ১৫ জানুয়ারি ২০২০ বিএফডিসি স্বাধীন নির্মাতা/প্রযোজকদের জন্য এই নতুন ফিস ধার্য করেছে এক লাখ টাকা। এর আগে এই দুই লাইনের ছাড়পত্রের ফিস ছিল দশ হাজার টাকা।

এই এক লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকার পাবে না। এই টাকা পাবে বিএফডিসি’র নিজস্ব ফান্ড। আপনি কী এবার এক লাখ টাকা বিএফডিসি’র তথাকথিত ফান্ডে জমা দিলেই ছাড়পত্র পাবেন? আরে না মশাই! এবার আপনাকে এই সিন্ডিকেটকে আরো চাঁদা দিয়ে আসতে হবে। এবার বিএফডিসি বলবে আপনি প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি এবং পরিচালক সমিতির সদস্য না হলে আপনি এই ছাড়পত্র পাবেন না। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো ভাবেই দুটি বেসরকারি সমিতি’র সদস্য হতে আপনাকে বাধ্য করতে পারে না। অথচ সবার চোখের সামনেই একটা অনিয়মকে নিয়ম বানিয়ে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

৪. এবার আপনি প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতির সদস্য না হলে বিএফডিসি ছাড়পত্র দেবে না। এই বেসরকারি সমিতি হলো বিএফডিসি’র চাঁদাবাজির আরেকটা চক্র। এখানে এক বছরের জন্য সদস্যপদ পাবেন এক লাখ তিন হাজার টাকার বিনিময়ে। এই টাকাও বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি চালান হিসেবে জমা হয় না। সমিতির ফান্ডে জমা দিতে হবে। আপনি পরের ছবি বানাতে বানাতে আপনার এক বছরের মেয়াদ শেষ। নতুন ছবি বানানোর সময় নতুন করে আবার চাঁদা দিয়ে সদস্য হবেন। চাঁদাবাজির কৌশলটা কী একটু বোঝা যাচ্ছে?

৫. প্রযোজক সমিতির সদস্য হতে আপনাকে পরিচালক সমিতির সদস্য হতে হবে। পরিচালক সমিতির সদস্য ফি ৫৫ হাজার ৭০০ টাকা। এই টাকাও বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি চালানে জমা হয় না। আপনাকে জমা দিতে হবে ওদের সমিতির ফান্ডে। এরাও এফডিসি’র এই চাঁদাবাজির আরেক চক্র।

৬. এই তিন চক্র আবার সেন্সর বোর্ডের সবকিছুর যোগসূত্র। সেন্সরের মূল আবেদনপত্রে কোথাও বিএফডিসি’র ছাড়পত্রের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নাই। আপনাকে ধরিয়ে দেবে সেন্সর বোর্ডের একটি স্মারক। এই স্মরকের আগামাথা তথ্য মন্ত্রণালয়ে কেবল কাগজে কপি আছে। তথ্য মন্ত্রণালয় এই স্মারকের শক্তি ও এটা নিয়ে চলচ্চিত্রে চাঁদাবাজির খবর স্বীকার করে না। তারা বলবে এটা নিয়ম। নিয়মটা কে বানালো? বিএফডিসি, প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি, পরিচালক সমিতি আর সেন্সর বোর্ড মিলে এই নিয়ম বানিয়েছে।

৭. এর বাইরে আপনি কেবল সরকারি নিয়ম অনুসারে আপনার ছবির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সেন্সর বোর্ডে আপনার ছবি পরীক্ষণ ও প্রদর্শনের ফি দেবেন। সেটাই একমাত্র সরকার বাহাদুরের কোষাগারে যায়। আর ওটা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার মত। সরকার বাহাদুর কেবল এই ২০/৩০ হাজার টাকার খবর জানে। মাঝখানের এই স্মারক আর সমিতি আর ছাড়পত্রের নামে যে নিরব তিন লাখ টাকার চাঁদাবাজি হচ্ছে, এটা সরকার বাহাদুর জানেই না।

যদি সরকারি নিয়ম হয় তাহলে সকল টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা হবার নিয়ম। এর বাইরে আপনি যত টাকা যাদের ফান্ডে দেবেন, এটার কোনো হিসাব সরকার জানবে না। চাঁদাবাজির এই কৌশল দিয়েই স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সায়েস্তা করার কৌশল নিয়েছে চলচ্চিত্রের এসব দুষ্টু সিন্ডিকেট।

আমাদের বড় বড় নির্মাতারা এসব নিয়ে কথা বলেন না। সোজা কথা তারা এই চক্রের শত্রু হতে চান না। যার যার নিজের স্বার্থ নিয়ে তারা এক একজন বড় বড় নির্মাতা। আমি বলতে চাই এফডিসি’র বাইরে আপনি যদি সিনেমা বানাতে চান, তাহলে এই চক্রের চাঁদাবাজি খাতে মিনিমাম তিন লাখ টাকা পকেটে রাখবেন। নইলে আপনি চলচ্চিত্রের জন্য সেন্সর পাবেন না।

কতিপয় সাধারণ প্রশ্ন:

প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি যখন একটা বই লেখেন তখন কী বাংলা একাডেমিতে চাঁদা দিয়ে আপনাকে সেই বইয়ের জন্য প্রকাশনা ছাড়পত্র নিতে হয়? আপনি যখন আপনার শিল্পকর্মের প্রদর্শনী করেন, তখন কী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চাঁদা দিয়ে আপনার প্রদর্শনীর জন্য কোনো ছাড়পত্র নিতে হয়? একজন কৃষক যখন ফসল বানান, তার কী কৃষি মন্ত্রণালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে টাকার বিনিময়ে কোনো ছাড়পত্র নিতে হয়? তাহলে একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা/প্রযোজককে কেন চলচ্চিত্রে সেন্সর পেতে বিএফডিসি থেকে ছাড়পত্র নিতে হবে? কোন আইনে নিতে হবে? কেন নিতে হবে? এই তিন লাখ টাকার চাঁদাবাজি নিয়ে সরকার কিছু জানে না কেন?

চলচ্চিত্রের এই চাঁদাবাজি যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন স্বাধীন চলচ্চিত্র বলে আপনি যতই আওয়াজ দেন, সবকিছু এদের নানা উপায়ে ম্যানেজ করার পর বাহাদুরী। আপনি হয়তো পকেটে ৫টা পাণ্ডা মন্ত্রী নিয়ে ঘোরেন। আপনি তিন লাখের জায়গায় একটু কম খরচে নিজের পিঠ বাঁচাবেন। কিন্তু চলচ্চিত্রের নামে এই চাঁদাবাজি নিয়ে আমাদের দেশে কেউ উচ্চবাচ্য করে না।

প্রশ্ন হচ্ছে- আমার সিনেমার রিলিজ ডেট কেন তথাকথিত সমিতি থেকে নিতে হবে? সিনেমা বানাবেন আপনি আর সেই সিনেমার রিলিজ ডেট দেবে আপনার থেকে চাঁদাবাজি করা তথাকথিত এই সিন্ডিকেট? স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের বানানো সিনেমায় বিএফডিসি বা প্রযোজক সমিতি বা পরিচালক সমিতি’র যেখানে ন্যূনতম কোনো ভূমিকা নাই, সেখানে তাদের এই অনিয়ম মেনে কেন তিন লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে?

একটা জিনিস খেয়াল করুন, আপনি যদি বিএফডিসি থেকে সিনেমা বানান, তখন আপনি বিনামূল্যে ছাড়পত্র পাবেন। কিন্তু বিএফডিসি’র বাইরে সিনেমা বানালে আপনাকে এই চাঁদা দিতেই হবে। এরকম চাঁদাবাজির কারণে এদেশে ভালো সিনেমা হচ্ছে না। সরকার বাহাদুর মুখে বলছে তারা সিনেমা বান্ধব এবং চলচ্চিত্রের উন্নয়ন চায়। কিন্তু কাজে গিয়ে দেখেন আপনি এই চতুষ্টয় সিন্ডিকেটের বাইরে সিনেমা বানানো কত কষ্টের!

‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রটি আমি বাংলাদেশের মানুষকে প্রথম দেখাতে চেয়েছিলাম। এখন এই তিন লাখ টাকা আমি কোনোভাবে সংগ্রহ করতে পারলে ওদের চাঁদা দিয়ে ‘হরিবোল’ সেন্সর করাবো কিনা তাই ভাবছেন? মোটেও না। আমি নতুন একটি শর্ট ফিল্ম বানাতে চলে যাব। তবুও এই দুষ্টু সিন্ডিকেটকে এক টাকাও চাঁদা দেব না। তাহলে ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ কী?

দেশের বাইরে আমি যে কোনো দেশ থেকে ‘হরিবোল’ রিলিজ করে দেব। সেই খবর খুব শিঘ্রই পাবেন আপনারা। সিনেমা যখন বানিয়েছি তখন তা দেখানোর সকল কৌশলও আমার জানা আছে মশাই। হয়তো সিনেমা হল থেকে আমার পুঁজি ফেরত আসার রাস্তাটা এরা বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু সিনেমা দেখানো এরা কোনো ভাবেই বন্ধ করতে পারবে না। কারণ আপনার হাতেই এখন সিনেমা দেখার মত ডিভাইস রয়েছে। আর আপনারা সবাই আমার সিনেমার দর্শক।

 

তাহলে স্বাধীন নির্মাতাদের বানানো সিনেমার ভবিষ্যৎ কী?

 

ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চার মাস আমি ‘হরিবোল’ চলচ্চিত্রের সেন্সর নিয়ে যত দৌড়ঝাপ করেছি, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড টু বিএফডিসি, বিএফডিসি টু চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিবেশক সমিতি, প্রযোজক সমিতি টু পরিচালক সমিতি, এই দুষ্টু সিন্ডিকেটে দৌড়ঝাপ করে আমার সুস্পষ্টভাবে মনে হয়েছে, এরা কেউ চলচ্চিত্রের ভালো চায় না। এরা কেবল অর্থ চেনে। এর বাইরে এরা সিনেমার কিছুই বোঝে না। সে কারণে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই সিন্ডিকেটের পেছনে দৌড়ঝাপ করে আমার মূল্যবান সময় আর নষ্ট করব না।

এই দুষ্টু সিন্ডিকেটের পেছনে দৌড়ঝাপ করলে আমার চলচ্চিত্র বানানোর আগ্রহটাই মাঠে মারা যাবে। তাই আমি আর এদের পেছনে সময় নষ্ট করব না বলে ঠিক করেছি। প্রশ্ন হল- আমি যখন এই চার মাস এদের পেছনে দৌড়ঝাপ করলাম, তখন সামাজিক স্যোশাল মিডিয়া এবং পত্রপত্রিকায় নিয়মিত এটা নিয়ে লেখালেখি করেছি। দেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা সেই খবর দেখেছেন। কিন্তু সত্যিকারভাবে কেউ আমার পেছনে এগিয়ে আসেনি। এটা নিয়ে কোনো প্লাটফরম থেকে কোনো ধরনের আন্দোলন বা বক্তব্য বা প্রতিবাদ আমার নজরে আসেনি।

ব্যক্তিগতভাবে দু’একজন আমাকে নানান কিসিমের পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ মামলা করার পরামর্শ দিয়েছেন। একজন নির্মাতা হিসেবে মামলাবাজি করাটা আমার কাজ নয়। তাই আমি সেই পথে যাইনি। কারণ মামলা করলে আমার আবার টাকা নিয়ে উকিলদের পেছনে পেছনে দৌড়াতে হবে। আমি মোটেও সেরকম মানুষ নই। তাই আমি নিজের কাজের মধ্যে রয়েছি। আর বাংলাদেশে সিনেমা না দেখানোর জন্য ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছি।

আপনি যদি আমার মত স্বাধীন নির্মাতা হন, তাহলে এই দুষ্টু সিন্ডিকেট ফেইস করার পর আমার মত মানসিক অবস্থা আপনার না হওয়া পর্যন্ত আপনিও ব্যাপারটা হান্ড্রেড পারসেন্ট বুঝবেন না। কারণ আমি যখন একা একা হাজারবার চিৎকার করেছি, আপনারা বসে বসে মুচকি হেসেছেন। তো আপনি যখন ফেইস করবেন, তখন আরেকদল বসে বসে মুচকি হাসবে। কিন্তু বাংলাদেশে এই দুষ্টু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়ানোর মত মানসিকতা আপনাদের যতদিন না হবে, ততদিন এদেশে স্বাধীন চলচ্চিত্রের কোনো ভবিষ্যৎ নাই।

হ্যা, আপনি সিনেমা বানিয়ে দেশের বাইরে বিভিন্ন ফেস্টিভালে পাঠাতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশে মুক্তি না দিয়ে আপনি এদেশে কোনো কমার্শিয়াল শো করতে পারবেন না। আমি জানি বাংলাদেশে এখন বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। অনেক নতুন ছেলেমেয়েরা চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসছেন। পাইপ লাইনে অনেকেই আছেন যারা স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র বানাবেন। কিন্তু আমার ডাকে কেউ সাড়া দেন নাই। তাই এই দুষ্টু চক্রকে আপনাদের সবাইকেই একদিন ফেইস করতে হবে।

এই দুষ্টু চক্র ফেইস করতে স্বাধীন নির্মাতারা যতদিন জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন না করবে, ততদিন এই চক্রের বাইরে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আমার মত একসময় বিরক্ত হয়ে আশাহত হয়ে দৌড়ঝাপ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। তিন বছর একটি সিনেমার পেছনে সময় দিয়ে সেই সিনেমা থেকে এখন পর্যন্ত একটি টাকাও ঘরে তুলতে পারি নাই। এই কষ্ট যতদিন আপনার নিজের না হবে, ততদিন আপনার কাছে এসব রূপকথার গল্প মনে হবে। আপনি নিজে যেদিন আমার মত সরাসরি ভুক্তভুগি হবেন সেদিন আপনার সিনেমা বানানোর ইচ্ছা কেমন হয়, তা টের পাবেন।

এই দুষ্টু সিন্ডিকেট ভাঙতে স্বাধীন নির্মাতাদের জোটবদ্ধ হয়ে যৌথ ইশতেহার নিয়ে মাঠে নামতে হবে। সেটা যতদিন না হচ্ছে ততদিন কাজীর গরু কেবল কাগজে থাকবে গোয়ালে দেখা যাবে না। আশা করি আমার পরিশ্রম, কষ্ট এবং হাহাকার আপনারা বুঝতে পারবেন। আপনি যদি স্বাধীনভাবে এদেশে চলচ্চিত্র বানাতে চান, আপনাকে এসব জেনে বুঝে তারপর নামতে হবে। নইলে ফেস্টিভাল কেন্দ্রিক ছবি বানিয়ে যা করার তাই করবেন। কারো কিচ্ছু বলার নাই।


লেখক :

রেজা ঘটক

কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা


 

 

error: Content is protected !!