‘এ পথেই আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’ – সিনেমা এবং কিছু কথা

এ পৃথিবীর রণ-রক্ত সফলতা / সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।

শেষ সত্য বলে আদৌ কি কিছু আছে? পরিবর্তনের পথরেখা ধরে পৃথিবীর যাত্রা। থেমে সে থাকেনি। আমরা মানুষেরা তাকে ব্যবহার করেছি কেটে ছেঁটে। আমাদের মাপে এনে বসিয়ে দিয়েছি। ফল কি হয়েছে? ফল মানুষের ক্রমাগত নিষ্ঠুরতায় পৃথিবী আমাদের বন্দী করেছে, কয়েদ করেছে। তবে সে শিখিয়ে দিচ্ছে নতুন করে নির্জনতার আস্বাদ নিতে। একটা ভীষণ বেদনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা সবাই। চারিদিকে মৃত্যু আর দূর্ভিক্ষের সাইরেন বেজে উঠছে। তবুও জীবন বহমান। মানুষ খড়কুটো আগলে হলেও আবার চলতে শুরু করে। আজকের পৃথিবীর এই বিপর্যস্ততার পেছনে প্রকৃতিকে দায়ী করে কোন লাভ নেই, এ দায় আমাদের, মনুষ্যপ্রজাতির।

ভবিষ্যত পৃথিবীর প্রতি আস্থা রেখেই ‘অকালবোধন’ এর এবারের আয়োজন সিনেমা নিয়ে। বর্ষাবন্দনায় আমরা নানামুখী চিন্তায় ডুবে থাকবো সিনেমার গুচ্ছ গুচ্ছ কিছু ভাবনা নিয়ে। কিছুটা চুপ করে অনুভবের, কিছুটা গালে হাত দিয়ে ভাববার, কিছুটা নিজের মধ্যে অন্তর্গহনের প্রয়াসে আষাঢ়ের প্রথম প্রহরে আমাদের এই আয়োজন।

এ পর্যায়ে ‘সিনেমা’ নিয়ে একটুখানি বলবার লোভ সামলে নিতে পারছি না। সিনেমা যার বয়স সোয়াশ’ বছরের কিছু কম। বিষ্ময়ের বোধ নিয়ে যে মাধ্যমটির জন্ম, সেটি কিন্তু কেবল বিষ্ময়ের আর বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিল্পের সর্বকনিষ্ঠ এই মাধ্যমটির সাথে সরাসরি অর্থ লগ্নিকারীর ব্যাপারটা জড়িত থাকায় সিনেমাকে মনে করা হয় ব্যবসা করার একটি মাধ্যম, যা কেবল দর্শকের দু’ঘন্টার মনোরঞ্জন করবে। পৃথিবীর তাবৎ শিল্পের কোনটাই নিছক মনোরঞ্জন বা বিনোদন দেওয়ার জন্য সৃষ্টি হয় না। জীবনানন্দ যখন বলেন ‘মরণের পরপারে বড়ো অন্ধকার / এইসব আলো প্রেম ও নির্জনতার মতো’। কিংবা গ্যাটের ফাউস্ট যখন বলে ‘I am part of that power which eternally wills evil and eternally works good’ কিংবা ভাবুন তো ভ্যানগগের ‘Starry Night’ পেইন্টিং এর কথা –এসবের মধ্য দিয়ে ঠিক কোন ধরণের বিনোদন উৎসারিত হয়? শিল্প কেবল মানুষের হৃদয়ে একটি মুহুর্তের, একটি ক্ষণকালের আভাসের মতো একটি সূক্ষ্মবোধের দ্যোতনা ছড়িয়ে দিতে পারে। সেই বোধ থেকে আমরা দর্শক বা পাঠক হিসেবে কেবল রস আস্বাদন করতে পারি। ভারতীয় নাট্যশাস্ত্রে যে নবরসের কথা উল্লেখ আছে, সেই রসসমূহ আমাদের মনে নানা ধরণের ভাবের উদ্রেক করে।

আমরা শিল্পের অন্তর্গূঢ় ভাবের সাথে একাত্ম হতে পারি। তবে রস আনন্দদায়ক কিভাবে? দুঃখের কাব্য নাটক থেকে আমরা দুঃখ নয়, আনন্দ লাভ করি। এরিস্টটল বলছেন, ভীতি ও করুণার মিশ্রণে ক্যাথারসিস ঘটে এবং ট্র্যাজিক প্লেজার লাভ করে থাকি আমরা। যেমনটা শেলি বলে থাকেন, ‘তীব্রতম দুঃখই মহোত্তম আনন্দের উৎস’। সিনেমায় ফিরতে আমি রবীন্দ্রনাথের কথা ধার করবো। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘শিল্পের কাজ সত্যকে নিয়ে আর সেই সত্য সাহিত্যে রূপায়িত হলেই সাহিত্য আনন্দদায়ক’। রবীন্দ্রনাথ আরো যখন বলেন, ‘দুঃখের তীব্র উপলব্ধিও আনন্দকর, কেন না সেটা নিবিড় অস্মিতাসূচক’। অর্থাৎ শিল্প একই সাথে ‘সত্য’ এবং প্রচণ্ডরকম ‘সাবজেক্টিভিটি’ – এই দুটি বিষয় নিয়ে কাজ কারবারে মেতে থাকে।

সিনেমাও শিল্পের এমন একটি মিডিয়াম যেখানে জীবনের সেই সত্যকে আরও বেশি কাছ থেকে আরও বেশি নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরী করে। সিনেমাকে বলা হচ্ছে ‘Temporal medium’ অর্থাৎ ‘Time’ বা সময় এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব সময়ের একটি অভিঘাত আপনি দুই ঘন্টার আরেকটি বাস্তব সময়ের মধ্যে বসে উপলব্ধি করবেন। সেই সাথে এর মধ্যে দুটি ‘স্থানগত’ দু’টি রিয়্যালিটিও উপলব্ধ হয়। একটি সিনেমার অই নির্দিষ্ট সময়ের কালিক, স্থানিক সত্য, আরেকটি দর্শক বা পাঠক হিসেবে আপনার স্থানিক সত্য। সিনেমার শক্তি এখানেই সব থেকে বেশি যা সত্যের এত কাছে পৌঁছাতে পারে। কেবল দৃশ্য-শব্দের সমাহার যে সিনেমা নয় এ ব্যাপারটি আমাদের বুঝে উঠতে দর্শক হিসেবে বেশ বেগ পেতে হয়। কেন না হলিউড বা স্টুডিওভিত্তিক বাণিজ্যিক পপকর্ণ চিবানো সিনেমা যেমন আছে, তেমনি আছে ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামের বিস্তার। টেকনোলজি আর ইন্টারনেটের পৃথিবীতে আমরা ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামের সাথে এত বেশি যুক্ত, পরিচিত যে সিনেমা আর এইসব ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামকে এক করে ফেলার প্রবণতা কাজ করে শুধু নয়, বেশিরভাগ মানুষ করেও ফেলে। সিনেমা যে নিছক ভিজ্যুয়াল মিডিয়াম নয়, তার জন্য আপনাকে তাত্ত্বিক কোন বই পড়তে বলবো না, শুধু এটুকু বলবো যে পূর্ব থেকে পশ্চিম, উত্তর থেকে দক্ষিণ – চ্যাপ্টা পৃথিবীর কোণায় কোণায় এরকম বহু সিনেমা রয়েছে যেগুলো আপনার ভিজ্যুয়াল মিডিয়ামে অভ্যস্ত চোখকে সত্যিকারের ‘সিনেমা’ দেখার উপলব্ধি দিতে পারবে। রবের ব্রেসোঁ থেকে ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভ – ফ্রাঁসোয়া ক্রুফো, জ্যঁ লুক গদার, এগনেস ভার্দা, ক্লদ শ্যাব্রল, এরিক রোমার; অন্যদিকে নিউ জার্মান সিনেমার রেইনার ফাসবাইন্ডার, ওয়ার্নার হারজগ, ভিম ভেন্ডার্স, মার্গারিটা ভন ট্রোটা; রাশান আন্দ্রে তার্কোভস্কি, সের্গেই পারাজনাভ; ইটালির ফ্রেডরিকো ফেলিনি, পিয়ের পাসোলিনি, মিকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনি; আফ্রিকান ওসমান সেমবেন, জিব্রিল দিয়োপ মামবেটি; মধ্য ইউরোপে শান্তাল আকারম্যান, বেলা তার; জাপানের ইয়াসুজিরো ওজু, আকিরা কুরোসাওয়া, কেনজি মিজোগুচি, মিকিও নারুসে; ভারতের সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, মণি কাউল, কুমার সাহানি, জন আব্রাহাম, আদুর গোপালকৃষ্ণান – যাদের নাম এখানে উচ্চারিত হলো এর বাইরেও রয়ে গেছে আরও অনেক নাম। যাদের শুধু নাম করতে গেলেই আমার আরও কয়েক হাজার শব্দের প্রয়োজন পড়বে। ‘সিনেমা’ কে বুঝতে চাইলে, সিনেমার ভেতরে লুকায়িত সত্যকে,  শিল্পকে, সুন্দরকে উপলব্ধি করতে চাইলে সিনেমা দেখার দৃষ্টিকেও ঘোরাতে হবে। যেতে হবে সত্যিকার স্রষ্টাদের কাছে।

ঠিক এই জায়গা থেকে সিনেমা নিয়ে আমার ভাবনা এবং এ কারণেই সিনেমা নিয়ে লেখাপড়ারও কোন বিকল্প নেই। ভালো সিনেমা দেখা, ভালো সিনেমা নিয়ে লেখালেখি যত হবে সিনেমা তত বেশি তার শেকড় বহুদূর পর্যন্ত ছড়াতে সক্ষম হবে। নির্মাণ আর পঠন পাঠনের পাশাপাশি পথ চলা- সিনেমাকে আরও বেশি নিজস্বতায় পৌঁছে দেবে। ‘অকালবোধন’ এর আষাঢ় সংখ্যায় আমরা উপস্থিত হয়েছি ‘সিনেমা’ নিয়ে। সিনেমাকে আরেকটুখানি কাছে গিয়ে উপলব্ধি করবার, বোঝবার প্রয়াসে আমাদের এই আয়োজন। এক গভীর দুস্থ সময়ের মাঝে দাড়িয়েও আমরা বিশ্বাস করি – ‘এ পথেই আলো জ্বেলে- এ পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’।


লেখক :

লাবনী আশরাফি

লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা


 

error: Content is protected !!