করোনাকালীন চলচ্চিত্র উৎসব

“সেলিব্রেটিদের ফিজিক্যাল উপস্থিতিই অনেক জানাজার মূল উপাদান।”

 

চলচ্চিত্র উৎসব; ভাবলেই চোখের সামনে প্রথমত ভেসে ওঠে সারা পৃথিবী থেকে আগত হাজারো গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, লাল কার্পেটে অভিনয়শিল্পীদের দর্শক মাতানো হেঁটে যাওয়া, একসঙ্গে স্ক্রিনিং হলঘরের ভেতরে কয়েক ঘণ্টা বসে সময় কাটানো, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে আফটার পার্টি—যেখানে অস্কারজয়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। কিন্তু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এই নিয়ে তৃতীয় মাস চলছে লকডাউনের। এখন অতীতের উত্সবগুলির স্মৃতি অনেকের কাছে কেবলই এক নস্টালজিক প্রেরণা।

গুগল ক্যালেন্ডার এবং টাইমহপ মে মাসে মে কান উৎসব হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। অথচ সেই লাল সিঁড়ি, মার্জিত গাউন এবং দুরন্ত পার্টি—কিছুই সম্ভব হয়নি কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে। অনেক উৎসব এবারের মতো বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে অনলাইনে। অনেক উৎসবই পিছিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট তারিখে আয়োজন করার আশা রাখছে।

কিন্তু বিপত্তিগুলোর একটি হচ্ছে সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন। ইন্ডিওয়্যারে নোয়াহ কাওয়ান তো বলেই বসেছেন, “সেলিব্রেটিদের ফিজিক্যাল উপস্থিতিই অনেক জানাজার মূল উপাদান।” অবশ্য অনেক উৎসবই এখন অনলাইনে করতে হচ্ছে শেষমেশ।

এদিকে ৭ জুন পর্যন্ত দশদিনব্যাপী আয়োজিত হলো, ‘উই আর ওয়ান: অ্যা গ্লোবাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’। ট্রাইবেকা চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক ট্রাইবেকা এন্টারপ্রাইজেসের উদ্যোগে এতে অংশ নিয়েছে বিশ্বের ২০টি উৎসব কর্তৃপক্ষ : কান, বার্লিন, ভেনিস, গুয়াডালাজারা, ম্যাকাও, জেরুজালেম, মুম্বাই, সারায়েভো, সিডনি, টোকিও, মারাকেশ টরন্টো, নিউ ইয়র্ক, ট্রাইবেকা, সানড্যান্স, বিএফআই লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসব, লোকার্নো, কারলোভি ভ্যারি, রটারডাম, সান সেবাস্তিয়ান, অ্যানসি আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র উৎসব ও টোকিও।

এছাড়া করোনার যুগে অন্যান্য প্রধান চলচ্চিত্র উত্সব আয়োজকরা কীভাবে পরিকল্পনা করছে এবং এই জুন মাসের শেষের দিকে চলচ্চিত্র উৎসবগুলো কী অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তা দেখে আসা যাক।

কান চলচ্চিত্র উৎসব

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র উৎসবের ভেন্যু ফ্রান্সের কান। এখানে বিশ্বের সেরা সেরা চিত্রপরিচালকরা তাদের সাম্প্রতিক কাজ নিয়ে হাজির হন। এবারের ৭৩ তম বাৎসরিক কান চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল ১২ থেকে ২৩ মে ২০২০ পর্যন্ত। ১৩ জানুয়ারি ২০২০, স্পাইক লি জুরি বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ঘোষিত হন। কিন্তু ফ্রান্সে কোভিড-১৯ মহামারি আকার ধারণ করলে ১৪ এপ্রিল ২০২০ এ, প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, এবার হয়তো ‘আগের মতো করে’ উৎসবটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না।

প্রাথমিকভাবে উৎসবটি পিছিয়ে গেলে জুন বা জুলাইতে অনুষ্ঠিত করার কথা ভাবা হয়। মার্চের মাঝামাঝিতে উৎসবের প্রধান ভেন্যুটি দ্য গ্র্যান্ড অডিটোরিয়াম লুই লুইমেরে-কে অস্থায়ী শরণার্থী কেন্দ্র করা হয়। মে মাসের মাঝামাঝিতে আশা করা হয়েছিল কান চলচ্চিত্র উৎসবে সাধারণ বিলম্ব যথেষ্ট হবে: হয়তো জুনের শেষের দিকে। এরপর ফরাসী সরকার পুরো জুলাইসহ অনির্দিষ্টকালের জন্য লকডাউন করে দেয়। ফলে নির্ধারিত উদ্বোধনের সময়ের প্রাক্কালে, উত্সবটি বর্তমান মহামারী পরিস্থিতির কাছে নতি স্বীকার করে এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে এই বছর কান কোনও শারীরিক সংস্করণ থাকবে না। সুতরাং প্রতি বছর মে মাসে অনুষ্ঠিত হলেও এবারের মতো বাতিলই হয়ে গেল সবচাইতে বড় চলচ্চিত্র উৎসব ‘কান’।

“একটি ‘উত্সব’ মানে—একটি সম্মিলিত পার্টি, এমন একটি দর্শন যা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দর্শকদেরকে একত্রিত করে। কিন্তু এই বছরের জন্য এটি অসম্ভব,” কান পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমাক্স কয়েক দিন আগেই স্ক্রিন ডেইলিকে জানান।

ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো চলচ্চিত্র উৎসব ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব যার পদযাত্রা শুরু হয় ১৯৩২ সালে। প্রতি বছর ভেনিসের লিডো দ্বীপে অনুষ্ঠিত হয় ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

এবার আয়োজকরা সময় নির্ধারণ করেছিলেন ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২০। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ততই অনিশ্চয়তার দোলচালে দুলছে উৎসবটি। এপ্রিল ১৭ পর্যন্ত ইটালিতে সবচাইতে মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে করোনা। মে পর্যন্ত ইটালিতে লকডাউন জারি থাকলেও বলা হয় যে, সিনেমা বা কনসার্ট বা সামাজিক উৎসবগুলো গ্রীষ্মের আগে আগেই চালু করার অনুমতি মিলবে।

ফলে সিনেমাপ্রেমীরা আশার আলো দেখছে যে, কোভিড-১৯ মহামারীকে পাশ কাটিয়েই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব। টানা তিনমাস চলচ্চিত্র জগতে লকডাউনের পর এমন উৎসবের খবর নিশ্চয়ই আনন্দের।  ইতালিতে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর পরও উৎসব করায় অনড় ডিরেকটর আলবার্তো বারবেরা। এখন ঠিক হয়েছে, উৎসব হবে ২ থেকে ১২ সেপ্টেম্বর। দীর্ঘ লকডাউনের পর ছন্দে ফিরতেও শুরু করেছে ইতালি।

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব হবে, তবে তা সামাজিক দূরত্বের সব নিয়মবিধি কড়াভাবে পালন করেই। ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতার ফিল্ম বাছাই শুরু হয়েছে। এবার অবশ্য কম ফিল্ম দেখানো হবে। তবে রেড কার্পেটে সেলেব্রিটিদের হাঁটার ছবি তুলতে এবার ভিড় থাকবে না পাপারাজ্জিদের। এবার অনলাইনে উৎসব করার প্রস্তাব এলেও তা মানেনি কেউই। কান চলচ্চিত্র উৎসবের ডিরেকটর থিয়েরি ফ্রেমোঁ কীভাবে ভেনিসের সঙ্গে বোঝাপড়া করা যায় তা নিয়ে কথা শুরু করেছেন। পাশাপাশি কম দর্শক নিয়ে আরও কয়েকটি জায়গায় ফিল্ম ফেল্টিভাল করা যায় কিনা তাও ভেবে দেখা হচ্ছে।

টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসব

অন্যান্য চলচ্চিত্র উৎসবের চাইতে টেলুরাইড উৎসবটি আরো অন্তরঙ্গ ও সুবিদিত। বড় কোনো শহরে বড় কোনো ভবনে নয়, বরং টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয় কলোরাডোর ছোট রিসোর্ট টাউনে। পরিস্থিতির বাঁধা থাকলেও আয়োজকরা এখনো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হতে হচ্ছে।

মে এর শেষের দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো একটি ইমেইলে তারা জানিয়েছেন, এ বছর টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে তবে উৎসবে যোগদানকারীদেরকে নিরাপত্তা ও অন্যান্য সাবধানতা মেনে চলতে হবে। তারা বলেন, ‘আমরা বিনীতভাবে পরামর্শ দিচ্ছি যে পৃথিবীতে এখন চলচ্চিত্রের আলো দরকার। চলচ্চিত্র এমন একটি বিষয় যা সহমর্মিতা এবং সংবেদনশীল কাহিনীর মিশ্রণে মানুষের মাঝে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে।”

সুতরাং ইন্ডিওয়ারের সূত্রমতে, এ বছর ৪৭তম টেলুরাইড চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত হতে যাচ্ছে ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০। এ ব্যাপারে আয়োজকরা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘আমরা এতটা অন্ধ তো নই যে পৃথিবীর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অসচেতন। আমরাও আতঙ্কিত এবং চিন্তাগ্রস্থ। সে জন্যই আমাদের এবারের আয়োজন হবে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে এবং ভিন্নভাবে। যাতে অংশ্রগ্রহণকারীরা কমফোর্টেবল থাকেন।”

টরোন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব

১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া এ চলচ্চিত্র উৎসব বর্তমানে উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ ও প্রভাবশালী উৎসবগুলোর একটি। অন্যসব চলচ্চিত্র উৎসবগুলির মতো প্রাথমিকভাবে টরোন্টো চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে কিনা, আয়োজকদের চোখে চিন্তা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এবারের ৪৫তম টরোন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবটি আয়োজিত হবে। তবে তা অন্যান্যবারের চেয়ে ভিন্নভাবে। সময় নির্ধারিত হয়েছে ১০ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০।

উৎসবের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জোয়ানা ভিসেন্তে এবং আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ক্যামেরুন বেইলি উৎসবের পরিকল্পনা নিয়ে We Are One : A Global Film Festival এ ভিডিও কনফারেন্সে আলোচনা করেন। “আমরা সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গেই উৎসবটি পালন করে চাই,’ জোয়ানা ভিনসেন্ট ভ্যারাইটিতে এ কথা বলেন। ‘হয়ত ছয় ফিট নয়, তবে আসনগুলোর মাঝে দুরত্ব রাখা হবে। তবে এ বছর আমরা উৎসবটির পরিকল্পনায় সুদৃঢ়।”

নিউ ইউর্ক চলচ্চিত্র উৎসব

নিউ ইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রচলিত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন বাৎসরিক চলচ্চিত্র উৎসব।

প্রতি বছর এই উৎসবের আয়োজন করে ফিল্ম সোসাইটি অব লিংকন সেন্টার। লিংকন সেন্টারের সভাপতি উইলিয়াম শুম্যানের সহযোগিতায় রিচার্ড রৌড ও অ্যামোস ভোজেল ১৯৬৩ সালে এই উৎসবের প্রচলন করে। যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ মহামারী ব্যাপক আকার ধারণ করলে অনুষ্ঠানের সময় পিছিয়ে সেপ্টেম্বরে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে হাতে কিছুটা সময় পেলেও যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ মহামারির দ্বিতীয় ধাক্কায় অনুষ্ঠান কতোটা সফল হবে সে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। দিন-তারিখ ধার্য করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ থেকে ১১ অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত।

তবে যাতায়াত সীমিতকরণের ফলে ভেন্যু হিসেবে এমন এক জায়গা বেছে নিতে হবে যেখানে অধিকাংশ সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ও মিডিয়ার জন্য সুবিধাজনক।

তবে যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্ক শহরটিতেই সবচাইতে বেশি করোনা কেস থাকার ফলে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বনের কথাও বলেছে উৎসবটির মূল আয়োজক লিংকন সেন্টার প্রতিষ্ঠান। বলা হয়েছে, “চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পী—যারা উৎসবে অতিথি হয়ে আসবেন, তাদের জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সতর্কতা ব্যবস্থা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

অতএব বলা যাচ্ছে যে, নিউ ইউর্ক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকরা সাহসিকতার সঙ্গেই আয়োজন করতে প্রতিজ্ঞ। আয়োজনের ডিরেক্টর ইউজিন হার্নান্দেজ সংবাদ মাধ্যমে বলেন, “হয়ত অন্যান্যবারের চাইতে ধীর ও নীরব মনে হতে পারে উৎসবটিকে, কিন্তু সব রকম পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই আমরা চলচ্চিত্রশিল্পকে সাপোর্ট দিতে চাই।”


লেখক 

রনক জামান


 

error: Content is protected !!