বোধন : মহিউদ্দিন ফারুক

মহিউদ্দিন ফারুক

জন্মঃ ১ মার্চ, ১৯৪২, ঢাকা।

মৃত্যুঃ ১৭ এপ্রিল ২০২০, ঢাকা

 

পৃথিবীর এখন রুদ্ধদ্বার। যখন চারপাশ থেকে ছিন্ন হয়ে ঘরে থাকাই বেঁচে থাকার একমাত্র মন্ত্র। তখন চারিদিক থেকে কেবল মৃত্যুর সাথে সংবাদ, প্রিয়জন হারিয়ে যাওয়ার বেদনা ভাসিত হয়। ‘অকালবোধন’ এর ‘সিনেমা’ সংখ্যায় আমরা স্মরণ করছি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রিয় চলচ্চিত্রজন, খ্যাতিমান শিল্প নির্দেশক, চলচ্চিত্রকার এবং চলচ্চিত্র শিক্ষক মহিউদ্দিন ফারুক এর নাম। গত ১৭ এপ্রিল, ২০২০ এ আমরা হারিয়েছি আমাদের এই গুণী ও অভিজ্ঞ শিল্পীকে।

তিনি একইসাথে যেমন ছিলেন শিল্প নির্দেশক তেমনি ছিলেন চলচ্চিত্রের শিক্ষকও। তাই তার প্রয়াণে চলচ্চিত্রের শিক্ষা অঙ্গনেও যেন শুন্যতা বাড়লো। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে যখন আবার পড়াশোনার চল গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র সম্পর্কে পাঠদানের পাশাপাশি; গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফিল্ম স্কুল – বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট। এই চলচ্চিত্রের পঠন পাঠনের ক্ষেত্রে আমাদের গুণী ও অভিজ্ঞ মানুষগুলো এক একজন খুঁটির সমতুল্য। মহিউদ্দিন ফারুকও তেমনি একজন গুণীজন, চলচ্চিত্রের শিক্ষক। তিনি পড়িয়েছেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে।

মহিউদ্দিন ফারুক

মহিউদ্দিন ফারুক – যার নামের সাথে যে পরিচয়টি সব থেকে বেশি যুক্ত হয়ে আছে তাহলো তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অঙ্গনে একজন নন্দিত শিল্প নির্দেশক। শতাধিক চলচ্চিত্রের তিনি শিল্পনির্দেশনা দিয়েছেন। এবং শিল্প নির্দেশনার জন্য তিনি মোট সাতবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। বসুন্ধরা (১৯৭৭), ডুমুরের ফুল (১৯৭৮), পিতা মাতার সন্তান (১৯৯১), পদ্মা নদীর মাঝি (১৯৯৩), দুখাই (১৯৯৭), মেঘলা আকাশ (২০০১), মনের মানুষ (২০১০) – এই সাতটি চলচ্চিত্রের শিল্প নির্দেশনার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার পেয়েছেন। তবে এত সব অর্জনের মাঝে তার যে কাজটির জন্য তিনি আড়ালে থেকে গেছেন তাহলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র শেখ নিয়ামত আলী ও মসিহউদ্দিন শাকের নির্মিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’। ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ বাংলাদেশের দর্শকদের কাছে চলচ্চিত্র ভাষার সামগ্রিক চরিত্র, চলচ্চিত্রিক সততা এবং শৈপ্লিক রুচিবোধের দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল। আর চলচ্চিত্রের মানুষের কাছে এভাবে পৌঁছে যাবার সক্ষমতায় শিল্প নির্দেশক মহিউদ্দিন ফারুকের অবদানও কিছু কম নয়। কোন পুরষ্কারের পাওয়া না পাওয়া সে অর্জন এতটুকুও ক্ষুন্ন হবার নয়। বরং ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’র মধ্য দিয়ে মহিউদ্দিন ফারুক জ্বলজ্বলে হয়ে থাকবেন সিনেমার আত্মবস্তু অর্জনকারীদের মনে। কেননা এর নির্মাণশৈলীতে যে শিল্পমান আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেখানে একজন অভিজ্ঞ, গুণী শিল্প নির্দেশক মহিউদ্দিন ফারুক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

শিল্প নির্দেশক এই পরিচয়ের বাইরে গিয়ে এই মানুষটির আরেকটি পরিচয় তিনি একজন চলচ্চিত্র পরিচালকও। তার পরিচালনার একমাত্র চলচ্চিত্র ‘বিরাজ বৌ’ (১৯৮৭)। তিনি তার সমস্ত ক্যারিয়ার জুড়েই এফডিসির সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেই কাটিয়েছেন তবু তার কাজে শিল্পবোধ বা সূক্ষ্মতার একটি ছাপ প্রকাশিত ছিল। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বিরাজ বৌ’ মূলত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যনির্ভর একটি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। তবু বাণিজ্যিক বিনোদনমূলক এ ছবিতে তার নিজস্ব নির্মিতের ছাপ রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অনেক না থাকা জুড়ে অল্প কজন যারা আছেন চলচ্চিত্রকে ভালোবাসেন, চলচ্চিত্রকে যাপন করেন, চলচ্চিত্রের সঙ্গেই যাদের সারাজীবনের সহবাস তাদের অন্যতম ছিলেন মহিউদ্দিন ফারুক। ‘অকালবোধন’ এই গুণী চলচ্চিত্র শিল্প নির্দেশক, পরিচালক, চলচ্চিত্রের শিক্ষকের প্রতি নিরন্তর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।


লেখক :

লাবনী আশরাফি

লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা


 

error: Content is protected !!