⁠কাইয়্যে দ্যু সিনেমা ও বাংলাদেশে চলচ্চিত্র পত্রিকার ধারা

চলচ্চিত্র চর্চায় নতুন জ্ঞান উৎপাদন, পুনরুৎপাদন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাহাস তৈরিতে চলচ্চিত্র পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, চলচ্চিত্র ইতিহাসের ভিতর থেকেই তার একটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। গত শতকের ৪০-এর দশকের শেষ দিকে ফ্রান্সে গুরুত্বসহ চলচ্চিত্রবিষয়ক পড়ালেখা এবং সেটাকে চর্চায় পরিণত করার অনুশীলন শুরু হয়। এক্ষেত্রে ফ্রান্সের চলচ্চিত্র চর্চায় ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে আঁদ্রে বাঁযা’র সম্পাদনায় পত্রিকাটিতে লিখতেন ক্লদ শ্যাব্রল, ফ্রাঁসোয়া  ক্রুফো, জ্যঁ লুক গদার, লুই মাল, অ্যাঁল্যা রেঁনে প্রমুখ।

 

চলচ্চিত্রকে বক্তব্যে পরিণত করা এবং অপরকে তা বোঝানোর তাগিদ থেকেই সম্ভবত চলচ্চিত্র চর্চার শুরু। পৃথিবীর সব জায়গাতেই এ চর্চার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে— চলচ্চিত্র দেখার চাহিদাকে জাগানো এবং ভালো চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা। উপর্যুক্ত দুটি উদ্দেশ্যকে মুখ্য স্বীকার করে যদি আমরা চলচ্চিত্র ক্ষেত্রটাকে চলচ্চিত্র সংস্কৃতির পরিসর থেকে বিবেচনা করি, তাহলে নিশ্চয়ই এতে আরো অনেক উদ্দেশ্য যুক্ত হবে। যেমন : চলচ্চিত্র প্রদর্শন, চলচ্চিত্রের প্রচার, চলচ্চিত্রবিষয়ক সেমিনার-বক্তৃতা-কর্মশালা, চলচ্চিত্র সংসদ গঠনসহ সংশ্লিষ্ট আরো বহু কিছু। এ সবই চলচ্চিত্র সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং চলচ্চিত্র চর্চার হাতিয়ার। কিন্তু চলচ্চিত্র চর্চার জন্য এ কথাটাও অত্যন্ত জরুরি যে তার একটি সুলিখিত প্রকাশের মাধ্যম থাকা দরকার। যেখানে সংশ্লিষ্ট সকলই চলচ্চিত্রটিকে ঘিরে আলোচনার অংশীদারিত্ব বহন করবে। শুধু চলচ্চিত্র নয়, যেকোনো শিল্পের জন্যই তার লিখিত রূপ প্রয়োজন। কেননা সে একটি বিশেষ সময়কে ধারণ করে অগ্রসর হতে থাকে এবং ধারণের মধ্য দিয়ে গুরুত্ববহ হয়ে উঠতে চায়। চলচ্চিত্রটির নিজস্ব কর্মকাণ্ড ও তাকে ঘিরে দর্শকের ভাবনার অবস্থান— চলচ্চিত্রটির দলিল হিসেবে পরবর্তী সময়ে গণ্য হয়।

ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাকে কিছু কর্মচাঞ্চল্য ও দায়বদ্ধতার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রগুলি এ আলোচনায় পরে দৃশ্যমান হবে। কিন্তু চলচ্চিত্রটির সুবিন্যস্ত লিখিত রূপ বা সমালোচনা তৈরি না হলে যা হতে পারে— সবাই একে বিচ্ছিন্নভাবে বোঝাপড়া শুরু করবে— এলোমেলোভাবে নির্দেশিত হবে এবং ক্ষেত্রটি একটি ক্ষণস্থায়ী আবর্তে ঘুরপাক খাবে। এতে করে তার অগ্রগতির পথ খাপছাড়াভাবে এগিয়ে যেতে থাকবে; কখনো পিছনে কিংবা শ্লথ গতিতে। ফলে তার লিখিত রূপ থাকাটা জরুরি। ভাব বিনিময়, আলোচনা-সমালোচনা, নতুন জ্ঞান উৎপন্ন প্রভৃতি বিষয়গুলোর মধ্য দিয়েই সর্বোপরি জ্ঞানের যুক্তিভিত্তিক অবস্থান নির্দেশিত হবে। আর এই বুদ্ধিবৃত্তির ভিতর দিয়েই ধীরে ধীরে জায়মান হয়ে উঠবে— চলচ্চিত্র কী, চলচ্চিত্রটি কী চায়, তার আদর্শ এবং সর্বোপরি সে কোন লক্ষ্যের অভিমুখী।

বিজ্ঞাপন

চলচ্চিত্র চর্চায় নতুন জ্ঞান উৎপাদন, পুনরুৎপাদন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাহাস তৈরিতে চলচ্চিত্র পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ, চলচ্চিত্র ইতিহাসের ভিতর থেকেই তার একটি উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। গত শতকের ৪০-এর দশকের শেষ দিকে ফ্রান্সে গুরুত্বসহ চলচ্চিত্রবিষয়ক পড়ালেখা এবং সেটাকে চর্চায় পরিণত করার অনুশীলন শুরু হয় এক্ষেত্রে ফ্রান্সের চলচ্চিত্র চর্চায় ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলো। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে আঁদ্রে বাঁযা’র সম্পাদনায় পত্রিকাটিতে লিখতেন ক্লদ শ্যাব্রল, ফ্রাঁসোয়া  ক্রুফো, জ্যঁ লুক গদার, লুই মাল, অ্যাঁল্যা রেঁনে প্রমুখ।

কাইয়্যে পত্রিকা সেসময় চলচ্চিত্র চর্চার ক্ষেত্রে এক ভিন্ন ধরন নিয়ে আসে। শুদ্ধতাই নয়— ‘লেখকনীতি’ বা ‘পলিতিক দেজতর’ ধারণার জন্ম দিয়ে এর পক্ষে তর্কের অবতারণা করে। ফলে তা অনেক সৃষ্টিশীল চলচ্চিত্রনির্মাতার জন্য বেশ সহায়ক হয়ে উঠেছিলো। এই নীতি ফ্রান্সের চলচ্চিত্রের নতুন তরঙ্গে অবদান রাখতেও সক্ষম হয়। কাইয়্যে মনে করতো, চলচ্চিত্রের আলোচক খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই তাদের যাত্রার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো লেখকগোষ্ঠী তৈরি করা। কাইয়্যের পাতাকে যারা সমৃদ্ধ করেছিলেন, তারা অনেকেই লেখাকে চলচ্চিত্র বানানোর মতোই মনে করতেন। লেখকনীতির ধারণা অনুযায়ী তারা মনে করতেন— একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় একজন শিল্পীর সত্তা থেকে এবং ওই চলচ্চিত্রটি শিল্পীসত্তা থেকে অবিচ্ছেদ্য। এই নীতির জোরে বহু চলচ্চিত্র সেসময় মূল্যায়নও পেয়েছিলো। কাইয়্যের চলচ্চিত্র সমালোচনার ফলে সাধারণ দর্শকও চলচ্চিত্র বোঝাপড়া আরম্ভ করে।

পরে তাদের ‘লেখকনীতির’ পক্ষে নানাভাবে নিজেকে ধরার চেষ্টা করেছে কাইয়্যে। পরবর্তী সময়ে বড়ো ধরনের পরিবর্তন আসে পত্রিকাটিতে। বিশেষ করে যখন ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শ্রেণিসংগ্রাম ও ‘প্রাক্সিসের’ দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে তারা। এ সময় কাইয়্যের পাতা সমৃদ্ধ করেছিলেন জ্যঁ লুই কমোলি, জ্যঁ নারবোনি ও মিশেল মারদোরি’র মতো লেখকরা। তারা মার্কসবাদকে সঙ্গে নিয়ে চলচ্চিত্র আলোচনা শুরু করেন। চলচ্চিত্রের সমালোচনা লিখতে গিয়ে মারদোরি লেখেন— ‘মার্কসবাদ’ হলো অনুসন্ধানের হাতিয়ার। আর চলচ্চিত্র পরিচালকেরা এই হাতিয়ার ব্যবহারে এখনো সফল হয়ে উঠতে পারেননি। এমনকি শ্রেষ্ঠ কমিউনিস্ট চলচ্চিত্রও আবেগ দিয়ে পরিচালিত। কিন্তু আবেগ অন্ধ, ক্ষণস্থায়ী, কোনো তত্ত্বের ধার ধারে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলেও এর ঠাঁই হয় না। আবেগ হয়তো আলোড়িত করতে পারে। কিন্তু এটা পৃথিবীর রহস্য উন্মোচনে কোনো সাহায্যই করে না।

অন্যদিকে জ্যঁ লুই কমোলি লেখালেখির মাধ্যমে কাইয়্যের পূর্বের চরিত্র বদলে দিতে শুরু করেন। কেননা ততোদিনে পোল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সে নতুন ধরনের চলচ্চিত্র-নির্মাণ শুরু হয়ে গেছে। ভাষা পালটে গেছে চলচ্চিত্রের।

কাইয়্যে এ সময় নতুন চলচ্চিত্রের ওপর গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা শুরু করে। নতুন চলচ্চিত্র কী— এই প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করে। বিনোদন কারখানা, ভোক্তার পণ্য ও শিল্পকর্ম সবমিলিয়েই চলচ্চিত্রকে বোঝার চেষ্টা করে কাইয়্যে। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ সংখ্যায় কাইয়্যে এক ইশতেহার প্রকাশ করে এবং সেখানে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বলতে কী বোঝায় তার ব্যাখ্যা দেয়— রাজনৈতিক চলচ্চিত্র সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক জায়গা থেকে শ্রেণিসংগ্রামের প্রকৃত সত্য তুলে ধরবে শ্রেণিসংগ্রামকে কার্যকর করার প্রত্যয়ে। কিন্তু যেসব সত্য কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থানকে তুলে ধরে না সেগুলোকে পাশে ফেলে দিয়ে এগিয়ে যাবে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্দিষ্ট সত্যের সঙ্গে থাকবে। এই চলচ্চিত্র-নির্মাণ কাঠামো এমন হবে যাতে সর্বসাধারণের বুঝতে তা সহায়কের ভূমিকা পালন করে এবং উপদেশ বা তত্ত্ব প্রদান করার প্রবণতা এড়াতে হবে।

ওই বছর কাইয়্যেকে যুদ্ধ করতে হয় বিভিন্ন রণক্ষেত্রে। তার বিরুদ্ধে ‘সংশোধনবাদী’ ও ‘ভাববাদে আক্রান্ত’ ইত্যাদি অভিযোগের আক্রমণ শুরু হয়। এ সময় কাইয়্যের পাতা অনেক বেশি মার্কসবাদী তত্ত্বে ভরে ওঠে।

এই পর্যায়ে কাইয়্যে কিছু নীতি নির্ধারণ করে, যেমন: সমালোচনার পাশাপাশি যেসব চলচ্চিত্রের প্রচারণার প্রয়োজন, সেসব চলচ্চিত্রকে তারা সহায়তা করবে এবং মার্কসবাদকে ভিত্তি করে চলচ্চিত্র বিচারের নতুন তত্ত্ব তৈরিতেও কাজ করে যাবে। তত্ত্বের সঙ্গে চর্চা বা প্রাক্সিসকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর সংখ্যায় কাইয়্যে প্রশ্ন তোলে এই সময়ের চলচ্চিত্র কী? প্রশ্নের উত্তর নিজেই খোঁজার চেষ্টা করে— চলচ্চিত্র হলো একটি নিশ্চিত পণ্য যা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিতর মিশে আছে। এর পিছনে থাকে শ্রম ও অর্থ। আর এজন্যই এর শ্রমিক প্রয়োজন এবং শেষ পর্যন্ত এটি একটি বাণিজ্য পণ্য এবং এর বিনিময় মূল্য থাকে। যেহেতু এটি প্রবেশ মূল্যের মাধ্যমে বা চুক্তি অনুযায়ী বেচাবিক্রি হয়, বাণিজ্যটা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় বক্স অফিসের ফলাফল, পরিবেশন, বিপণন ইত্যাদির ওপর। অন্যভাবে বললে চলচ্চিত্র একটি পণ্য যা নির্ধারিত হয় একটি নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা, যে আদর্শের ভিতর ওই চলচ্চিত্র তৈরি ও প্রদর্শন হয়। ফ্রান্সে যে পরিবেশে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও দেখানো হয়, সে স্থানে পুঁজিবাদী আদর্শই শেষ কথা।

কাইয়্যের লেখকরা মনে করতো চলচ্চিত্র নির্মাণের পর যেহেতু সেটি বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাই চলচ্চিত্র সবসময়ই রাজনৈতিক। এছাড়াও কাইয়্যে মনে করতো, চলচ্চিত্র সবসময়ই কোনো না কোনো আদর্শকে তুলে ধরে বা রিপ্রেজেন্ট করে। আর এক্ষেত্রে সমাজের আধিপত্যশীল আদর্শই পুনরুৎপাদিত হয় সাধারণ সব চলচ্চিত্রে। তাই কাইয়্যে মনে করে চলচ্চিত্রকে প্রশ্ন করতে হবে। কোন আদর্শিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে চলচ্চিত্র— এসব প্রশ্ন একেই করা উচিত, যাতে আদর্শিক বোঝাপড়ার জায়গাটা দৃশ্যমান হয়। বুর্জোয়া বাস্তবতাকে ভিত্তি করে নির্মিত চলচ্চিত্রকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করাই ছিলো কাইয়্যের এ পর্বের উদ্দেশ্য।

 

এই শতকের শুরুর দিকে চলচ্চিত্র চর্চার সহযাত্রী হওয়ার অঙ্গীকারে শুরু হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর যাত্রা। ইতোমধ্যে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আঠারোটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। এই আঠারোটি সংখ্যায় ম্যাজিক তার উদ্দেশ্যকে একাধিকবার খোলসা করেছে। প্রথম সংখ্যায় ম্যাজিক, চলচ্চিত্র নিয়ে তার স্বপ্নের কথা আমাদের জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় সংখ্যার পর থেকেই স্বপ্নের আচ্ছাদন সরিয়ে একটি আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিবিষ্ট হয়ে ওঠে পত্রিকাটি। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রকে সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র-ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রচেষ্টা লক্ষ করার মতো। এবং লেখক তৈরির উদ্যোগটিও অত্যন্ত আশার। এই প্রয়াস চলচ্চিত্র চর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রেক্ষাগৃহে মানুষ চলচ্চিত্র দেখতে যায় বিনোদন পেতে। বিনোদনই তার কাছে মূল বিষয়। আর নির্মাতারাও বিনোদন বিক্রি করে মুনাফা পেতে চায়। সাধারণত এমন বিনোদনই তারা বিক্রি করতে চায়, যা দর্শককে অস্থির ও প্রশ্নকর্তা করে তুলবে না। বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি যেনো চ্যালেঞ্জ ছুড়তে না পারে, প্রেক্ষাগৃহে তেমন বিনোদনই বিক্রি করা হয়। এখন চলচ্চিত্র কীভাবে বুর্জোয়া বাস্তবতার এজেন্ট হয়ে কাজ করে, কী করে পুঁজিবাদী অর্থনীতির হাতিয়ার হয়— এসব আপাত ‘ভারী’ কথা। কিন্তু এসব ‘ভারী’ কথা সহজ করে দর্শককে চিন্তাশীল মানুষে পরিণত করতে চেয়েছে কাইয়্যে। চলচ্চিত্রটি কোন আদর্শের ধারক ও বাহক সেটা নিয়ে তর্ক করা, যুক্তি-প্রতিযুক্তি দিয়ে চলচ্চিত্রের সাধারণ ভাষাকে নাস্তানাবুদ করা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড দর্শকের চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। শুধু দর্শক নয়, নির্মাতারাও নির্মাণের ক্ষেত্রে অনেক সচেতন হয়ে উঠছিলেন সেসময়। দীর্ঘ যাত্রায় কাইয়্যে চলচ্চিত্র নিয়ে যে সাহিত্যিক কারবার করেছে এক কথায় তা অসাধারণ। আর এই পত্রিকার নানা পর্বে তুখোড় লেখকদের ভূমিকাও অনন্য।

বাংলাদেশে চলচ্চিত্র পত্রিকার ধারা
যেকোনো ভূখণ্ডে তার সাংস্কৃতিক আঙ্গিকের চর্চার সঙ্গে সেই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক দিকগুলো জড়িয়ে থাকে; জড়িয়ে থাকে প্রয়োজনের দিকগুলোও। চলচ্চিত্র যে একটি শিল্প আঙ্গিক, এর যে একটি আন্তর্জাতিকতা রয়েছে, এর মাধ্যমে যে এর স্রষ্টা নিজের শিল্প সৃষ্টির আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারে, এর দ্রষ্টা (দর্শক) যে তার শিল্পকর্ম আস্বাদনের ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে এবং সর্বোপরি এটি যে একটি আন্দোলনের ক্ষেত্র— এই উপলব্ধি চলচ্চিত্রে সবসময়ই খুঁজে পাওয়া যায়।
এই ভূখণ্ডে গত শতকের ৬০-এর দশকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের (তদানীন্তন পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ) হাতে প্রকাশিত ‘ধ্রুপদী’তে এমন জোর কমিটমেন্ট লক্ষ করার মতো। তার উন্মোচনের স্বরূপ, উদ্দেশ্য আমরা জানতে পারি প্রথম সংকলনের সম্পাদকীয় থেকে— ‘অন্যান্য চলচ্চিত্র সংসদের মতো পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদের লক্ষ্যবস্তু বর্তমান, যেমন নিয়মিত সৎ ও শিল্পছবি প্রদর্শন, চলচ্চিত্র গ্রন্থাগার নির্বাহ, চলচ্চিত্র সংরক্ষণাগার স্থাপন, চলচ্চিত্র শিক্ষায়তন স্থাপন, চলচ্চিত্র প্রকাশনালয় স্থাপন, চলচ্চিত্র উপলব্ধি সঞ্চারণ, সংসদ প্রেক্ষালয় স্থাপন, সৎ ও সৃজনধর্মী চলচ্চিত্রায়ণে আন্তর্জাতিকতা বিষয়ে যোগাযোগ রক্ষা করা ইত্যাদি।’

কিন্তু ‘ধ্রুপদী’কে কঠিন সময়ের মুখোমুখি লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ; এই অঞ্চলের সমাজ-বাস্তবতা একটি ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছিলো। তৎকালীন সরকারপক্ষ চায়নি এ আন্দোলন বিকশিত হোক। এক্ষেত্রে ‘ধ্রুপদী’র প্রথম সংখ্যায় যে উদ্যোগগুলো আশা জাগায়, সেসব বাস্তবায়নের পথে সরকারের নানারকম বাধানিষেধ আসে। এই ক্রান্তিকালে ‘ধ্রুপদী’র দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশ হয়। ‘ধ্রুপদী’ জানান দেয়, ‘অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো চলচ্চিত্র ক্ষেত্রটিও নানারকম সরকারি বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।’ এভাবে সময়োপযোগী উপলব্ধির একাত্মতায় পাকিস্তান পর্বে ও পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ পর্বে ‘ধ্রুপদী’র কার্যকরী অবদানে চলচ্চিত্র বোদ্ধা যেমন তৈরি হয়, তেমনই চলচ্চিত্র সংস্কৃতির বিকাশও ত্বরান্বিত হতে থাকে।

পরবর্তী সময়ে ৮০’র দশকে এ দেশে অনেক চলচ্চিত্র সংসদ গঠিত হয়। অনিয়মিতভাবে হলেও চলচ্চিত্র সংক্রান্ত কিছু পত্র-পত্রিকা তারা প্রকাশও করে। চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশের ওপর জোর দিয়ে গবেষণাধর্মী আলোচনাও কিছু হয়েছিলো। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠিত হলে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় রক্ষানাবেক্ষণের জন্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ উদ্দেশ্য থেকে তারা গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ শুরু করে। চলচ্চিত্রের বর্তমান, অতীত, সংকট-সম্ভাবনা এরকম বিষয়ে তাদের গবেষকদের উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ জার্নালে প্রকাশিত লেখাজোখার পরিসংখ্যানে এমন বিষয়ই উঠে আসে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ড চলচ্চিত্র ক্ষেত্রটিতে কতটুকু কার্যকরী অবদান রাখতে পারছে তা মূল্যায়নের সময় এসেছে। কেননা চলচ্চিত্র বিশাল প্রেক্ষাপটে যেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে যথেষ্ট গতিশীল থাকতে না পারা ব্যর্থতার শামিল।

টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রচর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট পত্রিকা বের হয়। কিন্তু লেখার দৈন্যদশা চোখে পড়ার মতো। ফলে চলচ্চিত্রচর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে যেসমস্ত পত্রিকা নিজেদের হাজির করেছে— তাদের মান, অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশও তারা তৈরি করেছে। এক্ষেত্রে কয়েক দশক আগে প্রকাশিত ‘ধ্রুপদীর’ জোর কমিটমেন্ট তাদেরকে ছাপিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রকলার নানা দিক নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ হয়েছে। সমালোচনা ও চলচ্চিত্রবিদ্যার শিক্ষকের সংখ্যা বেড়েছে। এই পথ ধরে বর্তমানে চলচ্চিত্রকলা প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পাঠযোগ্য বিষয় হিসেবে অধ্যয়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন ফিল্ম সংগঠনগুলো অনিয়মিত সম্পাদিত গ্রন্থ ও স্মরণিকা বের করে। কেউ কেউ চলচ্চিত্র বিষয়ে লিখছেন ও বই বের করছেন। এ সবই চলচ্চিত্র চর্চা ও চলচ্চিত্র সাহিত্যের জন্য সম্ভাবনার, কিন্তু তার সঞ্চিত পরিসরটি যে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল— এই দৈন্য লক্ষ করার মতো।

এই শতকের শুরুর দিকে চলচ্চিত্র চর্চার সহযাত্রী হওয়ার অঙ্গীকারে শুরু হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর যাত্রা। ইতোমধ্যে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আঠারোটি সংখ্যা প্রকাশ হয়েছে। এই আঠারোটি সংখ্যায় ম্যাজিক তার উদ্দেশ্যকে একাধিকবার খোলসা করেছে। প্রথম সংখ্যায় ম্যাজিক, চলচ্চিত্র নিয়ে তার স্বপ্নের কথা আমাদের জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় সংখ্যার পর থেকেই স্বপ্নের আচ্ছাদন সরিয়ে একটি আন্দোলনের ক্ষেত্রে নিবিষ্ট হয়ে ওঠে পত্রিকাটি। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রকে সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র-ক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রচেষ্টা লক্ষ করার মতো। এবং লেখক তৈরির উদ্যোগটিও অত্যন্ত আশার। এই প্রয়াস চলচ্চিত্র চর্চার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই যাত্রায় ম্যাজিকের মনে রাখতে হবে যে— চলচ্চিত্র একটি শিল্প এবং তারা সেই শিল্পের বিনির্মাণ করে চলেছে। ভাষা ব্যবহার, আবেগের বিহ্বলতা, অপ্রয়োজনীয় কথার সংশ্লেষ প্রভৃতি বিষয়ে যথাযথ সতর্কতা হয়তো তাদের শৈল্পিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানকে সমৃদ্ধ করবে। সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্য তৈরিতে এবং চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তাকে প্রসারিত করতে এগিয়ে যাবে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’। এছাড়া চলচ্চিত্রকে জানা ও বোঝার জন্য যে পরিমাণ মানুষ রয়েছে এবং যাদের বোঝালে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রটিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব— সেই ক্ষেত্রও তারা প্রস্তুত করবে।

তবে ম্যাজিক’কে ঘিরে আশার ব্যাপার এই যে, গত এক যুগ ধরে চলচ্চিত্রকে ঘিরে তার বোঝাপড়ার পরিসরটি ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলচ্চিত্রের বৃদ্ধিবৃত্তিক মূল্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

কবি রুদ্র আরিফের সম্পাদনায় ‘ফিল্মফ্রি’ নামের অনলাইন ফিল্ম জার্নালটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। চলচ্চিত্রকে ঘিরে পত্রিকাটির নিবিড় সম্পর্ক লক্ষ্য করার মতো। বিশ্ব চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছেন। চলচ্চিত্র বিষয়ক জ্ঞান উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রের যে ভূমিকা, সাধারণ মানুষের শিক্ষার যে দৈন্যদশা— সেখানে চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হলে নিশ্চিত অনেক কাঠখড়, বেদনা পেরোতে হবে। তবে এসব মিলিয়েই এগিয়ে যাবে চলচ্চিত্র চর্চা। অতঃপর সামনে ‘কাইয়্যে দ্যু সিনেমা’র ঐতিহাসিক যাত্রার উদাহরণ তো রয়েছেই।


লেখাটি তৈরিতে বিধান রিবেরুর ‘চলচ্চিত্র সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা’ নিবন্ধটির কাছে ঋণী


error: Content is protected !!