আবৃত্তিশিল্প ও পেশাদারিত্ব


গত ৩০ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে ঢাকার আবৃত্তি সংগঠন ‘হরবোলা’ কর্তৃক আয়োজিত সেমিনারে এই লেখাটি মূল প্রবন্ধ হিসেবে পাঠ করা হয়। সেমিনারে আলোচক ছিলেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, আবৃত্তি প্রশিক্ষক মীর বরকত, আবৃত্তিশিল্পী তামান্না তিথি। লেখাটি অকালবোধন এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।


ভূমিকা
প্রবন্ধের শিরোনামে দুটো শব্দ এমনভাবে আছে যেন এখনই ঝগড়ায় নামতে যাচ্ছেন; আপাত দেখতে ভদ্র দুজন লোক। আবৃত্তিশিল্প ও পেশাদারিত্ব। আবৃত্তিশিল্প বলে উঠতে পারে, ‘আমি শিল্পের উচ্চাঙ্গের শাখা বটে, পেশা হয়ে ওঠার কোনো সাধ-আহ্লাদ কিংবা প্রয়োজন আমার নেই’। পেশাদারিত্ব শব্দটিভাব প্রকট করে বললেন, ‘তুমি চাইলেই হবে, বাজারের বিশ্বে এখন সবই পণ্য’।

খুব হালকা মেজাজে শুরু করতে চাইলাম। পারলাম কিনা জানি না। তবে এটুকু বলতেই পারি, দ্বন্দ্ব আছে বলেই এরা মানে ‘আবৃত্তিশিল্প ও পেশাদারিত্ব’ প্রবন্ধযোগ্য হয়েছে। শিরোনাম লিখতে গিয়েও আমি এদের বিবাদ কিছুটা কমিয়েছি। যেমন শিরোনাম হতে পারতো ‘আবৃত্তিশিল্পে পেশাদারিত্ব’ অথবা আবৃত্তিশিল্পীর পেশাদারিত্ব। রসিকজন বুঝতেই পারছেন কত বড় ঝগড়ার আম্পেয়ার হওয়া থেকে আমি নিজেই নিজেকে রক্ষা করেছি।

য্ইা হোক। প্রবন্ধের কিছু ব্যাকরণ আছে। আমি সেসবের ধার ধারবো না প্রকাশ্যে, কিন্তু গোপন কথা হলো আমি ব্যাকরণে যথেষ্টই কাঁচা।

তাই যা বলার তা বলবো। কারো কাছে মনে হবে; ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছি। কারো কাছে মনে হবে; স্পষ্ট। কারো কাছে মনে হবে; ধরি মাছ না-ছুঁই পানি- গোছের কিছু হয়েছে।

‘আবৃত্তিশিল্প’ নিয়ে সংজ্ঞায় আমি যাবো না, কারণ শিল্পের এই মাধ্যমটি আমরা যতটা জানি তারচেয়ে এখন ভাল বুঝি। শুধু বুঝি না- হৈচৈ ক’রে, উৎসব করে, শোভাযাত্রা করে বুঝি, অডিও-ভিডিও করে বুঝি, মডেলিং করে বুঝি আর সবচেয়ে বেশি বুঝি ‘না-বুঝেই’। তাই এর সম্পর্কে খুব বেশি বলার নেই।

‘পেশা’ নিয়ে দু’টো কথা বলা উচিত, প্রবন্ধের ব্যাকরণ মেনে। পেশা কি ? আর পেশাদারিত্বই বা কি?
আমি খুবই সতর্কতার সাথে আশ্রয়ার্থী হবো বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানে। পেশা শব্দটির পাশে এখানে লেখা হয়েছে- বৃত্তি, ব্যবসা, জীবিকার উপায়।

পেশাদার মানে বৃত্তিজীবী, ইংরেজিতে বললে সুবিধা হয় বুঝতে ‘প্রফেশনাল’।

যাই হোক। পেশা হিসেবে আবৃত্তিশিল্পকে নেয়া যায় কিনা, সম্ভাবনা আছে কিনা। সম্ভাবনা কেন আছে, সম্ভাবনা থাকলে এর প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী। সেইসব প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণের উপায় আছে কিনা। এইতো মূল কথা? তাহলে অত ব্যাকরণে যেয়ে কাজ কি!

স্বগতোক্তি
যে কোনো শিল্প নিয়েই আমার একান্ত কিছু মত আছে। সেখানে উচিত-অনুচিত প্রশ্নটি আছে। আমি মনে মনে ভাবি আবৃত্তিশিল্প কারো পেশা এমনটা কি জরুরী? বা উচিত? মনে হতে পারে একজন শিল্পী যদি তাঁর চর্চার শিল্পমাধ্যমটিকে পেশা হিশেবে নিতে পারে তবে নিশ্চয়ই তিনি সেই শিল্পকে উৎকর্ষের শিখরে নিয়ে যেতে সক্ষম হবেন। আমার খুব সন্দেহ, তখন সেই শিল্পের প্রয়োজন সমাজ কি হারাবে না!

শিল্পীর দায় বলে একটি কথা খুব মানি। আপনারাও মানবেন আশাকরি। সেই দায়টা কি? শিল্পীর জায়গায় যদি ‘শিল্প’ বলি- সেখানেও এই শব্দটি স্বয়ং দায়বদ্ধ মানুষের প্রতি।

দায়
আবৃত্তিশিল্পের অথবা শিল্পীর দায়;যদি ধরি তাহলে মানতেই হয় এর সাথে মানুষের সম্পৃক্ততা রয়েছে। শুধু জীবিকা অর্জনের জন্য যে-মাধ্যমের প্রচলন হয়েছে সেখানে শিল্প প্রধান থাকেনি। যেমন সার্কাস। এখানে দক্ষতা আছে, দক্ষতার চূড়ান্তও আছে, শিল্প হিশেবে তার প্রতিষ্ঠা শিল্পরসিকদের কাছে আছে কি?

আমি মনে করি, শিল্পীর দায়- এই বিষয়ের মীমাংসা না হলে পেশার বিষয়টি এগুবে না।

‘শিল্প’ শিল্পের জন্য নাকি ‘শিল্প’ মানুষের জন্য। বদলেয়ার প্রথম বলেছেন,‘শিল্পের জন্য শিল্প’। কিন্তু আমরা অনেকেই তা মানি না। এই তত্ত্ব হাজিরেরও ইতিহাস আছে সেই আলোচনায় যাবো না। তবু বলি, মানুষ না থাকলে শিল্প কেন? শুধু শিল্পের রসাস্বদনই একমাত্র বিষয় হতে পারে না। রাজা-বাদশা-জমিদারদের শিল্প বা শিল্পী পৃষ্ঠশোষকতার পেছনে আভিজাত্য, বিনোদন- এ-ই তো ! এছাড়া আর কি? কিন্তু আমরা দেখি শিল্পের মধ্য দিয়েইতো জীবনের কথা, মানুষের কথা উঠে আসে অনবদ্য গতিতে। সেখানে শিল্পী তাঁর প্রকৃত ঠিকানা-পরিচয় আবিস্কার করেন। এমন কি সুন্দরের বন্দনায় মেতে ওঠে যে শিল্প সে-ও সমাজে মূলত শুভ বোধেরই চাষাবাদ করেন।

বদলেয়ারের ‘শিল্পের জন্য শিল্প’- এই মতের বিরুদ্ধাচারণ করে আপাতত আমি রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যচেতনার কাছে যাই; রবিঠাকুর বলছেন, ‘সৌন্দর্য আমাদের প্রবৃত্তিকে সংযত করিয়া আনিয়াছে। জগতে সঙ্গে আমাদের প্রয়োজনের সম্বন্ধ না রাখিয়া আনন্দের সম্বন্ধ পাতাইয়াছে। প্রয়োজনের সম্বন্ধে আমাদের দৈন্য, আমাদের দাসত্ব: আনন্দের সম্বন্ধেই আমাদের মুক্তি’।
শেষ পর্যন্ত ‘আমাদের’ এবং ‘মুক্তি’ শব্দটির সঙ্গে আমি শিল্পের সম্পর্ককে খুব গভীরভাবে যুক্ত হিশেবেই নিতে চাই।

কার্ল মার্ক্স প্রশ্ন তুলেছেন, ‘শিল্প কি আফিমের মতো, নাকি আমাকে নাড়া দেয, ধাক্কা দেয়। আমার চিন্তাকে প্রখর করে তোলে। নির্মল আনন্দই কি হবে শিল্পের মূল কথা নাকি আমাকে সজীব ক’রে তুলবে। সামাজিক অসামঞ্জস্যতার বিরুদ্ধে আমার চিন্তাকে চিন্তাশীল হতে সাহায্য করবে।’

আমিও এইসব চিন্তাকে দূরে রেখে আবৃত্তিশিল্পের বা যেকোনো শিল্পের পেশাদারিত্ব নিয়ে কথা বলতে পারি না।

তবু এই কথাতো আসবেই তাহলে শিল্পচর্চার সাথে যাঁরা থাকবেন তাঁদের বেঁচে থাকার উপায় কী হবে? আমি হাতজোড় করে বলবো, এই উপায় যাঁরা খুঁজতে চান তাঁদের এখানে প্রয়োজন নেই। আর যাঁরা আছেন শত বৎসর কাল ধরে শিল্পের চর্চায়;তাঁরা এসবের মধ্যেই বেঁচে থাকার উপায় খোঁজেননি বা খুঁজতে চান না বলেই আমার দৃঢ় ধারণা।

দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় বা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে গিয়ে অথবা মানবিক মূল্যবোধ এমনকি মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রশ্নে একজন মানুষের অবস্থান যদি ভিন্ন হয়, বিপরীত হয় তাহলে তিনি গান-আবৃত্তি-নাচ, ছবি আঁকা- যাই করেন তাঁকে শিল্পী বলতে চাই না। এখানে শিল্পী ‘শিল্পীর দায়’ এই প্রশ্নে স্বনিয়ন্ত্রিত থাকেন। নইলে তিনি একজন কেবলই গায়ক, কবিতাপাঠক বা চিত্রকরই রয়ে যান; শিল্পী হতে পারেন না। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, যেমন তেমন উপায়ে অর্থ উপার্জন একজন শিল্পী করতে পারেন না।

তাহলে এই বাজারের যুগে বসে আমি শিল্পের সঙ্গে মানুষকে জুড়ে দিয়ে অভুক্ত থাকতে পারি না। শিল্পী সমাজের প্রতি দায় মেটাতে গিয়ে যদি অভুক্ত থাকেন তবে সমাজেরই দায় পড়ে বেশি শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখার। নইলে শিল্প যখন পণ্য হয়ে উঠবে তখন এখানে মোড়কের চাকচিক্যে চেতনার রঙে ‘চুনি’ রাঙা হয়ে উঠবে না।

এবার ফিরি আবৃত্তিতে
আবৃত্তি নিয়ে এখন আমাদের মাতামাতি খুব তুঙ্গে। ধরে নিচ্ছি আবৃত্তির এই যে ¯্রােতধারা তার গন্তব্য যাই হোক না কেন এর রেশ টানা সম্ভব নয়। বরং আমরা ইতিবাচক অর্থেই এই ধারাকে আমাদের জীবিকার মূলধারাও করতে পারি কিনা! পারলে কীভাবে তা সম্ভব?

প্রথমত বাংলাদেশে কি এখন এই সম্ভাবনার সামান্য আভাস পাওয়া যাচ্ছে? এই প্রশ্নটি জরুরী। কারণ আভাস পাওয়া না গেলে এর সম্ভাবনার কথা ওঠে না।

আমি এমন আভাস খুব বেশি দেখি না। তবে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বাঙলাভাষার মানুষদের মধ্যে আবৃত্তিশিল্প নিয়ে যে যজ্ঞ; তাতে হয়তো হাতছানি আছে। ইঙ্গিত আছে, আভাস আছে। আমরা আশাবাদী হই। বাংলাদেশের প্রধান আবৃত্তিশিল্পী যাঁরা আছেন তাঁদের মধ্যে পাঁচজন শিল্পীর পেশাও আবৃত্তি নয়। দুইএকজন আছেন যাঁরা আবৃত্তি ক’রে বা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা ক’রে হয়তো ভাল অর্থ অর্জন করেন। কিন্তু তা ‘পেশা’ শব্দটির বিস্তৃতিকে ছুঁতে পারছে না।

বাজার
বাজার ছাড়াতো এখন পেশা সেভাবে দাঁড়াবে না। আমরা যেভাবেই ভাবি না কেন, প্রকৃত কথা হলো, একজন শিল্পী আবৃত্তি করবেন এবং এর বিনিময়ে অর্থ নেবেন। তা সম্মানী বলি আর যাই বলি- এই ‘অর্থে’ যদি কারো জীবিকা নির্বাহ হয় তবেই সেই শিল্পীকে পেশাদার বলব। শিল্পীকে পেশাদার বলা সহজ হলেও আমরা কিন্তু শিল্পটিকে পেশার তকমা দিতে পারবো না এত সহজে। কারণ আগেই বলেছি- পেশা শব্দটির বিস্তৃতি।

আবৃত্তির বাংলাদেশের বাজার কেমন তার কিছুটা ধারণা আমাদের সবার আছে। আবৃত্তির সিডি, ইউটিউব চ্যানেল, শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তির প্রশিক্ষণ, আবৃত্তিবিষয়ক পুস্তক প্রকাশনা, মঞ্চ বা টিভিতে নিয়মিত আবৃত্তি- এই তো আবৃত্তির বাজার। সংবাদপাঠ, উপস্থাপনার বাজার সম্ভবত খুব খারাপ নয়, কয়েকজন এতে ভরসা করতেই পারেন কিন্তু আবৃত্তির সাথে আপাতত এসব এক করতে চাই না কিছুতে।

সম্ভাবনা ও প্রয়োজন
আবৃত্তির সীমানাকে একটু বাড়িয়ে নিলে বাচিকশিল্পের অন্যান্য বিষয়গুলোকে যদি ধরা যায় তবে পেশা হিশেবে এই শিল্পের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রয়োজন দেখা দিলেই সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। প্রয়োজনতো জোর করে হয় না। তাহলে বাচিকশিল্পচর্চার প্রয়োজন সমাজে আছে কি? আমি বলি আছে। ছোট্ট করে একটা প্রস্তাবও রাখতে পারি এই ক্ষেত্রে- যেমন, আমাদের স্কুল-কলেজে ভাষা শিক্ষা একটি আবশ্যিক বিষয়; এখানে আমরা বাংলা মান উচ্চারণ শেখাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রত্যেক ক্লাশেই কবিতা, গল্প, উপন্যাস বিষয় হিশেবে আছে। তাই খুব সহজেই আবৃত্তি-পাঠ-গল্পবলা হয়ে উঠতে পারে আবশ্যিক চর্চার বিষয়। সিলেবাসের এই আবশ্যিক বিষয়গুলোকে পড়ানোর জন্যে শিক্ষক যিনি হবেন তিনি নিশ্চয়ই একজন বাচিকশিল্পী হবেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়েও মান উচ্চারণে কবিতা পড়ার বা শোনার আগ্রহীদের সংখ্যা বাড়বে। আমরাতো জানি শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতার সাথে যুক্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাচিকশিল্পীর নিয়োগ এই শিল্পের সামগ্রিক চেহারা বদলে দেবে। সমাজে সাংস্কৃতিক-মানবিক চর্চা গতিশীল হবে। ফলে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে সংস্কৃতিচর্চার পরিধি বড় হবে।

মানুষের আগ্রহ বাড়লে দেশের গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা লোকদেখানো বা দিবসভিত্তিক থাকবে না। আবৃত্তি-পাঠ-গল্পবলার জন্য একজন শিল্পী হয়ে উঠবেন গণমাধ্যমের জন্য অপরিহার্য।

যদি এমন হয় গণমাধ্যমগুলোর সাথে সাথে সরকারি-আধাসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান শিল্পীদের জন্য কোটা রাখেন তাহলে কাজটা এগিয়ে যাবে। শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, টেলিভিশন বা বেতার নিজস্ব শিল্পীতালিকা ক’রে মাসিক সম্মানীর ব্যবস্থা করতে পারে। যে কয়জনই হোক শিল্পী। এতে একজন শিল্পীর অন্যেও দ্বারস্থ হতে হবে না।

আমি এই সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখি কারণ এর প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের ধর্মীয় মৌলবাদ, গোড়ামী, কুসংস্কার, এসব থেকে সমাজকে একটি মানবিক-সমাজে রূপ দিতে চাইলে মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির মনন তৈরির বিকল্প কি?

আর এই আন্দোলন নিঃসন্দেহে আবৃত্তির মতো একটি আপাত অবিপণনেয় শিল্পকে অবলম্বন করে পেশাদার শিল্পী তৈরি হবে।

পৃষ্ঠপোষকতা
টিকিট কেটে অনুষ্ঠান দেখার প্রবণতা একেবারেই নেই আমাদের। একসময় ছিল- এমন কথা আপ্তবাক্যের মতো শোনাবে। সংগঠনগুলো সেই চেষ্টা করতে পারে কেউ কেউ করছেও ইদানীং কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করলে পেশাদার শিল্পীর জন্য টিকিট-ধারণা খুব বড় কিছু নয়। বরং আয়োজকের অনুষ্ঠানের খরচ ওঠানোর একটি উপায় হতে পারে টিকিট। তবুও আমি মনে করি দর্শনীর বিনিময়েই অনুষ্ঠান হওয়ার প্রবণতা থাকতে হবে। এতে আয়োজক থেকে শুরু করে এরসাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের দায়িত্ব বাড়বে। যেমন তেমন করে একটি অনুষ্ঠান করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। বিনিময় যখন অর্থ তখন দায় এড়ানোর সুযোগ থাকে কম। আর এতে অনুষ্ঠানের মান বাড়বে সন্দেহ নেই। মান বাড়লে দর্শক বাড়বে। দর্শক বাড়লে পৃষ্ঠপোষক পাওয়া সহজ হবে। সর্বোপরি শিল্পীকে একটি সম্মানজনক সম্মানী দেয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। ‘সম্মানী’ শুধু শিল্পীর সম্মান বাড়াবে তা নয় এতে শিল্পীর দায়িত্বও বাড়বে।

পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে দুটো কথা বলতে চাই। এই শব্দটির মধ্যে একধরণের পোষা ব্যাপার আছে। অন্যের আনুকুল্য পাওয়ার আকাক্সক্ষা আছে। পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন মনে না করলে অর্থ দেবে না। আর দিলেও তা দয়া করে দেবে। দয়ার টাকায় পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে কি!

ভাল মানের অনুষ্ঠান হওয়াই একমাত্র এবং শেষ শর্ত। মান ভাল না হলে দর্শক বিমুখ হবে। দর্শক আগ্রহ না দেখালে পৃষ্ঠপোষকতা দয়া-দাক্ষিণ্যে পরিণত হবে।

তার আগে চাই
এতো গেল আবৃত্তি বা বাচিকশিল্পীর পেশাদার হয়ে ওঠার স্বপ্নকথা (!)।কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আছে ‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’। আমাদেরও ঠিক করতে হবে ‘তার আগে’ কি চাই। আমাদের এই স্বপ্নকে অলীক প্রতীয়মান করতে না চাইলে আবৃত্তিশিল্পকে পেশা হিশেবে নিতে কিছু পূর্বশর্ততো মানতেই হবে। শিল্পী হিশেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা এবং এই শিল্পের উৎকর্ষসাধন। সমাজের অভ্যন্তরে প্রয়োজন দেখা না দিলে অথবা মানুষের জীবনবোধে স্থান না হলে সেই শিল্প কী করে পৃষ্ঠপোষকতা পাবে। আর এই প্রয়োজন অনিবার্য করে তুলবার দায়িত্বতো সমাজের মধ্য থেকেই তৈরি হবে। অথবা যিনি বা যাঁরা এই শিল্পের সাথে আছেন তাঁদের দায় বেশি বৈকি।

আমরা আমাদের এখনকার অবস্থা যদি বিবেচনা করি তবে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারি না। এমন কি পাশ্ববর্তী দেশের শিল্পীদের যে উৎকর্ষসাধন এই শিল্পে; তাও ভিন্ন মূল্যায়ন দাবি রাখে। ওপারে অনেকেই আছেন যাঁদের আবৃত্তি বা বাচিকশিল্পচর্চা ছাড়া আর কিছুই করতে হয় না। আমাদের এখানে সেই ক্ষেত্র তৈরি হয়নি এখনো। সম্ভাবনা নেই সেকথা বলছি না। ক্ষেত্র তৈরির সমস্ত সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখেই বলতে চাই, সবার আগে চাই শিল্পী; হোক একজন অথবা একঝাঁক।

সংকট
‘সংকট’ শব্দটির মধ্যে আমি সম্ভাবনা দেখি। অর্থাৎ সম্ভাবনা আছে বলেই আমরা এর সংকট বা সীমাবদ্ধতাগুলো নিয়ে চিন্তাযুক্ত থাকি। আবার যে মাধ্যমটি সম্ভাবনাময় সেই মাধ্যমে সংকট সপরিবারে নিজ দায়িত্বে এসে হাজির হয়। ফলে একে দূর করা দূরহ হয়ে পড়ে। আমরা কি বুঝতে পারছি আবৃত্তিশিল্পের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সংকট বা সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী?

আমি খুব সংগঠনপ্রিয় মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে সংগঠনের পক্ষে আমার একটি দৃঢ় অবস্থান আগেই বলে রাখছি। এদেশে আবৃত্তি সংগঠনগুলোর ভূমিকা ঐতিহাসিক এবং আমাদের জন্য গর্বের। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আবৃত্তির ইতিহাসের সাথে আমাদের এই জায়গায় সামান্য পার্থক্য আছে বলে মনে হয়। আমাদের এখানে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে সংগঠন গড়ে উঠেছে। আবৃত্তিকে হয়ে উঠেছে শাসন-ত্রাসনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার। ফলে সংগঠনের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা কখনোই হারাবে না, হারানো ঠিক হবে না।

কিন্তু সংগঠনচর্চা আমাদের এখানে পেশাদার আবৃত্তিশিল্পী তৈরিতে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতাগুলোর অন্যতম- একথা আমি বলতে চাই। খুব বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাবো না। ব্যক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে যদি সমষ্টির বিকাশ হতো তবে সংগঠনই হয়ে উঠতে পারতো পেশাদার শিল্পী তৈরির অন্যতম স্থান কিন্তু উল্টোটা হয়েছে; আমরা দেখবো ব্যক্তির বিকাশ রুদ্ধ হয় এখানে সমতার নামে। ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’-এই ধারণা সংগঠনের শক্তি বৃদ্ধি করেছে সন্দেহ নেই এবং অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সফলতা দিয়েছে হয়তো কিন্তু ব্যক্তির বিকাশকে বাধাগ্রস্তও করেছে। ফলে অন্য অনেককিছু করে সময় পেলে আবৃত্তি করবার চেষ্টা করেছে মেধাবীরা। অমেধাবীদের সাথে ‘রাজা’ হওয়ার সাধও মিটেছে অল্প দিনেই। তবে সংগঠনের ইতিবাচক ভূমিকা নেই সেকথাও বলতে চাই না। কিন্তু সামান্য বলেই মনে হচ্ছে সে ভূমিকা।খুব অল্প কয়েকজনের নাম আমরা বলতে পারবো যাঁরা খুব উজ্জ্বল আবৃত্তিতে। খুব গভীর পর্যবেক্ষক হওয়ার প্রয়োজন নেই- এঁদের আবৃত্তিশিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে সংগঠনের ভূমিকা বোঝার জন্য।

নিজেদের মতো
আমি বলেছি পেশাদারিত্বে আসতে হলে পেশাদারিত্বের এখনকার ধারণা থেকেও হয়তো বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা পেশাদার বলতে এতক্ষণ যা বুঝেছি তা আমাদের বোঝানো হয়েছে বলেই বুঝেছি। আমরা পশ্চিমকে বুঝেছি। এমনকি পশ্চিম বাংলা দিয়েও পেশাদারিত্বকে বোঝার চেষ্টা করি কেউ কেউ। কিন্তু এই যে পশ্চিম বা পশ্চিমবঙ্গ তার সমাজ-অর্থিৈনতক এমনকি রাষ্ট্রিক বাস্তবতার সাথে আমাদের কোনো অমিলও কম নয়। আরেকটু সাহস করে বলতে চাই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ইতিহাসেরও অমিল অনেক। ফলে ‘ওদের’ মতো করেই পেশাদার হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের সমাজনিরিখে আমাদের মতো করে ভাবতে হবে।

আবৃত্তিশিল্পে পেশাদার শিল্পী তৈরিতে এখানকার অর্থনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতাকে মাথায় নিতে হবে। ক্ষেত্রগুলোকে তৈরি করতে হবে। দর্শকই শেষ কথা। সমাজে মননশীল মানুষই চূড়ান্ত কথা। অন্যকে উদাহরণ হিশেবে ভাবতে অসুবিধা নেই কিন্তু নিজেদের সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেদের মতো করেই পেশাদার হয়ে ওঠার বিকল্প নেই আবৃত্তিশিল্পীদের।

আমি জানিই না শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা কেমন ছিল অন্তত চার-পাঁচশো বছর ধরে। শিল্প-সাহিত্যের লোকজনের বেঁচে থাকা কেমন করে ছিল। আমরা রাজা-নবাব-জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতার কথাই শুধু জানি এর বেশি কিছু না। কিন্তু আমাদের বাউল বা চারণ শিল্পীদের মূল পৃষ্ঠপোষণা তো সাধারণ মানুষই করেছে। তাই আজকে শিল্পীর পেশাদারিত্বের আলোচনায় আমি নিজেদের সামর্থ্যরে কথা বলছি। আমরা তাকিয়ে থাকবো কখন অন্যদের মতো করে সুবিধাগুলো তৈরি হবে আর সুবিধাবাদিরা তা চেটেপুটে খাবে আর এই বলে প্রচার করা হবে যে, আবৃত্তিতে পেশাদারিত্ব খুব হচ্ছে।

শেষের কথা
শেষ কথা বলে কিছু নেই। কারণ কথা শেষ হবার নয়। আবৃত্তিশিল্প ও পেশাদারিত্ব – এই শিরোনামের প্রবন্ধে কেবল আমি আমার নিজের মতকেই তুলে ধরেছি। খুব গোছালো হয়েছে তা বলতে চাই না। তবে কথাগুলো, এই বিষয়আলোচনার ‘শুরু’ হিশেবেই আমি আপনাদেরকে বিবেচনা করতে বলবো। আমার এই আলোচনাকে সূত্র ধরে যদি বিস্তৃত হয় পেশাদারিত্বের আলোচনা এবং পরিশেষে যদি আমার কথাগুলোর অপ্রাসঙ্গিকতা প্রমাণিত হয়ও বিদগ্ধ আলোচনায়; তবু আমি আনন্দিত হবো।

২৮ নভেম্বর ২০১৮, ঢাকা


লেখক:

সোহেল আনোয়ার
আবৃত্তিশিল্পী ও প্রশিক্ষক


error: Content is protected !!