আবৃত্তি আমার হৃদয়বৃত্তি


মানুষ বুদ্ধি দিয়ে চলে, উপলব্ধি করে হৃদয় দিয়ে। এই দু’য়ের সংমিশ্রণে তৈরি হয় বিবেক। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সংস্কার ও অর্জিত শিক্ষা বিবেককে করে শানিত। আমি যা কিছুই করি না কেন, তার পিছনে কাজ করে যুক্তি। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, ভালো-মন্দ যে কোন কাজের জন্য মানুষ কিছু যুক্তি খাঁড়া করে। সেটা কাজ করার পূর্বে বা পরে যে কোন মূহুর্তেই ঘটতে পারে। যুক্তি তৈরি নিজেকে সমর্থন করার জন্যে, নিজেকে রক্ষা করার জন্যে। কিন্তু বিবেক, সে কখনো বাঁকা হাসি হাসে। কখনোবা তীব্র হুল ফোটাতে দ্বিধা করে না। তবে, অই যে বুদ্ধি, সে হৃদয়ের চতুর্দিকে আবরণ তৈরি করে বিবেকের বাঁকা হাসির উপর পর্দা ঢেকে দেয় মুহূর্তেই। জয় হয় বুদ্ধির, তবে তা শুভ নয়, কূটবুদ্ধি। আর এখানটায় এসে ভর করে কৌশল।


জীবনে একটি মহাকাব্য রচনা না করেও কবি-খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করা রবীন্দ্রনাথকে উদ্দেশ্য করে অনেকেই ব্যাঙ্গোক্তি করতেন। কায়কোবাদ বলেছেন, “যিনি সারা জীবনে একটিও মহাকাব্য রচনা করিতে পারেন নাই, তিনি কিসের কবি?” সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মন্তব্য, “যে রবীন্দ্রনাথের গৌরবে আজ বাংলাদেশ আত্মহারা হইয়া উঠিয়াছে তিনিও মহাকবি নহেন; তিনি শুধু গীতিকবি। তিনি বহু সংখ্যক সঙ্গীত, গাঁথা ও কবিতা রচনা করিয়াছেন বটে; কিন্তু একখানিও মহাকাব্য লেখেন নাই।সঙ্গীত, গাঁথা ও কবিতা বসন্তের ফুলের ন্যায়, উহা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় না”। এসব কথায় কোন আমল না দিয়ে রবীন্দ্রনাথ অবলীলায় বলতে পেরেছেন,

“আমি নাববো মহাকাব্য
সংরচনে
ছিল মনে
ঠেকিল যখন তোমার কাঁকন
কিংকিণীতে,
কল্পনাটি গেল কাটি
হাজার গীতে।
মহাকাব্য সেই অভাব্য
দুর্ঘটনায় পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে
কণায় কণায়।”

এরকম সরল উক্তি নান্দনিক হয়েছে সহজভাবে বলার ধরনটিতে। ফুল উপহার দেওয়ার অর্থ কী হতে পারে, তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভাবিত হননি। বরং এর মধ্যে অর্থ খোঁজার প্রবণতা তাঁকে পীড়িত করেছে।

আমন্ত্রিত হয়ে বহু অনুষ্ঠানে যেতে হয় আমাদের। আয়োজকদের বিলম্ব অথবা ত্রুটিতে ক্রোধ সংবরণ না করতে পেরে বিব্রত করি তাদের। রবীন্দ্রনাথ একবার এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করার আমন্ত্রণ পেলেন। নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে দেখলেন আয়োজকদের কেউ সেখানে নেই। একটুও হৈচৈ না করে তিনি এক টুকরো কাগজে লিখে রেখে গেলেন –

“এসেছিলেম
বসেছিলেম
দেখলেম কেউ নেই ;
আমার সাড়ে পাঁচটা জেনো
পাঁচটা তিরিশেই।”

রবীন্দ্রনাথ পারেন, আমরা পারি না। কারণ বড় মানুষের মধ্যে যে সাধারণ একটি মানুষ লুকিয়ে রয়েছেন, তার প্রকাশটিকে আমরা অসাধারণ ভেবে আড়ালে রাখি। আর আমাদের মেকি অসহজ আচরণটিকে সাধারণ ভেবে স্বস্তি পাই। যার অহঙ্কার করার মতো ধন আছে, তিনি যদি অহঙ্কারী না হন, তবে তাকে অসাধারণ ধরে নেওয়া হয়। আর যিনি ধনে মানে দরিদ্র হলেও বড়াইয়ে কমজোরি নন, তাকে মনে করা হয় সাধারণ। কিন্তু এর উল্টোটা হওয়া উচিৎ নয় কি? সাধারণ তো সেই ব্যক্তি, যার প্রকৃত ক্ষমতা আছে, কিন্তু দাপট দেখাবার উৎসাহ নাই। আর অসাধারণ যে জন, তার আচরণও অস্বাভাবিক, নিজের ক্ষমতার ওজন কতটুকু তা সে নিজেই জানে না।

এখন কথা হচ্ছে সাধারণ হওয়ার জন্য সাধনার প্রয়োজন আছে কি না? সেটা আবার কেমন? ধরা যাক,আমি হাঁটতে শিখেছি, কথা বলতে পারছি, তার জন্য চর্চার প্রয়োজন পড়েনি? পড়েছে, তবে অবচেতনে। এই চর্চাটি আমরা সকলেই যে যার মতো করে চলেছি নিরন্তর। কিন্তু যে সহজভাবে কথা বলছে তাকে তো আমরা আলাদা করে ফেলতে পারছি, নাকি? যেমন মনে করা যাক, ওয়াহিদুল হক, তাঁর কথা বলার ধরণটি কি সাধারণ না অসাধারণ? আমরা শম্ভু মিত্রকে কলকাতায় সামনাসামনি হাঁটতে দেখে স্তম্ভিত হয়েছি, পুলকিত হয়েছি। তো তাঁর হাঁটার মধ্যে কি অস্বাভাবিকতা ছিল, না তিনি খুব অবলীলায় সহজ ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছিলেন? যদি এই দু’জনের কথা ও হাঁটার ভঙ্গিমায় কোন বিশেষত্ব থাকে, তা হচ্ছে তাঁরা সহজভাবে বলেন ও হাঁটেন। তাই স্বাভাবিক নয় কি? তবে একে অসাধারণ ভেবে ধোঁয়াশা করে তুলি কেন? হয়তো এটাই তাঁদেরকে অন্যদের থেকে পৃথক করে বলে তাঁরা সকলের চোখে অসাধারণ হয়ে ধরা দেন। সহজ হয়ে বলার ও চলার ব্যাপারটি তাঁদেরকে যেমন অসাধারণ করে তোলে, অন্যদেরকে তেমনি সাধারণ করেও ফেলে। তা, এটা কি এমনিই ঘটেছে? না তার পশ্চাতে কোন সাধনার ঈঙ্গিত রয়েছে।

এই পথরেখাটি ধরে আর একটু অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা যাক এবার। আমাদের কথা বলা, আবৃত্তি করা, সাংগঠনিক চর্চা, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদির ভেতরে কেমন একটা কৌশলের প্রলেপ প্রবেশ করছে।

আবৃত্তি কর্মশালাগুলিতে শেখানো হয় সহজ হওয়ার উপায়। স্বর, শরীর, মনকে উন্মুক্ত করে রাখার পদ্ধতি সাজানো হয় বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে। উচ্চারণ, গদ্য-পদ্য পাঠের মধ্য দিয়ে বোধকে জাগ্রত করার ও প্রকৃত উপলব্ধির স্বরূপ উন্মোচনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত থাকে সেখানে। ধরে নেওয়া হয়, পথ চলতে চলতে স্বাভাবিক বিকাশ ঘটবে মানবিক গুণগুলোর। এ পর্যায়টি যান্ত্রিকতার কাল। আলাদা কর্ম শুরু হওয়ার কথা মূল দলে প্রবেশের পর। আর এইখানটাতেই গোলমাল বেঁধে যায়। তালগোল পাকিয়ে ফেলে অধিকাংশ ছেলেমেয়ে। দমন করা প্রচলিত ধ্যান-ধারনার সুপ্ত লক্ষ্মণগুলো মাথা চাড়া দেয় আবার। যে পর্যায়গুলো অতিক্রম করা হলো তার অন্তর্নিহিত সুর হারিয়ে দিশেহারা হয়ে কুশলী হয়ে উঠতে শুরু করে পুনরায়। তার প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত আচরণে এবং আবৃত্তি হয়ে উঠে যান্ত্রিকতায় পরিপূর্ণ। তা শুনতে মন্দ লাগে এমন নয়। উচ্চারণ হয়তো ভালোই হয়, স্বরভেদ ও টেমপো যথাযথ এবং অর্থ প্রকাশে তেমন কোন অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা না গেলেও তাতে একটি ব্যাপারে ফাঁকি থেকে যায়। তা হলো প্রাণের ছোঁয়া। স্বরবাদনের পৌনঃপুনিকতায় ভরপুর প্রচেষ্টা নিষ্ফলা হয় একটুখানি প্রাণ-স্পর্শের অভাবে।

এই যে আমি বোকা সাজার ভান করে মস্ত কুশলী থাকছি, আমার আবৃত্তিতে প্রভাব ফেলার জন্য এটাই যথেষ্ট নয় কি? বাহবা পেতে পেতে একদিন শূন্যের ঘরে পৌঁছে যেতে হবেই আমাকে। এর থেকে পরিত্রাণ নেই কোন। অল্প সময়ে এবং আয়াসে আপাতত ভালো করে ফেলতে পারার ক্ষমতাটুকু দাঁড়িয়ে থাকে একঠাঁই, এগোয় না একতিলও। আবৃত্তিযোদ্ধা, আবৃত্তিবোদ্ধা বা আবৃত্তি-পন্ডিত হয়ে উঠি একলাফে। শেখবার, জানবার ও মানবার আকাঙ্ক্ষাটুকু লোপ পেয়ে যায় তখন। মুখে বলি, আপনার কাছে শিখতে চাই আরো। কিন্তু মনে মনে বলি, তোমার চেয়ে আমি কম কিসে? আমিও তো পারি নানান কারিশমা দেখাতে। তোমাকে আর গুরু মানবো কেন?

অন্তরের ভাব গোপন রেখে অন্য ভাব প্রকাশ করাকে বলে অবহিত্থা ভাব। আমরা অবহিত্থার পাল্লায় পড়ে গেছি। তাইতো আমাদের আবৃত্তি হয়ে উঠে যান্ত্রিক ও কৌশলগত। কেন, আমি কি প্রাণ খুলে হাসতে পারি না? মনের কথাগুলোকে সরল ও অকপটে বলতে পারি না? পারি হয়তো, বলি না। অমুকে তমুকে আমার কথাগুলোকে সহজভাবে গ্রহণ করবে না, তাই। আমার হাসির ভিতর অন্য কোন রহস্যের সন্ধান পাবে, তাই। বেশ, তাহলে তুমি যদি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করো, তবে একাজ কর কেন? অন্য কিছু করো। অযথা সময়ের অপব্যবহার কেন? তাহলে ভাবতে হবে, ত্রুটি কি আমার নিজের? আমি যখন হাসি তখন কি কায়দা করে হাসি? যখন মন খুলে কথা বলতে চাই, তখন মনের সুতোগুলো কি পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে প্রকাশিত হয়? তাই হয়তো কথাগুলো গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে না। হাসির অন্য কোন অর্থ দাঁড়িয়ে যায়।

এই যদি অবস্থা দাঁড়ায়, তাহলে আমার কথা বলা, আবৃত্তি করা আর সাংগঠনিক চর্চা করা-এতে ক্রমাগত প্যাঁচ লাগতেই থাকবে।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন —

“উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে
তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।”

এই তফাৎ ঘোচাতে হলে আমাকে সহজ হাওয়ার সাধনায় মগ্ন হতে হবে। কৌশল করে করে সিঁড়ির ধাপ টপকে উপরে উঠা যায়, তবে নিঃশেষ হয় প্রাণাবেগ। এই ব্যাপারটি আমাদের এমনই চেপে ধরেছে যে, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য-রাজনীতি, খেলাধুলা -প্রায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা হীনবল, দীনদরিদ্র হয়ে পড়ছি। যা দেখতে চাই, তার বীজ বপন না করেই ফললাভের আশায় ছুটে চলেছি।

মানুষ বুদ্ধি দিয়ে চলে, উপলব্ধি করে হৃদয় দিয়ে। এই দু’য়ের সংমিশ্রণে তৈরি হয় বিবেক। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সংস্কার ও অর্জিত শিক্ষা বিবেককে করে শানিত। আমি যা কিছুই করি না কেন, তার পিছনে কাজ করে যুক্তি। ন্যায়-অন্যায়, সত্য-অসত্য, ভালো-মন্দ যে কোন কাজের জন্য মানুষ কিছু যুক্তি খাঁড়া করে। সেটা কাজ করার পূর্বে বা পরে যে কোন মূহুর্তেই ঘটতে পারে। যুক্তি তৈরি নিজেকে সমর্থন করার জন্যে, নিজেকে রক্ষা করার জন্যে। কিন্তু বিবেক, সে কখনো বাঁকা হাসি হাসে। কখনোবা তীব্র হুল ফোটাতে দ্বিধা করে না। তবে, অই যে বুদ্ধি, সে হৃদয়ের চতুর্দিকে আবরণ তৈরি করে বিবেকের বাঁকা হাসির উপর পর্দা ঢেকে দেয় মুহূর্তেই। জয় হয় বুদ্ধির, তবে তা শুভ নয়, কূটবুদ্ধি। আর এখানটায় এসে ভর করে কৌশল।

আলোচনা থেকে কী বেরিয়ে এলো আর একটু বুঝে নিই। ক্রমাগত অনুশীলনের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় দক্ষতা। তা ক্ষমতাকে সংহত করে এবং এর সঙ্গে বুদ্ধি প্রয়োগ করে সাফল্যের সন্ধান লাভ করা যায়। অপরদিকে হৃদয়বৃত্তির জন্য দরকার মানসিক বিকাশের এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির। তার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। সবকিছু সহজ, স্বাভাবিক ও সরলভাবে দেখতে পারার যে আনন্দ, সেই আনন্দকে উপভোগ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। উপলব্ধির জগৎটাকে আবিষ্কার করতে পারলে জীবনাচরণ হবে শুদ্ধ, শান্ত ও সৌন্দর্যময়। তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাচনে ও আবৃত্তিতে। লাগবে প্রাণের ছোঁয়া। কৃত্রিমতামুক্ত আবৃত্তি বেরিয়ে আসবে মনের গহীন অঞ্চল থেকে। জটিল পংক্তিমালা উচ্চারণকালেও সরল অর্থ প্রকাশিত হবে এবং স্বাভাবিক হৃদয়াবেগের মুক্তি ঘটবে। প্রতিষ্ঠা পাবে প্রাণ।


লেখক:

মীর বরকত
আবৃত্তিশিল্পী ও প্রশিক্ষক
অধ্যক্ষ, কণ্ঠশীলন

error: Content is protected !!