উত্তরের অনুভবে দক্ষিণ

‘শালু, ওঠ এবার। ঘড়িতে কটা বাজে দেখ।’ মায়ের কথা শুনে গায়ের চাদরটা মুখের ওপর টেনে মেয়ে ওদিক ফিরে শুল। মেয়ের অবস্থা দেখে, মা চিল্লিয়ে বলল, ‘উঠবি এবার, ১১টা বেজে গেছে। বাইরে থেকে থেকে স্বভাবটা গেছে’। মায়ের কথায় মেয়ে একটু বিরক্ত হয়ে, ‘উফ্, দাঁড়াও না, উঠছি’। আলসে চোখটা আধখোলা অবস্থায় শালু হাতড়ে হাতড়ে ফোনটা খুঁজে পেল।

শালুর মা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সকালে উঠতে না উঠতেই হাতে ফোন’। মা-র কথা উপেক্ষা করেই মেয়ে হোয়াটস্ অ্যাপ স্ট্যাটাসের উপড় আঙুল বোলাচ্ছিল। হঠাৎই একটা ভিডিও দেখে আনমোনা হয়ে পড়ল শালুর আঙুলগুলো। একজন পাবলিক ফিগারের একমিনিটের একটা ছোট্ট ভিডিও, এই লকডাউনের সময় নিজের কাছের বন্ধু যার সাথে অনেকদিন কথা হয় না, তাকে একবার জিজ্ঞেস করেই ফেলুন, ‘কেমন আছিস?’

মিনিট খানিকের এই ছোটো ভিডিও ঝড় তুলল শালুর মনে। মনের ওপারে একটা নাম ভেসে উঠছিল ‘শৌর্য’। কেমন আছে ও? বাড়ি ফিরেছে! নাকি পড়ে আছে ওই দূর শহরেই, চাকরিটা….

ও ঘর থেকে ভেসে এল শালুর মায়ের চিৎকার, ‘উঠবি তুই?’। শালু বিরক্তিস্বরে বলল ‘ উঠে পড়েছি, আসছি’। মায়ের সাথে কথা বলতে বলতেই আড়ষ্ঠ আঙুলগুলোর হালকা স্পর্শে খুলে গেল একটা ছোট্ট টেক্সট বক্স, শিরোনামে ‘শৌর্য’ ৷ মনের দ্বিধা নিয়ে নিজের অজান্তেই টাইপ করে ফেলল একটা ছোটো মেসেজ ‘কেমন আছিস?’
মেসেজটা টাইপ করেই ফোনের আলো বন্ধ করে ধড় পাকিয়ে উঠে পড়ল শালু।

শালু অবশেষে বিছানা থেকে উঠে মুখ ধুঁয়ে, এক কাপ চা নিয়ে ব্যালকনিতে বসে বদলে যাওয়া শহরটাকে দেখছিল, হঠাৎই ফোনটায় আলো জ্বলে উঠল, শৌর্যের ম্যাসেজ। তাড়াহুড়োর ছলকে পড়ল কাপের চা, আর সঙ্গে একটা চাপা ঝড় উঠেছে শালুর মনেও। ম্যাসেজের উত্তরে দুটো অক্ষর এসেছে… ‘ভালো’। আনমনা শালুর মনে পড়ে গেল পুরোনো দিনের কথাগুলো।

শালুর ভালো নাম শালিনী সেন, জাতে বাঙালি, জন্ম কোলকাতায়। কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোর নিবাসী হলেও করোনার কড়াল ছায়ায়, চাকরি হারিয়ে বর্তমান ঠিকানা তিলোত্তমা কোলকাতা। এই ব্যাঙ্গালোর শহরের বুকেই কর্মসূত্রে শালুর সাথে আলাপ শৌর্যের, খাঁটি বাঙালিবাবু গোছের মফস্বলের ছেলে। কোলকাতা থেকে ব্যাঙ্গালোর ভায়া দিল্লিগামী ফ্লাইটের যাত্রী দুজনেই। দুজনেরই গন্তব্য ব্যাঙ্গালোর। এয়ারপোর্ট থেকে বেরোবার সময় প্রথমবার কথা হয় ওর সাথে শালুর।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল শালু, শৌর্যের থেকে কোনো পাল্টা প্রশ্ন না পেয়ে নিজে থেকেই বলে উঠল ‘আমি কেমন আছি, জিজ্ঞেস করবি না?’
সোজা সাপ্টা উত্তর এল ‘না, মেসেজ যখন করতে পারছিস, তখন ভালোই আছিস’।

….একই থেকে গেলি তুই।
বরাবরই শৌর্য এমনই অভিমানী। সবাই উত্তরে গেলে ও দক্ষিণে যাবেই।

… এই কথাটা শুনতে শুনতেই শৌর্যের বড় হওয়া। যেমন গাড়ি চালানো শেখার সময়ও নাকি উত্তরকে দক্ষিণ বলাটাই ছিল তার স্বভাব। একবার শৌর্য ও শালুর কথোপকথনের মাঝেই প্রকাশ পেয়েছিল, শৌর্যের অজানা জীবনের দক্ষিণটাকে ভালোবেসে ফেলার গল্প। আসলে শৌর্যের কাছে দক্ষিণ শুধুই একটা দিক নয়, দক্ষিণ মানে একটা বাঁধনছাড়া মুক্ত অধিশ্রয়, যেখানে নেই রোজনামচার আড়ম্বর, নেই ‘অচলায়তন’ এর বিশাল প্রাচীর। উদীয়মান সোনালী ভোর যেখানে রোজ নতুন নতুন স্বপ্নের ডালি নিয়ে হাজির। তাই স্বাভাবিকভাবেই মায়ের কথায় ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে, দক্ষিণে গিয়ে সাংবাদিকতাকেই আপন করেছিল। তাই হয়ত সাউথ ফেসিং ব্যালকনির চেয়ে জীবনের দক্ষিণটাই তার বেশি প্রিয়, আর প্রিয় ছিল শৌর্যের শৈশবের বেড়ে ওঠার কলকাতা শহরটাও।

এসব ভাবতে ভাবতেই মনের মধ্যে উথাল পাতাল চলছিল শালুর। ফোনটায়, আলো জ্বলতেই সে দেখল, শৌর্যের মেসেজ ‘আমপানের পর তোরা সব ভালো তো? লকডাউনে আমার শহরটা কেমন আছে?’

শালু অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, সে কোলকাতায় সে খবর কেউ জানে না, অথচ সে জানে। হঠাৎই এক ঠাণ্ডা হিমেল পরশ বয়ে গেল শালুর শরীরের মধ্যে দিয়ে, তবে কি….

নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে, কাঁপা হাতে টাইপ করল, ‘তুই কি করে সিউর হলি, আমি কোলকাতায়?’
উত্তরের অপেক্ষায় থাকা শালুর কাছে প্রতি মিনিট কয়েক ঘন্টার মতো মনে হল। দক্ষিণের ঝড়ো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল তার মন। শৌর্য তাকে একবার বলেছিল, এমনটাই হয় নাকি সাউথ ফেসিং ব্যালকনিতে, কখনো চায়ের গ্লাস হাতে মৃদু হাওয়ায় জীবনের দু-চার কথার চর্চা, আর ঝড় উঠলেই হয় বিষম বিপদ। ঠিক যেমন দক্ষিণকে ভালোবেসে রোমান্সের চরম মুহূর্তে উন্মত্ত হয়ে যেত, আবার অভিমান, খারাপ লাগার মুহূর্তে সে বিমর্ষ। শৌর্য এরকমই চঞ্চল, জীবনরসে ভরা, যে থামতে শেখেনি, হার মানতে শেখেনি, যার স্বপ্নেরা বিশাল আকাশের মত। যার কাছে প্রদীপের নীচের ছায়াটাও ‘রে অব হোপ’। এখনও কি ও এমনই আছে?

ফোনের নোটিফিকেশনে হুশ ফিরল মেয়ের… জ্বল জ্বল করছে কয়েকটা শব্দ, ‘খবর রাখি তোর’।
শৌর্য অদ্ভুতভাবে ফেলে আসা সেই দিনগুলোতেও একইরকম ভাবে শালিনীর খবর রাখত। হাজারও কাজের মাঝে শালুর জন্য তার সময়ের অভাব হত না। একবার শালুর জ্বর হয়েছিল, শিফট শেষে শালুর বাড়ি এসে সারা রাত শালুর মাথায় জলপট্টি লাগিয়েছিল। সারা রাত না ঘুমিয়ে ভোরবেলা আবার কাজে গেছিল। যাওয়ার আগে শালিনীকে বলেছিল ‘মাই স্লিপিং বিউটি’।
পুরোনো দিনের কথাগুলো আজ বড্ড মনে পড়ছে শালুর। এসব ভাবতে ভাবতেই শালু পাল্টা উত্তর দিল ‘তাই!!! আর কী কী খবর রাখিস, শুনি?’
….এই তুই যেমন একটু আগে ঘুম থেকে উঠে কফির কাপ হাতে বারন্দায় বসে৷ এখনও সেই লেট রাইজার।
….ভুল হল একটু, কফি নয় চা ।
…হ্যাঁ! তুই তো চা লাভার।
শালু আর শৌর্য উত্তর-দক্ষিণই ছিল বটে। স্যার কফি হলে, ম্যাডাম চা। আর লেট রাইজার শালুকে ঘুম থেকে তুলে শিফটে পাঠানোর দায়িত্ব ছিল শৌর্যের। আর কফি খাওয়া নিয়ে সেদিন সে এক কাণ্ড করে বসে শালু।

সাদামাটা ছেলেটাকে কাটিং গ্লাসে ক্যাপাচিনো খাইয়েছিল শালিনী, হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘ইডিয়েট, কোলকাতা হলে মাটির ভাড়ে দিতাম’। যদিও সেই কাটিং গ্লাসের সেই কফি, শৌর্যের কাছে ক্যাফিন নয়, শালিনীর হাতের অমৃতের স্বাদ ছিল। কেবলা চোখে শালুর চোখে তাকাতে গিয়ে ঠাণ্ডা কফিতেই মন ভরিয়েছিল শৌর্য।

‘সকাল থেকে ফোন…’ মায়ের গলায় মতি ফিরল শালুর। কিছুটা ভয় আর জড়তা নিয়েই শৌর্যকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো, ‘তুই কি আবার প্রেমে পড়েছিস?’
‘…অবশ্যই, আমি তো রোজ প্রেমে পড়ি৷’
শৌর্যের কথায় শালুর চোখে অজান্তেই জল এল। ঝাপসা হয়ে এল চোখ।
‘…নতুন কাকে জোগাড় করলি, শুনি?’
রহস্যের ভাষায় উত্তর এলো ‘এক দক্ষিণকে’।
‘…মানে?’
‘…মানে আবার কি? ব্যাঙ্গালোরের প্রেমে পড়লাম।’
‘…তুই আর ব্যাঙ্গালোর!’

দক্ষিণমুখী ছেলের চাকরিসূত্রে ঠিকানা হয় এই দক্ষিণের শহর। কলেজবেলা থেকে যার স্বপ্ন দেখত সে, ভারতের গার্ডেন সিটি, সিলিকন ভ্যালি দক্ষিণের অন্যতম এক শহর, ব্যাঙ্গালোর। শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের প্রথম এয়ারপোর্টে পা রেখে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল শৌর্যের, এক অজানা ভয় আর কৌতুহল তাকে গ্রাস করছিল। সত্যি বলতে একদম মনে ধরেনি সেদিনের শহরটা। চারিদিকে ধূ ধূ লাল মাটি, রোদ্দুর, ধোসা, ইডিলি-বডায় এক অদ্ভুত দক্ষিণী গন্ধ, নাক সিঁটকেছিল সে। আর রান্নার তড়কায় কাড়িপাতা, ..বিরক্তিকর…!

রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে মায়ের এই বীরপুরুষের বাড়ি যেতে ইচ্ছা করত। একবার শালুকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কেঁদেছিল শৌর্য। ‘দূর, ছেলেরা আবার কাঁদে নাকি, মায়ের বাবুসোনা…’ শালিনী এভাবেই বলত।

মিনিট দশেক বাদে এলো শৌর্যের রিপ্লাই, ‘হ্যাঁ রে! লকডাউনে যখন শহরের আকাশে নতুন নতুন মেঘ ছবি আঁকত, আর রঙিন ফুলগুলো হাজারও গল্প বলত, আমি কান পেতে সব শুনলাম। এই শহরের একটা মিষ্টি গল্প আছে রে। এই শহরটা হয়ত একাকি, আমার মতই, কোন তিলোত্তমা তার মন কাড়েনি। তবে শহরটা অভিমানী, বড্ড জেদী৷ ঠিক আমার মত। নাইট রাইডের রাতে মুগ্ধ হয়ে একদিন আকাশের তারা গুনলাম, সবুজের ছায়া ঘেরা রাস্তাগুলোর পাতাও গুনলাম’।
‘…মনে আছে ইন্দিরা নগরের সেই রাস্তা, সবুজের ছায়া ঘেরা রাস্তা তোর বড় পছন্দের, না?’
‘…হুম!!!৷ ভালো লাগে।’
‘… আর বৃষ্টি…’
‘… বৃষ্টি তো আমার প্রেম। এই যখন তখন দক্ষিণের টুপটাপ, ফিস ফাসই মন কেড়ে নেয় আমার।’
‘… তুই তো পার্সিয়ানের ছাদের বৃষ্টিতেও পাগল হতিস। সারারাত ফোনে বৃষ্টির গল্প বলতিস।’
‘…তুই জানিস না, পার্সিয়ানের উন্মুক্ত ছাদে যখন বৃষ্টি নামে, কী অপরুপ সেই দৃশ্য! ছোট ছোট করে কাটা সবুজ গাছগুলো হাওয়া বৃষ্টির ঝাপটে বেসামাল, সবুজ গাছে টিয়া গুলো চঞ্চল, সামনের লেকের সবুজ আবছায়া জলে অঝোর ধারায় বৃষ্টি…পারফেক্ট রোম্যান্টিক ওয়েদার…’
‘…ওরে আমার রোম্যান্টিক পুরুষ, তাতেও তোর চুমু খেতে এত অসুবিধে হত।’
‘…ছাড় এসব কথা। সাহস করে চুমু খেয়েও তো তুই আমার প্রেমে পড়িস নি।’
ইমোজির ব্যবহারে কয়েক মুহুর্তের নিস্তব্ধতা।

প্রথম স্যালারির গুটিকতক টাকা পেয়ে শৌর্য আর শালিনী ব্যাঙ্গালোর শহরটাকে দেখতে বেড়িয়েছিল। অটোরিকশায় সবুজ ঘেরা আবছায়া রাস্তায় ক্রমে জমে উঠছিল প্রেম। শালুর হাতটা ধরে শৌর্য বলেছিল, তুই না থাকলে ব্যাঙ্গালোরের সকালগুলো এত মিষ্টি হত না।

সময় যত কেটেছে, তত গভীর হয়েছে তাদের বন্ধুত্ব। তারপর এল সেই নবমীর রাত। শালু আর শৌর্যের প্রথম শহর ছাড়া দুর্গাপুজো। নীল সাদা শাড়িতে তখন শৌর্যের মনে বসন্ত। অঞ্জলি দিতে দিতে কানে কানে বলেছিল, ‘মিষ্টি লাগছে’। পুজো শেষে হাত ধরে হ্যাচকা টান মেরে একটু আলাদা হয়ে গিয়ে, এক উষ্ণ দৃষ্টিতে অনেকক্ষণধরে শালুকে দেখে বলেছিল, ‘ঠিক আমাদের বাড়ির পাশের ঝগড়ুটে কাকিমার মত লাগছিস…’। এরকমই শৌর্য, হাসি ঠাট্টায় মজলিস জমিয়ে দেয়। নবমীর রাতে, সেকি বৃষ্টি! দুজন এক ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে, ভিজেটিজে অবশেষে বাড়ি ফেরা। এই জন্যই শালিনীর বৃষ্টি একদম পচ্ছন্দ নয়। শালু বলত, বৃষ্টি হলেই ক্যাব পাব না, এই সেই হাজারও জ্বালা। সেদিন দেরি করে ক্যাব এলেও বৃষ্টিতে জমে উঠছিল রসায়নগুলো। ক্যাব বাইরের জানলার কাঁচ দিয়ে বয়ে চলছে বৃষ্টির জল আর সঙ্গে…
‘মুঝে ক্যাইসে পাতা না চলা
কে তু ম্যানু প্যার কারদি
মুঝে ক্যাইসে পাতা না চলা
কে মেরে হি ইনতিযার কারদি…’

অপেক্ষারত শৌর্যের ভীতু ঠোঁটগুলোই সেদিন বেসামাল হয়ে ডুবে গেছিল শালুর ঠোঁটের হালকা গোলাপি রঙে। শালুর হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল, ‘তোর হাতটা এইভাবেই সারাজীবন ধরতে চাই’। না, প্রেম পরিণতি পায়নি। কারণ শালিনীর কাছে জীবন মানে ছিল শুধুই কেরিয়ার, বাকিটা স্রোতের সাথে এগিয়ে যাওয়া। শৌর্য কোন এক চোরাস্রোতে শালিনীতে যখন ক্রমাগত হারিয়ে যাচ্ছে, শালিনী তখন স্পষ্ঠ জানিয়ে দিল, ‘তারা শুধুই ভালো বন্ধু’। আর দুজনের ঠোঁটে দুজনের ডুবে যাওয়াটা, নেহাতই একটা ‘গো ইউথ দ্য ফ্লো’…আর ব্যাঙ্গালোরের এমন বৃষ্টি ভেজা মিষ্টি ওয়েদারে এমন একটা দুটো স্রোতে ভাসা হতেই পারে।

মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরল শালুর, ‘খেতে আয়’। ঘড়িতে বারোটা বাজে। শালু অস্বস্তিগুলোকে উপেক্ষা করেই জিজ্ঞেস করল, ‘রান্না করলি নাকি অর্ডার করবি? এখন কিন্তু বাইরে থেকে অর্ডার করাটা ঠিক নয়। যা পরিস্থিতি!’
শৌর্য আর শালিনীর পথটা কিছুটা হলেও সমান্তরাল হয়ে গেলেও শালু আজও শৌর্যের হাতটা ছাড়তে রাজি নয়। বারন্দায় বসে অশ্রুসজল চোখ মুখে অস্পষ্ঠ ভাবে শালু বলে উঠল, ‘মিস ইউ রে’।

খেতে বসে ভাতের থালায় আঁকিবুঁকি করতে শালু ভাবছিল, রান্না করতে শিখেছে শৌর্য? ঘরের একমাত্র ছেলে হওয়ায় একসময় রান্নাবান্না, কাপড়কাচা কিছুই জানত না শৌর্য, তার উপড় নতুন শহরের একাকিত্ব। সবকিছু মিলিয়ে খানিকটা ঘেঁটে যাওয়া শৌর্যের জীবনের জটগুলো আলগা করাই ছিল শালিনীর কাজ।

ফোনের নোটিফিকেশনে ফোনের দিকে তাকিয়ে শালু দেখল শৌর্যের রিপ্লাই, ‘জানি, মাসিমা!! হাত পুড়িয়ে ডিম ভাজা আর ভাত রান্না করেছি’।
‘…আচ্ছা, আজকে অফ্?’ শালিনী জিজ্ঞেস করল।
‘…হুম!!!’
‘…কী করিস রে অফ ডে তে?’
‘….কেন বুড়ো সন্ন্যাসীর, পেট মোটা বোতলের সাথে নিজের দুঃখগুলো শেয়ার করি’
‘…তুই আর ওল্ড মন্ক…’

সেই সময় ছুটির দিনগুলো একদম মনে ধরত না শৌর্যের। শালুকে একবার সে বলেছিল, এখানে পাড়ার মোড়ে না আছে ক্রিকেট, না আছে রকের আড্ডা। এখানে আড্ডা হয় কাঁচের গ্লাসে রঙিন পানীয় আর বরফে। নাইট পার্টি, উদ্দাম নাচ গান, সেল্ফিতে হয় এখানকার উইকেন্ড। আর অফ ডে মানেই ঘরে আসবে বুড়ো সন্ন্যাসীর পেট মোটা বোতল, শুরুতে ভীষণ অপচ্ছন্দ ছিল শৌর্যের। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অপচ্ছন্দটাও পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই শৌর্যের রিপ্লাই এল ‘শহরটার সাথে অ্যাডজাস্ট করছি৷ নইলে ব্যাঙ্গালোরের পথে চলতে চলতে বস্তিগুলো দেখলে যেমন আগাছা মনে হয়, আমাকেও তাই মনে হত, না!’
‘…তুই অনেক বদলে গেছিস।’
‘…হ্যাঁ! আমাদের সমাজটাও যে বদলাচ্ছে। নিউ নর্মাল, মাস্ক পরছিস তো।’
‘….মজা করিস না।’
‘…শোন মাসিমা, মাস্ক আর স্যানিটাইজারটাকে সঙ্গের সাথী করে নে।’
‘…মাস্ক পরলে দমবন্ধ হয়ে আসে। তোর শহরটায় আর দমবন্ধ হয়ে আসে না, না?’
‘…না রে, নন স্মোকিং শহরটায় জীবনের স্মোকগুলো মিশে গেলেই কেল্লা ফতে।’
‘….মানে!’
‘….কিছু না। ’
‘…বল না।’
‘…জ্বালাস না। ’
‘….আর কোলকাতা কবে ফিরবি?’
‘…আগামী কয়েকদিনের মধ্যে।’
‘….হোটেলের খবর…’
‘…টার্মিনেশন লেটার চলে এসেছে। দুদিনে ক্লিয়ারেন্স।’
‘…মানে!’
‘….প্রেম পরিণতি পায়নি, যথারীতি।’
‘….প্যাকিং হয়ে গেছে?’
‘…কোথা থেকে শুরু করি বল তো, গোছানো। এই শহরের এত স্মৃতি গুলো কোন ট্রলিতে গোছাই, বল তো?
মসলা ধোসা, সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্লিটার কফি, এম জি রোডের মোমোর দোকানটা, দক্ষিণী ‘ফিস কারি’, কর্ণাটকা চিকেন কোথায় নেব এদেরকে?’
‘…কোলকাতায় আয়, মাছের ঝোল, কচি পাঠার মাংস, মাটির ভাড়ে চা, যাদবপুরের মোমোয় ভুলে যাবি তোর দক্ষিণকে।’
‘…আর তোর স্মৃতিগুলো? বাক্স বন্দি করে মেরে ফেলব বলছিস?’

নীরবতায় সেদিন ভালোবাসারা গল্প করেছিল। শহরটা ছাড়ার একরাত আগেও ডুকরে ডুকরে সারা রাত কেঁদেছিল শৌর্য। সেই শহর যে শহরটার সে একদিন স্বপ্ন দেখত, সেই শহর যে শহর থেকে সে একদিন পালাত চাইত, সেই শহর যেখানে এসে সে আর তার স্বপ্নরা বেসামাল হয়ে পড়েছিল, সেই শহর যা তার কাছে ভীষণ দমবন্ধ ছিল। তবুও আজকাল বড় ভালোলাগত শহরটাকে।

দিন চারেক বাদে শৌর্যের ফ্লাইট, প্রেমিকাকে ছেড়ে তিলোত্তমার বুকে ফিরবে প্রেমিক। একবার শেষবারের মত এই শহরটায় বুক ভরে নিশ্বাস নিল। রাতের জোনাকির আলোয় আরেকবার পুড়িয়ে দিল তার স্বপ্নগুলোকে। স্বপ্ন-বাস্তবায়নের শহরের ডাইরির পাতাগুলো দাউ দাউ আগুনে পুড়ছিল, যন্ত্রণায় কুকড়ে উঠছিল সে। শেষ হল একটা অধ্যায়, কাল থেকে আবার নতুন স্বপ্ন, নতুন জীবন, সবটাই যে ‘নিউ নর্মাল’।

পরদিন নতুন সকালের নতুন সূর্যের আলোয় বোর্ডিং গেট খুলে গেল, মাত্র দু ঘন্টার পথ, তারপর আবার তার পরিচয়, একটা চ্যাংড়া, বেকার। আজ কিছুতেই স্বপ্ন দেখতে পারছে না শৌর্য। ফ্লাইটের সিঁড়িতে পা দিতেই শৌর্যের ফোনে ভেসে উঠল শালুর ম্যাসেজ, ‘হ্যাপি জার্নি’। উত্তরের অপেক্ষা না করেই চঞ্চল শালুর প্রশ্নবাণ ছুটে এলো,
‘আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে
কিছুই কি নেই বাকি?’

একটু চুপ করে থেকে রিপ্লাই দিল,
‘রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।’


লেখক

সঞ্চারী পাল


error: Content is protected !!