একাল সেকাল সংগীতে অসমন্বিত দ্বন্দ্ব

ফিউশন বনাম কনফিউশান

একালের সংগীতে বাজার লুটছে ফিউশন সংগীত। নতুন কালের নতুন বিষয়ের প্রতি ঝোঁক থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আতঙ্ক হচ্ছে, ফিউশনের ঝোঁক পৃথিবীর সব দেশেরই আত্মজ সংগীতকে দিনকে দিন কনফিউশনে ভরিয়ে তুলছে। ভেবে দেখুন, আধেক হিন্দি-উর্দু বুলি তো আধেক পর্তুগিজ কিম্বা এরাবিক বুলি যুক্ত করে সারা বিশ্বের যাবতীয় তাল ও সুর বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রণে লেপ্টে যাচ্ছে লালন, রবি, নজরুল, হাসন প্রমুখের গান। সে গান ফিউশন না কনফিউশান -তা ভাবতেই নিশ্চিত আঁতকে উঠবে লালন-রবিদেরও প্রাণ।

এমনকি এ কালের নামকরা কতিপয় বাংলাদেশী কণ্ঠশিল্পীরাও নিজেরাই নিজেদের মৌলিক গান নিয়ে ফিউশনের প্রতিযোগিতায় মরিয়া। কারণ এইসব ফিউশন মানে, পৃথিবীর তাবত বাদ্যযন্ত্র শিল্পী ডেকে এনে নিজেরই গাওয়া গানকে আন্তর্জাতিক মান দিয়ে নতুনভাবে গাওয়ার প্রয়াস। তাতে মূলগানের ওপর জবরদস্ত অপারেশন চালানো হলেও সমস্যা নেই কারোর। আর এইসব ফিউশনওয়ালাদের কম্বিনেশনে দেখা যায়, বাদ্য শিল্পীরা নিজেরাই একেকজন সেরের উপর সোয়া সের। চার মিনিটের গান চৌদ্দ মিনিট পর্যন্ত বাড়াতেও এদের জুরি নেই। ফিউশন ওস্তাদদের কাছে একটা ভাওয়াইয়া গান দিন। গানটিকে টুকরো টুকরো করে হিপহপের পেরেক ঠুকে জোড়াতালি দিয়ে তার উপর ইরানি-আজেরি-রাশান লোকজ গানের বার্ণিশ মেরে আপনাকে একটা রিফাইন্ড গান উপহার দিতে পারবে ফিউশন ওস্তাদ। অর্থাৎ একটা গানেই আপনি বিশ্বসংগীত ভ্রমণ সেরে নিতে পারবেন অনায়াসে।

কিন্তু কী শুনলেন, কী বুঝলেন – ওসব প্রশ্নের কোনো উত্তর পাবেন না। কারণ আপনার মগজে একটা জরুরি নীতিশিক্ষা বহু আগে থেকেই কর্পোরেট প্রভুরা গুঁজে দিয়েছে। তা হলো, বিদেশি মানেই উন্নত চকচকে আন্তর্জাতিক মানের লোভনীয় কিছু একটা। বিদেশি বলতে তা সে কোনো জিনিসই হোক আর কোনো মানুষই হোক। দেশির চেয়ে বিদেশি সবেতেই আপনার আমার দৃষ্টি একটু আহ্লাদিত ও পুলকিত হয় বেশি। এই যেমন, দেশির ভীড় ঠেলে রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ এক বিদেশিকে হাঁটতে দেখলে আপনার আমার নজর বারবার ঐ বিদেশির দিকেই দৌড়বে। তা সে বিদেশি সাদাই হোক কিংবা কালো। তেমনি করে এই বিদেশি আকর্ষণের দৌড় খেলানো চলছে দেশি সংগীতের সাথেও। ফিউশন একপ্রকার দেশি বিদেশি সুরের কোলাজ। কিম্বা জোড়াতালি বললেও ক্ষতি নেই। সংগীত যদিও নিজেই তার স্বীয় মান নিয়ে ভৌগলিকতার রেখা টেনে বসে থাকে। তাই সংগীতকে বিশ্বমানের ট্রফি প্রতিযোগিতায় দৌড়তে হয় না। সারাবিশ্ব যদি একই সুর, একই তাল, একই বাদ্য দিয়ে গান গাইতোই তাহলে তা এতদিনে এত এত বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে পারতো না। একঘেয়ে আকাশও কিন্তু ক্ষণে বদলাতে চায় বলেই সারাদিন ওর দিকে তাকিয়ে থাকলেও মানুষের চোখ ক্লান্ত হয় না। বরং বিস্মিত হয়।

কিন্তু বাংলাগানের জগতে ফিউশনে জোড়াতালি দেওয়া পরিবর্তনগুলো বিস্মিত করতে পারছে না। এখানে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার দৌড়ঝাঁপের ব্যস্ততার অতিমাত্রা লক্ষণীয়। যেন গ্রাম্য বাউলকে ধরে এনে এসব ফিউশন ওস্তাদের পরিচালনায় ভিন দেশি কণ্ঠশিল্পী-বাদ্যশিল্পীর ভীড়ে গাওয়াতে পারলেই সেই গান, সেই বাউল বিশ্বমানের হয়ে গেলো!

আদৌ কি ব্যাপারটা ঠিক তাই? সংগীত শিল্পের উৎস কি এরকম বারোয়ারি হরেকমালের বাজারে পাওয়া গেছিলো? প্রকৃত অর্থে, নৃগোষ্ঠীর স্বভাব-চরিত্র-খাদ্য-পোশাকের মতন সংগীতও মূলত ভৌগলিক বস্তু। সংগীতের নিজস্বতা মানেই নির্দিষ্ট ভৌগলিক নৃগোষ্ঠীর বায়োলজিকাল ভাষা-ভাবপ্রকাশ-শিল্প। আর তাই ফিউশনের নানান সুরের কোলাজে নতুন কিছু গড়েনি এখনও। বরং আত্মজায় ভাঙন ধরার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। কারণ, ফিউশনে বহুজাতিক কোলাজ থাকে ঠিকই কিন্তু যার যার নিজস্ব নৃ-সত্তার প্রকটে মিশে যেতে পারে না একে অন্যের সাথে। ফলে ফিউশানকৃত (কোলাজ) গানগুলো হয়ে পড়ে পোস্টমর্টেম করা ডেডবডির মতোন কাটাছেঁড়া। অথচ পৃথিবী জুড়ে বিচিত্র ভৌগলিক সংগীতের দিকে তাকালে কোলাজের চেয়ে মিলনের সম্ভারে একেকটি মার্গ (Classic) সংগীত সৃষ্টির উপাখ্যান পাওয়া যায়।

প্রতিটি মার্গ সংগীত লোকজ (Folk) সুরের সম্ভারে মোকাম প্রাপ্ত হয়েছে। যেমন আজারবাইজানি-ইরানি নৃগোষ্ঠীর পারিসার (এক প্রকার লোকগান) ‘হে-হে-হে-হে’ (কম্পনযুক্ত দীর্ঘ সুরের ধ্বনি) যাকে বলে ‘জমজমা’। এই জমজমা শৈলী মরুদেশ পাড়ি দিয়ে ভারতে ঢুকে টপ্পা গান সৃষ্টি করেছিলো। জমজমা শৈলী টপ্পায় এসে হয়ে উঠেছে দানাদার। অর্থাৎ প্রাচ্যের জমজমা (হে-হে) পঞ্জাব-গুজরাটের ভৌগলিকতায় মিশে গিয়ে ভিন্ন মাত্রার দানাদার ও (আ-আ, এ-এ) টপ্পা নামের নবশৈলী সৃষ্টি করেছে। পারিসার জমজমা আরব্য সংগীতের সাথে মিশে গিয়ে হয়ে উঠেছে চটুল ও দীর্ঘ সুরের স্বতন্ত্র প্রকাশ। মঙ্গোলিয়ান সুর কম্পনও প্রকাশ করে ভিন্ন মাত্রা। তাই, টপ্পার দানাদারের পাশাপাশি পারিসার জমজমা শুনলে দুটিরই ভিন্নতা সাধারণ শ্রোতার কানেও সনাক্ত হয়। কিন্তু সেই ভিন্নতা ছাপিয়েও সুরের মিলনের যে সৌন্দর্য – তাতেই আবিষ্ট করে তোলে শ্রোতার চিত্তকে। অথচ ফিউশনের কোলাজের ভিতর এই মিলনকে ছিন্ন করে হড়বড়িয়ে ঢুকে পড়ে স্বতন্ত্রতা আর তাতেই শ্রুতিতে লাগে প্রচণ্ড ধাক্কা। ফলে বেশিক্ষণ সে গান শ্রোতার মননে টিকতে পারে না। গানের সুর-বাণীর চেয়ে ফিউশনে কণ্ঠ শিল্পীর সাথে ঝাঁক ঝাঁক বাদ্যশিল্পীর দক্ষতাই সেখানে প্রধান। কে কত গাইতে পারে আর কে কত বাজাতে পারে – ফিউশনের মাহাত্ম্য সেখানেই যেন ঠেকে আছে বাংলাদেশে। যার ফলে যন্ত্রের যত সম্ভারই থাকুক না কেন ফিউশন বাংলা গানের জন্য শিকড় ছিন্ন করার অশনি বৈ আর কিছু নয়। বিশ্বের সবার সাথে মিতালি করার চেষ্টায় ফিউশনে ডুবে গিয়ে যেন এক অসমন্বিত দ্বন্দ্বের গভীরে হাতড়ে বেড়াচ্ছে গানের অস্তিত্ব। এটার মূল কারণ বোধ হয়, আমাদের কতিপয় ফিউশন ওস্তাদরা হয়ত মূল গানের সাথে সময় কম কাটিয়ে, আন্তর্জাতিক বৈচিত্র্যের পিছনেই বেশি সময় দিচ্ছেন। যার ফলে, ফিউশনকৃত গানগুলোয় কোকস্টুডিও ফ্যাসিনেশন যতটা, মূল গানের প্রতি মনোযোগ ততোটা দেখা যায় না।

মর্ডান ফোক

ফিউশন আগমনের কিছুকাল আগে মর্ডান ফোক বলে আর এক প্রকার ঝড় বাংলাদেশে বয়ে গেছে। যার গতি এখনও থামেনি। চলছেই। তবে ফিউশন ঝড়েরই পূর্ব আলামত এই ‘মর্ডান ফোক সং’। কেডস-জিন্স-পাঞ্জাবি/টিশার্টের সাথে মাথায় একটা গামছার পট্টি বাঁধলে কিম্বা গলায় গামছা ঝুলিয়ে রাখলে মর্ডান ফোকের চিত্রটি দেখা যায়। হ্যাঁ, মর্ডান ফোক সং- এর বাংলায়ন করলে সমার্থক হিসেবে আধুনিক পল্লীগীতি দাঁড়ায়। এজাতের গানে ঢোলও বাজে সাথে অক্টোপ্যাডও তাল দেয়। একতারা, দোতরার পাশে রিদম ধরে রাখতে বাজে গীটারও। সবমিলে কীবোর্ড সর্বস্ব মিউজিক অর্কেস্ট্রা।

পল্লীগীতির মত নিখাদ আঞ্চলিকতা পুষ্ট না হলেও বাণীর ধরণ অনেকটা আঞ্চলিকই। কিন্তু তবুও মর্ডান ফোক গান শুনলে কোথায় যেন মনে হয় ফোক শব্দটা না রাখাই উত্তম। আঞ্চলিক আধুনিক গান হলেই বা দোষ কোথায়! কিম্বা মর্ডান রিজিওনাল সং। পল্লীর তো আধুনিক হবার দরকার নেই। পল্লীর কোল থেকে উঠে আসা সুর-বাদ্য, ভাষা-ভাবের জন্যই তো সে পল্লী। এ তো শহুরে বিষয় নয়। তো মর্ডান ফোক সং না বলে মর্ডান টাউন সং, মানে আধুনিক মফস্বলি গান – এসব নামও মানানসই লাগে। কেডস-জিন্স-পাঞ্জাবি/টিশার্টের শহুরে পোশাকের সাথে মাথায় পট্টি বা গলায় তামাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য গামছা ঝোলানোর চিত্রের মতন।

তবে স্বীকার করতেই হয়, মর্ডান ফোক সংয়ের ভীড় ঠেলে অনেক নতুন গানের বাণী-সুর এবং গায়কী সত্যিকার অর্থেই প্রাচীন পল্লীসংগীতের ভাবধারা বয়ে নব্য যুগে উৎকৃষ্ট কিছু পল্লীগীতির প্রজন্ম পাওয়া গেছে। অনেক উদাহরণ থাকলেও আলোচনার ছোট্ট পরিসর বজিয়ে রাখতে এই মূহুর্তে প্রসঙ্গক্রমে একজনকেই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। ওস্তাদ বারি সিদ্দিকীর গাওয়া প্রতিটি নতুন গানই যেন মেঠো বাংলার হৃদয় ছোঁয়ানো। একালে শোনা তাঁর গাওয়া গান এবং গায়কীই বলে দেয় মহাকাল তিনি পেরিয়ে গিয়েছেন অবলীলায়।

বাংলাগানের ভুবনে আধুনিক যাবতীয় নতুন নতুন সুর-তালবাদ্যের সাথে পরিচয় ছিলো তাঁর। বলতে গেলে, এসবের আখড়াতেই তিনি বসত করতেন। কিন্তু তবুও তাঁর গানে আমরা বাদ্যের ব্যবহারে যে পরিমিতিবোধ এবং সুরসংযোগে পল্লীর নিজস্ব যে মার্গীয় পরিচয় পেয়েছি তাতে মনে হয় না মর্ডান ফোক বলে আদৌ কিছু রয়েছে বা গড়বে। প্রকৃত সংগীত বোদ্ধার কাছে মর্ডান-ওল্ড বলে কিছু থাকে না। ভালো সুর, ভালো বাণীর ভাবের সাথে যথার্থ সুরতাল বাদ্য সঙ্গতই মূখ্য। তাছাড়া ‘মর্ডানফোক’ – শব্দ যুগলই সংগীতের ক্ষেত্রে এক অসমন্বিত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। পল্লীর সাথে শহুরে যোগসাধনায় ওস্তাদ বারী সিদ্দিকী একজন অনন্য প্রতিভা।

মর্ডান ফোকের ঝড়ে লালন, হাসন, রাধারমণ, বিজয়, শাহ্ আব্দুল করিম সবার গানকেই যেন কচলে কচলে আধুনিক করার অপপ্রয়াস দেখা যায়। অথচ এঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের স্বীয় কালে আধুনিকই ছিলেন চিন্তায়, চেতনায়, মননে এবং সংগীতে। এই জাতীয় পল্লীগীতি আজকের যুগে ফিউশনের অপারেশন-অটিতে এসে যেন প্রকৃত লাবণ্য হারিয়ে ফেলছে।

বাংলাগানের আদি ইতিহাসে এক অসন্বিত দ্বন্দ্ব

বাংলাগানের ধারাক্রমিক ইতিহাসে চর্যাপদকে মিশ্র ও সান্ধ্যভাষার দায় চাপিয়ে বৈষ্ণব কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দ’কেই বাংলাগানের আদি উৎস মানা হয়। কিন্তু যদি জয়দেব কালীন বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয় তাহলে বাংলাগানের এই আদি উৎসের সাথে সমূহ অসমন্বিত দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। বাংলাগানের ইতিহাসে এও মানা হয় জয়দেবের গীতগোবিন্দই মূলত বাংলার কীর্তন গানের উৎস। কিন্তু চর্যাপদের বাণী যদি ভাষার অণুবীক্ষণে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে, গীতগোবিন্দকে বাংলার পদাবলী কীর্তনের উৎস মানা যায় না। এমনকি বাংলাসাহিত্যের পদযাত্রাও গীতগোবিন্দের মাধ্যমে শুরু হতে পারে না। এছাড়াও, গীতগোবিন্দের সাথে বাংলা সংগীত ও সাহিত্যের মূলত কোনো সম্পর্কই ছিলো না কোথাও। গীতগোবিন্দ বাংলারই গান্ধর্ব ইতিহাস বটে, কিন্তু এমন জাতপাত ছুঁৎ মার্গের রাজসভার গান্ধর্ব সেটি, যার সাহিত্য সংগীতের সাথে তৎকালের আদি বঙ্গবাসীর কৃষ্টির কোনো লেনদেনই ছিল না।

বর্তমানে, কীর্তন একপ্রকার ধর্মীয় মার্গসংগীত (classic) রীতি। কীর্তন মানে কোন মতবাদ, উদ্ভাবন (Idea) কিম্বা মিথ কেন্দ্রিক গল্প সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা (narrating), পাঠ করা (reciting), বলা (telling), বর্ণনা (describing); এই শিক্ষানীতি প্রাচীন ভারতের সকল জনপদেই মুনিঋষি-গুরুশিষ্য তাপসিক পরম্পরায় প্রচল ছিলো। কারণ তখন গ্রন্থ তুলনায় শ্রুতিশিক্ষাই ছিল আদর্শ পন্থা। বিশেষ করে প্রাচীন ভারতীয় সকল লোক ধর্মেও এই রীতির ব্যবহার ক্রমবিবর্তনের পথে হেঁটেছে। সুরে সুরে মিথ সংশ্লিষ্ট মতবাদকে অধ্যায়/সর্গ এমনকি নাট্যাঙ্ক বিভাজনেও এই শ্রুতিশিক্ষার প্রচল ছিলো। কাহিনী বিন্যাসের এমন কৃষ্টি প্রাচীন বাংলায় বুদ্ধনাটক ও বুদ্ধকীর্তনেরও বিকাশ ঘটায়। বুদ্ধকীর্তন ও নাটকের পরিচয় চর্যাপদেও পাওয়া গেছে। চর্যাপদ একপ্রকার কীর্তনই। চর্যার পদে পদে বাংলার আধ্যাত্মশিক্ষা, সমাজচিত্র এবং জীবন-জীবিকা সহ জীবনবোধ শিখনের প্রয়াস পাওয়া যায়। এছাড়াও গৌতম ও মহাবীর উভয়েরই জীবনচরিত কীর্তন, নাট্যশিল্পের মধ্য দিয়ে যে বিশ্লেষিত হতো তার ইঙ্গিত বিভিন্ন শিলাপ্রত্নেও পাওয়া যায়। এই যাবতীয় কীর্তনকেই পদাবলী বলা হতো। বুদ্ধপদাবলী আজও সীমিত হলেও প্রচলিত। কিন্তু বিশেষ ভাবে অবহেলিতও।

কীর্তনকে সংস্কৃত শব্দ বলা হলেও এখানে সন্দেহ থেকে যায়। কেননা যে আর্যরা কৃষিকাজই জানতো না, বরং পুণ্ড্রে প্রবেশ করে কৃষিকাজের ব্যবস্থাপনা দেখে হতভম্বই হয়েছিলো কালের বিবর্তনে দেখা যায় তাদেরই শব্দ ভাণ্ডারে বাংলার বিভিন্ন কৃষি হাতিয়ার সহ কৃষিজাত শব্দের সঞ্চয়। বহু প্রাকৃত শব্দই আর্য লেখকের গ্রন্থে গিয়ে সংস্কৃতের দাবীদার বনে গেছে। তাই কীর্তনকেও সংস্কৃত শব্দ হিসেবে মানতে ঊনরাজী। বৈদিক রীতি বিরোধী বাংলার লোকজ ধর্মে বিশ্বাসী মানুষগুলো আর্যভাষায় নিশ্চয়ই আকৃষ্ট ছিলো না। নৃপতি শশাঙ্কের ‘বৌদ্ধ তাড়াও’ কর্মসূচি নিশ্চিত সহজিয়ারা মেনে নিবে না। তাই চর্যাতেই লক্ষণীয়, সংস্কৃতকে দূরে রেখেই বরং বাংলার প্রাকৃত শব্দ ও ভাষায় বুদ্ধপদাবলী রচিত হয়েছে। যার কয়েক শতবর্ষ পরে রচিত হয় বৈষ্ণব কীর্তন। শশাঙ্কের পর বহু শতক পেরিয়ে যে কৃষ্টির সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটেছে রাজা লক্ষণ সেনের দরবারে।

অর্থাৎ কীর্তন কৃষ্টি (মৌর্য-গুপ্ত যুগেরও আগে) প্রাচীন বাংলার বৈরাগ্য সাধনার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি শব্দ। আবার বৈদিক সহ বাংলার লৌকিক, বৌদ্ধিক এবং জৈন সব মতবাদেই কীর্তন-পদাবলীর ব্যবহার প্রাচীন বঙ্গেরও কৃষ্টি বহন করে। কারণ, কীর্তন প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন মহাজনপদে প্রতিষ্ঠিত মহাবিহারেরও (বিশ্ববিদ্যালয়) পাঠ অন্তর্ভুক্ত বিষয় হওয়া অস্বাভাবিক নয়। গৌতম বুদ্ধ ও মহাবীরের মৃত্যুর পরেই এঁদের জীবনচরিত সম্বলিত কীর্তন বৈষ্ণবকীর্তনের চাইতেও প্রাচীন সৃষ্টি। এমনকি শশাঙ্কের আমলেও বৈষ্ণব কীর্তনের আলামত ছিলো না। গৌতম ও মহাবীর উভয়ই প্রায় সমকালীন মানব। উভয়েরই ভাবধারায় প্রাচীন বাংলার বৈরাগ্য সাধনা বিস্তৃতি পায়। কেননা, উভয়ই বঙ্গীয় জনপদে দীক্ষা দিতে এসেছিলেন। যোগসাধনার নিগূঢ়ে গৌতম ও মহাবীর সিদ্ধাচার্য উভয়েরই সাধন প্রভাব বাংলার মহাবিহারে যোগসাধনা শিক্ষাবলয় সৃষ্টি করেছিলো। আর তাই বৌদ্ধ ও জৈন সাধকদের কীর্তন বৈষ্ণবকীর্তনের চাইতে বাংলায় ছড়িয়ে ছিলো বহু শতাব্দী আগেই। নানান দেশের শাসকের নানান ধর্মের আবির্ভাবে বাংলার প্রাচীন লোকধর্ম তলিয়ে গেছে, জৈনরা হারিয়ে গেছে আর বৌদ্ধরা নেপাল, তিব্বত, আরাকান, চীন, থাইল্যান্ড বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে গেছে; অধিকাংশ নিহত হয়েছে। একথা তো বাংলার ইতিহাসই বলে। তাই গীতগোবিন্দ রচয়িতা জয়দেবকে ঘিরেও প্রশ্ন জাগে। কে এই কবি জয়দেব? কেন তাঁর গীতগোবিন্দকে বাংলার সাহিত্য ও সংগীতের উৎস ভাবতে হবে বা মানতে হবে?

ওডিসি বংশোদ্ভূত (পুরী, বঙ্গোপসাগরীয় অধিবাসী) কবি জয়দেব ছিলেন লক্ষ্মণ সেনের রাজসভার একজন সভাসদ। পণ্ডিত, কবি এবং রাজসভার পঞ্চরত্নের অন্যতম একজন। যিনি কখনই প্রাকৃত বাংলায় একবাক্যও সাহিত্য চর্চা করেননি, নিদর্শনও রেখে যাননি। তবুও কার ভুল বোঝাবুঝির জেরে বীরভূমকে তাঁর আদিনিবাস ভেবে জয়দেব মেলা পালিত হয়ে আসছে কয়েক শতক ধরে? ওডিশির জগন্নাথ মন্দিরে তাঁর গীতগোবিন্দ অক্ষত আজও। বাংলায় কেন নেই! নেই এজন্য যে তিনি তো মোটেই বাংলাভাষার সাধক ছিলেন না। এর সুরাহা দিয়েছেন বহু গবেষক। সম্প্রতি নতুন গবেষণাও একই কথা বলেছে, ‘By the time (1921) Mr. Popley wrote the said text, probably no modern Odia scholars have protested the dubious information about birth place of Sri Jayadeva although he belongs to Odisha. However now many researchers, scholars, poets, pandits and musicians of Odisha as well as West Bengal have clarified with supporting evidences that the real birth place of Jayadeva is Kendubilow of Khurda district (erstwhile Puri), Odisi’ (The style of Gita Guvinda Recital and Odissi Music, Page 42)। অর্থাৎ নতুন কালের গবেষকরাও প্রমাণ করেছেন, কবি জয়দেব অবাঙালি এবং ওড়িশি রাজ্যের পুরীর লোক ছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের নন। রাজা লক্ষ্মণ সেন তাঁকে দরবারে নিয়ে আসেন এবং সেই দরবারেরই সভাসদ হিসেবে তিনি গীতগোবিন্দ রচনা করেন।

তাহলে গীতগোবিন্দ কেন আদি নিদর্শন হলো বাংলা গানের ইতিহাসে? তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসও তো বলে না যে, লক্ষণ সেনের আমলে বাংলাসাহিত্য ও সংগীতের কোনো প্রকার যত্ন নেওয়া হয়েছিলো গান্ধর্ব পর্যায়ে। গান্ধর্ব তো দূরের কথা, বঙ্গবাসীর ভাষা শুনলেও সভাসদরা রৌরব নরকে যাবে – এমনই ব্রাহ্মণ্য বিধান ছিলো সেই দরবারে। বঙ্গীয় জনতা অপবিত্র, শূদ্র আর নমঃশূদ্র বৈ আর কিছু নয়। একদা সম্রাট অশোকের তাড়া খেয়ে জীবন বাঁচাতে পরাক্রমশালী বাংলাতেও ঢোকার সাহস পায়নি আর্য এবং তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদ। পরবর্তীতে সেই তারাই মনুসংহিতা সমেত ব্রাহ্মণ্যবাদ নিয়ে এদেশে প্রবেশ করার কিছুকালের মধ্যেই দেশি সমাজকে নিম্নবর্ণজাতে নিক্ষেপ করেছিলো নিজেদেরকে উচ্চস্তরে বসিয়ে। লক্ষণসেনের রাজসভায় সেই ব্রাহ্মণ্যবিধানই রাজত্ব করেছিলো। আর সে কারণেই বাংলার প্রকৃত অধিবাসীর সাথে গীতগোবিন্দ’র কোনো সম্পর্কও ছিলো না। তেমনি ব্রাহ্মণ্য রাজত্বের দরবারে কবি জয়দেবরও বাঙালি হবার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু কাল ও প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কয়েক শতাব্দী পরেও আমাদের ঐতিহাসিকগণ ব্রাহ্মণ্য ঔপনিবেশিক মনোভাব প্রকাশ করলেন, গীতগোবিন্দকে কেবল বাংলার কীর্তন গান নয় বরং বাংলাসংগীত ও সাহিত্যেরও আদি নিদর্শন ঘোষণা দিয়ে। এমনকি শ্রীচৈতন্যদেবকে বাংলার মহাজাগরণের মহানায়ক বানাতে গিয়ে, গীতগোবিন্দকে স্বীকার করে নিলেন আর বাংলার প্রকৃত শিকড়কেই ইতিহাসের পাতায় এড়িয়ে গেলেন- যা বোধগম্য হয়নি আজও। বিশেষ করে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের পর সেই পথ ধরেই তো বুদ্ধকীর্তন, বুদ্ধনাটকই হবার কথা ছিলো আদি নিদর্শন। কিন্তু তা হয়নি। যা সত্য তা ধর্ম-বর্ণ-কাল মাড়িয়েও সত্য। সে সত্যকে এখন স্বীকার না করলে বাংলাভাষা, বাংলাসংগীত, বাংলাসাহিত্যকেই আধখেঁচড়া ইতিহাস বইতে হবে আরও শতবর্ষ। বাংলার আদি ইতিহাসের সাথে সাহিত্য-সংগীত যে অসমন্বিত দ্বন্দ্বের ভিতর আজও চলছে; প্রাচীন ঔপনিবেশিকতার দাসত্ব বইছে; অস্তিত্বের আদি না খুঁজে বাতলে দেওয়া পড়শীর ঠিকানাকেই নিজ গৃহ ভাবছে – তাতে বন্দী হাতির গল্পটাই মনে পড়ে। এক পরাক্রমশালী হাতীর পায়ে কোনমতে শিকল লাগানো হলো। এভাবে দীর্ঘদিন গেলো। একদিন শিকল খুলে দেওয়া হলো। কিন্তু হাতীটা তবুও আগের মতোই অবস্থানে রইলো বহুদিন। কারণ দীর্ঘদিনের শিকল আর খুঁটি তার মগজে বন্দিত্বেরই ওপর বিশ্বাস গাঢ় করে দিয়েছিলো।

প্রসঙ্গক্রমে বিদ্যাপতির পদাবলীও বাংলার আদি নিদর্শন হতে পারে না। শ্রীচৈতন্য জয়দেব-বিদ্যাপতিতে মজেছিলেন বলেই কি জাগরণের জোয়ারে তাঁদের পদাবলী বাংলার আদি নিদর্শন হতে হবে? সে জাগরণ তো কৃষকের মাঠে ছিলো না, মজুরের জীবনে ছিলো না, মুসলমান সালতানাতের শুল্কের হিসেবে ছিলো না। এমনকি বাঙালিকে এক করতেও পারেনি। বরং ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’ – এই কালজয়ী বাণীটিরও মর্মার্থ বাঙালির মজ্জায় ধারণ করেনি। বৈষ্ণব জাগরণ ঘটেছিলো হয়তো কিন্তু তাতে ধানের মাঠের হিসেব বদলায়নি। জয়দেব-বিদ্যাপতির প্রতি শ্রীচৈতন্যের অনুরক্ত হওয়ার দরকার ছিলো বৈষ্ণবীয় প্রচারে, বাংলাগানের ইতিহাস প্রচারে নয়। সালতানাত ভাঙার পর বৃটিশ আমলে কেন জয়দেব-বিদ্যাপতি কাদের ভুলে বাঙালির শিকড় ঐতিহ্য হয়ে গেছিলো? বাংলাগানের আদি পর্বের ধারাটি নতুন করে সঠিক তথ্যে নির্মাণ জরুরি। এমনকি সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। মনে রাখতে হবে আমাদের ভূখণ্ড-ইতিহাসে বৃটিশ আমলের এক মীরজাফরই ছিল না। মীরজাফরের আগেও ছিল একজন, হলায়ুধ। লক্ষণ সেনের দরবারের সভাসদ, পণ্ডিত, কবি, সাহিত্যিক হলায়ুধও কিন্তু ইতিহাস বদল ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে মীরজাফরের চেয়ে কম ছিল না। তুর্কি শাসনকে স্বাগতমের জন্য ‘শেখ শুভদয়া’ তাঁর লেখা সবচে বড় প্রমাণ। বাংলার মসনদি ইতিহাস একদিকে ধর্মান্তরের কাহিনী গাঁথা, আরেকদিকে হলায়ুধ, মীরজাফরদেরও কুটক্যাচালের নকশা আঁকা। তাই, এখানে পদে পদে নতুন নতুন ধর্মশাসন কায়েম করতে ধ্বংস করা হয়েছে মহাবিহার এবং শিল্প-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির আদি শেকড়ও। আর এসব কাজে সবচে বেশি নৃশংসতার পরিচয় দিয়েছিলেন বিন বখতিয়ার। লক্ষন সেনকে হটিয়েই তিনি ক্ষান্ত ছিলেন না। শত শতাব্দী ব্যাপী বাংলার শিল্প-কৃষ্টির ঐতিহ্য ধারণকারী মহাবিহারও ধ্বংস করেছিলেন। এমনকি মাসের পর মাস ধরে বিহারের সকল গ্রন্থাগার পুড়িয়ে বঙ্গকে ইতিহাসশূন্য করে দিয়েছিলেন। এমনকি এই কাজ ভয়ঙ্কর রকমের বৌদ্ধ বিদ্বেষী সম্রাট শশাঙ্ক কিম্বা লক্ষণ সেনও করেনি। তারা বঙ্গীয় আমজনতার ওপর অত্যাচার করেছেন, বঙ্গীয় কৃষ্টিকে দরবার থেকে বহিষ্কার করেছেন, অপমান করেছেন জাতপাতের ব্রাহ্মণ্য বিধান আরোপ করে। কিন্তু তাঁদের আমলেও ইতিহাস হারা ছিলো না বঙ্গীয় কৃষ্টি। আবার যবন-বৃটিশ আমলে পশ্চিম বাংলা হয়ে ওঠে হিন্দু প্রধান। সেজন্য কি আদি কীর্তনের ইতিহাস জয়দেব-বিদ্যাপতিতেই মানতে হবে? কিন্তু কৃষ্টিতে যা সত্য তা ধর্মান্তরিত হলেও সত্য। ঠিক তেমনি সত্য বাংলার ভূখণ্ডে বৈষ্ণব সাহিত্যের আমলে (সেন আমল) প্রাকৃত বাংলার কদর ছিলো না। মনু ও ব্রাহ্মণ্য বিধান মতে বাংলা ছিলো অপবিত্র। অথচ, আর্যরা এই অপবিত্র মাটিতে থেকেই নিজেদেরকে সমাজের উচ্চ বলে মসনদ শাসন করিয়েছে। বঙ্গভাষা শুনলেই যাদের রৌরব নরকবাসের ভয়, আবার তাদেরই রাজসভার গীতগোবিন্দ কিম্বা বিদ্যাপতির পদাবলী কচলে বাঙালির আদি কৃষ্টি খোঁজাও তো সেই বন্দী হাতীরই দশা! নয় কি?

★ The style of Gita Guvinda Recital and Odissi Music, Dheeraj Kumar Mahapatra (International Journal of Humanities and Social Science Invention, October 2015)


লেখক

নূরিতা নূসরাত খন্দকার
সংগীত শিক্ষক ও গবেষক


error: Content is protected !!