কাকতালীয় কিংবা অন্যান্য

কাকতালীয় কিংবা

অনেকদিন পর ওর সাথে। বসুন্ধরা সুপার মার্কেটে এভাবে হঠাৎ করে দেখা হয়ে যাবে ভাবতে পারিনি। ফুডমলে বসে ওরা খাচ্ছিলো। উল্টোদিকে সাহেবি পোশাকে বসা ভদ্রলোকটি যে ওর হাজবেন্ড বুঝতে অসুবিধা হয়নি। বেশ উচ্ছ্বসিত হয়েই রীণা আমাকে ডাকে। পরিচয় করিয়ে দেয়, ‘মিট মাই হাবি ফয়সল… অ্যান্ড ফয়সল, মিট মাই ফার্স্ট ক্রাশ অলোক’। রীণার কথায় অপ্রতিভ হই। আগের মতোই আছে, মুখে আগল নেই। ফয়সল মৃদু হেসে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। ভদ্রলোকটি মাই ডিয়ার প্রকৃতির- প্রথম দেখাতে যে কারোরই ভালো লাগার কথা।

এবার রীণার পাশে বসা ছোট্ট ছেলেটির দিকে তাকাই। রীণা ওকে বলে, ‘সৌরভ, ইনি তোমার অলোক আংকেল, সালাম দাও’

বাচ্চাটিকে ভালোভাবে দেখে চমকে উঠি। এ যে অবিকল ছেলেবেলার আমি!



পরস্ত্রী

বিভাজিকায় চোখ পড়তেই দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে ফেলে। আমার দৃষ্টিটা যে অসভ্য ছিল না তা আমি দিব্যি দিয়ে বলতে পারি। তবুও খানিকটা অপ্রতিভ হয়ে হাসি আমি।
– হাসছো কেন?
– না, এমনিই …
– আমি জানি কেন … বুড়ো হয়ে গেছ তবু স্বভাব বদলালো না!
– কিসের স্বভাব?
– আহা, কী যে সুবোধ বালক… কিচ্ছু বোঝে না!
– দ্যাখো, সেইদিন কি আর আছে! এখন তো তুমি পরস্ত্রী!

লীনার মুখের দিকে তাকাই। ঈশান কোণে মেঘ জমেছে। ওর চোখ টলোমলো। শ্রাবণের ধারা যেন সহসাই নেমে আসবে। নিজেকে সামলে নিয়ে এবার বলে, ‘কাগুজে অধিকার নিয়ে ভাবছো কেন এতো? এখনো আমি তোমার… একটু জোর করেই দ্যাখো না…’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুনগুন করে গাইতে শুরু করি, ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে…’



অসহায় বিড়বিড়

ভুয়াপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জলিল ভুঁইয়া বাজার থেকে বাড়ি ফিরছেন। রাত নয়টা। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। মফস্বলের জন্য বেশ রাত। ভুয়াপুর স্কুলে তাঁর শিক্ষকতার বয়স প্রায় বারো বছর। এলাকার সবাইকে তিনি চিনেন। অনেকেই তার ছাত্র। এছাড়া তিনি ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন না। তাই রাতবিরোতেও নিঃশঙ্কে তাঁর চলাফেরা। বাজার থেকে ফসলান্দির দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে সেটিই তাঁর বাড়ির শর্টকাট পথ। তিনি সে পথেই হাঁটতে শুরু করলেন। কিছুদূর এগুতেই রাস্তার মোড়ে রাখা ইটের ঢিবির পেছন থেকে নারী কন্ঠের আর্তনাদ ভেসে আসলো, ‘বাঁচাও, বাঁচাও…’

কন্ঠটি তাঁর চেনা। কালাম ব্যাপারির মেয়ে রাজিয়া। এ বছরই এসএসসি পাশ করেছে। মেয়েটির আবেদনে সাড়া দিতে তিনি দ্রুতই ঢিবিটির দিকে এগিয়ে গেলেন। ধস্তাধস্তির শব্দের সাথে মেয়েটির গোঙানি স্পষ্টতঃই শুনতে পাচ্ছেন। হঠাৎ চোখে পড়ে ঢিবিটির সামনে পিস্তল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শামিম চেয়ারম্যানের সাগরেদ হান্নানকে। হান্নান তাঁর স্কুলেরই ছাত্র ছিল। নেশাখোরদের পাল্লায় পড়ে লেখাপড়া হয়নি। এখন শামিম চেয়ারম্যানের পেছন পেছন ঘুরে। স্যারকে দেখে হান্নান সালাম দিয়ে ধাতব কন্ঠে বলে, ‘চেয়ারম্যান সাব অপারেশনে আছেন। স্যার আপনি চলে যান, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি, কিছুই শুনেননি’। কথা শেষ করেই পিস্তলে হাত বুলাতে শুরু করে সে।

জলিল ভুঁইয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভূতগ্রস্তের মত বাড়ির দিকে দৌঁড়াতে শুরু করেন। কেউ পাশে থাকলে নিশ্চিত শুনতে পেত স্যারের অসহায় বিড়বিড়, ‘আমি কিছু দেখিনি, আমি কিছু শুনিনি’।


লেখক

মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর
কবি ও গল্পকার


 

error: Content is protected !!