তুলা রাশি

প্রচণ্ড গরম পড়েছে এ বছর। বৃষ্টি হচ্ছে না অনেক দিন। আবহাওয়া ঘর্মাক্ত। উঠোনে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষগুলিও ঝিরঝির করে ঘামছে, যার ফলে তাদের থমথমে মুখ আরও স্পষ্ট এবং প্রকটভাবে চোখে পড়ছে। একেকজনের মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে তারা তারা কতটা কৌতূহলী এবং আগ্রহী। কিছু নিস্পৃহ এবং ভাবলেশহীন মুখও দেখা যাচ্ছে। আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বিশু কবিরাজ। তার খালি গা, একটা ধুতি পেচিয়ে পরা। আর মাথায় শক্ত করে লাল কাপড়—ময়লা জমে জমে কালচে রং ধারণ করেছে। অর্থাৎ আজ এ বাড়িতে তিনি ওঝা হিসেবে এসেছেন। গ্রামের সবাই জানে, ঝাড়-ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রের কাজ হলেই তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে আসেন। এই মুহূর্তে তার চোখ গাঢ় লাল কেন—সে রহস্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

বিশু কবিরাজের সামনে আহসান মাস্টারের বাড়ি থেকে আনা একটা কাঁসার বাটি। আগে প্রত্যেক বাড়ি এমন বাটি পাওয়া যেত। আজকাল আর দুয়েকটি বনেদি বাড়ি ছাড়া কাঁসার বাটি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশু কবিরাজ কাঁসার বাটিটা সযত্নে নেড়েচেড়ে সামনে রাখলেন। উদ্যত ধাতুর মতো সূর্যের আলোতে ঝিকঝিক করতে লাগল কাঁসা। মনে হচ্ছে যেন আহত কোনো মোঘল সম্রাটের ঢাল উল্টে পড়ে আছে।

বিশু কবিরাজকে ডাব কেটে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছেন তিনি। অভিব্যক্তিতে তৃপ্তির একটা ছায়া। তার চোখ কাঁসার বাটির দিকে। আশপাশের তীব্র নীরবতা সর্বপ্রথম তিনিই ভাঙলেন—
‘এই বাটিতে হইব না। পুরাতন বাটি লাগব। আর কোনো পুরাতন কাঁসার বাটি নাই? পুরাতন থাল হইলেও চলব।’
আহসান মাস্টার বললেন, ‘আছে, আছে। পুরাতন কাঁসার বাটিই আছে। আনতেছি, খাড়ান।’
কাছেই কামাল দাঁড়িয়ে ছিল। লুঙ্গির উপর সাদা একটা গেঞ্জি পরা। সে এই মাস্টার বাড়ির ফাইফরমাশ খাটে। আহসান মাস্টার তাকে বললেন মায়ের ব্যবহার্য কাঁসার বাটিটা নিয়ে আসতে। কামাল বাটি আনতে ছুটল।

সপ্তাহখানেক পরে আহসান মাস্টারের ছোট মেয়ের বিয়ে। ছেলেরা সবাই বিদেশে থাকে। বিয়েতে এখনো আসেনি, কিন্তু গয়না কেনার টাকা আগেই পাঠিয়েছে। কাল-পরশুর মধ্যে সবাই এসেও যাবে। এর মধ্যে অঘটনটা ঘটল।
ছোট মেয়ে তিতলির তিন ভরি ওজনের সোনার নেকলেস চুরি গেছে। বিয়ে উপলক্ষে অনেকেই আসছে-যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন আছে, তিতলির বান্ধবীরা আছে, দুছেলের বন্ধুরাও এসেছে কয়েকজন। হয়ত স্রেফ হারিয়েই গেছে, কিংবা এদের মধ্যে কেউ একজন নিয়েছে। কিন্তু কাকে ধরবেন তিনি? আলাদা করে কার ওপরেই-বা সন্দেহ করা যায়? সবাই কাছের মানুষ। সবাইকেই তিনি বিশ্বাস করেন।

শেষমেষ বিশু কবিরাজকে ডাকা হলো। পরিবার-প্রতিবেশী সবাই এই বুদ্ধি দিচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধা মায়েরই চাপ বেশি। মা থানা-পুলিশ করতে রাজি নন। পুলিশ সম্পর্কে অজানা কোনো ভীতি কিংবা সংস্কার তার ভেতরে অনেক আগে থেকেই কাজ করে—আহসান মাস্টার সেটা জানেন। তিনি নিজে ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। মায়ের চাপাচাপিতেই শেষে ওঝা আনায় মত দেন। বিশু কবিরাজ বাটিচালান দেবেন। বাটি দৌড়ে গিয়ে উঠবে চোরের গায়ে। কিংবা তার ঘরে গিয়ে উঠবে। বের করে দেবে চুরি করা জিনিস।

বিশু বিশ্বাস কবিরাজ পরিচয়ে খ্যাত হলেও তিনি এ গ্রামের প্রসিদ্ধ ওঝা। এমনকি গ্রামের আশপাশেও মাঝেমধ্যেই তার ডাক পড়ে। তন্ত্রমন্ত্রে মাস্টার সাহেবের পুরোপুরি অবিশ্বাস থাকলেও বিশুকে তিনি যে কারণে বিশ্বাস করেন তা হলো ওঝাগিরিতে বিশু কোনো ধরনের অর্থ নেন না। গুরুর নাকি নিষেধ আছে। অবশ্য এটা তার ব্যবসায়িক বুদ্ধিও হতে পারে—ওঝা খ্যাতির কারণেই বোধহয় তার কবিরাজি ব্যবসা রমরমা।

কামাল একদৌড়ে কাঁসার বাটি নিয়ে এল। এসেই সারাসরি কবিরাজের হাতে তুলে না দিয়ে বাটিটাকে প্রথমে গলায় জড়ানো গামছা দিয়ে সন্তর্পণে মুছল। তারপর সেটিকে যে ভঙ্গিতে সে বিশু কবিরাজের হাতে তুলে দিল, সেই ভঙ্গিই বলে দেয় বিশু কবিরাজকে সে কতটা সমীহ করে।

হাত বাড়িয়ে বাটির দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে রইলেন কবিরাজ। তারপর যত্ন নিয়ে সেটিকে মাটিতে রাখলেন। এবার নিজের চারপাশে একবার চোখ ঘুরিয়ে আনলেন। নারী-পুরুষ সবাই কেমন যেন ভয় পেয়ে আরেকটু জড়োসড়ো হলো। লালচে চোখ মেলে বিশু কবিরাজ হাঁক দিলেন, ‘আপনেগো মইধ্যে তুলা রাশির জাতক কে আছেন? তুলা রাশি! কে আছেন? আমার কাছে আসেন। আছেন কেউ?…’
একটু থেমে আবার বলেন, ‘সিংহ রাশি হইলেও চলব। কে আছেন?…’
কেউ সাহস করে এগিয়ে আসছে না।
বিশু কবিরাজ আবার হাঁক দিলেন, ‘কেউ নাই আপনেগো ভিতরে তুলা রাশির জাতক?…জাতিকাও নাই কেউ?’

হঠাৎ ভিড় ঠেলে যে যুবক বিশু কবিরাজের সামনে এসে দাঁড়াল, সে সুলতান। বিশু কবিরাজ তাকে সামনে বসতে বললেন। সুলতান বসল। কবিরাজ চোখ বন্ধ করে বাম হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী এক করে সুলতানের কপালে রাখলেন। আধমিনিট চোখ বন্ধ রেখে যখন তার দিকে তাকালেন, তখন তার চোখ টকটকে লাল। প্রশ্নের ভঙ্গিতে প্রায় গর্জন করলেন, ‘সিংহ রাশি?’
সুলতান দুপাশে মাথা নাড়াল।
‘তাইলে? তুলা রাশি?’
‘হ।’ সুলতান মাথা ঝাঁকায়।
‘আপনে নিশ্চিত?’
‘হ।’
‘জানেন কেমনে?’
‘আমার জন্ম আঠাইশে সেপ্টেম্বর।’
বিশু কবিরাজ চোখ লাল করে তাকান। ‘শুধু জন্মতারিখ দিয়া নিশ্চিন্ত হইছেন?’
‘ঢাকায় এক জ্যোতিষীও বলছেন।’

বিশু কবিরাজের চোখ সামান্য কোমল হয়। বলেন, ‘আপনে বাটির সামনে গিয়া বসেন। তারপর দুই হাতের মুঠা দিয়া বাটিটা শক্ত কইরা ধরবেন। চোউখ বন্ধ কইরা থাকবেন। বাটি নিজে নিজে নড়ার আগে চোউখ খুলবেন না।’
সুলতান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়িয়ে কাঁসার বাটির সামনে বসে। তারপর দুহাতে শক্ত করে ধরে বন্ধ করে ফেলে চোখ। তার কপালে ঘাম জমে আছে বড় বড় ফোঁটায়।

দুই
জাহিদ এ গ্রামে এসেছে বছর দুয়েক হবে। সে এখানকার একমাত্র সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ছাত্রদের প্রিয়। গ্রামবাসীও তাকে পছন্দ করে। তবু তার বন্ধুসংখ্যা সীমিত। ঘনিষ্ঠ বলতে গেলে একমাত্র সুলতান। প্রয়োজনের খাতিরেই মানুষ এমন দু-একজন বন্ধুবান্ধব বানিয়ে নেয়, যার কাছে অকপটে সবকিছু বলা যায়। সুলতান তেমন বন্ধু। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও জাহিদের অন্য বই পড়ার অভ্যাস আছে, সুলতানেরও তাই। সম্ভবত দুজনের বন্ধুত্ব জমে ওঠার এটাই একমাত্র কারণ।

শামুকভাঙা নদীর পাশে বড় বাজারটিতে সবচেয়ে চালু কাপড়ের দোকান সুলতানের। তার দুজন কর্মচারী আছে—তারাই দোকান চালায়। সুলতান মাঝেমধ্যে গিয়ে হিসাবপত্র দেখে। শহর থেকে বিএ পাস করে আবার গ্রামে ফিরে এসে এই ব্যবসা ধরেছে সে। স্রেফ মায়ের চাপাচাপিতে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামে আসা। মা তাকে ছাড়া থাকতে পারেন না, আবার স্বামীর ভিটে ছেড়ে শহরেও যাবেন না বলে গোঁ ধরেছেন। শুধু কান্নাকাটি করেন। শেষমেশ বাধ্য হয়েই মানিয়ে নিয়েছে সে। ব্যবসাও জমিয়ে তুলেছে দারুণভাবে।

যেখানেই থাকুক, প্রতিদিন বিকেলে দুজনের আড্ডা হয় শামুকভাঙার তীরে। পুরনো স্মৃতিচারণ করে। সারা দিনে জমে থাকা বিষাদ, বেদনা ও আনন্দের গল্প শেয়ার করে। এভাবেই কথায় কথায় জাহিদ একদিন হুট করে বলে বসে ফাহিমার কথা। ফাহিমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা, প্রেমের কথা।
—বেতনটা আরেকটু বাড়ুক। সামান্য কিছু টাকা জমলেই তারা বিয়ে করে ফেলবে। ফাহিমার বাড়ি থেকে খুব চাপ দিচ্ছে।

সব শুনে সুলতান খেপে যাওয়ার ভান করে। চোখ কুঁচকায় কপট রাগে। এবং অবশেষে নিখাদ আনন্দে অভিনন্দন জানায়। জাহিদেরও বুক থেকে যেন পাথর নেমে যায়। অনেক দিন ধরে সুলতানকে বলবে বলবে বলে বলতে পারছিল না। ফাহিমারও বারণ ছিল—কাউকে জানানো যাবে না। একধরনের মুক্তির স্বাদ নিয়ে সুলতানের দুহাত চেপে ধরে জাহিদ।

রাতে বাড়ি ফিরে অবাক হয়ে সুলতান টের পায়, সে আসলে সত্যি সত্যি আনন্দিত নয়, বরং তার শরীরে একধরনের জ্বলুনি হচ্ছে। ঈর্ষার জ্বলুনি। অহেতুক ঈর্ষায় সারা শরীর কাঁপতে থাকে তার।

ফাহিমা সুন্দরী—একথা সত্যি। সে শিক্ষিতা—এ-ও সত্যি। ফাহিমার বাবা এ গ্রামে বেশ প্রভাবশালী—এটাও মিথ্যে নয়। কিন্তু এটাও সত্যি, সুলতান এর আগে ফাহিমার প্রতি সামান্যতর দুর্বলতাও অনুভব করেনি। হঠাৎ এ কেমন অনুভূতি হচ্ছে তার? জাহিদের ওপর অহেতুক ঈর্ষা কেন জেগে উঠছে, আচমকা? একধরনের অপরাধবোধে ভুগতে থাকে সে, কিন্তু ঈর্ষার তীব্র টানে সে অপরাধবোধ ভেসেই উঠতে পারে না—বরং গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে। ক্রমাগত তীব্র হতে থাকে ঈর্ষা, বেড়ে যায় জ্বলুনি। যেন তীব্র আক্রোশ নিয়ে শামুকভাঙা নদী তাকে টেনে নিতে থাকে আরও অন্ধকার তলানিতে।

তিন
ভিড়টা একটু বিস্তৃত হয়ে গেল আচমকা। সবাইই দেখে যে বাটিটা নড়ে উঠল। সুলতান চোখ খুলতেই কাঁসার বাটি তাকে নিয়ে উত্তরে রওনা দেয় । ভিড়ের উত্তর দিক ফাঁক হয়ে তাকে জায়গা করে দিতে থাকে। সবার চোখে তীব্র ভয় এবং বিস্ময়।

দুপায়েই চলছে সুলতান। তার ভঙ্গি অনেকটা ছোটখাটো গরিলার মতো। নুয়ে দু হাতে বাটি ধরে আছে। বাটি এখন দক্ষিণ দিকে চলছে—মন্থর গতি। সুলতানের পেছনে পেছনে হাঁটছে বিশু কবিরাজ, তার পেছনে আহসান মাস্টার, তার পেছনে আর সবাই। ধীরে ধীরে বাটির গতি বাড়ে। দক্ষিণে যেতে যেতে পুকুরের পাশ ঘেঁষে শামুকভাঙার দিকের রাস্তায় ওঠে সুলতান। এবার পুব দিকে যে রাস্তাটি বাঁক নিয়েছে, সেই রাস্তাটি ধরে ছোটে।
একটা কুৎসিত প্ল্যান ভর করেছে সুলতানের মাথায়। হ্যাঁ, জাহিদের বাড়িতে গিয়ে উঠবে সে। জাহিদকেই চোর সাব্যস্ত করবে। শেষ পর্যন্ত এতেই হয়তো তৃপ্তি মিলবে তার। ঈর্ষার অসহ্য জ্বলুনি সামান্য হলেও কমবে। এই মুহূর্তে এই যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া তার কাছে জরুরি। সুলতান তার গতি বাড়িয়ে দেয়।

সামান্য বাতাস শুরু হয়েছে। এতক্ষণ জাহান্নাম ছিল। পুবের রাস্তা ছেড়ে বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সরু পথ ধরে সুলতান। মৃধাবাড়ির সাপেকাটা ঘেয়ো কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করতে করতে ছুটে আসে তার দিকে, অন্যরা তাড়িয়ে দেয়। দু-চারজন বড় বড় মাটির ঢেলা ছুড়ে মারে কুকুরটির গায়ে—ফলে কেঁউ কেঁউ করতে আবার মৃধাবাড়ি ঢুকে যায় কুকুরটি। কাঁসার বাটির গতি একা একাই বেড়ে যায় যেন হঠাৎ। মৃধাবাড়ি থেকে অনেকগুলো মুখ তখন তাকিয়ে আছে অদ্ভুত ভঙ্গিতে ছুটতে থাকা সুলতানের দিকে।

মৃধাবাড়ি ছাড়িয়ে এসেছে অনেকক্ষণ। টপটপ করে ঘাম ঝরছে সুলতানের গা বেয়ে। সারা মুখের ঘাম নাক হয়ে পড়ছে বাটিতে। কপাল বেয়ে সামান্য ঘাম চোখে যেতেই ছ্যাঁৎ করে ওঠে চোখ। জ্বলছে। বাটিতে ঘাম পড়ার সাথে সম্পর্ক আছে কি না কে জানে, আচমকা যেন নিজেকে একটি হাস্যকর প্রাণী হিসেবে দেখতে পায় সুলতান—অন্য আরেকটি কুকুরের মতোই চারপায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে যেন। অপরাধবোধ যেন তলানি থেকে আবার ভেসে উঠছে জলের উপরে। ঈর্ষা পাতলা হয়ে আসছে। এবং তৎক্ষণাৎ নিজের প্রতি একধরনের ঘৃণা বোধ হতে থাকে তার। এ কী করছে সে? নিজের বন্ধুকে চোর সাজাচ্ছে! কিন্তু তা-ও এমন ভিত্তিহীনভাবে? জাহিদকে তার ঈর্ষা করারই-বা যৌক্তিক কী কারণ আছে? এমন তো না যে ফাহিমার সাথে সুলতানের মাখোমাখো প্রেম ছিল, সেখানে অবাঞ্ছিত আগন্তুকের মতো ঢুকে পড়েছে জাহিদ। ফাহিমাকে তো সে কোনো দিনও ভালবাসেনি। সামান্যতম দুর্বলও ছিল না। তাহলে ঠিক কী কারণে জাহিদকে বিনা অপরাধে লজ্জিত করতে যাচ্ছে সে? সম্পূর্ণ নিরপরাধ একটা মানুষের প্রতি অমূলক ঈর্ষায় এতখানি নিচে নেমে এল সে! বন্ধুর কাছে প্রেমের ব্যাপার লুকানোটা আসলে ঠিক কত বড় অপরাধ? অপরাধ হলেই তার শাস্তিই বা কী হওয়া উচিত?

হঠাৎ জেগে ওঠা অপরাধবোধ সুলতানের পায়ে মাটির ঢেলা হয়ে পড়তে থাকে। নিজেকে তার মনে হয় মৃধাবাড়ির হাড়সর্বস্ব কুকুর।

জাহিদের বাড়ি আর বেশি দূরে নয়। পেছনের ভিড় থেকে দু-চারজন জাহিদকে সন্দেহ করা শুরু করেছে। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, জাহিদ চোর। সবাই ছি ছি করে। মাথায়ই আসেনি কারও বিষয়টা! জাহিদ আহসান মাস্টারের নাতি মামুনকে বাসায় এসে পড়ায়। তার পক্ষে তো নেকলেস চুরি করা আসলেই সহজ।

মাস্টার সাব চোর! সে কই এখন? স্কুলে? এই টাইমে স্কুলেই থাকার কথা। ছি ছি!

আচমকা সুলতান থমকে দাঁড়ায়। সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ শোরগোল শোনা যায়। সুলতান ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অন্য দিকে মুখ ঘুরে গেছে তার। অন্য পথ নিচ্ছে। আর এ সময়ই অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটে। সুলতানই টের পায় শুধু।

জারুল গাছের দিকে মুখ ঘুরিয়েই সুলতান টের পায়, বাটি ঘুরছে না। থামছেও না। জাহিদের বাসার দিকেই যেতে চাইছে কাঁসা। সুলতান শক্তি দিয়ে টান দেয় অন্য দিকে। বাটি নড়ে না। বরং তার যেন তুমুল আগ্রহ জাহিদের বাড়ির দিকে। সুলতান শক্ত করে ধরে বাটিটা। বাটির ভেতর থেকেও অদৃশ্য কেউ যেন তাকে টানে জাহিদের একলা দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির দিকে। ওই তো, তাকালেই দেখা যাচ্ছে রোদে চকমক করা বাড়ির টিন।
সুলতান বাটি ছেড়ে দিতে চায়। নাহ, সে বাটি ছেড়েও দিতে পারছে না। ওপর থেকে অন্য কোনো হাত যেন শক্ত করে চেপে ধরে আছে তার হাত। হ্যাঁচকা এক টানে পড়ে যাবার উপক্রম হয় তার—কোনোমতে ভারসাম্য ঠিক রাখে। টান বাড়তে থাকে। দুপা এগোতে বাধ্য হয় সুলতান। রাবারের চটিজুতো খুলে যায় একপাটি। অন্যপাটিও খুলে ফেলে সুলতান। যেভাবেই হোক, বাটি আটকাতে হবে তাকে। যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। কিন্তু সুলতান তো মীন রাশি। বাটি এমন আচরণ শুরু করেছে কেন, রহস্য লাগে তার কাছে।

না! কোনো অবস্থাতেই জাহিদকে চোর প্রমাণ হতে দেবে না সুলতান। ভাঙা শামুকে পা কেটে যায় তার। কাটুক। ফালি ফালি হয়ে যাক। তবু সামনে এগোবে না আর এক পা-ও। অন্য কোথাও ঘুরিয়ে নিতে হবে বাটি। কিন্তু নেবেই বা কোথায়! আটকে রাখতেই বা পারবে কি?

দূর কোথাও থেকে সুলতানের কানে ক্রমশ বাজতে থাকে জাহিদের উৎফুল্ল স্বর, ‘দোস্ত দেখিস, একদিন আমি আর ফাহিমা সুখে সংসার পাতব। বেতনটা একটু বাড়ুক। কিছু টাকা জমুক। তাহলেই দেখিস, সংসার পাতব। তুই কিন্তু রোজ বিকেলে আসবি। চা আর মুড়ি নিয়া তিনজনে বসব। তুই, আমি আর ফাহিমা। আর বেশিদিন না। দেখিস…’
সুলতান বাটিটার সাথে যুদ্ধ করছে। তার কান বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল অদ্ভুত এ দৃশ্য।


লেখক

রাসেল রায়হান
কবি ও কথাসাহিত্যিক


error: Content is protected !!