নামবিভ্রাট

নামে কী এসে যায়? শেক্সপিয়ার বলেছিলেন না! গোলাপকে যে নামেই ডাকো, সে তো গোলাপই… ইত্যাদি ইত্যাদি। এতৎসত্বেও কবির ন্যাকা কথায় গান বেজে ওঠে, ‘কী নামে ডেকে বলবো তোমাকে…!’ যতই বলুন নামে কিছু যায় আসে না, আমি কিন্তু সহমত নই। নামে অনেক কিছু যায় আসে। খামোকা কিছু বদনাম, লাঞ্ছনা অবহেলা জীবনভর অনাবশ্যক বয়ে বেড়াতে হচ্ছে, এরকম নামধারী বহু মানুষ আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। নামের সঙ্গে উড়ে এসে জুড়ে বসা লেজুড়গুলোর উৎস-সন্ধানে ভাষাবিদরা হদিশ দিতে পারেন হয় তো, তবে সেই সব নামধারী ব্যক্তিদের একটুকুও বিড়ম্বনা কমে না তাতে।

এই যেমন আমার বন্ধু, পোষাকি নাম মানিক ভট্টাচার্য। বেশ নাদুসনুদুস গোলগাল চেহারা ছিল ছেলেবেলায়। তার ওপর গাত্রবর্ণটি ছিল অধিক মাত্রায় কালো। ওর দাদু আদর করে ওকে কেলো মানিক বলে ডাকতো। সেই থেকে ওর নাম কেলো। শুরু শুরুতে কেউ গা করেনি। করার কথাও নয়। দিনেকালে মানিক বড় হল। স্কুলে ভর্তিও হল। পাড়ায়, বন্ধুমহলে “কেলো” নামই কিন্তু পরিচিতি দিল। আর এই নাম ঘিরেই মানিকের বিস্তর দুঃখ। জিজ্ঞাসাও। কে কোথায় বাজে কাজ করছে, সেই সব অপকর্মের দায়ভাগ “কেলোর কীর্তি” শিরোপায় ভূষিত হচ্ছে। ছোট-বড় যে-কোন হুজ্জতকেই যখন লোকে ‘কেলো’ বলে চালাচ্ছে, তখন মানিকের রাগ সেই লোকগুলোর ওপর যত না হয়, তার চেয়ে বেশি রাগ হয় ওর দাদুর ওপর।

কিছুতেই ভুলতে পারি না আমাদের স্কুলের ক্লাসের মধ্যেই সেই মারপিটের কথা। আমরা বোধহয় তখন ক্লাস এইটে। সমাস, কারক এইসব শিখছি টিখছি। পড়াশুনায় ভালো ছিল কিন্তু খুব ফাজিল ছিল তন্ময়। আলটপকা জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘বল তো, কেলেঙ্কারি’র ব্যাসবাক্য সহ সমাস কী হবে?’ কেউই উত্তর দিতে পারছি না দেখে তন্ময়ই জবাব দেয়, ‘কেলোর মায়ের এনকয়ারি’। শুধু ব্যাসবাক্যটিই বলতে পেরেছিল, সমাসের নাম বলার আগেই তন্ময়ের পিঠে মুখে মাথায় এলোপাতাড়ি কিল বসাতে থাকে মানিক। অনেক কষ্টে ওদের নিরস্ত করি।

ফোন এলে ‘বলো’ বলেই রিসিভ করার অভ্যেস আমার। যেমন ‘বলো অসীম’, ‘বলো শ্যামল’, ‘বলুন হারুদা’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বন্ধু হরির ফোন রিসিভ করতে গেলেই আমি বিপদে পড়ি। রিসিভ করি ‘হ্যাঁ শুনছি’ জানান দিয়ে। বলাবাহুল্য এই বিপর্যয় হরি নামধারী বন্ধুটির নয়, একান্তই আমার। এমনিতেই আমি নাকি ফোনে অনাবশ্যক চেঁচিয়ে কথা বলি, বৌয়ের অভিযোগ। তার ওপর সকাল সন্ধে ‘বলো হরি বলো হরি’ চিৎকারে নাকি বৌয়ের গা-পিত্তি জ্বলে যায়।

পালপাড়ার নবতিপর হরিদাস বাবু এলাকার সিনিয়র মোস্ট। লোকে বলে তিনি সেঞ্চুরি করার পথে। এখনো শরীর-স্বাস্থ্য দিব্যি আছে। হরিদাস পালের নাম করলেই যে কেউ এককথায় তার বাড়ি দেখিয়ে দেয়। ইদানিং তার নাম এত বেশি চারপাশের লোকজনের মুখে মুখে ঘোরে হরিদাস বাবু বেশ বিরক্তই তাতে। তবে গতবার ভোটের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন প্রধানমন্ত্রী মোদিকে হরিদাস পাল নামে অভিহিত করেছিলেন, আর তার পরের দিনই নিজের নাম খবরের কাগজে ছাপার অক্ষরে দেখে পালমশাই যারপরনাই পুলকিত হয়েছিলেন বলে খবর। তা বলে এই আদ্যন্ত নিরীহ নামটি ধরে মানুষকে এলেবেলে, নস্যাৎ করার প্রবণতাটি হরিদাস বাবু এই বয়সেও মন থেকে মানতে পারেন না।

তপেন আর মানস দুই বন্ধু। বয়সেও এক। এক স্কুলে পড়ে। এক মাঠে খেলে। টিউশনও পড়ে একই মাস্টারের কাছে। যেখানেই যায় , একসাথে। হরিহর বাবু ওদের দেখলেই বলে ওঠেন, ‘এই যে জগাই-মাধাই, কোথায় চল্লে?’ হরিহর জেঠুকে একটুকুও ভাল্লাগে না ওদের। দেখা হলেই সেই একই কথা- জগাই-মাধাই আর জগাই-মাধাই । ওরা ঠিক করে একদিন শুনিয়ে দেবে, ‘আমরা যে হরিহর আত্মা, জেঠু !’ যদিও বলাটা ঠিক হবে না, ভেবেই নিজেদের সংযত রাখে।

গোবিন্দর কথা ভাবলে আমার খুব কষ্ট হয়। ওর নামের সঙ্গে কেন যে ঢোল বাজে, ও যেমন, আমিও কোন যুক্তি খুঁজে পাই না। গোবিন্দর মত আপাদমস্তক শান্ত ছেলেটিকে কে যে গোঁয়ার আখ্যায়িত করল তা ভেবে গোবিন্দ যুগপৎ দুঃখিত ও জিজ্ঞাসু হয়। সে দুঃখও তেমন কিছু নয়, কেন যে শুধুমুধুই গালফোলা গোবিন্দর মায়ের নামে মাসীমাকে ধরে টানাটানি, বুঝি না।

আর খগেন ? শুধু শুধু বাপের নাম খগেন করে দেবার হুমকি যে কেন, তারও কোন কুলকিনারা পাই না। এ নিয়ে খগেনেরও দুঃখের অন্ত নেই।

তখন আমরা কোলকাতা ইউনিভার্সিটির পড়ুয়া। ছ-সাত জন ছেলেমেয়েদের একটা দল ছিল আমাদের। ক্যান্টিনে, রেস্টুরেন্টে, সিনেমায় দল বেঁধেই যেতাম। সেই দলে বর্ণালী, নীপার সঙ্গে গৌরিও ছিল। সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে পড়তেই সজলের সঙ্গে, মানে সজল সেনের সঙ্গে গৌরি বিয়ে করে ফেলল। আর যায় কোথায়! বিয়ের পর গৌরি হয়ে গেল গৌরি সেন। মনে পড়ে, রেস্টুরেন্টে কিংবা ক্যান্টিনে বিল মেটাবার সময় হলেই আমরা সমস্বরে বলে উঠতাম, ‘টাকা দেবে গৌরি সেন’। দিতও।

একবার দোতলার রেস্টুরেন্ট থেকে দল বেঁধে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ইন্দ্র কিভাবে যেন পড়ে গিয়েছিল। গড়াতে গড়াতে একেবারে নিচের সিঁড়ি অব্দি। আমরা তো বেশ ঘাবড়েই গেছি। উৎকন্ঠায় জানতে চাই কোন বড়সড় চোট পেল কিনা ! ইন্দ্র কিন্তু নির্বিকার। চটপট ধূলোটুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কিসসু হয়নি। এ হল ইন্দ্রপতন, বুঝলি?’ নন্দ তখনও ওপরের সিঁড়িতে। তেমন বড় কোন বিপদ হয়নি আশ্বস্ত হবার পর আমরা সবাই নন্দর দিকে আঙুল তুলি, ব্যাটা যত দোষ নন্দ ঘোষ। নন্দও সমস্ত দোষের ভাগীদার হবার জন্য নামভাগ্যকে স্বীকৃতি দিয়েছে অনেকদিন আগে থেকেই। ফলে খ্যাঁকখ্যাঁক হাসি ছাড়া ওর মধ্যে বিরূপ কোনো প্রতিক্রিয়া আমরা লক্ষ্য করিনি সেদিন।

আমার সহকর্মী সনাতন। সনাতন সর্দার। আদিবাসী। সিধাসাদা। সনাতনের বাবার নাম যেদিন থেকে জানা গেল নিধিরাম, কতজন যে ঢাল-তলোয়ারের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেছে তার ইয়ত্তা নেই। সিধাসাদা সনাতন তির ধনুক জানে, ঢাল-তলোয়ারের প্রসঙ্গের কারণটাও ঠিক ঠাওর করতে পারে না। নামের ক্ষেত্রে তো নিজের হাত থাকে না; ফলে এ নিয়ে আমি কোনদিন সনাতনের সঙ্গে ইয়ার্কি মারিনি। তবে মজা করে ওকে ‘সর্দারজি’ বললে ওর চোখেমুখে একটা পরিতৃপ্তির আলো ঝিলিক দিতে দেখেছি বলেই আমার মনে হয়।

কার্তিক আর মদন দু’ভাই। ‘ক্যালানে কার্তিক’ আর ‘কোথাকার মদন রে’ ইত্যকার সম্বোধন শুনতে শুনতে দু’ভাইয়ের জীবন প্রায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বছর দুয়েক আগে কোর্টে গিয়ে দুজনেই নাম এফিডেবিট করে বদলে যথাক্রমে কাজল আর মলয় করে নিয়েছে। পিতৃদত্ত নাম দুটিরই আদ্যক্ষর অক্ষত রেখে পরলোকগত পিতৃদেবের প্রতি সম্মান জানিয়েছে। কিন্তু তাতে কী! কোর্ট মানল, পাড়াপ্রতিবেশী মানল না। এখনো পুরনো নামেই ডাকে সবাই।

চিন্ময় বাবুর ছোট ছেলে তো উঠেপড়ে লেগেছিল, হয় নাম অথবা পদবি, যে কোন একটা বদলাবেই বদলাবে। সমস্যাসঙ্কুল পদবিসহ ছোকরার নাম ছিল মৃন্ময় পাত্র।

এই ফাঁকে আরো দুই ভাইয়ের কথা বলে নিই। কৃষ্ণপদ চক্রবর্তী আর বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী। গরিব মানুষ। পুজোআচ্চা করেই চলে দু’জনের সংসার। কেষ্ট চক্কোত্তি আর বিষ্টু চক্কোত্তি নামেই চেনে সবাই। তা ডাকুক, আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের যখন ‘এ গ্রামের কেষ্টবিষ্টু’ বলে কেউ উপহাস করে, তখন ওরা দুঃখ পায়। ভাবে, সবাই বুঝি ওদের গরিবি নিয়েই ঠাট্টা করছে।

ফাটাকেষ্ট নামে ‘ফাটা’ শব্দে যে গ্ল্যামার, যে পরাক্রম এতদিনে আমরা সবাই তা জেনে গেছি। এতটাই যে, ‘ফাটাকেষ্ট এম এল এ’ সিনেমায় মিঠুন চক্রবর্তী কেষ্ট নামকেই মহীয়ান করে তুলেছেন। ফাটাকেষ্ট, হাতকাটা দিলীপ, কানা ভোলা, হুব্বা শ্যামল- নামের আগে ব্যবহৃত এই সব ফাটা, হাতকাটা, কানা কিংবা হুব্বা বিশেষণগুলো সমাজে, নিদেনপক্ষে মহল্লায় আজকাল বেশ সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। আমাদের জগন্নাথদা’র আফশোস, তার নামের আগে ‘ঠুঁটো’ বিশেষণটি আজও গ্ল্যামারের সেই ডিগ্রিতে পৌঁছতে পারল না।

পাঁচ ভাইয়ের এক ভাই নীলমনি যেমন ‘সবেধন’ বিশেষণের কারণ খুঁজে পায় না; গোকুলও বোঝে না কোত্থেকে চলে এলো গোকুলের ষাঁড়! একইরকম হয়রান গণেশ, তার নামে গোবর লেপে দেওয়ায়। গদাই লস্করের দুঃখটাই বা কম কিসে? তার চালটা কী এমন বিশিষ্ট যে গদাই লস্করি চাল বইয়ের পাতায় লেখা থাকবে?

কত আর দুঃখী মানুষের কথা বলব! আমাদের হরি ঘোষও কি কম দুঃখী! ব্যারাকপুর লোকালে আমার সহযাত্রী। আটটা চল্লিশের লোকালে উনিও রোজ একসাথে অফিসে যান। একদিন কথায় কথায় আমার কাছে তাঁর দুঃখের কথা বলছিলেন, ‘কোন শালা যে আমার সঙ্গে একটা গোয়াল রেখে গেল, রিটায়ারমেন্ট অব্দি বয়ে বেড়ালাম। অথচ অফিসফেরৎ রোজ এক লিটার দুধ কিনে ঘরে ঢুকতে হয়, বুঝলেন!’

আমারই চারপাশে এইসব নিরীহ নামধারী মানুষ, যাদের দুঃখে আমারও মনটা দুঃখী হয়ে ওঠে। ঠিক ততটাই রাগ হয় সেই সব ব্যক্তিদের ওপর, নামকরণের দায়িত্বটি পালন করেছিলেন যারা। এক এক সময় মনে হয় মেরে বৃন্দাবন দেখিয়ে দিই তাদের। এমন মার দিই যেন নামকরণ করার আগে একটু ভেবেচিন্তে নাম দেন। একমাত্র মারই মুক্তির উপায়। সাধে বলে মারের নাম ধনঞ্জয়!


লেখক

স্বপন নাগ
রম্যলেখক


 

error: Content is protected !!