বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা

ছাপার অক্ষরে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার কুণ্ঠিত সূচনা উনিশ শতকের উষাকালে। বাংলায় ‘মুদ্রণ ধনতন্ত্রের’ বিকাশ নিঃসন্দেহে এই চর্চাকে আরো প্রসারিত করেছে। উনিশ শতকের পরাধীন দেশে বিজ্ঞানচর্চার ভিত্তি ও সুযোগ ছিল সীমাবদ্ধ। তা সত্ত্বেও শুধু উনিশ শতকেরই বাংলা ভাষায় মুদ্রিত বিজ্ঞানের পুস্তক, পত্রপত্রিকা ও প্রবন্ধের বিপুল সম্ভার সংখ্যা ও বিষয়বৈচিত্র্যের বিচার যুগপৎ বিস্ময় শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। অবশ্য বাংলা ভাষায় যথার্থ বিজ্ঞান শিক্ষা সম্ভব কি না বাঙালি এলিটের এই শঙ্কা ও সংশয়ের নিরসন হয়নি। সম্ভবত আজও নয়। ডা.মহেন্দ্রলাল সরকারের মতো বিজ্ঞান শিক্ষা ও প্রসারের পথিকৃৎও মনে করতেন, ইংরেজি ভাষা বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে শ্রেয়। এই প্রসঙ্গে উনিশ শতকের শেষে (বাংলা ১৩০৫) রবীন্দ্রনাথ লিখলেনঃ

বিজ্ঞান যাহাতে দেশের সর্বসাধারণের নিকট সুগম হয় সে উপায় অবলম্বন করিতে হইলে একেবারে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার গোড়াপত্তন করিয়া দিতে হয়। পূর্বকালে ভারতবর্ষে কেবল ব্রাহ্মণদের জ্ঞানানুশীলনের অধিকার ছিল। অদ্য ইংরেজিশিক্ষিতগণ কিয়ৎপরিমাণ সেই ব্রাক্ষণদের স্থান অধিকার করিয়াছেন। সাধারণের কাছে ইংরেজি ভাষা বেদের মন্ত্র অপেক্ষা সরল নহে। এবং অধিকাংশ জ্ঞানবিজ্ঞান ইংরেজি ভাষার কড়া পাহারার মধ্যে আবদ্ধ।

‘ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশন ফর দি কালটিভেশন অফ সায়েন্স’-এর এই ভাষাশিক্ষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য কোনো কোনো অতি উৎসাহী পণ্ডিত বাঙালির ‘মজ্জাগত’ ব্যক্তিগত রেষারেষির ছায়াপাত লক্ষ্য করেছেন। এই অবান্তর পণ্ডিতি বিতর্ক বাদ দিয়ে এ কথা বলা যায় যে, বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের কর্মপ্রচেষ্টা যেমন ম্লান হওয়ার নয়, তেমনিই ‘স্বদেশের ভাষায় বিজ্ঞান প্রচার’ করার যে যুক্তি রবীন্দ্রনাথ উপস্থাপিত করেছিলেন তা বিশেষভাবে যথার্থ। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা যে বিজ্ঞান শিক্ষার গণভিত্তি প্রসারের ও বিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগের আবশ্যিক পূর্বশর্ত-এ কথা অনেকেই উল্লেখ করেছেন উনিশ শতকের প্রথম থেকেই। শতকের শেষ ভাগে (১৮০৩ শতক) ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় লেখা হলো-

কিন্তু বিজ্ঞান যাহাদের জীবিকার উপায় হইবে সেই শ্রমজীবীদিগের মধ্যে যতদিন ইহার বিশেষ চর্চা না হইতেছে ততদিন ইহা দ্বারা এতদ্দেশ্যের কোনো উপকার দর্শিতেছে না। অতএব যে উপায় বিজ্ঞান সেই শ্রমজীবী শ্রেণিতে প্রবেশাধিকার পায় তজ্জন্য সাধারণের যত্ন ও চেষ্টা একান্ত আবশ্যক হইয়া উঠিতেছে।

‘স্বদেশের ভাষায় বিজ্ঞান’ শিক্ষা ও প্রচারের এই ‘একান্ত আবশ্যক’ কাজটি সম্পন্ন করার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা বহু অনভিপ্রেত প্রতিকূলতা এবং অবাঞ্ছিত দ্বিধা সত্ত্বেও অব্যাহত থেকেছে উনিশ শতকের সূচনাকাল থেকে। কিন্তু বিশ্বায়নের সূত্র ধরে নতুন করে আজ বিজ্ঞানচর্চার স্বভাষাবিরোধী মানসিকতাকে সচেতনভাবে লালন করা হচ্ছে। স্বভাবতই কীভাবে শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা, তার পুনরীক্ষণও আবশ্যক হয়ে উঠেছে।

গুনার মারদাল তাঁর ‘এশিয়ান ড্রামা’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘একটি গ্রন্থ কী নিয়ে লেখা এবং কোন উদ্দেশ্যে তা চরিতার্থ করতে চায় সেকথা ব্যাখ্যা করার সহজতম উপায়টি হলো কয়েন এবং কীভাবে গ্রন্থটি লেখা হয়েছে তা বলা। ‘ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টইনবি এই মত ব্যক্ত করেছেন, শিল্পবিপ্লবের সময় থেকে বিজ্ঞানই ধর্মের স্থান নিয়েছে। ‘বৈজ্ঞানিক প্রগতি’ আসলে ‘ধর্মবিশ্বাস’ এবং তা ইউরোপ থেকে প্রসারিত হয়ে সারা বিশ্বকে আচ্ছন্ন করেছে। বিজ্ঞানকে ধর্মের আসনে অধিষ্ঠিত করে লাভ যাদের, তারা তা করবেই। কিন্তু বিজ্ঞান ধর্ম নয়, ধর্মের মতো তা অপরিবর্তনীয়, চরম ও শাশ্বত সত্যের দাবি করে না। বিজ্ঞানের প্রগতির অন্তর্নিহিত শক্তি হলো জে.ডি. বার্নাল আখ্যাত ‘সাময়িকতাবাদ’। সুসংবদ্ধ সংশয়বাদ বিজ্ঞানকে এমন এক চর্চার ক্ষেত্রে পরিণত করেছে যেখানে খণ্ডনযোগ্যতা বা ভুল প্রমাণিত হওয়া এক কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য। স্বভাবতই উনিশ শতকের প্রথমার্ধে উপনীত বৈজ্ঞানিক সমস্ত সিদ্ধান্তই আজও সচল এই দাবি কেউই করেন না। তাই আজকের বিজ্ঞানের পাঠও উনিশ শতকের বিজ্ঞানচর্চার পরিধিতে সম্পন্ন করার কথাও ওঠে না। সেই পাঠ থেকে একটা বিবর্তনের আভাস পাওয়া যেতে পারে মাত্র।

এই আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায় যে বাঙালি জীবনে বিজ্ঞান বড় প্রক্ষিপ্ত। আজ যখন বিজ্ঞান মানবিক অস্তিত্বের অঙ্গ হিসাবে বিবেচিত তখন অবিজ্ঞানচর্চার সংস্কৃতিই আধিক্য লাভ করেছে। কথাটা উড়িয়ে দেবার নয়। কিন্তু এটাও ভেবে দেখার কথা যে, এই বৈশিষ্ট্য শুধু বাঙালির নয়, যুক্তিবাদের চারণভূমি বিলেতেও। বিজ্ঞান যত এগোচ্ছে, প্রযুক্তির হাত যত প্রসারিত হচ্ছে ততই অবিজ্ঞানের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। প্রযুক্তির স্বর্গ্রাসী হস্তক্ষেপ, বিজ্ঞানচর্চার দুর্বোধ্যতা ও রহস্যময়তা, প্রযুক্তির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে নতুন কর্তৃত্ববাদ, প্রকৃতিকে ‘জয়’ করে নিঃশেষে শোষণ-এ সবাই বিজ্ঞান সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি করেছে এবং মানুষের অসহায়তাকে বৃদ্ধি করেছে। আজকের বাঙালি মানসেও এর ছাপ পড়েছে অবিসংবাদিতভাবে। ইউরোপীয় ঘরানার যে বিজ্ঞানচর্চা বাংলা ভাষায় শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আজকের এই মানসিকতার কোনো প্রতিফলন কি সেখানে অন্তর্লীন? জিজ্ঞাসু মনের কাছে এ প্রশ্ন অবান্তর নয়।

রবার্ট মেট্রন বিজ্ঞানের যে মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলেছেন তাঁর অন্যতম হলো বিশ্বজনীনতা। দুটি অর্থে। বৈজ্ঞানিক কর্মপ্রকৃতির মূল্যায়নে নৈর্ব্যক্তিকতা (অর্থাৎ বিজ্ঞানীর কাজই বিবেচ্য, অন্য কোনো পরিচয় নয়)। আবার বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান ও সিদ্ধান্ত সর্বত্র প্রযোজ্য। বিজ্ঞান অবশ্যই বিশ্বজনিন। কিন্তু বৈজ্জানিক কিছুটা আত্মগত। সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে যে অসংখ্য টানাপোড়েন, যে অজস্র অভিঘাত তাঁর রেশ তো থেকেই যায়। জগদীশচন্দ্র বসুর উক্তি প্রণিধানযোগ্য-

বৈজ্ঞানিক সত্যকে অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো শত্রুরাজ্যে’র মধ্য দিয়া জয়ী করিয়া আনিতে না পারিলে যজ্ঞ সমাধা হয় না।

এ কথা শুধু বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানচর্চা যারা করেন তাঁদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই ‘শত্রুরাজ্যে’র কিছুটা বাইরের পরিমণ্ডলে কিছুটা বিজ্ঞানচর্চাকারীর নিজের মনে’। ‘মন’ কথাটা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস বিজ্ঞানের ধারণাকে কীভাবে আহরণ করা হচ্ছে, কোন পটভূমি এবং পরিমণ্ডলে তা দেখার দৃষ্টি প্রভাবিত হয়েছে তাঁর জানাটাও জরুরি। কেননা, উনিশ শতকে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার সামগ্রিক পটভুমিতে ছিল জ্ঞানচর্চার এমন এক অনুশীলনের সাংস্কৃতিক ধারা যেখানে বিজ্ঞানকে স্থাপন করা হয়েছিল বিজয়ীর আধিপ্ত্যের চিহ্নস্বরূপে এবং একই সঙ্গে চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল এই ধারণা যে বিজিতের জ্ঞান ‘তুচ্ছ’, ‘অনুন্নত’ এবং ‘নিকৃষ্ট’। এই মানসিকতার রেশ উনিশ শতকের বিজ্ঞানচর্চায় ছাপ ফেলেছিল অবশ্যম্ভাবীরূপে। অভিঘাতের এই পটভূমি আমাদের বিজ্ঞান দেখার ও চর্চার দৃষ্টিকে আজও কিছুটা আচ্ছন্ন রেখেছে। শ্রদ্ধের সুকুমার সেন ‘বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান’ ( ড. বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য) গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন-

আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষা প্রবর্তনের আগে বিজ্ঞানের অনুশীলন অসম্ভব ছিল। …বিদেশের হাওয়া এসে এই কুয়াশা খানিকটা পাতলা করে দিলে পরে তবেই আমাদের বিজ্ঞান-অনুসুন্ধিৎসা জেগেছে।

‘কুয়াশা খানিকটা পাতলা’ হয়েছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু ‘বিদেশের হাওয়া’ কতটা মুক্ত ছিল তা বিবেচনা করার প্রয়োজন নিশ্চয়ই রয়েছে।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার উদ্যোগ এসেছিল তিনটি সূত্র থেকে- মিশনারি, কোম্পানির আমলাতন্ত্র এবং প্রযুক্তিবিদদের একটি অংশ এবং সর্বোপরি সমকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী। ‘বিদেশের হাওয়া’ এই বিভিন্ন সামাজিক শক্তিকে ভিন্নধর্মী কারণে প্রভাবিত করলেও ইউরোপীয় ঘরানায় বিজ্ঞানচর্চা যে আবশ্যক সে ব্যাপারে এক ধরনের সহমত গড়ে উঠেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে চিন্তাজগতের আদান-প্রদানের সুযোগও গড়ে উঠেছিল। ফোর্ট উইলিয়াম, শ্রীরামপুর মিশন, এশিয়াটিক সোসাইটি, হিন্দু স্কুল, স্কুল বুক সোসাইটি, কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি, এগ্রিকালচারাল এবং হর্টিকালচারাল সোসাইটি, ইন্সটিটিউশন ফর প্রোমোটিং ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া, ভার্নাকুলার লিটারেচার কমিটি প্রভৃতি বিভিন্ন সংগঠনের সুত্র পারস্পরিক যোগাযোগের একটি বলয় সৃষ্টি হয়।

বাংলাকে ভিত্তি করে ইংরেজ শাসনের বিস্তার। স্বভাবতই ‘বাইরের হাওয়ার’ মতাদর্শগত অভিঘাতও বাংলাতেই প্রথম অনুভূত হয়। একই সূত্রে বিজয়ী ও বিজিতের বিজ্ঞানকে তুলনামূলকভাবে দেখার প্রবণতাও এল, কিছুটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও। ‘অন্বেষণ ও সম্মুখীন’ হওয়ার এই পর্যায়ে ব্যবহৃত হতে থাকলো বিজ্ঞানকে দেখার নতুন ইডিয়াম (idiom), ‘পার্থক্য’ ও ‘অভাব’ তাঁর মূল নিরিখ। এই পার্থক্য ও অভাবের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করা হলো বিজ্ঞানকে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির নিরিখেই মাপা হলো সভ্যতার অবস্থান। ওরিয়েন্টালিজম সম্পর্কে এডও্যার্ড সাঈদ তা বলেছেন সাম্রাজ্যবাদের প্রাধান্য-প্রতিষ্ঠাকারী মতাদর্শে, যা ‘প্রাচ্যকে অধীনস্থ’ করতে, নিজের মতো করতে ‘পুনর্গঠিত’ করতে চেয়েছিল। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে – শুধু ওরিয়েন্টালিজমই নয়, ক্লাসিকালপন্থী, ইউটিলিটেরিয়ান, পজিটিভিস্ট-সব ধারণাতেই এই প্রচেষ্টা অন্তর্লীন। স্বভাবতই গ্রহণ করেছিলেন সমকালীন বাঙালি বুদ্ধিজীবী।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় শ্রীরামপুর মিশনারিদের উদ্যোগের কথা বহু আলোচিত। হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখানোর শুরু শ্রীরামপুরের মিশনারিদের উদ্যোগে প্রকাশিত সাময়িকপত্র বিজ্ঞানের প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রায় নিয়মিতই প্রকাশিত হতো। এছাড়াও শ্রীরামপুর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে প্রথমদিকের অনেকগুলো বিজ্ঞান গ্রন্থ। ইউরোপে বিজ্ঞানের বিকাশ এবং সেই সঙ্গে ধনতন্ত্রের বিস্তার জেসুইটদের ভূমিকা নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। তাঁদের কর্মপরিধিতে ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান ছিল। বিজ্ঞান তাঁদের কাছে ঈশ্বরের ‘অপার মহিমা’ উন্মোচিত করার যুক্তিসঙ্গত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। শ্রীরামপুর মিশনারিদের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। ভারতে প্রথম থেকেই বিজ্ঞানকে ধর্মপ্রচারের কাজে ব্যবহার করার মিশনারি প্রচেষ্টায় কোনো খামতি ছিল না। এ প্রচেষ্টা অবশ্য সব ধর্মের মিশনারিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। মিশনারিদের ধারণায় আরও একটি দিক ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো, ‘বিশৃঙ্খল’ প্রাচ্যে খ্রিস্টিয় শৃঙ্খলা বা নিয়মানুবর্তিতার প্রবর্তন। প্রাচ্যকে বিশেষ করে ভারতবর্ষকে ‘বিশৃঙ্খলা’র চারণভূমি হিসেবে দেখার মানসিকতা অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজনৈতিক দর্শনেও প্রতিফলিত। বিজ্ঞান এই ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ সমাজ প্রতিষ্ঠার সহায়ক। ধারণা ছিল ঈশ্বরনির্দিষ্ট শারীরিক, ঐহিক এবং মানসিক শান্তির সমন্বয়িত অবস্থার চাবিকাঠি রয়েছে বিজ্ঞানচর্চার মধ্যে। অক্ষয়কুমারের ‘বাহ্যবস্তর সহিত মানব প্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’ প্রবন্ধে কি এর ধূসর ছায়াপত ঘটেছিল? শুধুই কি খ্রিস্টধর্মের পরিবর্তে এসেছে ব্রাহ্মধর্ম?

শ্রীরামপুর মিশনারিদের অনেক আগেই ‘বৈজ্ঞানিক সৈনিক’-দের (রেনেল, ডাল্টন, হুকার প্রমুখ) ব্যবহারিক প্র্যগের মধ্যে দিয়ে এবং অন্যদিকে আমলাতন্ত্রের (জেমস, কোলব্রুক প্রমুখ) প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সূত্র দিয়ে সাম্রাজ্যিক স্বার্থ এবং শাসককুলের বিজ্ঞান নিয়ে জাত্যভিমানের প্রকাশ কীভাবে ঘটেছিল তাঁর অবতারণা এখানে কিছুটা প্রাসঙ্গিক। ক্লিমেন্ট মার্কহাস বলেছেন, ‘মহান ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে’ সাম্রাজ্যিক সরকারের ‘ভুগোলসংক্রান্ত সুসংবদ্ধ কার্যক্রম’ যা পালোস থেকে কলম্বাসের নৌযাত্রার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমরা আমাদের বিজয়ের দ্বারা যাদের চমকে দিয়েছি, হিন্দুস্থানের একটি মানচিত্র তাঁদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষক না হয়ে পারে না।

-এ কথা লিখেছেন জেমস রেনেল নিজেই। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় ‘মানুষ ও প্রকৃতি’-যুক্তিবাদের এই বাহ্যিক ঘোষণা সত্ত্বেও সাম্রাজ্যিক স্বার্থ অপ্রকাশ্য থাকেনি। সোসাইটির উদ্দেশ্য হিসেবে ঘোষিত হলো জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, ক্ষেত্রবিদ্যা, যন্ত্রবিজ্ঞান, আলোকবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, এমনকি শারীরসংস্থানবিদ্যা বা রসায়নে এদেশের অবস্থা ও পদ্ধতিসমূহ সম্পর্কে অনুসন্ধান করা। অনুসন্ধানের প্রয়োজন-কেননা এদেশে শাসনের পুরোনো পদ্ধতিসমূহ জানার উপরেই নির্ভর করছে ‘আমাদের (ইংরেজদের) জাতীয় কল্যাণ এবং ব্যক্তিগত লাভ। সংস্কৃত চর্চার সূত্রে এশিয়াটিক সোসাইটিতে কিছুটা বিজ্ঞানের চর্চাও হলো। মার্টিন বারনাল দেখিয়েছিলেন অর্বাচীন ইউরোপের আত্মপরিচিতির অনুসন্ধানে কীভাবে মিসর চর্চার পরিবর্তে এল ভারত চর্চা। কোলবুক বিমুগ্ধ বিষয়ে ‘আবিষ্কার’ করলেন প্রাচীন হিন্দু গণিতের চর্চা। প্রাচ্যবাদীরা প্রাচীন যুগকে স্বর্গমহিমা প্রদান করলেন-যেখানে সবাই ছিল, বিজ্ঞানও ছিল। এরই সূত্র ধরে জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধির সঙ্গে এদেশে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। একটি হলো পুনরুথানবাদী। একদল বললেন, প্রাচীন মুনি ঋষিরা বিজ্ঞানের সবই জানতেন। হাঁচি, টিকিরও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করা হলো। আর এক ধারার প্রতিক্রিয়ায় সুপ্ত রইলো এই ধারণা যে ‘ভেতরের জগতে’ (আধ্যাত্মচিন্তা/দর্শন) আমরা সার্বভৌম, শ্রেষ্ঠ। ‘বিজ্ঞান’ বাইরের জগত, পশ্চিম সেখানে এগিয়ে, অতএব আমাদের তা অনুসরণ করতে হবে। এই দ্বৈততা সম্পর্কে চমৎকার আলোচনা করেছেন সমাজবিজ্ঞানী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। যাই হোক, প্রাচ্যবিদদের প্রচেষ্টা বিশেষ এগোল না। ইউরোপের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় তাঁরাও কম ছিলেন না। উইলিয়াম জোন্স একদা এই মত ব্যক্ত করেছিলেন যে, নিউটনের তত্ত্ব ও দর্শনের প্রায় সবই খুঁজে পাওয়া যাবে বেদ এবং সুফিদের চিন্তায়। তিনিই পরে লিখলেন, ‘যুক্তি এবং রুচি ইউরোপীয় মনের বিশেষাধিকার’ এবং সেই কারণেই ভারতের প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ইউরোপের তুলনায় নিকৃষ্ট।

আসল চাবিকাঠি ছিল প্রশাসক রাজপুরুষদের হাতে। এদেরই মাধ্যমে শুরু হলো বর্তমানের স্বার্থে ‘অতীতের উপনিবেশীকরণ’। ‘বিজ্ঞান শ্রেষ্ঠ’ পশ্চিমের শাসনের বৈধতা দিতে বলা হলো, ভারতের মতো দেশের সমাজ ‘বিজ্ঞান-হীন’ বা ‘বিজ্ঞান-বিমুখ’। জেমস মিল, এলিয়েট-ডওসনরা এর সঙ্গে জুড়লেন মুসলিম বিরোধিতা। বলা হলো, ‘হিন্দু” ভারতে যাও-বা বিজ্ঞানচর্চা ছিল ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ মুসলিম শাসনে তাতে ছেদ পড়লো। রাজপুরুষেরা এই ‘বিজ্ঞান-বিমুখতা’ নিয়ে অহরহ বলতে থাকলেন। চার্লস গ্রান্ট লিখেছিলেন, আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বললেন, “এটা হিন্দুদের বিজ্ঞানের অনুন্নত অবস্থার সবচেয়ে সন্তোষজনক প্রমাণ, এবং যাদের (ভারতীয়দের) কাছ থেকে এই বই এসেছে তাঁদের সংস্কৃতিহীনতার পরিচায়ক’’। মেকলের কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। এই আরোপিত ‘বিজ্ঞান-হীনতার’ বিরুদ্ধে বর্তমানে এদেশের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসকে পুনর্গঠিত করার চেষ্টা চলছে। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, আধুনিক পদ্ধতিতন্ত্রের ভিত্তিতে ইউরোপীয় বিজ্ঞানের জয়যাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানে, তা ভারতে প্রচলিত ছিল আয়ুর্বেদশাস্ত্র। কায়সার দেখিয়েছেন, মোঘল শাসনকালে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গতিশীলতার অভাব ছিল না, ভারতীয় মনন ইউরোপীয় প্রযুক্তি গ্রহণে কোনো মানসিক জড়ত্ব দেখায়নি। তবে বিশ্বনাথন মন্তব্য করেছেন, ভারতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পরিবেশ আশ্রিত বিকাশ। আবার অন্যদিকে উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই চলেছিল এক ‘আভ্যন্তরীণ খোঁজ’।

অক্ষয়কুমার অনুভব করেছিলেন এক ভারতিয় বেকনের অভাব। আরও পরে এই অনুসন্ধান প্রসারিত হলো মানসিক এবং কায়িক শ্রমের সামাজিক বিভাজনের মধ্যে, কখনো বর্ণব্যবস্থার অনাচারে, কখনো বিজ্ঞান প্রতি-বিজ্ঞান সংঘর্ষে। শুধ উনিশ শতকে বিজ্ঞাচর্চার শুরু থেকেই নয়, আজও এমন এক ধারণা মজ্জাগত যে যুক্তিবাদের বিকাশে আমাদের সমাজ ও মানসিকতা ‘ওদের’ তুলনায় অনেক দূর্বল। ‘একমাত্র পশ্চিমি সভ্যতাতেই বিকশিত হয়েছে বিজ্ঞানের পূর্ণ বিকাশ যা প্রাচীন গ্রিক, মধ্যযুগের আরব, ভারতীয় বা চীনাদের থেকে কত বেশি পৃথক ও সাফল্যমণ্ডিত। ‘পার্থক্য’র উপর প্রতিষ্ঠিত এই চলতি ধারণার কারণ দেখানো হয়েছে যুক্তিবাদ যা নাকি পশ্চিম ছাড়া বিকশিত হয়নি। কুসংস্কার এবং প্রতিবিজ্ঞানের লড়াইয়ে এগিয়ে-পিছিয়ে থাকার ধারণা এক ভ্রান্তি। সব দেশ, সব সমাজ তা চলে নিজস্ব ধরনে। এ সম্পর্কে খুব সহজবোধ্য আলোচনা করেছেন রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। যুক্তি বিজ্ঞানে, একই সঙ্গে তা সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও। আমরা প্রায়ই বিস্মৃত হই আলোচ্য সময়কালে অর্থাৎ উনিশ শতকের প্রথমার্ধেই সতীদাহ, বিধবাবিবাহ প্রসঙ্গে রামমোহন ও বিদ্যাসাগর শাস্ত্র মন্থন করে যুক্তিবাদের সুপ্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিকরণের কাজে লাগিয়েছেন। রামমোহন যে প্রথম দিকে সব-ধর্মের মধ্যেই অসারতার উপাদান খুঁজে পেয়েছিলেন তাও পারস্যিক যুক্তিবাদের ঐতিহ্যে লালিত। বরং ইংরেজি জ্ঞানচর্চার পরে তাঁর এই তুলনামূলক অবস্থানে ইউরোকেন্দ্রিক প্রবণতার প্রাধান্য সত্ত্বেও বিজ্ঞানের সর্বজনীনতা এবং দেশকাল ভেদে বিজ্ঞানের পরস্পরযুক্ততার কথা উচ্চারিত হয়নি এমন নয়। ১৮২৫ সালে হামফ্রে ডেভি বলেছিলেন-

সৌভাগ্যক্রমে বিজ্ঞান, প্রকৃতির মতোই এবং যে প্রকৃতিতে তা সংস্থিত, সময় বা দুরত্বের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়। তা সারা পৃথিবীর এবং কোনো দেশ বা কালের নয়।

এ সুর উপেক্ষিত থেকেছে ক্রমবর্ধমান সাম্রাজ্যিক বিস্তার এবং জাতিশ্রেষ্ঠত্বের ধারণায়। বিজ্ঞানের দেশগত, মহাদেশগত আলোচনায় পুনর্গঠনের প্রবণতা বর্তমানে এসেছে নতুন করে। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত যে বিজ্ঞানে প্রাচ্য ও ইউরোপের অবস্থানের পার্থক্য ছিল না এ কথা এখন প্রতিপন্ন করেছেন অনেকই। বিজ্ঞানকে সভ্যতার অম্বিত অংশ হিসাবে বিবেচনা করে বিভিন্ন সভ্যতার তুলনামূলক আলোচনার ঐতিহ্য অনেক প্রাচীন। নবম শতাব্দীতে বাগদাদে আলজাহিজ গ্রিক, ভারতীয়, চৈনিক, আরবিক বিজ্ঞানের যে আলোচনা করেছেন তাতে অন্তর্লীন রয়েছে বিভিন্ন সভ্যতার প্রতি অপরিমেয় শ্রদ্ধা ও জ্ঞানের বিনিময়ের আভাস। জ্ঞান ও বিজ্ঞানকে সামগ্রিক মানবিক বিকাশের অঙ্গ হিসাবে দেখার এবং তা পারস্পরিক বিনিময়ের প্রবণতা হিসাবে বিচারের দৃষ্টিভঙ্গির ছেদ ঘটলো উপনিবেশের বিস্তারে।

দৃষ্টিভঙ্গিগত এই প্রসঙ্গের অবতারনা করা হলো, আধিপত্যবাদী মতাদর্শের কোনো সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে শুরু হয়েছিল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সেটি বোঝার জন্যই। রামমোহন থেকে অক্ষয়কুমার সকলেই মনে করেছিলেন ইংরেজ অগ্রগতির প্রাণভ্রমর রয়েছে তাঁর বিজ্ঞানে। উনিশ শতকের শেষে এসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ইউরোপ, ‘তাঁর বিজ্ঞানের দ্বারা পৃথিবীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন ঘরানা নিয়ে ইংরেজ শাসন কোনো চ্যালেঞ্জ উত্থাপিত করেছে। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ সকলেই বুঝেছিলেন যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন ঘরানা নিয়ে ইংরেজ শাসন কোন চ্যালেঞ্জ উপস্থিত করেছে। স্বভাবতই তাঁরা চাইলেন সেই সূত্রকে আয়ত্ত করতে। আমহার্স্ট-এর কাছে রামমোহনের প্রতিবেদন বহুচর্চিত। বিদ্যাসাগর-ব্যালেন্টাইন বিতর্কও সকলের জানা। প্রগতি পন্থী রামমোহন হোন বা রক্ষণশীল রাধাকান্তই হোন- বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন সকলেই। এমনকি দ্বারকানাথ রামমোহন নীল চাষে ইউরোপীয় অংশগ্রহণকে সমর্থন করেছিলেন এই আশায় যে, এরই সূত্রে ইউরোপীয় প্রযুক্তি আসবে। তারই সূত্রে কৃষিবিপ্লবের পথ ধরে শিল্পবিপ্লব সংগঠিত হবে সমুদ্রের ওপারের মতো এপারেও। জমিদার রাধাকান্ত চেয়েছিলেন কৃষিতে ‘সাহেবদের’ প্রযুক্তি এদেশের কৃষির অনগ্রসরতা ঘোচাবে। এই প্রত্যাশা ও পরিণতিতে তফাৎ ছিল অনেক। বিদ্যাসাগর জনশিক্ষার ভিত্তি প্রসারিত করে বিজ্ঞান শিক্ষাকে প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন। একারণেই তাঁরা তাঁদের উদ্যমকে নিয়োজিত করেছিলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার। কিন্তু প্রত্যাশা ও পরিণতিতে তফাৎ ছিল অনেক। বিজ্ঞান শিক্ষা দূরে থাক, বিদেশী শাসক সাধারণ শিক্ষাবিস্তারেও তেমন আগ্রহী ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানের স্বাতন্ত্র্য এমনই যে মতাদর্শগত আধিপত্যের বেড়াজাল ছিন্ন করে, শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তা প্রভাবিত হলো। বিজ্ঞানের অন্তর্নিহিত শক্তিই হচ্ছে তাঁর আধিপ্ত্যবিরোধিতার বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞানচর্চার সুবাদেই জন্ম নিল যুক্তিবাদের নতুন ধরন, বিজ্ঞানচর্চার নতুন নৈতিকতা। প্রকাশ্যে বেদান্তকে ভ্রান্তদর্শন ঘোষণা করলেন বিদ্যাসাগর। ‘বোধোদয়’ লিখে প্রমাণ করলেন কী ধরনের বোধ তিনি চান। নিউটনীয় দ্বৈতবাদ তখনো ঈশ্বরের অবস্থান স্বীকৃত। তাঁর সূত্র ধরে যুক্তিবাদের প্রসারে আরও অগ্রসর হলেন অক্ষয়কুমার। ‘নিয়মের রাজস্ব’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখলেন-

সংসারে তাবৎ বস্তুর যাবৎ কার্যই বিশেষ বিশেষ। নির্দিষ্ট রীত্যনুসারে সংঘটিত হয়। সমুদ্রের জল সূর্য্যের তেজে বাষ্প হইয়া উর্দ্ধগামী হয়, এবং তাহাতেই মেঘ জমিয়া পৃথিবীতে বারিবর্ষণ করে। এই স্থল জল ও তেজ এই উভয় পদার্থের কার্য্য বাষ্প অথবা মেঘ। এই কার্য্য জগতের নিয়মানুসারে ঘটিয়া থাকে, অর্থাৎ জল ও তেজের যাদৃশ প্রকৃতি এবং উভয়ের যাদৃশ পরস্পর সম্বন্ধ নিরূপিত আছে, তাহাতে ঐ কার্য্যের ঐ প্রকার ঘটনা ব্যতিরেকে আর কিছুই হইতে পারে না, জল ও তেজের যে অবস্থায় ঐ কার্য্য একবার ঘটিয়াছে, পুনর্ব্বার তাহাদের সে অবস্থা ঘটিলে অবশ্যই সে কার্য্য ঘটিবে, এই যে বিশিষ্ট রীতি আছে, ইহাকেই নিয়ম বলা হয়।

কার্য-কারণ সম্পর্কের দিকে অন্নিষ্ঠ যাত্রায় ‘জগতের নিয়মানুসারে’র কথা প্রাধান্য পেল। অক্ষয়কুমারের পদত্যাগের পরও ‘তত্ত্ববোধিনী’র চালাতে হলো বিজ্ঞান সম্পর্কিত আলোচনা, যদিও তা হলো ‘ঊশ্বরের মহিমা’ এই শিরোনামে। বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানচর্চার সূত্রেই আমাদের এই সম্পদের উত্তরাধিকার।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন জ্ঞানের সাহিত্য। বিজ্ঞানচর্চা এই জ্ঞানের সাহিত্যের অন্যতম উপাদান। ভাষার বিকাশ ও বিষয়বস্তু একে অপরের অগ্রগতির আপেক্ষিক। বিজ্ঞানচর্চা এই বিষয়বস্তুর দৈন্য অপসারণে সাহায্য করে বাংলা ভাষাকে প্রকাশভঙ্গির বৈচিত্র্য ও সুষ্মা অর্জনে অপরিসীম সাহায্য করেছে। বিজ্ঞানের সমস্ত বিষয়ই এই চর্চার অন্তর্গত হওয়ায় বিষয় বস্তুর নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হতে থাকে। ‘দিগদর্শন’ থেকে ‘তত্ত্ববোধিনী’ বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞানবিষয়ক রচনা ছিল প্রায় আবশ্যিক। যে সব সূত্রে বাংলা ভাষা প্রকাশভঙ্গির শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও বৈচিত্র অর্জনে অসামান্য হয়ে ওঠে, বিজ্ঞানচর্চা তাঁর অন্যতম উপাদান। খ্রিস্টান মিশনারিদের বাক্যের সজ্জা, যতিচিহ্নের ব্যবহার প্রভৃতির প্রয়োগ ছিল লক্ষ্য করার মতো। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ‘হওয়া’ ক্রিয়ার ব্যবহার বাংলা বাক্যের নিজস্ব গঠনবিরোধী। ইংরেজি রীতির প্রভাবে অনেক সময় ‘___’এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় যেমন-

নক্ষত্রের মধ্যে কোন কোন নক্ষত্র প্রায় সুর্যের ন্যায় বৃহৎ আছে।

আবার ইংরেজির অনুসরণে ‘এবং’ দিয়ে বাক্যের শুরুও লক্ষ করা যায়-

। এবং তাহাদের দ্বারা অন্ধকার নষ্ট হইতেছে

বিজ্ঞানচর্চার ভাষারীতির বিকাশ খ্রিস্টিয় মিশনারি ও ওরিয়েন্টালিস্টদের ভূমিকা স্বীকার করে নিয়েও বলা যায় তা অনেক বেশি সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ হয়ে উঠেছিল রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্তদের গদ্যে। বিদ্যাসাগর এবং অক্ষয়কুমার দত্তের বিজ্ঞানচর্চার ভাষা অনেক পরিণত, সমৃদ্ধ এবং প্রকাশভঙ্গির কার্যকারিতায় সুষমামণ্ডিত।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম জটিলতর বিষয়টি ছিল পরিভাষা। বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ ও গ্রন্থরচনার সূত্রপাত হওয়ায় বাংলা পরিভাষা সৃষ্টির প্রয়োজন হলো। সংস্কৃতে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও রসায়নে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা শব্দের দ্যোতনা থাকলেও বাংলা পরিভাষায় কোন পূর্ব আদর্শ ছিল না। উনিশ শতকের প্রথম থেকেই বিজ্ঞানচর্চায় বাংলা পরিভাষার সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ বিষয়ে দিগদর্শনকে পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক শব্দের উপযুক্ত পরিভাষার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ফেলিক্স কেরি লেখেন-

অপ্র সকল বিদ্যাগ্রন্থে সংজ্ঞা শব্দ না হইলে নির্বাহ হয় না। অতএব যে স্থানে উপযুক্ত সংগা পাওয়া গিয়াছে তাহাই গ্রহিতা হইয়াছে।…. অপ্র কহি উপযুক্ত সংজ্ঞা গঠনই অতি দুঃসাধ্য কার্য অতএব এই বিদ্যাহারাবলী গ্রন্থতে যে যে সংজ্ঞা অনুপযুক্তাকে বোধ হয় সেই সকল জ্ঞাত করাইলে এবং তৎপরিবর্তনে সংজ্ঞা দেওনে পারক অত্যাহলোদি বিষয় হয় জানিবেন।

পরিভাষায় জন কেরি সাহায্য নিয়েছিলেন সংস্কৃত ‘বিশ্বকোষ’, ‘অমরকোষ’, অভিধান্তন্ত্র’ প্রভৃতির। ‘ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা’ (dissection of human body), ‘শরীরসংস্থান বিদ্যা’ (anatomy), ‘অস্থিবিদ্যা’ (osteology), ‘উপাস্থি’ (cartilage), ‘মাংসপেশী’ (muscular tissues), ‘মূত্রোৎপাদক’ (urinary system), ‘ক্ষুদ্রমস্তিষ্ক’ (cerebellum) প্রভৃতি পারিভাষিক শব্দ সংস্কৃত ভাষার ভাণ্ডার থেকে চয়ন করে আনা। রামকমল সেন সংস্কৃত অনুসারী পরিভাষার পক্ষপাতী ছিলেন। পাদরি ইয়েটস ‘physics’-এর পরিভাষা করেছিলেন ‘পদার্থবিদ্যা’। কালীকৃষ্ণ দেব ‘রাসেলাস’ গ্রন্থ astronomer-এর বাংলা করেছিলেন ‘জ্যোতির্বিদ্যা’। ‘সমাচার দর্পণ’ পত্রিকায় কিমিয়াবিদ্যা (chemistry)- উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কিমিয়াবিদ্যাসার’-এর লেখক জন ম্যাক বৈজ্ঞানিক শব্দের সংস্কৃত প্রতিশব্দ ব্যবহারের বিরোধী ছিলেন। সাধারণভাবে ইংরেজি শব্দই বাংলা অক্ষরে উচ্চারণরীতি কিছুটা পরিবর্তিত করে তিনি ব্যবহার করতেন। যেমন ‘অক্সিজেন’, ‘ক্লোরিন’ ‘আইয়োডিন’, প্রভৃতি। আবার ইংরেজি শব্দের ব্যাখাধর্মী বাংলা শব্দচয়নের প্রবণতা ছিল তাঁর। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে-‘কিমিয়া প্রভাব’ (chemical forces), ‘তাপক বিষয়’ (caloric heat), ইত্যাদি।

জ্যোর্তিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রকৃতি দর্শন, ভূগোল, চিকিৎসা প্রভৃতি বিষয়গুলি নিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকলে পরিভাষা আর অর্থবাহী এবং সাঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। ১৮৫২ সালে বাংলা ভাষায় মেডিকেল ক্লাস শুরু হওয়ায় চিকিৎসাবিদ্যা চর্চায় আরও বেশি পরিভাষার প্রয়োজন দেখা দেয়। বাংলা শব্দভাণ্ডারে বহু ইংরেজি শব্দ যোগ হতে থেকে বিজ্ঞানচর্চার সূত্রে। বহু ইংরেজি শব্দ উচ্চারণগত ও ব্যাকরণগত দিক থেকে বঙ্গীয় রূপ লাভ করতে থাকে। এর কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে-‘ডক্ত্র’ (সমাচার দর্পণ), ‘কম্পাস’ (দিগদর্শন), ‘লোগারিথিমস’ (বিজ্ঞান সেবধি), ‘তের্মোমেতর’ (কিমিয়াবিদ্যাসার) প্রভৃতি। জেমস আর ব্যালেনটাইন বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় যে সব পরিভাষাগুলি গ্রহনের পরামর্শ দেন তাঁর অনেকগুলিই বহুদিন ব্যবহৃত হয়েছিল। তিনি chemistry-র প্রতিশব্দ ‘রসায়ন’ করেন। প্রানীবিদ্যার জন্য যে পরিভাষা তিনি রচনা করেন যেগুলি অনেকাংশে জটিল এবং পরে তা পরিত্যক্ত হয়। ‘পৃষ্ঠংশ বিশিষ্ট’ (vertebrata), ‘সমান অবয়াবৃত্ত নাভি বিশিষ্ট’ (radiate) প্রভৃতি পরিভাষা সহজবোধ্য ছিল না। জেমস লঙ, অবশ্য যেসব পরিভাষা তাঁর স্কুলের জন্য পাঠমালা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন তা অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। ‘ঘন’ (solid), ‘স্বচ্ছ’ (transparent), স্থায়ী’ (deniable), ‘ভঙ্গুর’ (brittle) প্রভৃতি শব্দগুলি এখনো প্রচলিত। তাঁর মত ছিল বিজ্ঞান শিক্ষা জনপ্রিয় করতে দেশীয় শব্দের ব্যবহার জরুরি এবং ইংরেজি ভাষার তুলনায় ‘অর্ধেক সময়ে’ দেশীয় ভাষায় বিজ্ঞান সহজেই শেখানো যায়। ভাষার চিত্রধর্মিতার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানমূলক পরিভাষার ব্যবহারে রামেন্দ্রসুন্দ্ররের আগে বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রভৃতির অবদান এক সুষ্মামণ্ডিত গতিশীলতা ও ব্যাপ্তি লাভ করে। জীবনচরিত গ্রন্থে বিদ্যাসাগর ব্যবহার করেছেন-‘গ্রহনীহারিকা’ (planetary nebule), ‘নক্ষত্রবিদ্যা’ (astrology), ‘পারিপার্শ্বিক’ (satellite), ‘ছায়াপথ’ (milky way), ‘কক্ষ’ (orbit), ‘আধিপ্রন্তিক ব্যবধি’ (focal distance) প্রভৃতি। সুসমন্বিত পরিভাষা প্রয়োগে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য প্রকাশ অনেক সহজভাবে উপস্থাপিত করা সম্ভব হলো। বিদ্যাসাগরের ‘জীবনচরিত’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত অংশটি প্রকাশের ঋজুতা কীভাবে বিকশিত হয়েছিল তাঁর নিদর্শন-

গ্যালিলিয় এই দৃষ্টপোষক নলাকার যন্ত্র নভোমণ্ডলে প্রয়োগ করিয়া দেখিতে পাইলেন, চন্দ্রমণ্ডলের উপরিভাগ অত্যন্ত বন্ধুর; সূর্য্যমণ্ডল সময় সময় কলঙ্কিত হয়; ছায়াপথে সূক্ষ্মতার কাস্তবক মাত্র; বৃহস্পতি পারিপার্শ্বিক চতুষ্টয়ে পরিবেষ্টিতে; শুক্র গ্রহের চন্দ্রের ন্যায় হ্রাসবৃদ্ধি আছে; শনৈশ্চরের উভয় পার্শ্বে পক্ষাকার কোন পদার্থ আছে। (গ্যালিলিয়)

‘পদার্থবিদ্যা’ গ্রন্থে অক্ষয়কুমারের ব্যবহৃত পরিভাষার মধ্যে আছে ‘গতিজাড্য’ (inertia of motion), ‘স্থিতিজাড্য’ (inertia of rest), আপেক্ষিকগত’ (relative motion), ‘ঘনত্ব’ (density) প্রভৃতি। উনিশ শতকের প্রথম ভাগ থেকেই অপরিসীম নিষ্ঠার সঙ্গে যে প্রচেষ্টার শুরু হয়েছিল তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় কিভাবে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বাংলা ভাষার বিজ্ঞানচর্চার। এরই ফল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে অপূর্বচন্দ্র দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, এবং যোগেশ্চন্দ্র রায়ের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রসঙ্গে অসামান্য প্রবন্ধগুলি।

প্রাথমিক পর্বে অনুবাদ এবং অনুসরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা। প্রতীচ্যের চিন্তাজগৎ অনুসরণ করে জ্ঞানের সাধনার বিস্তারের জন্য এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্কুলপাঠ্য গ্রন্থ প্রণয়নের প্রয়ো মেটানোর প্রাথমিক প্রচেষ্টায় এই উদ্যোগের শুরু। রামকমল সেনের ‘ঔষধসারসংগ্রহ’ (১৮১৯) ‘ফার্মাকোপিয়ার’ অনুবাদ। হলধর সেনের ‘বাংলার অঙ্কপুস্তক’ বিভিন্ন ইংরেজি গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত। ইয়েটস-এর ‘জ্যোতির্বিদ্যা’ ফারগুসনের ‘অয়ান ইজি ইনট্রোডাকশান টু অ্যানাটমির’ অনুবাদ। ফেলিক্স কেরির ‘বিদ্যাহারাবলী’ রচিত হয়েছে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’র পঞ্চম সংস্করণ অবলম্বনে। ‘এনিমাল বায়োগ্রাফি’ গ্রন্থের অনুবাদ লসনের পশ্বাবলী। ‘বিবিধার্থ সংগ্রহ” প্রকাশিত হয়েছিল ‘পেনি ম্যাগাজিন’-এর আদর্শ অনুসরণ করে।

ইংরেজি ঘরানায় জ্ঞান ও বিজ্ঞানচর্চার যে সূত্রপাত তাতেও অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা ছিল অনস্বীকার্য। ‘সংবাদ প্রভাকর’ বিদ্যাসাগরের কাছে আর্জি জানায়-

বাংলা ভাষায় উপযুক্ত পুস্তক ইংরেজি হইতে অনুবাদ করিতে হইবে। অনুবাদের দায়িত্ব দুই ভাষায় অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তির উপর দেওয়া উচিত এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উপযুক্ত।

বিদ্যাসাগরের ‘বোধোদয়’ মূলত চেম্বার্স-এর গ্রন্থ অনুসরণে রচনা। অবশ্য তিনি অন্যান্য গ্রন্থের সাহায্য নিয়েছিলেন। প্রয়োজনমতো আক্ষরিক অনুবাদ, ভাবানুবাদ, সারানুবাদ-সমস্ত পদ্ধতিরই আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। তিনি স্পষ্টই বলেছেন-

বোধদয় নানা ইংরেজি পুস্তক হইতে সঙ্কলিত হইল, পুস্তক বিশেষের অনুবাদ নহে।

বিদ্যাসাগরের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অক্ষয়কুমারের মূলগত সাদৃশ্য লক্ষণীয়। অক্ষয়কুমারও বিজ্ঞানচর্চায় অনুবাদের ক্ষেত্রে এখানকার প্রয়োজন, বাস্তব অবস্থা ও পরিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখে বিদেশী গ্রন্থের অনুসরণ ও আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে গ্রহণ ও বর্জনের পথ নিয়েছিলেন-

যে সকল উদাহরণ ইউরোপীয় লোকের পক্ষে সুসঙ্গত, কিন্তু দেশীয় লোকের পক্ষে সেরূপ নহে, তাহা পরিত্যাগ করিয়া তৎপরিবর্ত্তে যে সকল উদাহরণ এদেশীয় লোকের পক্ষে সঙ্গত ও হিতজনক হইতে পারে তাহাই লিখিত হইয়াছে।

এই ধারাতেই অক্ষয়কুমার রচনা করেছিলেন ‘বাহ্যবস্তর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার’। জর্জ কুম্বের ‘কনস্টিটিউসন অফ ম্যান’ গ্রন্থটির উল্লেখ করেছেন অক্ষয়কুমার। তাঁর যুক্তি উপস্থাপনার সূত্রে এসেছে আরও কয়েকটি গ্রন্থ-লরেন্স এর ‘লেকচারস অন কমপারেটিভ অয়ানাটমি’, লাইবিগ-এর ‘অর্গানিক কেমিস্ট্রি’, ফাউলার-এর ‘সাইকোলজি’ প্রভৃতি। ‘চারুপাঠ’-এর প্রথম সংস্করণের বিজ্ঞাপনে অক্ষয়কুমার লিখেছেন-

চারুপাঠ প্রথম ভাগ প্রস্তুত ও প্রচারিত হইল। এই গ্রন্থে যে নানা ইংরেজি পুস্তক হইতে সঙ্কলিত, ইহা বলাই বাহুল্য।

অনুবাদ-অনুসরণের এই সীমাবদ্ধ পরিধির মধ্যেও তত্ত্ব ও তথ্য নিষ্ঠার যে স্বাক্ষর রয়েছে তা বাঙালি মনীষার উজ্জ্বল নিদর্শন। ’দিগদর্শন’ পত্রিকায় আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ঐ একই বিষয়ে অক্ষয়কুমারের রচনা অনেক বেশি তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক কারণসমূহের উল্লেখসমৃদ্ধ। ‘দিগদর্শন’ বিসুবিয়াসের উল্লেখ করে আগ্নেয়গিরির সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে অক্ষকুমার আগ্নেয়গিরি সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক কারণ উল্লেখ করে বিসুবিয়াসের প্রসঙ্গ এনেছেন-

পদার্থবিদ্যাবিদ পণ্ডিতগণ এই পর্ব্বতাগ্নির উৎপন্ন হইবার যে সকল কারণ নির্ণয় করিয়া থাকেন, তাহা লিখিত হইতেছে। পৃথিবীর গর্ভে গন্ধক-প্রভৃতি নানা প্রকার দাহ্যপদার্থ নিহিত আছে। সেই সকল পদার্থের এরূপ স্বভাব যে, কোন স্থান হইতে জল আসিয়া তাহাদের উপরিভাগে পড়িলেই অগ্নি উৎপন্ন হয়, এবং সেই সকল দাহ্যবস্তু এই অগ্নির প্রভাবে বিস্তারিত, পস্পর বিঘর্ষিত ও বিলোড়িত হইয়া থাকে। ইহাতে পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিচলিত এবং তাহার উপরিভাগ কম্পিত হওয়াতে ভূমিকম্প উপস্থিত হয়। ঐ অগ্নি দ্বারা সেই সকল দ্রব্যের আয়তন এত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় যে, তাহারা পর্যাপ্ত স্থান না পাইয়া ভূমি ভেদ করিয়া উঠে। অতএব সেই সমস্ত স্থানের উপরিভাগে যত বস্তু থাকে, তাহারা সর্বাগ্রেই অগ্নির তেজে উৎক্ষিপ্ত হইয়া পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে আসিয়া পর্বতাকার হয়। পরে দাহ্য পদার্থ সকলও সেই পর্বত ভেদ করিয়া উত্থিত হয়। এইরূপে আগ্নেগিরির উৎপত্তি হইয়া থাকে।

কার্যকারণের সুনির্দিষ্ট ব্যখ্যায় বিজ্ঞানমনস্কতা এইভাবেই দ্রুত বিজ্ঞানচর্চার উপাদান হয়ে উঠতে থাকে। পদার্থবিদ্যার আলোচনায় ইয়েটস-এর রচনা কথোপকথনের আঙ্গিকে অত্যন্ত সূত্রাকারে পদার্থবিদ্যার তত্ত্বসমূহ উপস্থাপিত করেছে। ‘পদার্থবিদ্যা’ গ্রন্থে অক্ষয়কুমারের আলোচনা অনেক সুবিন্যস্ত। অঙ্গকের মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণের হার ব্যাখ্যার চেষ্টা বাংলা বিজ্ঞানচর্চায় সূত্রপাত ‘পদার্থবিদ্যা’ গ্রন্থেই প্রথম-

বিবিধার্থ সংগ্রহ’ পত্রিকায় ‘রেশম প্রস্তুতকরণের প্রথা’, ‘তমলুকের কুঠিতে লবণ-প্রস্তুতকরণের প্রথা’ প্রভৃতি দেশীয় প্রযুক্তির যে সুচারু, পর্যানুক্রমে অনুসারী এবং অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে তা পর্যবেক্ষণ শক্তির গভীরতা বহন করে। বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার বা রাজেন্দলাল কেউই প্রথাগত অর্থে বিজ্ঞানী ছিলেন না। অথচ বিজ্ঞানচর্চার প্রাথমিক পর্বে যে মনন, নিষ্ঠা এবং দ্রুততায় তাঁরা এই নতুন ঘরানাকে আত্মীকৃত করে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে অবদান রেখেছেন তাতে শ্রদ্ধাবনত হতে হয়। উনিশ শতকে দ্বিভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে বাঙালি মনীষার এই বিকাশ আজ ইতিহাসের সম্পদ।


লেখক

সন্দীপন ধর
ভারত সরকারের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব; প্রাবন্ধিক ও বিজ্ঞান লেখক।


error: Content is protected !!