ভাষার কোন ধর্ম পরিচয় নাই

ভাষার কি ধর্মপরিচয় আছে? যেমন ধরুন ইহুদি ভাষা, বৌদ্ধ ভাষা, খ্রিস্টীয় ভাষা, মুসলমানি ভাষা, হিন্দুয়ানি ভাষা, জৈন ভাষা। হ্যাঁ, আছে। এবং তা বাংলা মুলুকেই আছে। অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানের কাছে ভাষা প্রধানত দু-প্রকার― মুসলমানি ভাষা ও হিন্দুয়ানি ভাষা। মুসলমানি ভাষা কোনগুলো? আরবি, ফার্সি ও উর্দু। আরবি না হয় কোরানের ভাষা, সেকারণে ইসলামি বা মুসলমানি ভাষা। কিন্তু ফার্সি ও উর্দু কেন মুসলমানি ভাষা? এই জন্য যে, তাদের যুক্তি, ফার্সি ও উর্দু হরফের সঙ্গে আরবি হরফের মিল আছে। আর হিন্দুয়ানি ভাষা কোনগুলো? প্রধানত সংস্কৃত ও বাংলা।

ভাষা-সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী কোন বাঙালি মুসলমানকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আরবি যদি মুসলমানি ভাষা হয়, তাহলে আবু জাহেল, আবু লাহাব, উতবা, শায়েবা, ওয়ালিদ বিন মুঘাইরা প্রমুখ কাফেরদের নামগুলো আরবি কেন? আরব কবি ইমরুল কায়েসের নাম আরবি কেন? দেখবেন, কেউ উত্তর দিতে পারবে না। আবার নবির পিতার নাম আবদুল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহর গোলাম বা আল্লাহর দাস। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় কোন আল্লাহ? ইসলামের আল্লাহ? তারা উত্তর দিতে পারবে না। কারণ তারা জানেই না এই আল্লাহ প্যাগানদের মধ্যে প্রচলিত আল্লাহ নামের দেবতা, যিনি লাত, মানাত ও উজ্জাতের পিতা।

আবার মুসলমানদের মধ্যে একদল আছে যারা বলে থাকে, আল্লাহর ভাষা আরবি। তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আল্লাহর ভাষা আরবি হলে আল্লাহ হযরত মুসার ওপর কেন আদি হিব্রু ইবরানি ভাষায় তাওরাত, হযরত দাউদের ওপর ইউনানি ভাষায় যাবুর এবং হযরত ঈসার ওপর কেন সুরিয়ানি ভাষায় ইঞ্জিল অবতীর্ণ করলেন? দেখবেন, সবাই চুপ মেরে যাবে, কেউ উত্তর দিতে পারবে না। উত্তর দিতে না পারার কারণ ধর্ম সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা। তারা তো তাদের ধর্মগ্রন্থ কোরান পড়ে না। ইসলাম বলতে তারা বোঝে মৌলবি-মাওলানাদের মুখের কথা। তারা যদি ঠিকমতো তাদের ধর্মগ্রন্থটি পড়ত, তাহলে তারা বুঝত, ভাষার কোন ধর্ম হয় না। কোরানের সূরা রুম-এর ২২ নং আয়াতে উল্লেখ : ‘আর তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সৃষ্টি আর তোমাদের ভাষা ও বর্ণের পার্থক্য। এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানী লোকদের জন্য’। সুরা ইব্রাহিমের ৪ নং আয়াতে উল্লেখ : ‘আমি সব রাসুলকে তাদের নিজ জাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা পরিষ্কার করে বোঝাতে পারে’।

হযরত মুহম্মদের জন্ম যদি ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় হতো, কোরানের ভাষা কি আরবি হতো? না। তখন কোরানের ভাষা হতো ইংরেজি। তার জন্ম যদি রাশিয়ায় হতো কোরানের ভাষা কি আরবি হতো? না। তখন কোরানের ভাষা হতো রুশ ভাষা। কোরান আরবি ভাষার হওয়ার একমাত্র কারণ নবির জন্ম ও কর্মস্থল ছিল আরব। আরবের লোকেরা যাতে তার কথা সহজে বুঝতে পারে সেজন্যই কোরান আরবি ভাষার। এই কোরণেই কোরানের সুরা শুরার ৭ নং আয়াতে উল্লেখ : ‘আর (হে নবি) এ রূপেই এ আরবি কোরানকে আমি তোমার প্রতি ওহি করেছি যে তুমি জনপদের কেন্দ্রস্থল (মক্কানগরী) ও তার আশপাশের বসবাসকারীদের সাবধান করতে পার’।
সুতরাং ভাষার পার্থক্য ও বৈচিত্র্য যেহেতু আল্লাহর নিদর্শন, তাই সব ভাষাই আল্লাহর অনুমোদিত ভাষা। কোন ভাষাই ভালো বা মন্দ ভাষা নয়। কোন ভাষাই নৈতিক বিচারে শ্রেষ্ঠ নয়। নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সব ভাষাই ভালো ও গ্রহণযোগ্য। কোনভাবেই আরবি ভাষা বাংলা ভাষা থেকে শ্রেষ্ঠ নয়। কোনভাবেই হিব্রু ভাষা ইংরেজি ভাষা থেকে শ্রেষ্ঠ নয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমান কোরানের এই বাণী মানতে নারাজ। তার মানতে চায় না ভাষার সঙ্গে ধর্মের যে কোন সম্পর্ক নেই। থাকলে ইরানের মুসলমানরা পার্সি নয়, আরবি ভাষায় কথা বলতো। ভারতবর্ষের মুসলমানরা হিন্দি-বাংলা-অসমীয়া-কাস্মিরী-মৈথিলী-মালয়ালম-মারাঠি-ওড়িয়া-সংস্কৃত-তামিল প্রভৃতি ভাষায় নয়, আরবি ভাষাতেই কথা বলতো। আফগানের মুসলমানরা পশতু ও দারি ভাষা, মালয়েশিয়ার মুসলমান মালয় ভাষা, ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান জাভা-বালি বাহাসা ইন্দোনেশিয়া ভাষা এবং বাংলাদেশের মুসলমানরা বাংলা ভাষা বাদ দিয়ে আরবি ভাষায় কথা বলতো। কিন্তু তা কি তারা বলে? বলে না।

তাহলে মুসলমানদের নাম কেন আরবিতে রাখা হয়? কারণ একটাই―তারা কোরান পড়ে না, ধর্মীয় বুদ্ধিজীবীর যা বলে তাকেই ইসলামের বিধান মনে করে। ধর্মীয় বুদ্ধিজীবী কারা? মৌলবি-মাওলানারা। তাদেরকে বলা হয় হুজুর। হুজুর বলেন, শিশুর নাম রাখতে হবে আরবিতে, তাই তারা শিশুসন্তানের নাম রাখে আরবিতে। কিন্তু হুজুরকে যদি প্রশ্ন করা হয়, আরবিতেই নাম রাখতে হবে, এমন কোন নির্দেশনা কি কোরান-হাদিসে আছে? হুজুর উত্তর খুঁজে পাবে না। পাবে কিভাবে? এমন কোন নির্দেশনা তো ধর্মগ্রন্থে নেই। আরবি যদি ইসলামের ভাষা হতো, তাহলে তো ইসলামের চার প্রধান খলিফা হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান, হযরত আলীকে নাম পরিবর্তন করতে হতো। কারণ তারা তো মুসলমান হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি, সবাই প্রাপ্তবয়সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কই, তাদের নাম তো পরিবর্তন হলো না!

হলো না এই কারণে যে, তারা আরবের অধিবাসী। আরব ভূখণ্ডের অধিবাসীর নাম আরবিতেই রাখা হয়। একজন আরব মুসলমান ও একজন আরব খ্রিস্টানের নাম শুনে তার ধর্মপরিচয় বোঝা যাবে না। যেমন আব্দুল্লাহ ইবন সাবার। তিনি একজন ইহুদি। মুসলমানদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন বলে তাকে ‘মুনাফিক’ বলা হয়। যেমন তারেক আজিজ। তিনি ইরাকের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর। কিন্তু তিনি ছিলেন ধর্মে একজন আরব খ্রিস্টান। এই নামে কিন্তু বাংলাদেশে বিস্তর মানুষ আছে। তারা ভাবে, শুনতে তো নামটি আরবি মনে হচ্ছে, সুতরাং এটি ইসলামি নাম!
হুজুরেরা মুসলমানকে একটি জাতি মনে করে। জাতি আর সম্প্রদায় যে এক নয়, তারা মানতে নারাজ। তারা মনে করে নামকরণের মধ্য দিয়ে বুঝি সারা পৃথিবীর মুসলমান একই জাতিভুক্ত হয়। এটি তাদের ভুল ধারণা। সৌদিরা তো ইরানের মুসলমানদের মুসলমানই মনে করে না। সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি আবদুল আজিজ আশ শেখ-এর মতে, ‘ইরানিরা মুসলমান নয়’। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের বক্তব্য, ‘পাকিস্তানের একজনও প্রকৃত মুসলিম নয়। সেখানে যারা আছে তারা সবাই হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হওয়া’। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই ইসলামিক রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পেয়েছে পাকিস্তান। অথচ ওই দেশে একজনও মুসলমান নেই। সৌদি আরবই এশিয়ার মধ্যে একমাত্র মুসলমান রাষ্ট্র। পাকিস্তানে নিজেদের মুসলমান দেশ বলে দাবি করে। একজন সত্যিকারের মুসলমান বলতে যা বোঝায়, ওই দেশে তেমন একজনও নেই। পাকিস্তান হলো একটা ক্রীতদাসের দেশ। ভারতের মতো দেশের হিন্দুদের ধর্মান্তর করে যারা মুসলমান হয়েছে তারাই পাকিস্তানে থাকে। এদের আসলে ‘হিন্দু-মুসলমান’ বলা হয়।’ [সূত্র : কলকাতানিউজ টোয়েন্টিফোর সেভেন এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন।] একইভাবে সৌদিরা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদেরকেও প্রকৃত মুসলমান বলে মনে করে না। সুতরাং নামকরণের মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের মুসলমানরা একই জাতিভুক্ত হবে, এটা দূরাশা, এটা ভ্রান্ত ধারণা।

কালের প্রবাহে বাংলা ভাষায় প্রচুর আরবি, ফার্সি, উর্দু, ইংরেজি, ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, গ্রিক, জাপানি, চায়না শব্দ প্রবেশ করেছে। বাংলা ভাষা নিজেকে সমৃদ্ধ ও গতিশীল করার জন্য এসব শব্দকে এমনভাবে আত্মস্থ করেছে যে এখন আর সেগুলোকে বিদেশি শব্দ বলে মনে হয় না। এখন প্রশ্ন, আরবি শব্দগুলো যদি তথাকথিত ‘মুসলমানি শব্দ’ হয়, ফার্সি বা উর্দু শব্দগুলোও যদি তথাকথিত ‘মুসলমানি শব্দ’ হয়, তাহলে ইংরেজি শব্দগুলো কি ‘খ্রিষ্টানি শব্দ’? কিংবা ওলন্দাজ, পর্তুগীজ, গ্রিক, জাপানি, চায়না শব্দগুলোকে কোন ধর্মপরিচয়ে শনাক্ত করব? এগুলোর তো কোনো ধর্মপরিচয় খুঁজে পাচ্ছি না। সুতরাং, একথা জেনে রাখা দরকার যে, এসব শব্দ শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে বাংলা ভাষায় ঢোকেনি, ঢুকেছে ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক, প্রশাসনকি ইত্যাদি কারণে। সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ফরাসি, পর্তুগিজ, তুর্কি, বর্মি সব ভাষার শব্দ নিয়েই বাংলা ভাষা। এই ভাষায় কোন ‘মুসলমানি শব্দ’ যেমন নেই, তেমনি নেই ‘হিন্দুয়ানি’ শব্দও। ভাষার কোন ধর্মপরিচয় নেই। হয় না।

সুলতান ও মুঘলরা এদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে নষ্ট করে দিতে চাননি, বরং তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। গিয়াসউদ্দিন আযম শাহর পৃষ্ঠপোষকতায় শাহ মুহাম্মদ সগীর রচনা করেন কাব্যগ্রন্থ ‘ইউসুফ জোলেখা’। শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ মালাধর বসুকে ভগবতের বাংলা অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনকালে বিস্তর কবি-সাহিত্যিক সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। সুলতান ও তার দরবারের সভাসদরা সাহিত্যচর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করছিলেন। ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’ গ্রন্থের লেখক যশোরাজ খান ছিলেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহের দরবারের কর্মচারী। যশোরাজ খান তার গ্রন্থে সুলতানকে ‘শাহ হুসেন জগত-ভূষণ’ বলে সম্বোধন করেন। সুলতানের বন্দনা করেছেন কবিন্দ্র পরমেশ্বর। এ সুলতানের আমলেই বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাস রচনা করেন ‘মনসামঙ্গল’ ও ‘মনসাবিজয়’ গ্রন্থ দুটি। বিজয়গুপ্ত তার লেখায় সুলতানের প্রশংসা করেছিলেন। নসরত শাহও বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সেনাপতি ও চট্টগ্রামের শাসনকর্তা পরাগল খান মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করার দায়িত্ব দেন কবি পরমেশ্বরকে। পরমেশ্বের মহাভারতের বিশাল অংশ অনুবাদ করেন। পরে পরাগল খানের পুত্র ছুটি খানের আদেশে বাকি অংশ অনুবাদ করেন সভাকবি শ্রীকর নন্দী। ভাষা সাহিত্যে সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতার আরো বিস্তর উদাহরণ দেওয়া যাবে। মুঘলদের অবদানও কম নয়। ভাষা-সাহিত্যের বিকাশে তাদের অবদানও স্বীকৃত। ইংরেজরাও বাংলা ভাষা-সাহিত্যের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অবদান অনস্বীকার্য। এ কলেজের হাত ধরেই বাংলা গদ্যের বিকাশ পর্বের যাত্রা শুরু হয়।

সুলতান, মুঘল ও ইংরেজ আমলে বাংলা ভাষায় জবরদস্তিমূলকভাবে বিদেশি শব্দ ঢোকেনি, ঢোকানো হয়নি। আগেই বলেছি এসব শব্দ ঢুকেছিল বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক এবং দাপ্তরিক কাজের মাধ্যমে। বরং এখন জবরদস্তিমূলকভাবে ঢোকানো হচ্ছে। বাংলা ভাষাকে খৎনা করিয়ে পূর্ণ মুসলমান বানানোর অপচেষ্টা চলছে। যেমন আগে বলা হতো খোদা হাফেজ, এখন বলা হচ্ছে আল্লাহ হাফেজ। আগে বলা হতো রোজা বা রমজান, এখন বলা হচ্ছে রামাদান। আগে বলা হতো সেহেরি, এখন বলা হচ্ছে সাহরি। আগে বলা হতো ঈদুল ফিতর, এখন বলা হচ্ছে ঈদ-উল-ফিতর। আগে বলা হতো কোরান, এখন বলা হচ্ছে কোরআন। এমন বিস্তর শব্দকে বদলে দেওয়া হচ্ছে কুকৌশলে। এটাই ভাষা রাজনীতি। এই রাজনীতির উৎস হচ্ছে হীনম্মন্যতা। এই রাজনীতির ব্যাপারে সচেতন থাকা কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবীদের খুব জরুরি।

সাধারণ বাঙালি মুসলমান অনেক শব্দ না বুঝেই ব্যবহার করে। যেমন তাদের যদি যদি প্রশ্ন করা হয়, পানিকে আপনারা জল বলেন না কেন? তারা উত্তর দেবে, জল হিন্দুয়ানি শব্দ, পানি মুসলমানি শব্দ। তারা জানেই না ভারতের কোটি কোটি হিন্দু ধর্মাবলম্বী যে জলকে পানি বলে। অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান মাংসকে বলে গোস্ত। কারণ সেই একটাই। ভারতের কোটি কোটি হিন্দু যে গোশত বলে, তা তারা জানেই না। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সম্বোধনসূচক ‘দাদা’ শব্দের পরিবর্তে ‘ভাই’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। ‘ভাই’ শব্দটি সংস্কৃত ‘ভ্রাতা’ উৎসজাত আর ‘দাদা’ ফারসি-তুর্কি উৎসজাত। অথচ বাঙালি মুসলমান ‘হিন্দুয়ানি ভাষা’ সংস্কৃতি উৎসজাত ‘ভাই’কে গ্রহণ করে ‘মুসলমানি ভাষা’ ‘দাদাকে’ বর্জন করল। কী তাদের ভাষা ও ধর্ম জ্ঞান!

সাধারণ মানুষের কথা থাক। তারা ভাষা-রাজনীতি বোঝে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সবকিছুকে সরলভাবেই গ্রহণ করে। আর ধর্মীয় বুদ্ধিজীবীরা হীনম্মন্যতাবশত এসব ভুল করে। জাতে তারা বাঙালি না মুসলমান― এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে না। তাদের হীনম্মন্যতা কাটিয়ে তোলার দায়িত্ব কার? তাদেরকে বোঝানোর দায়িত্ব কার? দায়িত্ব লেখক-বুদ্ধিজীবী-ভাষাবিদদের। সাধারণ মানুষের ভাষারুচি ও ভাষাসংস্কৃতি গঠনের বিশেষ দায় তাদের। কিন্তু এক শ্রেণির লেখক-বুদ্ধিজীবী রয়েছে যারা সাধারণদের মতো ভাষাকে ধর্মপরিচয়ে শনাক্ত করতে চায়। এই শ্রেণিটিকে শনাক্ত করে রাখা জরুরি। কারণ তারা নির্বোধ। নির্বোধদের কাছে ভাষা-সাহিত্য নিরাপদ নয়।


লেখক

স্বকৃত নোমান
কথাসাহিত্যিক


 

error: Content is protected !!