রূপে রূপান্তরে নৃত্য: প্রেক্ষিত বাংলা সাহিত্য

সৃষ্টির মধ্যেই আছে এক নৃত্য বিভঙ্গ। যখন মানুষের আবির্ভাব ঘটেনি, যখন বিশ্বপ্রকৃতি আপন সৌন্দর্যে আপনি থাকত মুগ্ধ, সচকিত, তখনো জলের তরঙ্গে হাওয়ার শিরশিরানিতে একটা অনির্বচনীয় ছন্দ জেগে উঠত। সেই ছন্দের প্রাণবেদনায় একসময় পৃথিবীতে জড়ের বিবর্তনে প্রাণ, প্রাণের বিবর্তনে মানুষের আবির্ভাব ঘটল। অনুকরণপ্রিয়তা মানবপ্রকৃতির চিরন্তন সম্পদ। জীবন ধারণের প্রয়োজনেই বিশ্বপ্রকৃতির অপার ছন্দকে নকল করার প্রবণতা লক্ষ করা গেল মানবজাতির মধ্যে। ক্রমাগত যুদ্ধ, ভয়, হিংসায় লিপ্ত বন্য-মানুষ একদিন অনুভব করল তাদের মধ্যে একটা পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান প্রয়োজন। ভাবপ্রকাশের জন্য তারা সেই সময় যে অঙ্গভঙ্গিগুলি করতো সেগুলিই আধুনিক পরিভাষায় ‘অভিনয়’ বলা যায়। সেই ছন্দ তরঙ্গায়িত হয়েছিল বিচিত্র প্রকরণে। আদিতে হয়তো বিনোদনের প্রয়োজনে নয়, আত্মসৃজন ও আত্মরক্ষার তাগিদে।

ক্রমশ মানুষ পেল সভ্যতার বাতাবরণ। মানুষের শরীরের প্রতিটা শিরায় ধমনীতে রক্তের যে একটা বহতা ধারা আছে তার ছন্দই মানব হৃদয়কে দোলায়িত করেছে অহরহ। দুই পায়ে ভর দিয়ে সে খুঁজে পেয়েছে চঞ্চল গতি। এই প্রাচীন গতিছন্দের আলোকেই সে আবিষ্কার করেছে হরিণের পদসঞ্চার, মুগ্ধ হয়ে দেখেছে ময়ূরের গ্রীবা ভঙ্গিমা, হিংস্র শ্বাপদের ক্ষিপ্রতার পাশাপাশি উড্ডীয়মান বিহঙ্গকুল অনুকরণ করে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তাদের শরীরে। এই ছিল প্রাচীন নাচ।

এই বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা শব্দ সংখ্যার সীমা লঙ্ঘন করবে। তাই গৌরচন্দ্রিকার পর সরাসরি বাংলা সাহিত্যে নৃত্য ভাবনায় প্রবেশ করা যাক। বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদের সময় থেকেই নৃত্য নিজেকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে এসেছে। ফলে বাংলা সাহিত্যে নৃত্যের বিবর্তন— ওঠাপড়ায় আলোছায়ায় সতত উচ্চকিত। সাহিত্যের জগতে উত্থান-পতন এসেছে সামাজিক আঘাতকে স্বীকার করে নিয়ে। ফলে সে কখনো গতিমুখ হারিয়ে আঁধারে মুখ লুকিয়েছে, আবার কখনো বর্ষার নদীর মতই হয়ে উঠেছে নবীন। পৃষ্ঠপোষকদের দাক্ষিণ্যেই দীর্ঘপথ অতিক্রম করে একসময় সাহিত্য হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। নৃত্যও সাহিত্যের সঙ্গেই হাত ধরাধরি করে হেঁটে হয়েছে একই পথের দিশারী। সাহিত্যের সর্বজনগ্রাহ্যতা বন্দীদশা থেকে মুক্তিও দিয়েছে নৃত্যকে। সে নিজের মতই স্বতোৎসারিত হয়ে উঠেছে সাহিত্যের আনাচে কানাচে। নিজেই খুঁজে নিয়েছে নিজের পথ। তাই মিলেমিশে গিয়েও কোথায় যেন নৃত্য, সাহিত্যের থেকে স্বতন্ত্র।

যুগ থেকে যুগান্তরে সাহিত্যের ভাষা যেমন নির্দিষ্ট খাত থেকে চোরা স্রোতের বাঁকে নূতন মোড় ঘুরেছে তেমনি নৃত্যের প্রসঙ্গেও এসেছে সুবিস্তৃত পরিবর্তন। কখনো ছন্দে, কখনো তালে, কখনো পোষাকে নৃত্যও রূপ থেকে রূপান্তরে ক্রম পরিণতির দিকে এগিয়েছে। এ পথের শেষ কোথায় কেউ বলতে পারে না। তবে আজ এই মুহূর্তকে শেষ ধরে নিয়ে আলোচনার গতিপথকে শনাক্ত করা চলতে পারে। বাঙালি লেখককুলের সাহিত্য-সাধনা কোনো একটি খাত ধরে অগ্রসর হয়নি। শূন্য থেকে শুরু করায় গতিও অনেক পথে বিভাজিত। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের স্পষ্ট ছায়াপাত বাংলা সাহিত্যে উত্থাপিত নৃত্যভাবনাগুলিতে মিশিয়েছে রামধনু রঙ। সাহিত্যে নৃত্যের উত্থান-পতনের ছন্দটিকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেই এই আলোচনা প্রবাহিত।

প্রাচীন কাল থেকেই নৃত্যের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিনোদন। সাহিত্যও সেই সত্যকে স্বীকার করে। ফলে আদিযুগ থেকে আধুনিকে নৃত্যকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্যগুলি দর্শক, যুগরুচি ও বিনোদনের প্রয়োজনকে মর্যাদা দিয়েই রচিত। পাশাপাশি সাহিত্যে স্বল্প পরিসরেও যে সমস্ত নৃত্য ভাবনা উঠে এসেছে সেগুলিও বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে। প্রাচীনতম সাহিত্যকীর্তি ‘চর্যাপদ’-এ সমাজ ও পারিপার্শ্বিকে নৃত্য, বিনোদনের একটি শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। ধর্মীয় আচরণেও নৃত্যের উপস্থিতি। ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য পাঠ করেও বহু সমালোচক এর মধ্যে পালাগান বা পুতুল নাচ সম্পর্কিত গানের হদিশ পেয়েছেন। কাব্যটিতে দৃশ্যের আয়োজন এই প্রমাণকে আরও জোরদার করে তুলেছে। বোঝা যায় ঝুমুরের আসরে এককালে বিনোদনের নিমিত্তই শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য অভিনীত হত। অধ্যাপক সুকুমার সেনের মতে, এটি নাটগীত ফর্মে লেখা। পরিবেশন কালে নাকি পুতুলনাচও প্রদর্শিত হত। যার জন্য তিনি এর শ্রেণিবিচার করতে গিয়ে বলেন, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন হল ‘নাটগীত পাঞ্চালিকা’। ‘পাঞ্চালিকা’ শব্দের অর্থ হল পুতুল। রোমাণ্টিক প্রণয়োপাখ্যান ‘লোরচন্দ্রাণী’ ও ‘পদ্মাবতী’-তে বৈবাহিক নানা অনুষ্ঠানের মধ্যেও পুরনারীগণ ঘরোয়া বিনোদনের মাধ্যম হিসাবে নৃত্যকে উপস্থাপন করেছে। এরকমই ঘরোয়া বিনোদনের ব্যবস্থা লক্ষ করা যায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’ উপন্যাসে। তাঁর ‘গৌড়মল্লার’ উপন্যাসেও গ্রামবাসীরা নিজেরাই নিজেদের আনন্দের জন্য ‘ঝুমুর’ নৃত্য করেছে। তাদের নৃত্যে আছে স্ব-বিনোদন। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ কিংবা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পদসঞ্চার’-এও দেবদাসীদের যে নৃত্য তাও কেবলমাত্র দেবতাদের বিনোদনের নিমিত্তই পরিবেশিত হয়েছে। মহাশ্বেতা দেবীর ‘মধুরে মধুর’ উপন্যাসেও সাধনের ট্রুপ সারাবছর পরিশ্রম করে যে নৃত্যকে আয়ত্ত করেছে তার মধ্যেও রয়েছে বিনোদনের তাগিদ। প্রিয়দর্শিনী ছদ্মনামে রচিত দীপ্তি ত্রিপাঠীর ‘ঊর্ব্বশীর তালভঙ্গ’র মধুশ্রী, সমরেশ মজুমদারের ‘মোহিনী’র আশা রাও প্রত্যেকেই নৃত্যের যে অনুষ্ঠানগুলিতে অংশ নিয়েছে তার প্রধান কারণ হিসাবেই রয়েছে দর্শকের চিত্ত বিনোদন। আলোচিত বিনোদনগুলি সবকটিই সহজ ও স্বাভাবিক বিনোদন। এগুলি ছাড়াও কিছু কিছু রচনায় বিকৃত বিনোদনও পাওয়া যায়। রমাপদ চৌধুরীর ‘লালবাঈ’ উপন্যাসে লালীর কামোত্তেজক মজলিস, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’ উপন্যাসে বসনের উলঙ্গবাহার শাড়ি পরে নাচ কিংবা নিমাই ভট্টাচার্যের ‘নাচনী’ উপন্যাসে কমলার রুমাল ঘুড়িয়ে নাচের সাথে সাথে দারোগা হাকিমের জড়িয়ে ধরাই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

সাহিত্যে নৃত্য থাকবে অথচ অনুশাসন থাকবে না একথা মেনে নেওয়া শক্ত। নৃত্য নির্দিষ্ট কিছু শাস্ত্রের দাসত্ব করে। একদম প্রাথমিক পর্যায় বা ভিত্তি গঠনে এই শাস্ত্রের বিধান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকালে এই অনুশাসন ছিল তীব্র। মঙ্গলকাব্যগুলিকেও সেরকম একটি সামাজিক ছকে ফেলে দেখা যেতে পারে। মঙ্গলকাব্যগুলিতে আমরা দেখি স্বর্গের নর্তকীগণ তালভঙ্গের ফলে অভিশপ্ত হয়ে মর্ত্যে প্রেরিত হয়েছে। একে যদি সামাজিক ছকে ফেলা যায় তাহলে মনে করা যেতে পারে নৃত্যকে তখন কঠিন নিয়মের জালে বদ্ধ করে রাখা হত। যার এতটুকু ত্রুটি-বিচ্যুতিও মেনে নিতেন না তদানীন্তন গুরুকুল কিংবা দর্শকমণ্ডলী। সম্ভবত সমাজ-বহির্ভূত করার মতোই কঠিন দণ্ড পেতে হত অপরাধীকে। তারই ছদ্মরূপ বারংবার উপস্থাপিত হয়েছে মঙ্গলকাব্যগুলিতে। এই অনুশাসনের কথা পাওয়া যায় নাথগীতিকায় গোরক্ষনাথের কথাতেও। সমরেশ মজুমদারের ‘মোহিনী’ উপন্যাসেও শিল্পী আশা রাও কঠোর অনুশাসনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েই একসময় পরিণত হয়েছিলেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পীতে।

সাহিত্য সমকালকে স্বীকার করে রচিত হয়। তাই যুগে যুগে সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয় সাহিত্যে অত্যধিক মাত্রায় অবস্থান করে। এই অবক্ষয়ের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায় জনমানসেও। নৃত্যশিল্পীদের জীবনে এই অবক্ষয়ের প্রভাব খানিকটা গ্রহণের মতো। নৃত্যশিল্পও যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে প্রায়শই অবক্ষয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়ে। কোথাও নিশ্চল হয়ে পড়ে, কোথাওবা খুঁজে নেয় নূতন পথ। যে সমস্ত উপন্যাসগুলিতে নৃত্যভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেই সমস্ত উপন্যাসেই কোনো না কোনো জায়গায় অবক্ষয়ের চিত্র দেখা যায়। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘গৌড়মল্লার’ উপন্যাসে অকর্মণ্য রাজা অগ্নিবর্মা মদের ফোয়ারা ও স্বল্পবসনা নারীদের নাচের মধ্যে দিয়েই বিকৃত যৌনলালসা চরিতার্থ করেছে। এই অবক্ষয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়। এর দ্বারা ক্ষতবিক্ষত হয়েছে জনসমাজ। শচীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জনপদবধূ’ উপন্যাসে দেববধূর মতো পবিত্রতম সম্প্রদায়ও মুনাফালোভীদের শিকার হয়েছে। মিথ্যা পাপের ভয় দেখিয়ে জনসাধারণের শয্যাসঙ্গিনী হতে বাধ্য করা হয়েছে গরীব বাড়ি থেকে তুলে এনে দেববধূতে রূপান্তরিত করা মেয়েগুলিকে। এই অবক্ষয় আসলে সংস্কৃতির অবক্ষয়। রমাপদ চৌধুরীর ‘লালবাঈ’ উপন্যাসে সমগ্র দেশ জুড়ে নিষিদ্ধ হয়েছে সাহিত্য-সঙ্গীত-নৃত্যকলার চর্চা। শিল্পীরা পালিয়ে আত্মরক্ষার পথ খুঁজেছেন। কোথাও যদিবা নৃত্যের মজলিস বসেছে তারও নেপথ্যে কারণ হিসাবে থেকেছে গুপ্ত-খবরের আদান প্রদান। এই উপন্যাসে শাস্ত্রীয় নৃত্যের যে অবক্ষয় আমরা পাই তা আসলে শিল্পের অবক্ষয়। শিল্পের অবক্ষয়ের প্রসঙ্গে আরো দুটি উপন্যাসের কথা বলা যায়। এক, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কবি’। দুই, নিমাই ভট্টাচার্যের ‘নাচনী’। প্রথমটিতে রয়েছে ‘ঝুমুর’ লোকশিল্পটির অবক্ষয় প্রসঙ্গ। পালাগানের আসরে ঝুমুরের যে জনপ্রিয়তা ছিল তা জনরুচির সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে পরিণত হয়েছে বিশ্রী খেমটা নাচে। অশ্লীলতার মোড়ক পরে সে বিসর্জিত হয়েছে ভদ্রসমাজ থেকে। ঝুমুরের নামে অকাতরে চলেছে দেহব্যবসা। এই ঝুমুরেরই আর একটি ক্ষয়িষ্ণু রূপ ‘নাচনী’। এই শিল্পীদের জীবনের অবক্ষয়ের পাশে দাঁড়ায়নি কেউই। এরা একাই লড়েছে তারপর একসময় জীবনযুদ্ধে হেরে গেছে। ‘নাচনী’দের হেরে যাওয়ার জন্য তদানীন্তন সমাজই দায়ী।

অবক্ষয়ের পরেই সাহিত্যে যেটি বড়ো হয়ে দাঁড়ায় তা হল আর্তনাদ। অর্তনাদ অবক্ষয় নয়। আর্তনাদ আসলে হাহাকার। আকাঙ্ক্ষার অপমৃত্যু। বলতে না পারা, দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া চাপা কষ্ট। সামাজিক জটিলতার দুর্ভেদ্য প্রাচীরে কান পেতে কখনো কখনো শোনা যায় এই আর্তনাদ, হাহাকার। মঙ্গলকাব্যের সময় থেকেই কত স্বর্গের অপ্সরা, কিন্নর-কিন্নরীরা দেব-দেবীদের শাপ কবলিত হয়ে নেমে এসেছে মর্ত্যে। তাদের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি মঙ্গলকাব্যগুলির পাতায় পাতায় আজও মূক হয়ে আছে। বিনা দোষে দোষী হয়েও তাদের শাস্তিভোগ করতে হয়েছে আজীবন। শাক্ত পদাবলীতে উপস্থিত নৃত্যভাবনাতে মা কালীর রুদ্র-রূপের সাধনা লক্ষ করা যায়। সেই সময় অত্যাচার, অবিচারে জর্জরিত মানুষ খুঁজছিল মুক্তির পথ। তাই সাধনায় নৃত্যরত মায়ের যে রূপ, তার নেপথ্যেও যেন খুঁজে পাওয়া যায় সর্বহারা বাঙালি জাতির আর্তনাদ। নৃত্যই যেন এখানে চালিত করেছে বিপর্যস্ত বাঙালিকে। আধুনিক যুগেও সেই আর্তনাদ শোনা যায় বিবিধ নারীকণ্ঠে। ‘জনপদবধূ’ উপন্যাসে আপাত অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মেয়েগুলি হাঁপিয়ে উঠেছে পুরুষের মনোরঞ্জন করতে করতে। কিন্তু যাবে কোথায়? কে দেবে তাদের আশ্রয়? এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় তারা যেখানেই যাক না কেন নারীমাংসলোভী পুরুষ জাতি শেয়াল কুকুরের মতোই তাদের ছিঁড়ে খাবে। তাই তাদের যে আর্তনাদ, তা অসহায় বন্দীত্বের। আর্তনাদ শোনা যায় ‘লালবাঈ’ উপন্যাসে লালীর কণ্ঠেও। একটি রাজ্য পরিচালনার ক্ষমতা চেয়েছিল সে, বিষ্ণুপুর রাজাকে এনেছিল হাতের মুঠোয়, সন্তানকে বসাতে চেয়েছিল সিংহাসনে। পাঠক হয়তো লালীর ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করে না। ক্ষমা করেননা লেখকও। তবু যদি লালীর দিক থেকে দেখা হয় তাহলে তার প্রাপ্তি কোথায়? পাওয়ার শূন্য ঘড়া যে বাড়ন্ত। বাঁদি জীবনের অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল লালী, তাকেই যেন জলমগ্ন প্রমোদতরীতে ডুবিয়ে মারা হয়েছে। লালীর মৃত্যু হয়নি, মৃত্যু হয়েছে তার আকাঙ্ক্ষার। মৃত্যু হয়েছে তার স্বপ্নের। বিষ্ণুপুরের লালবাঁধে যে স্বপ্ন পাঠককে শুনিয়েছিলেন লেখক তা আসলে উচ্চাশা নিয়ে জন্মানো একটি মূর্খ মেয়ের আর্তনাদ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসের নায়িকা আনন্দের সরল মনে ভালোবাসা এসেছে সশব্দে, কিন্তু তা বিভক্ত। তাই আনন্দের অবদমিত যৌনতা, আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটেছে অগ্নিকুণ্ডে। এই আত্মাহুতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অব্যক্ত আর্তনাদ। যে ক্রমাগত হেরে গিয়েও জিতে যাওয়ার গল্প বলে চলে। ‘নাচনী’ উপন্যাসে কমলা কোনোদিন জানতেই পারেনি বাস্তব কী? আদরে সোহাগে ভুলে থেকেছে সে। কিন্তু শরীরের রোগ তাকে মানুষ চেনালো। সকল পরিচিত মানুষই পরিত্যাগ করল তাকে। তার আর্তনাদ আসলে সমাজে ফিরে যেতে না পারার বেদনা। সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘রসিক’ উপন্যাসে স্রোতের টানে মৃত নাচনীর ভেসে যাওয়া দেহ যেন সমাজকেই ব্যঙ্গের চোখে দেখে। কমলা কিংবা বসনের যে আর্তনাদ তা আসলে স্বীকৃতি না পাওয়ার। অপরিসীম পরিশ্রম ও প্রচুর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও সমাজবিমুখতা তাদেরকে কুরে কুরে খেয়েছে। এই আর্তনাদ আছে ‘ঊর্বশীর তালভঙ্গ’তেও। মধ্যবিত্ত মেয়ের নৃত্যশিল্পী হওয়ার বাসনাকে সমাজ কীভাবে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করেছে এবং কীভাবে একসময় পারিপার্শ্বিক চাপে মধুশ্রী নাচ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে সেই হাহাকারই যেন উপন্যাসের প্রতিটা ছত্রে ধ্বনিত। উপন্যাসের শেষে জন্মজন্মান্তরে নৃত্যের তালভঙ্গ না হওয়ার যে ব্যাকুল প্রার্থনা রয়েছে, তা আসলে মধুশ্রীরই নারী হৃদয়ের আর্তনাদ।

একজন নৃত্যশিল্পীর জীবন ভাঙাগড়ার দোলাচলতায় প্রবহমান, যাকে বলা চলে বিমিশ্রণ। এই বিমিশ্রণ স্পষ্টত চোখে পড়ে মহাশ্বেতা দেবীর ‘মধুরে মধুর’, দীপ্তি ত্রিপাঠির ‘ঊর্ব্বশীর তালভঙ্গ’ এবং সমরেশ মজুমদারের ‘মোহিনী’ উপন্যাসে। একজন নৃত্যশিল্পীর জীবন, তার উত্থানপতনের মানচিত্র, সামাজিক অবস্থান, তার যশ, খ্যাতি এমনকি অর্থনৈতিক অবস্থাও তুলে ধরেছেন লেখকগণ। ব্যক্তি ও শিল্পী জীবনের দ্বন্দ্ব ঘুরে ফিরে এসেছে উপন্যাসগুলিতে। এই মোড়কটি একেবারে আধুনিক। নব ধারার উপন্যাসে নানা ধরনের নূতন ঘটনার সংযোজন ঘটেছে। যেমন ‘মধুরে মধুর’ উপন্যাসে দেখা যায় নৃত্যশিক্ষা সমাপনান্তে কিছু নৃত্যশিল্পী একত্রিত হয়ে বানিয়েছে ট্রুপ। যেখানে সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি নৃত্যশৈলীর নির্মাতা হয়ে উঠেছে সাধন। ‘ঊর্ব্বশীর তালভঙ্গ’ উপন্যাসে অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার অধিকারী মেয়েটি একদিন শিল্পের কাছে হার মেনে গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে, এই উপন্যাস যেন মধ্যবিত্ত ঘরে নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠার উচ্চাশা নিয়ে বড় হওয়া একটি মেয়ের জীবনের গোপন আত্মকথা। সমাজের চাপে একসময় কীভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যায় একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, তাই যেন দেখিয়েছেন লেখিকা। ‘মোহিনী’ অবশ্য সে তুলনায় স্বতন্ত্র। জীবনের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক অবিচ্ছদ্য কিন্তু তাকে একই রেখায় সমতা বিধান করা এককথায় অসাধ্য। কিন্তু যিনি সামঞ্জস্য বিধান করতে পারেন তিনিই হয়ে ওঠেন প্রকৃত শিল্পী। নৃত্যশিল্পী আশা রাও তার কল্পলোকের জগত থেকে একদিন বাস্তবে নেমে এসে সেই সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। বেঁচে থাকার জন্য খুঁজে পেয়েছেন নূতন আলোর পথ। বিমিশ্রণ লক্ষ করা যায় মধ্যযুগের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যটিতেও। এই কাব্যে উষা তালভঙ্গের অপরাধে মর্ত্যে এসে বেহুলা নাম নিয়ে নৃত্যশিক্ষা করেছে। সেকালে গৃহস্থ মেয়ের গৃহকর্ম নিপুণতার পাশাপাশি কলাশাস্ত্রের দক্ষতাকেও গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হত। সমাজে নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যশিক্ষার্থীর আলাদা মান-সম্মান ছিল। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে বেহুলাকে ‘নাচনী’ বলা হয়েছে। ব্যাঙ্গার্থে নয়, অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে। সেই ‘নাচনী’ই যে বর্তমানে মূলস্রোত হারিয়ে কালের প্রক্ষেপে বারবণিতা রূপ পরিগ্রহ করেছে, স্মৃতি হিসেবে ধরে রেখেছে পূর্বতন নামটুকু সে বিবেচনা অবিবেচকের নয়।

প্রতিটা পতনের মুহূর্ত থেকেই উত্থানের জয়যাত্রার শুভসূচনা ঘটে। তাই অবক্ষয়, আর্তনাদ ও বিমিশ্রণের পাশাপাশি উত্থান নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। উত্থানের কথা বলতে গেলে পতন থেকেই শুরু করতে হয়। নৃত্যের সেই ভগ্নরূপটিই দেখা গিয়েছিল মধ্যযুগের প্রান্তবর্তী সাহিত্য ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। কষ্ট, দুঃখ, লাঞ্ছনা, পেটের দায়, আত্মরক্ষার তাগিদ মানুষকে নৃত্যবিলাসী হতে দেয়নি। রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি মানুষকে এতটাই কোণঠাসা করে দিয়েছিল যে মাথা তোলার কোনো জায়গা তাদের ছিল না। ঘরের মেয়ে-বৌকে সামলাতেই হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিল মধ্যবিত্ত বাঙালি। তাই এই পর্যায়ে এসে যে নাচ পাওয়া গেল তার মধ্যে কেবলই ক্ষুধার হাহাকার। নাচ তো শুধু বোলের ধ্বনিতে হাস্যমুখে পদচারণা নয়! তার প্রতিটা ছন্দে, প্রতিটা লয়ে আছে ভাবের গভীরতা, সমাজের অভিঘাত। তাই হয়তো নৃত্য একসময় তার পারিপার্শ্বিককে স্বীকার করে নিয়েই পা বাড়াল বিলুপ্তির পথে।

কিন্তু মধ্যযুগ শুধুই পতনের চিত্র আঁকেনি। মধ্যযুগের একটি পর্বে নৃত্যের অভূতপূর্ব উত্থান চোখে পড়ে। নৃত্যের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরপ্রাপ্তির বাণী প্রচার করেছিলেন চৈতন্যদেব। সে বাণীই হয়ে উঠেছিল এই শাস্ত্রের গোড়ার কথা। দুই হাত তুলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে, পরম ভাবে ভাবিত হয়ে ঈশ্বরে লীন হয়ে যাওয়া। এই পর্যায়ে নাচ আর নিছক ‘নাচ’ ছিল না। তা হয়ে উঠেছিল সমর্পণের, আত্মনিবেদনের সিঁড়ি, যে সিঁড়িতে পা ফেলাই আসলে ছন্দ। সেই সিঁড়ি ধরে এগিয়ে যাওয়াই হয়ে উঠেছিল প্রকৃত নাচ। চৈতন্য জীবনীসাহিত্য প্রণেতারাও এই নৃত্যকে সসম্ভ্রমে স্থান দিয়েছিলেন সাহিত্যের পৃষ্ঠায়। নৃত্যই হয়ে উঠেছিল এই আন্দোলনের সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা। বাংলার হারিয়ে যাওয়া একমাত্র শাস্ত্রীয় নৃত্য রীতি ‘গৌড়ীয়’ এই সময় থেকেই পুনর্জীবন লাভ করে। এই নৃত্য খ্রিষ্টীয় দুই শতকে ‘ওড্র-মাগধী’ নামে দক্ষিণে তাম্রলিপ্ত থেকে উত্তরে মালদহের পৌণ্ড্রবর্ধন, এবং পশিমে মল্লভূমি থেকে পূর্বে পূর্ববঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সত্য শ্রীমতী মহুয়া মুখোপাধ্যায় তাঁর সুগভীর গবেষণায় উত্থাপন করেছেন।

উল্লেখ্য বিষয় এই যে, উপন্যাসে স্বল্প পরিসরে নৃত্য-ভাবনা উপস্থিত থেকেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটি হয়ে উঠেছে উপন্যাসের নিয়ামক। ‘নাচনী’ উপন্যাসের নামকরণ নাচনী হলেও লেখক খুবই স্বল্প পরিসরে কমলা নাচনীর কথা বলেছেন, কিন্তু তার জীবন-যন্ত্রণার ইতিহাস এতটাই বেদনাদায়ক যে অন্য সকল চরিত্রকে অতি সহজেই ছাপিয়ে গেছে সে। ‘কবি’ উপন্যাসে ঠাকুরঝিও হয়ে উঠতে পারত উপন্যাসের নিয়ামক। কিন্তু তার জীবনে কোনো জটিলতা নেই। সরল জীবনে একসময় প্রেমের বহ্নিতে ঝাঁপ দিয়েছে সে, লড়াই করার ক্ষমতা যে প্রেমিকার নেই ইতিহাস সেই হতভাগিনীকে স্মরণে রাখেনি কোনোদিনই, তাই নিঃশব্দে সরে যেতে হয়েছে ঠাকুরঝিকে আর তার সবটুকু জায়গা দখল করেছে ঝুমুর দলের বসন। নৃত্যশিল্পীর জীবনের দগদগে ঘা-এর ওপর বসন যেন ছিটিয়ে দিয়েছে নুন মরীচ। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়ে গেছে সে। নৃত্যশিল্পী হিসেবে সে যেমন থেকেছে সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তেমনি জীবনেও সে সকলকে হারিয়ে দিয়েছে। ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাসে সামাজিক জটিল আবর্তে আটকে পড়েছে হেরম্ব। তার একদিকে সুপ্রিয়া অন্যদিকে আনন্দ। উভয়কেই উপেক্ষা করতে পারে না সে। তবু একসময় আনন্দর অকৃত্রিম সরলতার কাছে হার মেনেছে হেরম্ব। আনন্দের নৃত্যে মনোরঞ্জন নেই। আছে দহন। সেই আত্মাহূতির দহনেই সুপ্রিয়াকে অতিক্রম করে গেছে সে।
অষ্টাদশ শতকে বেনিয়াতন্ত্রের উদ্ভব এবং তোষামোদকারীদের ব্যক্তিত্বহীনতা সাহিত্য ও সমাজকে আরও বেশি করে কর্দমাক্ত করেছিল। সংস্কৃতির বিপর্যয় লগ্নে ভাষা-সাহিত্য-রুচি সবটাই লুপ্ত হয়ে কেবল অশ্লীলতাসর্বস্ব হয়ে উঠেছিল। কবিগান হয়ে উঠেছিল খিস্তি খেউড়ের আশ্রয়। ঝুমুর নাচের আসরে প্রকৃতপক্ষে অশ্লীল খেমটা নাচা হত। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা হয়ে উঠেছিল দুরূহ ব্যাপার। সমাজে উদ্ভূত হয়েছিল নূতন এক বাবু শ্রেণি, যারা ইংরেজদের খিদমৎ খাটত ও দুই হাতে দেদার টাকা ওড়াত। তাদের রুচিও ছিল অত্যন্ত মোটা দাগের। ফলে মদের ফোয়ারা ও বাঈ নাচের বিপুল আয়োজন বসত নগর কলকাতার পাড়ায় পাড়ায়। এসব ছিল ‘হুজুগ’। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ কিংবা প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এই সংস্কৃতিরই দুটি প্রামাণ্য দলিল। বাঙালির হৃদয়ে যে সঙ্গীতের সুর-লহরী-তান, তাকে কি দীর্ঘদিন অনাস্বাদিত করে রাখা যায়! ফলে সমাজে যখনই ক্ষীণ শিক্ষার আলো প্রবেশ করল তখন থেকেই খোঁজ পড়ল অতীত গৌরবের। সমাজ তখনও বহু পিছনে। দীর্ঘদিনের কুসংস্কারের অভ্যাসে মৃতপ্রায়। সেই সমাজে মেয়েদের পড়াশোনা নাকি বৈধব্যযোগের একমাত্র কারণ। তাই সেখানে নৃত্য-সঙ্গীত পড়ে রইল শতহস্ত দূরে।

তর্জা গান ও নাচের কুশ্রীতা ঘুচিয়ে দিতে প্রথম এগিয়ে এলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ। নাটক মঞ্চসফল করে তোলার প্রয়োজনেই নৃত্যকে ব্যবহার করার প্রয়াস করেছিলেন তিনি। এরপর যে মানুষটি এগিয়ে এলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ। এই সময় থেকেই নৃত্যের উত্থানের শুভ সূচনা ঘটল। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড কবিকে স্তব্ধ করেছিল। তিনি অনুভব করেছিলেন বিশ্বশান্তি স্থাপনের জন্য একটা সর্বজনবোধ্য ভাষার প্রয়োজন। তাই দীর্ঘদিনের একক প্রচেষ্টায় তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে লুকিয়ে থাকা শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলিকে খুঁজে বের করে নিয়ে এলেন। বিশ্বভারতীতে নৃত্যচর্চার যে দ্বারোদঘাটন করলেন রবীন্দ্রনাথ তাতে বঙ্গীয় সংস্কৃতিতে প্রবল ঝড় উঠল। সমগ্র বাঙালি জাতি, সমাজ তোলপাড় করে হৃত সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধারের আনন্দে মেতে উঠল। রবীন্দ্রনাথও অকুণ্ঠ চিত্তে নির্বাসিত নৃত্যের পুনর্বাসনে ঘুরে বেড়ালেন দেশ থেকে বিদেশে। সংগ্রহ করে আনলেন নানা ধরনের নৃত্য পদ্ধতি। কোথাও নিজে শিখলেন আবার কোথাও শিখিয়ে নিলেন অনুসারীদের দিয়ে। রবীন্দ্র-নৃত্যের গোড়াপত্তন হল শান্তিনিকেতনে। শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলি পঠন-পাঠনের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি পেল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঐশ্বরিক চেতনার আদর্শে নৃত্যের আদিরূপ, ব্রম্ভাণ্ডের প্রথম আদিশক্তির হদিশ পেলেন। সৃষ্টির রহস্যকে উন্মোচিত করতে গিয়ে দেখলেন জগতের সবটুকুতেই অপার আনন্দের মূর্ছনা তরঙ্গায়িত। সবটুকুতেই নৃত্য। জীবনের ছন্দটাই আসলে নাচের ছন্দ। সেখানে নটরাজের রূপে তিনি পেলেন তাঁর ঈশ্বরকে। দেখলেন ষড়ঋতুর খেলায় কেমন করে যুগ যুগ ধরে বিশ্বপ্রকৃতি নেচে চলেছে। আপামর বাঙালি জাতিকে বিশ্বকবি অনুসন্ধান করতে শেখালেন সৃষ্টিলীলার এই রূপটিকেই। নৃত্য খুঁজে পেল তার প্রাণবায়ু। নৃত্যের বহু বাঁকের ভিতর এই একটি বাঁক ‘রবীন্দ্র নৃত্য’। বঙ্গের নৃত্য বিবর্তনের ইতিহাসে স্তম্ভ স্বরূপ। নৃত্যের শুচিতা পুনরুদ্ধারের পর নৃত্য আবার সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত হল। নৃত্যকলা ও সংস্কৃতির প্রাচীন রূপটিকে আবিষ্কার করতে উৎসাহী হয়ে উঠলেন লেখকশ্রেণি।

ভারতবর্ষে ইংরেজ আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংস্কৃতিও বেশকিছু এদেশীয়রা রপ্ত করে ফেলেছিল। তার পিছনে অবশ্য বড় একটি কারণ ছিল— নাগরিক সভ্যতায় টিকে থাকার লড়াই। নিজেকে সমমর্যাদাসম্পন্ন প্রমাণ করার আপ্রাণ প্রয়াস। বাঙালি উচ্চবিত্ত শ্রেণি নিজেকে স্যোসালিস্ট ও আধুনিক প্রমাণের নিমিত্ত যাবতীয় বিদেশি কালচারকেই গলাধঃকরণ করেছিল নির্নিমেষে। তার মধ্যে অন্যতম একটি হোটেল কালচার। শাস্ত্রীয় নৃত্যের যে-ধারা উপন্যাসে স্থান পেয়েছে তারই একদম সমান্তরালে বয়ে যাচ্ছিল বিদেশি নৃত্যের ধারা। সেই ধারাকেই উপন্যাসে স্থান দিলেন শংকর। লিখলেন জনপ্রিয় উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’। মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে আপাত অধরা একটি শ্রেণি অকস্মাৎ ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে খুব কাছে চলে এল বাঙালির। রক এন্ড রোল, চা চা চা, ক্যান ক্যান প্রভৃতি বিদেশি নৃত্যের পাশাপাশি হোটেলের ব্যাঙ্কোয়েটে নাচা ক্যাবারে ডান্সারদের একটা অন্য ধরনের জীবন উপস্থাপিত করলেন লেখক।

উপন্যাসের গল্পগাথালোকের বাইরে বেরিয়ে কলকাতার লোক বিস্ময়ীভূত হল যখন প্রকাশিত হল ‘সন্ধ্যা রাতের শেফালি’। শুনতে যেন গল্পেরই মতো তবু গল্প নয়। একটা জীবন। একটা জীবনী। প্রথম বাঙালি ক্যাবারে ক্যুইন মিস শেফালি ওরফে পুব বাংলার ছিন্নমূল উদ্বাস্তু মেয়ে, পেটের দায়ে হোটেলে নাচতে আসা আরতি দাসের জীবন কাহিনি। ক্যাবারে সংস্কৃতিকে শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায় লিপিবদ্ধ করেছেন আরতি দাসেরই জবানিতে। তাই এই রচনার প্রতিটা বর্ণ অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। এটি উপন্যাস না হলেও বাংলা সাহিত্যে নৃত্য-ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বাদ দেওয়া যায় না এই নৃত্যশিল্পীকে। কারণ তিনি শুধু ক্যাবারে ডান্সারই ছিলেন না, সেই সময়ের নাটকে ক্যাবারে সংস্কৃতি প্রদর্শনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগ ছিল তাঁর। আর নাটক তো বাংলা সাহিত্যেরই একটি শাখা।

বাংলা সাহিত্যের সুবিস্তৃত পরিসরে অনেকগুলি ক্ষেত্র আছে। সময়ের স্বল্পতায় সব দিকগুলিকে স্পর্শ করার সুযোগ অপ্রতুল। আদিযুগ থেকেই লেখকদের নৃত্যপ্রিয়তা কাব্যে নাটকে নৃত্যের ভাবনাকে উপস্থাপিত করেছে। যুগরুচি পরিবর্তনের সাথে সাথে কখনো সে বর্ণনা হয়েছে সম্মানজনক আবার কখনও থেকেছে চরম অবহেলিত। বারবার নানা জাতির অপ্রতিরোধ্য আক্রমণে একসময় সংস্কৃতি জট পাকিয়ে মুখ লুকিয়েছে, তাই সেই পর্যায়ে সাহিত্যে নৃত্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিসর নেই বললেই চলে। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের স্পর্শে রাহুমুক্তি ঘটেছে নৃত্যের। তিনি ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে, বহু যুগ থেকে চলে আসা নৃত্যের বিবিধ শৈলীকে আত্মস্থ করেছেন ও নবরূপে তাদের নির্মাণ করেছেন। সে যেন ‘প্রাণ পেয়েছে পান করে যুগ যুগান্তরের স্তন্য’। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি নৃত্যকে। এর উচ্চাঙ্গী সুর সাহিত্যে উপস্থিত হয়েছে পুনর্বার। তবে এবার বাস্তবতার আলোকে। স্বাভাবিকভাবেই বারবার ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এসেছে সামাজিক শোষণ-শাসন ও চোখ-রাঙানিতে জর্জরিত নৃত্যশিল্প। উঠে এসেছে সেই নৃত্যগুলি যেগুলি সভ্যতার অগ্রগতির বাঁকে ধুঁকতে ধুঁকতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে। সেই শূন্যস্থানগুলি পূরণ করতেই সমাজে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে এককালে প্রায় বিলুপ্তির পথে অগ্রসর হওয়া শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলি। কিন্তু ভারতবর্ষ যুগে যুগে ভিন্ন ভাষারুচির দ্বারা আকৃষ্ট। নিজেকে যেমন অকুণ্ঠ চিত্তে বিলিয়ে দিয়েছে তেমনি দুহাত ভরে আত্মস্থও করেছে নতুনত্বকে। ফলে এবার শাস্ত্রীয় নৃত্যের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আরো নানা ধরনের নাচ। ভারতীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্য আরও বেশি মাত্রায় ফুলে ফেঁপে উঠেছে।

আধুনিক যুগে সাহিত্য নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হলেও সম্ভবত নৃত্যের প্রতি একটা চির ঔদাসীন্য কাজ করেছে, তাই সাহিত্যে নৃত্যের উপস্থিতি খুবই সংক্ষিপ্ত। আধুনিক কালে নৃত্যশিল্পীদের জীবনের উত্থান-পতন নিয়ে যে উপন্যাসগুলি লেখা হয়েছে তা অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু সুবিশাল সাহিত্যরাজির এককোণে সেগুলির স্বল্পতা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। ফলে বর্তমানে নৃত্য ও সাহিত্যের মতো দুটি সমৃদ্ধিশালী শাখার যদি পুনরায় মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব হয় তবে তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আকর্ষক হয়ে উঠবে। মানুষের জীবন সমাজের সঙ্গে এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক নিবিড় জৈব যোগে বিজড়িত। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কয়েক শতাব্দীর বিপথগামিতায় মানুষ সৃষ্টির সেই ছন্দ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে অনেকটাই। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে বিশ্বের এই ছন্দরূপ প্রকাশিত এবং বিকশিত। নৃত্যের, বলা যায়—বিশ্বরূপকে, তিনি শুধু নৃত্য প্রসঙ্গেই নয় (‘নৃত্যের তালে তালে’ প্রভৃতি গানে যেমন) মানুষের জীবনে এবং ইতিহাসের মধ্যেও দেখেছেন বিস্তৃত হতে। (‘আকাশে দুই হাতে প্রেম বিলায় ও-কে’ অথবা ‘মেঘ বলেছে যাব যাব, রাত বলেছে যাই’ প্রভৃতি গানে যেমন)। অনাগত দিনে যখন সৃষ্টির সেই সহজ ছন্দ, সহজ সুরকে আরও ভালো করে আত্মস্থ করতে পারা যাবে, অন্তত কিছুটা তাঁরই মতো, তাহলে নৃত্য ও সাহিত্যের বিকাশের পথটি প্রশস্ত হয়ে উঠবে। এর প্রয়াস দিকে দিকে শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই। অচিরেই জীবন এবং সাহিত্যে নৃত্য তার প্রাপ্য অধিকার আবার ফিরে পাবে এই বিশ্বাসেই সমাপ্তি টানা যাক।



ঋণস্বীকার:

1. গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়, ভারতের নৃত্যকলা, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, প্রথম করুণা সংস্করণ ২০০২।
2. সুকুমার সেন, নট নাট্য নাটক, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, ১৯৭২।
3. মঞ্জুলিকা রায়চৌধুরী, নৃত্যে ভারত, ডি. এম. লাইব্রেরী, কলিকাতা, ১৯৯৩।
4. মহুয়া মুখোপাধ্যায়, ধ্রুপদী নৃত্যের গৌড়ীয় জন্মসূত্র, দেশ পত্রিকা, সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরী, এবিপি লিমিটেডের পক্ষে বিজিত বসু কর্তৃক প্রকাশিত, কলিকাতা, ৬ই মার্চ, ১৯৯৯।
5. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, ১৪০০ বঙ্গাব্দ।
6. প্যারীচাঁদ মিত্র, আলালের ঘরের দুলাল, ড.খগেন্দ্রনাথ মাইতি সম্পাদিত, করুণা প্রকাশনী, কলিকাতা, ১৪১৩ বঙ্গাব্দ।
7. সটীক হুতোম প্যাঁচার নকশা, অরুণ নাগ সম্পাদিত, আনন্দ পাবলিশার্স, কলিকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৯৮ বঙ্গাব্দ।
8. শান্তিদেব ঘোষ, ‘গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক ভারতীয় নৃত্য’, আনন্দ, কলিকাতা, ১৩৯০ বঙ্গাব্দ।
9. পদসঞ্চার, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় রচনাবলী, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলিকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ।
10. শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, জনপদবধূ, ত্রিবেণী প্রকাশন, কলিকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৩৬৫ বঙ্গাব্দ।
11. শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু অমনিবাস, তৃতীয় খণ্ড, আনন্দ, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ।
12. রমাপদ চৌধুরী, লালবাঈ, আনন্দ পাবলিশার্স, কলিকাতা, প্রথম সংস্করণ ১৯৯৭।
13. তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, তেত্রিশ মুদ্রণ ১৪২৩ বঙ্গাব্দ।
14. সুব্রত মুখোপাধ্যায়, রসিক, আনন্দ পাবলিশার্স লিমিটেড, কলকাতা, ১৯৯১।
15. নিমাই ভট্টাচার্য, নাচনী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮১ বঙ্গাব্দ।
16. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, চিরায়ত প্রকাশন, কলিকাতা, প্রথম চিরায়ত সংস্করণ ১৯৯৭।
17. মহাশ্বেতা দেবী রচনা সমগ্র-মহাশ্বেতা দেবী, দ্বিতীয় খণ্ড, সম্পাদনা অজয় গুপ্ত, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ২০০১।
18. প্রিয়দর্শিনী, ঊর্ব্বশীর তালভঙ্গ, নাভানা, কলকাতা, ১৯৬২।
19. মোহিনী-সমরেশ মজুমদার, সম্পা. সাগরময় ঘোষ, দেশ, বিনোদন সংখ্যা, ১৩৯৪ বঙ্গাব্দ।
20. শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা রাতের শেফালি, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ ২০১৪।
21. শংকর, চৌরঙ্গী, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, প্রথম বাক সংস্করণ ১৯৬২।


লেখক

নুনম মুখোপাধ্যায়
গবেষক, কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়


 

error: Content is protected !!