রোহিতগিরির চিঠি

এখন এই শহরে ক্রমশ আশ্বিনের রাত হলো। একটা দিবাস্বপ্নের আয়োজন। একই লাইট জ্বালিয়ে নিভিয়ে শেষ দোকানঘর বন্ধের শব্দ হচ্ছে আবার। স্থির হয়ে থাকা ফুটওভার ব্রীজ থেকে নেমে আসে মানুষের অন্বেষণ। আর এই শহর থেকে তীব্রভাবে চলে যাচ্ছি একই স্টেশন বরাবর। কোথাও টিলার মতন পাহাড়ি শীতের সকাল হবে। সেখানে বিচিত্র জীবন থেকে তুলে আনবো সুবর্ণ শীত। কুয়াশা।

একটা শাদা বুড়ী ব্লাউজ ছাড়া শাড়িতে বেশ টিকে থাকে একই শীতে। আমি তার কাছে বাঁশি বাজানো শিখছি। নতুন কোন ক্যাম্পাসের মসজিদ পার হলেই শুরু হয় পাহাড়ি গ্রাম। গ্রামের ভিতর গুল্মপাহাড়ি ফলে ওঠে। সেখানে প্রত্যেকদিন খুব ভোর হয়ে নেমে আসে ধীর সকাল। আমি হেঁটে যাই। খুব উঁচুতে ফুটে থাকে লাল লাল জবাফুল। বুড়ির বাড়ি। আমি রোজ বৃদ্ধার ফুলবন আর হলুদের বাগান পরিচর্যা করি। বাঁশি বাজানোর মতন নিজের গলাকে তৈরি করি তীব্র কল্কিতে।

বৃদ্ধা কখনোই খুব কথা বলেনি। অসংখ্য চায়ের কাপ অসমাপ্ত রেখে শুধু কথাগুলো শুনে যায়। তিনি জ্বলন্ত লাভা থেকে তীব্রতা এনে আমাকে দেখায় সুর। আমাকে একটি বাঁশি ধরিয়ে দিয়ে কান্নাকে সুর দিয়েছেন সুফি সাধনায়। আর শীতার্ত বৃষ্টির চা বানাতে বানাতে একবার শুধু গম্ভীর হয়ে বললো নারী প্রেম থেকেই জন্মায় এইসব স্রষ্টার অনুভূতি।

বৃদ্ধা নিশ্চয় জানে দূরবর্তী কোন গ্রামের ভিতর তুই এখনো স্বপ্নে দৌঁড়াতে পারিস।

তুই কোন একফসলী গ্রাম ফেলে আদিম বিহার। তোর নদীতে কোন জোয়ার ভাটা নেই। শহরের সমস্ত বসতি বৃত্তান্তে তোর রয়েছে নিজস্ব নাম। যেখানে নীরবতার সিন্ধু আর বিকেলবেলা দেখার বিবরণ দেয়া যেতে পারে। বিহারের দেয়াল ছুঁয়ে মনে পড়ে আরো সব ক্রান্তিকাল। আমি এই জীবন থেকে ফলে পালিয়ে যেতে পারি না বিষণ্ণতার কাফনে।

ভার্সিটির হলগুলো কেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দেখা শৈশবের ভার্সিটি এবং তোর প্রিয় অস্তিত্ব। আমি বন্ধুহীন স্বজন আর বিদায়ী ছায়া নিয়ে অন্যমনস্ক তাকিয়ে থাকি। নিজের ক্যাম্পাসে তবুও আর সব পরিচিত রিক্সার শরীর ভুলে থাকা যায় না।

আমি খুব চাই একদিন তুই আসবি। যেমন আসে ধূমকেতু। তোর সাথে তারপর অনেকদিন পর দেখা। যেমন দেখা হয় অনেকদিন পর আকাশে। তার মধ্যে অনেক বৃষ্টি থেমে গেছে। আশ্বিন শীত। কাঁচা হলুদ বিকেলে বাদামী পাতার মৃত্যুর ভিতর তোর পায়ের শব্দ হবে। যেন সেই শব্দ হয়েছে বাঁশির কাছে। তখন আমি আগমনী যাপন বলে যাচ্ছি রুদ্রজটায়। অসংখ্য নাম। অনেক কোলাহল দিনগুলো। মাঠের ভিতর। বনের ভিতর। তুই তোকে না ভেবে ক্রমশ বিহার ভ্রমণ চোখে পিচ্ছিল। যেন পোষা বন থেকে তুলে আনছিস শাদা শাদা খরগোশ। আমরা তখন আবার একই ইয়ারফোন শেয়ার করে গান শুনছি। আর নির্দিষ্ট স্থাপত্যের ভিতর কৈশোর থেকে সরাসরি ফুরিয়ে যাচ্ছি।

কখনো প্রথম পূর্ণিমায় পাহাড়ে বসে একান্ত কেউ সমস্ত গল্প শুনে যাচ্ছে। আমি ভাবছি। অনেকেই যেমন নিঃসঙ্গ গ্রহ ভালোবেসে যায় একা একা। অনেকেই। আর তারপর একা একা রুমের দিকে হেঁটে যায় এমন। খণ্ড খণ্ড ভাষাহীনতায় একটা জবাগাছ শুধু সাক্ষী হয়ে নীরব থাকে। আমি একা একা বাঁশি বাজাবো। আর ভাববো বৃদ্ধার শাদা শাড়ি। আর আমাদের মূল দূরত্ব। আর বিগত আকাশ দিনের আলোতে পৃথিবী কতোটাই বা নীল। নীলের আভা নীলচে হতে হতে কতোটাই রক্তিম লাল।

পৃথিবীতে অনেক অনেকদিন এভাবে চলবে সূফিনৃত্য। অবশবোধ নেমে আসবে আরাধনার ভিতর। আরো আরাধনা ঘনিয়ে আসবে। শরীর থেকে চিকন ঘাম শুকিয়ে যাবে তিত্তির বাতাসে। আমি কৃষক হতে না পেরে রাখাল হয়ে যাবো আরো। কিছু কিছু জবাফুল উড়ে যাবে তারার দিকে। কিছু কিছু পাখির কাছে থেকে যাবে শিকার হবার আরো মাহাত্ম। শিশুর অভিমান থেকে জন্ম নিবে আরো আরো পাহাড়। ভার্সিটি। আরো আরো ম্লান চাহনি থেকে যাবে পাহাড়ের দিকে। আরো আরো আশ্বিন। তুই। আরো আরো বৃদ্ধার দেয়া বাঁশি। আর সব গ্রাম। এই শহর।


লেখক:

আশিকুর রহমান


 

error: Content is protected !!