শেকড়ের টানে

‘শুভ সন্ধ্যা!

আজকের এই শুভদিনে – বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের এই আয়োজনে আপনাদের পাশে পেয়ে আমি সত্যি আপ্লুত। আপনাদের ভালোবাসার উষ্ণতায় আমি ধন্য।

বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই আজকের এই বই “শেকড়ের টানে” আর “ইন সার্চ অফ দ্যা রুটস” আমার প্রথম কাজ। কোভিডের সঙ্গে বইটির খুব ঘন যোগ আছে বলে সকল কোভিড আক্রান্তদের ও কোভিডে যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের উৎসর্গ করছি এই বইটি। আমার ডাক্তার বাবা মা এখানে আসতে পারলে আমার আরও ভালোলাগতো। ওদেরও খুব ভালো লাগতো। আমার মা ও বাবার লেখা ডায়েরি থেকেই আমি সংকলন করেছি এই বইগুলোর বেশিরভাগ লেখা। আমার বাঙালি‐বাবা তার শেকড়ের টানের কথা যেভাবে বলেছেন আর আমার আমেরিকান‐মা তার নিজের সংসারের শেকড়কে যেভাবে জেনেছেন আর ভালবেসেছেন তার কথাই আছে এই বইটিতে। তাই আমি বেশ কিছুদিন আগেই ঠিক করেছিলাম করোনাকালের পর লকডাউন উঠে গেলেই প্রথমবার বিমান পরিষেবা আবার শুরু হলে আমি ওই শেকড়েই ফিরে যাবো। তাই এই বইগুলোর এখানেই মোড়ক উন্মোচন।’

কথাগুলো বলে শুভ একবার চশমাটা খুলে নেবার বিরতি নেয় তারপর আবার মুছে নেওয়া চশমাটা চোখে তুলে নিজেই ঘোষণা দেয় –

‘এই বইটির মোড়ক উন্মোচনের জন্য আমি মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাই আজকের প্রধান অতিথি শ্রী শঙ্খশুভ্র চৌধুরী ও শ্রীমতি অনিন্দিতা চৌধুরীকে’।
এতবড় খুশির জন্য প্রস্তুত না থাকায় বড় বেশিরকম অপ্রস্তুত হয়ে যান চৌধুরীদম্পতি। তবুও ভাসিয়ে নেওয়া খুশির জোয়ারে কোনমতে উঠে দাঁড়ান আর ততক্ষণে শুভ আর সঙ্গে অনুষ্ঠানের আরো কয়েকজন কর্মকর্তারা ছুটে এসে ধরে ধরে নিয়ে যায় ওঁদের মঞ্চের দিকে। চোখ বেয়ে পড়া জলকে শঙ্খশুভ্র পোশাকি অহংকারে আড়াল করে নিলেও অনিন্দিতার চোখের জল মনের দাগকে স্পষ্ট করে যাচ্ছে দুগালে। তেইশ বছরের শুভ নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করার দায়ে আজ যেন ভুলেছে বয়স আর তাই চেহারায় বয়সের চেয়ে অনেকগুণ বেশি গাম্ভীর্য্। মাঝে মাঝে চশমাটা খুলে একটু অন্যমনস্ক হলেও আবার সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসছে এই সান্ধ্য অনুষ্ঠানের ঘনত্বে।

অনিন্দিতা তাকিয়ে দেখছে গতবছর জন্মদিনে ছেলেকে পাঠানো কুর্তাটায় শুভকে ঠিক ওর বাবার মতোই লাগছে কখনো আবার ঠিক ওর দাদাইয়ের মতোই লাগছে। শুভটার বিদেশেই জন্ম, বড় হওয়া সবকিছুই তবু এতো সুন্দর বাঙালি আদব কায়দা আচার শেখা! বাংলাটাও এতো সুন্দর বলে! অনিন্দিতা আজ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না বলে বারবার আত্মসমর্পণ গাল বেয়ে আর বুক বেয়ে পড়া জলের কাছে।

ফেরার পথে অনিন্দিতা এটা ওটা বলে নতুন নতুন প্রসঙ্গ তুলছিলেন কিন্তু শুভর অনেকবেশি ফোন আসতে লাগলো। আন্দাজ করা গেল এই কদিন ওর ঠাসা প্রোগ্রাম। তাই গাড়িতে আর পারিবারিক উষ্ণতার তেমন কথাবার্তা হল না।
পরদিনই খুব ভোরে দিল্লি যেতে হবে বইগুলো নিয়ে দিল্লি ইউনিভার্সিটি‐আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় যোগ দিতে। তাই খাবার টেবিলে খুব বেশি কথা হলো না। ঠাম্মির বাড়তি আন্তরিকতা আর স্নেহের পাশে দাদাইয়ের নীরব আদর শুধু অনুভব করছিলো শুভ কিন্তু তিনজনেই লুকোচুরি খেলছিল বলে বেশিরভাগটুকু সময়ই নীরবতার শীতলতা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিলো উষ্ণ খাবার টেবিলকে।

ঘরে এসে তাড়াহুড়োয় ছোট সুটকেসটা গুছিয়ে একটা বইয়ে দাদাইয়ের নাম আর অন্যটিতে ঠাম্মির নাম বাংলায় গোটা গোটা করে লিখে নেয় শুভ। তারপর মাঝরাতে ওদের ঘরে চুপিচুপি এসে টেবিলে বইগুলো রেখে পায়ে হাত ছুঁইয়েই পালিয়ে যায়।

মাঝরাতেই পালিয়ে যায় এয়ারপোর্টের দিকে। আসলে পালিয়ে যায় এক বাবা‐মায়ের কাছ থেকে যাঁদের ও এখনো জানাতে পারেনি যে মানুষকে সুস্থ করে তুলতে তুলতে কেউ কেউ নিজেরাই প্রাণটুকুও হারিয়েছে এই কোভিডে। প্রতিদিন যারা দিন গুণে ছেলে আর বৌমার মুখ দেখবে বলে শুভ তাঁদের এমন নিষ্ঠুর সত্যিটা জানাবে কী করে! অনেকদিন পর শুভ হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে চৌধুরীবাড়ির পুরোনো এম্বাসেডারেই । রাস্তার নীরবতা ধুয়ে ধুয়ে নরম ভোর জেগে ওঠে আকাশে।


লেখক

সুমনা রায়


error: Content is protected !!