সম্পর্ক এক অমীমাংসিত ধাঁধাঁ

– ‘তোমার শরীরে অনেক তাপ। না, এভাবে বসে থাকলে তো চলবে না, বয়স সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক, আর শরীর তার চেয়েও বেশী, এই যে জন্মের পর থেকে যাকে খাইয়ে পরিয়ে অতি যত্নে বড় করে তুলছো, সে তোমাকে না জানিয়েই তোমাকে বিদায় জানিয়ে দেবে। আজকেই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।’ চৌধুরী মাজহার স্ত্রীর কপালে হাত রেখে হাতের তালুকেই অবিশ্বাস করা আরম্ভ করলেন। এই পর্যন্ত জয়নবকে অসুখে পড়তে দেখেন নি, শংকার মেঘ তালু ছুঁয়ে হাত বেয়ে মস্তিষ্ক পর্যন্ত চলে গিয়ে কাঁপিয়ে দিলো ভাবনার কেন্দ্রকে।
– ‘না না, জ্বর কোথায় দেখলে তুমি? এই একটু খারাপ লাগছে। ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আজ এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরলে যে, তোমার না আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো, মিটিং শেষ?’ কথা কথা বলতেই হাঁপিয়ে উঠলেন জয়নব, কিন্তু তিনি কিছুতেই তার এই ক্লান্তি স্বামীর কাছে প্রকাশ করেত চান না। মানুষটা এমনিতেই অনেক ঝামেলার মধ্যে থাকে, তাঁকে এইসব ছোটখাটো বিষয়ে জড়াতে দিতে চান না জয়নব।
– ‘তুমি বললেই তো হবে না রাকিনের মা। তোমাকে খুব ভালো করেই চিনি, তুমি কিছুতেই নিজের অসুস্থতার কথা কাউকে বলতে চাও না, এটা তোমার বদ অভ্যাস। তুমি রেডি হও,আমি হাসপাতালে ফোন দিয়ে দেখি, এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় কিনা।’

‘এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় কিনা’- কথাটা শুনে শরীর খারাপের মধ্যেও হাসে জয়নব। একবার যখন উচ্চারণ করেছে হাসপাতালের কথা, ডাক্তার দেখাবার কথা তখন চৌধুরী সাহেব এটা করেই ছাড়বে, এটা তার অভ্যাস।
জ্বর যে নেই তা না, আছে, ঘুসঘুসে জ্বর, যেন মাঘ মাসের সন্ধ্যা ভর করেছে জয়নবের শরীরে, প্রথম প্রথম কয়েকদিন শরীরটা ম্যাজম্যাজ করত, পরের দিকে দুই পায়ে হালকা ব্যথা অনুভূত হতো। এই ব্যথার কথা স্বামী আর ছেলের কাছে গোপন রেখেছেন জয়নব। কারণ তিনি ভালো করেই জানেন তার এই অসুস্থতার কথা শোনা মাত্রই ছেলে-বাবা দুইজনেই অস্থির হয়ে পড়বে।

– ‘তোমাকে কে বলল আমার শরীর খারাপ?’ জয়নব তার শরীর খারাপের ব্যাপারটা গোপন রাখতে পারে না কিছুতেই, শরীর কখনও কখনও কোন কিছুই গোপন রাখতে দেয় না।
– ‘কে বলবে আবার? তোমার চেহারার অবস্থা দেখেছো? রাকিন তোমার সাথে স্কাইপে কথা বলেছে গতকাল। ছেলেও লক্ষ্য করেছে তোমার এই অবস্থা।’ নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বাক্য দুইটা উচ্চারণ করলো চৌধুরী সাহেব।
– ও, ছেলে বলেছে বলেই বুঝি চোখে পড়ল।’ স্বভাব বিরুদ্ধ প্রগলভতায় মেতে উঠতে চাইলো জয়নব। মাঝেমাঝে সেই পুরোনো দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনতে খুব ইচ্ছা করে জয়নবের। সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে তাদের, জয়নবের শ্বশুর ছিলেন এমন একজন মানুষ- যাঁর দৃষ্টি কোন কিছুকেই ফাঁকি দিতে পারতো না। ছেলে নতুন বিয়ে করেছে, ছেলের নতুন বউয়ের কোন ধরনের যেন ত্রুটি না হয় সেই জন্য তিনি নিজে বারবার জিজ্ঞেস করতেন। শ্বশুর তো নয়, যেন নতুন বাবাই পেয়েছিলো জয়নব। চৌধুরী মাজহার খানের সাথে বিয়ে হয়ে আসবার সময় তার বয়স আর কতই বা ছিলো। উনিশ বিশ হবে। দু:খ কি তা চৌধুরী সাহেব তাকে বুঝতেই দেন নি। পিতামাতার একমাত্র সন্তান মাজহার। বাবার ব্যাবসার হাল তিনি ভালোভাবেই ধরেছিলেন। জয়নবের শশুরের ছিলো তেলের ব্যবসা, সেখান থেকে মাজহার খান ব্যবসাকে টেনে তুলেছেন আকাশে। চৌধুরী গ্রুপ অব কোম্পানীজ এর একছত্র মালিক তিনি।
– ‘ডাঃ আজিজুল হকের এপয়েন্টমেন্ট ম্যানেজ করা গেছে। তুমি রেডি হও। আমি হাসমতকে গাড়ী বের করতে বলছি।’ এই বলেই দ্রুত ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন মাযহার খান, পেছনে পড়ে থাকলো এক বিশ্বস্ত সঙ্গীর ছায়া, মাঝে মাঝে জয়নবের খুব মায়া হয় এই মানুষটার জন্য, ছায়াটার জন্যও।

লিফট দিয়ে নামার সময়ও জয়নবের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে মানুষটা, যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে ফেলবে তাকে। কিন্তু চাইলেই সবকিছুকে ধরে রাখা যায়? জয়নব ভাবে কিছু মানুষ ক্যানো এতো ভালো হয়। স্ত্রী হিসেবে সে তার স্বামীর যোগ্য কিনা বলতে পারবে না, তবে চেষ্টার কোন ত্রুটি সে রাখেনি। জয়নবের সাধ্যে যতটুকু কুলিয়েছে সে এই সংসারের জন্য তাই করে গেছে। স্বামী হিসেবে এই মানুষটার চাইতে আর ভালো কিছুই চাইত না সে। এর চেয়ে ভালো আর কী কিছু আছে? জয়নবের চোখে অশ্রু এসে জমা হয়, জয়নব তা লুকাতে সচেষ্ট হয়ে ওঠেন।

অ্যাপোলো হাসপাতালের গেটে ঢুকতেই পেসেন্টকেয়ার এটেন্ডেন্টরা ছুটে আসে, সাথে থাকে একটা হুইলচেয়ার, রোগী হবার আগেই তারা মানুষকে রোগী বানিয়ে দিতে চায় নাকি? জয়নব গাড়ী থেকে নেমে হেঁটেই লিফট পর্যন্ত যেতে চেয়েছিল, কিন্তু চৌধুরী সাহেব চোখের ইশারায় নিষেধ করলেন, তাই অগত্যা হুইলচেয়ারেই নিজেকে সঁপে দিলো জয়নব। মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ আজিজুল হক অনেকক্ষণ সময় নিয়ে দেখলেন জয়নবকে। চেম্বারের বেডে শুইয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করলেন, খুবই আন্তরিক মানুষ তিনি, সব ডাক্তাররা যদি এমন হতো! প্রেসক্রিপশন লিখলেন, সেটা প্রিন্ট করে চৌধুরী সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন,
– ‘চৌধুরী সাহেব, পরীক্ষাগুলো আজকেই করানো প্রয়োজন। আমি আছি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত।’
– ‘ডাঃ সাহেব, এনি থিং সিরিয়াস?’ নিজের দুঃশ্চিন্তাকে আড়াল করেই কথাগুলো বললেন মাজহার খান।
– ‘না, ইনভেস্টিগেশানগুলো হোক আগে, রিপোর্টগুলো দেখি। কী মিসেস চৌধুরী, ভয় পাচ্ছেন? কোন চিন্তা করবেন না।’ জয়নবের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চৌধুরী সাহেবের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বললেন ডাঃ আজিজুল, জয়নব বুঝে গেলো আসলে যা ভয়, যা চিন্তা, তা ডাক্তার সাহেব নিজেই করছেন।

এই রোগী রোগী ভাবটা ভালো লাগছে না জয়নবের। আবার হুইলচেয়ার, পেছন থেকে সেটাই সুদক্ষ কারিগরের মত করে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে পনের ষোলো বছরের এক মেয়ে, নিম্ন আয়ের মানুষগুলো কত দরদ দিয়েই না নিজের কাজটা করে। সবাই যদি যার যার কাজটা এভাবে করত! ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলেন জয়নব,
– ‘ম্যাডাম, সাবিহা, আমার নাম সাবিহা, ম্যাডাম।’ মেয়েটির চেহারা দেখে বোঝা গেলো এমন আন্তরিক কণ্ঠে কেউ তার নাম জিজ্ঞেস করবে এমনটি সে মোটেও প্রত্যাশা করে নি। মানুষ কত অল্পতেই খুশী হয় তাই না।
– কতদিন থেকে এখানে চাকুরী করো? আজ জয়বনবের কথা বলার খুব ইচ্ছা করছে। এমনটা সাধারণত হয় না, সে চুপচাপ থাকতেই পছন্দ করে।
– সাত মাস ম্যাডাম। ম্যাডাম আপনি এখানে বসুন আপনার সিরিয়াল আসলে আপনাকে ডেকে নেবে ওরা। এর ফাঁকে আমি আরেকজন রোগীকে নিয়ে আসি। আপনার কিছু হবে না ম্যাডাম, আপনি ভয় পাবেন না। হাসি পাচ্ছে জয়নবের। এরা ভয় ভয় করছে ক্যানো? ভয় পারাব কী আছে? প্রথমে ডাক্তার সাহেব পরে মেয়েটি- জয়নব নিজেকে দেখে নেবার চেষ্টা করে।

ব্লাড স্যাম্পল কালেকশনের জন্য নিদৃষ্ট আসনে বসলে জয়নবের দুই হাতের কনুইয়ের ভাঁজের উপরের দিকটা খুব ভালো ভাবে টিপে দেখল ছেলেটি, বিড়বিড় করে কী সব বলল, ছেলেটি যা বলছে সম্ভবত সে নিজেই ঠিক মতো শুনেছে কিনা তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ জয়নবের।
– ‘ম্যাম একটু বসবেন? প্লিজ।’ এই কথা বলে হালকা নীল রঙা শার্ট পরা ছেলেটি তার চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। মাথার উপর দাঁড়িয়ে চৌধুরী সাহেব।
– ‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কী করো? যাও ঐখানে গিয়ে বসো। সেই কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে। যাও তো ওখানে অই চেয়ারে বসো। রাকিন ফোন করেছিলো?’ স্বামীর দিকে তাকিয়ে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলার পর জয়নব বুঝতে পারে এভাবে টানা কথা বলতে গিয়ে একটু কাহিল হয়ে পড়ছে সে।
– ‘ম্যাম দেখি আপনার ডান হাতটা দেখি।’ সেই ছেলেটি আর বসেনি তার নিদৃষ্ট চেয়ারে, সেখানে বসেছে আরেকজন, মনে হলো আগের ছেলেটির সিনিয়র, স্যাম্পল কালেকশন করতে গিয়ে এরা কী কোন সমস্যায় পড়লো?
– ‘আপনার ভেইন খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সমস্যা নেই, পাওয়া যাবে, হ্যাঁ, এইতো, ম্যাম একটু ব্যথা লাগবে, প্লিজ’ এই বলে ছেলেটি জয়নবের ডান হাতের উপরের দিকে একটা চ্যাপটা ফিতা দিয়ে বেঁধে ফেলল, হালকা ঘিয়া রঙের গ্লাভস পরে লিকুইড মাখানো ছোট টিস্যুর মতো জিনিস দিয়ে তার ডান হাতের কুনই এর ভাঁজের জায়গাটা বার কয়েক মুছে নিলো, এরপর খুব সাবধানে সর্বচ্চো সতর্কতার সাথে একটা নিডিল প্রিক করল। নিডিলের মাথায় ছোট একটা স্যালাইনের পাইপ, তার মাথায় বড় সিরিঞ্জের মত কী একটা লাগানো, সেটার ভেতর একটা করে টেস্ট টিউব ঢুকালেই রক্ত গিয়ে টেস্ট টিউবটা ভরিয়ে ফেলছে। এভাবে চারটা টেস্টটিউবে রক্ত নেয়া হলে তার হাতের বাঁধন খুলে দিলো ছেলেটি, একটা ব্যান্ড এইড লাগিয়ে দিলো জায়গাটায়। জয়নব খেয়াল করল, এখনো তার মাথার উপর উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে স্বামী।
– ‘চলো, ফুড কোর্টে যাই, ওখানে বসি কিছুক্ষণ, আর্জেন্ট ফি পে করা হয়েছে, ঘণ্টা খানেকের ভেতর রিপোর্টগুলো পাওয়া যাবে।’ শাদা পাঞ্জাবী পরা একষট্টি বছরের মানুষটাকে আরও বেশি ফ্যাকাশে লাগছে, স্বামীর এমন চেহারা দেখে অভ্যস্থ নয় জয়নব, আজ সবার বেশি বেশি ভয় পাওয়া দেখে জয়নবের হাসি পাচ্ছে। যে মানুষটা সারাজীবন সব সমস্যা বা বিপদ হাসি মুখে সামলেছে তাঁকে ভয় পেতে দেখে একটু মায়াও লাগছে, মায়া খুব খারাপ জিনিস।
– ‘ম্যাডাম, ব্লাড দেয়া শেষ!’ কোথায় ছিলো মেয়েটি! হ্যাঁ, সাবিহাই তো বলল নাম, হুইল চেয়ার নিয়ে হাজির।
– ‘না, সাবিহা, হুইল চেয়ার লাগবে না’ মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল জয়নব, মনে হলো তার মন একটু খারাপ হয়েছে।
– ‘আচ্ছা চলো’ বলেই হুইল চেয়ারে বসে পড়ল জয়নব, সামান্য কারণে একজনের মন খারাপ করানো ঠিক না। মানুষের মন ভালো করানো কঠিন, আবার কারো মন খারাপ করিয়ে দেয়াও এক ধরণের অন্যায়।
সাবিহা লিফট পর্যন্ত হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে গ্যালো। লিফটের বাটন স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। লিফট আসা মাত্র হুইলচেয়ারসহ জয়নবকে লিফটের ভেতর উঠালো সাবিহা। জয়নব চৌধুরী সাহেবকে ইশারা করতেই চৌধুরী সাহেব পকেট থেকে দুইটা একশ টাকার নোট বের করে জয়নবের হাতে দিলো।
– ‘এই নাও সাবিহা’ মূল্যবান কিছু হস্তান্তর করলে যে গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন, ঠিক সেই ভঙ্গিতে টাকাটা সাবিহার হাতে দিতে চাইলো জয়নব।
– ‘না ম্যাম, এটা আমার ডিউটি।’ কথাগুলো বলার মধ্যে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের ছাপ পাওয়ায় জয়নব জোরাজুরি করল না, কেউ যদি তার সামান্যতম সক্ষমতা দিয়ে আত্মসম্মানের সাথে বাঁচতে চাই তাহলে সেটাকে বিঘ্নিত করার কোন ইচ্ছা জয়নবের নেই।

হুইলচেয়ারটাকে ফুডকোর্টের সাইডের দিকের একটা টেবিলের কাছাকাছি রেখে সাবিহা যাবার অনুমতি চাইলো। জয়নব আর চৌধুরী সাহেব পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলো, কেউ কাউকে কিছু না বলেই।
– ‘মা, এখন কেমন লাগছে তোমার? ব্লাড দেয়া শেষ, রিপোর্ট তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। তুমি আর বাবা দুইজনে মিলে বসো, চা-কফি খাও।’ স্কাইপ কলে ছেলের অস্থির চেহারা জয়নবকে আরও অস্থির করে তুলতে চাইলেও নিজেকে সামলে নেন জয়নব।
– ‘এই তোরা বাপ ছেলে মিলে কী আরম্ভ করেছিস বলত? আর চেহারার কী ছিরি করেছিস? মায়ের সামান্য জ্বর হয়েছে এই শুনেই যদি এই অবস্থা হয় তবে… যা ঘুমাতে যা, এখন তো ওখানে গভীর রাত। শরীর খারাপ করবে বাবা। ঘুম থেকে উঠে ফোন দিস। আর তোর বাবা তো আছেই।’
রিপোর্ট দেখলেন ডাঃ আজিজুর। অভিজ্ঞ ডাক্তার, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা লাগে না, কিন্তু যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েই দেখলেন।
– ‘ডাঃ চক্রবর্তী আর ইউ ইন চেম্বার? ওকে, ওকে, আই অ্যাম কলিং ইউ ব্যাক।’

শেষ বারো মিনিট রিহার্সাল ছাড়াই এক নাটকের মঞ্চায়ন দেখছে জয়নব, ডাঃ আজিজ খুব ভাল অভিনয় করছেন, চৌধুরী সাহেব কখনও দর্শক কখনও না বুঝেই পার্শ্বচরিত্রে ঢুকে পড়ছে। ডাঃ আজিজের চরিত্র পড়ার চেষ্টা করলেন জয়নব, না, সম্ভব হলো না। একজন ভালো চিকিৎসকের ভালো গুনের মধ্যে সম্ভবত এটাও পড়ে। কোন পরিস্থিতিতেই নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করবেন না- যাতে রোগী তার চিকিৎসকের কাছে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারেন। জয়নব ভাবে তার কী খুব খারাপ কিছু হলো? ভাবে আর হাসে, কোনটা কার জন্য ভালো আর কোনটা খারাপ এটা আসলে সময় সবচেয়ে ভাল জানে। ডাঃ আজিজের সামনে রাখা ডেস্কটপের মনিটরে দেখা রিপোর্টগুলোয় কী এমন দেখা যাচ্ছে, যা দেখে এমন অভিনয় করে যাচ্ছেন ডাঃ আজিজ।
– ‘মিসেস চৌধুরী, আপনাকে ডাঃ চক্রবর্তী’র কাছে পাঠাচ্ছি, আপনার রিপোর্টগুলো উনাকে একটু দেখানো প্রয়োজন। মিস্টার চৌধুরী আমি ডাঃ চক্রবর্তীকে কল করে দিয়েছি, হি ইজ ইন হিজ চেম্বার। প্লিজ একটু দেখিয়ে আসুন।’ জয়নবের সমস্ত মনোযোগ আছড়ে পড়ল স্বামীর দিকে।
– ক্যা-নো-ডাঃ-আ-জি-জ? এনি প্রবলেম?’ হতচকিত হয়ে চৌধুরী সাহেব কথাগুলোক একপ্রকারে প্রায় ছুঁড়েই মারলেন ডাঃ আজিজের দিকে।
– আচ্ছা আসুন, আমিও যাচ্ছি। মিসেস চৌধুরী আপনি এখানেই বসুন, প্লিজ।

হেমাটোঅনকোলোজিষ্ট ডাঃ চক্রবর্তী আরো কিছু পরীক্ষা করিয়ে দুঃসংবাদটা জানালেন চৌধুরী মাজহারকে। মাজহার খান কিছুতেই বিশ্বাস করতে চান নি। কিন্তু তার বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে তো আর পৃথিবীর সব কিছু চলবে না। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে ফোন দিলেন তিনি, চৌধুরী সাহেব জয়নবকে সিংগাপুর নিয়ে যাবেন। দ্রুত সব ব্যবস্থাও হয়ে যায়। তাদের একমাত্র ছেলে রাকিন কানাডা থেকে আসছে। ছেলে এলেই জয়নবকে নিয়ে তিনি সিংগাপুরের উদ্দেশ্যে উড়াল দেবেন।

এই পর্যন্ত পৃথিবীর কোন কিছুই যেমন মানুষের ইচ্ছায় ঘটেনি, এবারও ঘটল না- দ্রুত জয়নবের শরীরটা আরো খারাপ হল। হাসপাতালে এডমিট করা হলো জয়নবকে। গতকাল রাতেই রাকিন এসেছে। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে আইসিইউ তে ট্রান্সফার করা হলো। লাইফ সাপোর্টে দেবার প্রয়োজন দেখা দিলে জয়নব কিছুতেই রাজী হন না। কিন্তু ছেলে এবং চৌধুরী মাজহার এসবের কিছুই শোনে না। জয়নবকে লাইফসাপোর্টে দেয়া হয়।

সময় কাউকেই ছাড়ে না। সাবেরা জয়নব খানও বুঝে গেছেন জীবনের অন্তিম ছায়া তাকে খুব দ্রুত গিলে খেতে যাচ্ছে, সমস্ত স্মৃতি আবছা অন্ধকারে হয়ে তার আশপাশ ঘিরে ফেলছে। আই সি ইউ -এর বিছানায় শুয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছেন কিন্তু শব্দেরা গতি পাচ্ছে না, মুখ থুবড়ে পড়ছে ভোকাল কর্ডের সীমানার মধ্যেই। রাকিন সাবেরা জয়নব খানের নাড়িছেঁড়া ধন। একমাত্র সন্তান। আইসিইউ এর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে মাকে বোঝার চেষ্টা করছে, তার মুখ পড়ার চেষ্টা করছে। মার জ্ঞান নেই বললেই চলে বিড়বিড় করে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু কোন কথা বলতে পারছে না।

জয়নবের বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন চৌধুরী মাজহার খান, তার চোখ ছলছল। দীর্ঘ প্রায় বত্রিশ বছরের সঙ্গী আজ তাকে ছেড়ে চলে যেতে বসেছে। কিছুই কি করার নেই? একিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া উইথ ব্লাস্ট ক্রাইসিস কী নিরাময় অযোগ্য ক্যান্সার? সিংগাপুর নিলে পারলেই বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার একটা সম্ভাবনা ছিলো, কিন্তু অবস্থা এত দ্রুত খারাপ হয়ে গেলো? সিংগাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে রিসেন্ট যে কেস স্যামারীটা পাঠানো হয়েছে সেটা দেখে ওরা বলেছে এই অবস্থায় ট্রান্সফার করলে এয়ারএম্বুলেন্সেই রোগী মারা যেতে পারেন। তাই তারা এই অবস্থায় রোগী ট্রান্সফার না করার পরামর্শ দিয়েছে। এখানকার চিকিৎসকরাও একই কথা বলেছেন। এতো টাকা পয়সা থাকার পরও মানুষ নিয়তির কাছে কতো অসহায়। চৌধুরী মাজহার চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না।

মনিটরে কিছু লাল নীল দাগে মায়ের জীবন দোল খাচ্ছে। বিছানার পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে রাকিন, বাবাকে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যেতে বলে। মায়ের আশপাশ থেকে সিস্টার আর ডিউটি ডাক্তারকেও একটু দূরে থাকার অনুরোধ করে। মা কথা বলতে পারছেন না, কিন্তু কিছু বলতে চান, কথাগুলো বলে যেতে না পারলে মা মরেও শান্তি পাবেন না, মার আত্মা শান্তি পাবে কি না তা উপরওয়ালাই জানেন,তাঁর ইচ্ছার কাছেই বন্দী মানুষ। শক্ত করে মায়ের হাত ধরে বসে থাকে রাকিন।
– ‘তুমি আমার মা, এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু নেই। তুমি আমাকে নয় মাস পেটে রেখে তিল তিল করে বড় করে তুলেছো, নিজ শরীর থেকে একটু একটু করে পুষ্টি দিয়ে আমার অপ্রস্তুত হৃৎপিণ্ডকে পথ দেখিয়েছো, আমার শরীরের হাড়মাংসগুলোকে তুমিই একটু একটু করে সরবরাহ করেছো রক্তকণিকা, আর আমার চোখ দুটাকে আলোর বিরুদ্ধে খেলার মতো করে উপযোগী করে তুলেছো তুমিই, মা আমি সৃষ্টিকর্তাকে দেখিনি, তোমাকে দেখেছি, তুমিই কী সৃষ্টিকর্তার রূপ ধরে আমার কাছে আসোনি?’ মায়ের মুখের দিকে না তাকিয়ে কথাগুলো বলতে থাকে রাকিন। সে অবাক হয়ে যায়, কীভাবে কোন শক্তিবলে এমন কঠিন কথাগুলো সে মাকে বলতে পারছে।
– ‘বিয়ের আট বছর পরও তোমাদের কোন সন্তান হয় নি। তোমার শরীরে আমার অস্তিত্বের জানান দেবার খবরে বাবাই সবচেয়ে বেশী আনন্দিত হয়েছিলেন, বাবা তোমাকে খুশি দেখতে চেয়েছিলেন। দাদা আরো বেশী খুশী হয়েছিলেন, তার বংশের উত্তরাধিকার আসার খবরে। মা, তুমি আমাকে কিছু চূড়ান্ত সত্যকথা বলতে চাইছো তো? কথাগুলো আমি জানি মা। তুমি বাবাকে পাগলের মতো ভালবাস, কিছুতেই এই পরিবারটাকে অখুশী দেখতে চাওনি তুমি, দাদা তোমার শ্বশুর ছিলেন না- ছিলেন পিতা। তোমার প্রতি আমার কোন ঘৃণাবোধ তৈরি হয়নি কখনোই। আর মানুষ তো নিজেকেই সর্বাপেক্ষা বেশী ভালোবাসে, তুমিও বেসেছো, তাতে দোষ কি মা? পৃথিবীতে কোন অবস্থাতেই কোন মা কোন দোষ করতে পারেন না, তুমিও কোন করোনি। আমি তখন অনেক ছোট, ছোটকাকার ডায়েরীটা আমার হাতে পড়েছিলো, কাকার ঘরটাই তো আমার খেলার ঘর ছিলো, আমি পুড়িয়ে ফেলেছিলাম ডায়েরীটা। আমার জন্মের মাস তিনেক আগে সুস্থ সবল ছোট কাকার হঠাৎ মৃত্যু হয়, তোমার কাছেই শোনা, রাতের খাবার খেয়ে ঘুম গিয়ে তার সেই ঘুম আর কখনওই ভাঙেনি, মা, তুমি হয়ত জানতে কাকার ঘুম কেন ভাঙেনি। চিন্তা করো না মা, আমি বাবার সন্তান হয়েই থাকবো।

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে রাকিন, চোখ বন্ধ রেখে মায়ের দিকে না তাকিয়েই বলে চূড়ান্ত সত্য কথাগুলো, হয়ত এই অন্তিম সময়ে মা এ কথাগুলোই বলে যেতে চান রাকিনকে।

– ‘মিস্টার রাকিন, আপনি আমাদের দূরে থাকতে বলেছিলেন বলে আমরা কেউ আপনার মায়ের বিছানার কাছে আসিনি, আর ‘ডু নট রিসাসিটেট’ ফর্মে সাইন করে রেখেছিলেন আপনারা, আপনার কথা শুনে যাবার সময় আপনার মা’র হয়নি, আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছেন তিনি, উই আর সরি, কর্তব্যরত চিকিৎসক বললেন কথাগুলো।

আই সি ইউ-তে কেবিনের বাইরে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা চৌধুরী মাজহার এসে রাকিনের মাথায় নিজের একটা হাত রাখেন। রাকিনের ডান হাতে মায়ের হাত আর বাঁ হাত দিয়ে সে আঁকড়ে ধরে রাখে বাবা চৌধুরী মাজহার খানের হাত।

আসলে সংসারধর্মে সম্পর্ক এক অমীমাংসিত ধাঁধাঁ…


লেখক

আশরাফ জুয়েল
কথাসাহিত্যিক


error: Content is protected !!