হাটকুরা

মাদ্রাসার মাঠে একটা সাদা প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে দেখে সাইদুর মনে মনে বলল, ‘এমপি সায়েব আসিছে! যাই, এক লজর দেখে আসি’।

একটু এগিয়ে গিয়ে মাঠের এক কোণে সে তার ভ্যানগাড়িটা দাঁড় করিয়ে রেখে দেখতে পেল বটগাছের নিচে একটা হাতলওয়ালা চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে বাতাস খাচ্ছে এক অচেনা ভদ্রলোক। তার সামনে একটু দূরে মাঠের ঘাসে বসে গল্পগুজব করছে এ গ্রামেরই কয়েকজন লোক।

‘এডা ত এমপি সায়েব লয়। তালে কে হবার পারে?’ বিড়বিড় করে বলল সাইদুর, এবং ঘাড়ের উপর গরম নিশ্বাসের সঙ্গে শুনতে পেল, ‘ডাক্তার’। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, প্রতিবেশী আজিমুদ্দি, ‘রূপনগরের মজিবর ডাক্তার। এমবিবিএস ডাক্তার হে, চিনিস না?’

রূপনগরের বিখ্যাত ডাক্তার মজিবর রহমানকে সাইদুর চেনে না, কিন্তু আজিমুদ্দি চেনে; এ জন্য আজিমুদ্দির এমন ভাব যেন সে বোঝাতে চায় সাইদুর একটা মূর্খ। সেটা বুঝতে পেরে সাইদুর নিজের জানাশোনার ঘাটতিটা স্বীকার করে নিল; কোন তর্কে না গিয়ে বলল, ‘তা ব্যাপার কী? চক্ষুশিবির হোবে নাকি?’

সাইদুর এর আগে একবার দেখেছে, রূপনগরে এক স্কুলের মাঠে চক্ষুশিবির বসেছিল, অনেক মানুষ বিনা খরচে চোখের ছানি কাটানোর সুযোগ পেয়েছিল। তার এই প্রশ্নের কারণ সেই অভিজ্ঞতা: এবার তাদের গ্রামেও চক্ষুশিবির বসবে নাকি।

কিন্তু আজিমুদ্দি বলল, ‘খালি এক চক্ষুশিবির ছাড়া ত জীবনে আর কেছু দেখিসনি। ডাইবেটিক সুমিতির সভা হোবে। ডাক্তার সায়েব কবে, কী কী কারণে মানুষের ডাইবেটিক হয়। ডাইবেটিক কী রোগ জানিস? বহুমূত্র, বহুমূত্র। এই রোগ হলে মানুষ খালি মোতে, খালি মোতে’।
সাইদুর হেসে বলল, ‘তাই নাকি? তালে ডাইবেটিক সুমিতির সভাত্ তোর কাম কী? তুই আসিছু কিসক? তোরও কি ডাইবেটিক হোছে নাকি?’
‘না না, দেরি আছে! মরদ দিনে একবার মোতে’।
‘তুই সারাদিনে মাত্র একবার মুতিস? এডা তোর কী ব্যারাম! যা যা, ডাক্তারক্ পুছ কর’।
‘দেরি আছে, দেরি আছে! মরদ তিন ছলের বাপ। তোর মতন হাটকুরা লয়’।

আজিমুদ্দির কথায় সাইদুর বড়ই দুঃখ পেল, কিন্তু প্রতিবাদ করল না। এরকম হয়। তার বউয়ের যে বাচ্চাকাচ্চা হয় না, এ জন্য গাঁয়ের লোকজন সুযোগ পেলেই আটকুরা বলে খোঁটা মারে। কিন্তু সে প্রতিবাদ করে না; ভাবে তাতে লজ্জা আরও বেড়ে যায়। বাপ হতে না পারা এমন এক অপরাধ যার জন্য লোকে পেটাতে চাইলেও প্রতিবাদ করা চলে না।

সাইদুর আর আজিমুদ্দির দিকে তাকাল না। হনহন করে হেঁটে গিয়ে ভ্যানগাড়ির সিটে বসল। কিন্তু প্যাডেলে চাপ দেওয়ার আগে হঠাৎ থেমে গেল। তারপর নেমে দোনামনা পায়ে এগিয়ে গেল বটগাছের ছায়ায় বসা ডাক্তারের কাছে। ভদ্রলোক আকাশমুখে চেয়ে পাখিদের বটফল ঠোকরানো দেখছেন। সাইদুর তার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফিস ফিস করে বলল, ‘ডাক্তার সায়েব, সালামালেকম’। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ তার ডাক্তারের কাছে আসা এবং প্রশ্ন করা লক্ষ করেছে কি না; কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে কি না। না, কেউ তাকিয়ে নেই, তার প্রতিবেশীরা ঘাসের গালিচায় বসে তুমুল গল্পগুজবে মেতে উঠেছে।

ডাক্তার সাহেব ঘাড় ফিরিয়ে চেয়ে সাইদুরের সালামের জবাব দিলেন। সাইদুর তাঁর ঘাড়ের পেছন থেকে মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে সামনে ঝুঁকে প্রায় ফিস ফিস করে বলল, ‘ডাক্তার সায়েব, হামার একখান সমস্যা’।

ওর চোর-চোর ভঙ্গিটা দেখে ডাক্তার সাহেবের হাসি পেল; তিনি নিশ্চিত ধরে নিলেন, লোকটা তাঁর কাছে এসেছে যৌন সমস্যা নিয়ে: নিশ্চয়ই তার পুরুষাঙ্গ কাজ করে না। তিনি কৌতূহল বোধ করলেন: সে তার সমস্যাটার কথা ডাক্তারের সামনে কী ভাষায় তুলে ধরবে। তিনি সাইদুরের মুখের দিকে চেয়ে নিচু স্বরে বললেন, ‘কী সমস্যা?’
সাইদুর আগের মতোই ফিস ফিস করে বলে, ‘হামার পরিবারের ছলপল হয় না’।
‘ও।’
‘কী করা যায়, ডাক্তার সায়েব?’
‘বিয়া করিছ কত বছর হয়?’
‘পাঁচ বছর ত হোবেই।’
‘তোমার বউয়ের শরীর-স্বাস্থ্য ভালো?’
‘হয়, ডাক্তার সায়েব। এক্কিবারে ভালো মানুষ, শরীলত বলশক্তি কম না। কাজকাম করে, হালাক হয় না।’
‘তোমাদের দুই জনকেই দেখতে হবে।’
‘দেখেন ডাক্তার সায়েব। হামি তাক ডাকে লিয়ে আসব?’
‘এখানে নয়। তুমি তোমার বউকে নিয়ে রূপনগরে আমার ডিসপেন্সারিতে আসো।’
‘অনেক ট্যাকা লাগবে?’
‘কিছু তো লাগবে।’
‘কত ট্যাকা লাগবে, ডাক্তার সায়েব?’
‘ডিসপেনসারিতে আসো একদিন, তখন বলব।’
‘এখন বলা যায় না, কত আন্দাজ লাগবার পারে?’
‘প্রথমে হাজার খানেক টাকা নিয়ে আসো।’
‘এক হাজার ট্যাকা? অত ট্যাকা ত হামার নাই, ডাক্তার সায়েব।’
‘আচ্ছা আসো তো একদিন, তখন দ্যাখা যাবে।’


সপ্তাহখানেক পর একদিন সাইদুর তার বউ মোমেনাকে সঙ্গে নিয়ে রূপনগর মজিবর ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে যায়। ডাক্তার তাদের দুজনকে কিছু কথা জিজ্ঞাসা করার পর বলেন, দুজনকেই রাজশাহী গিয়ে কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। তিনি রাজশাহীর একজন ডাক্তারের নাম লিখে দিয়ে বলেন, তাঁর কাছে গেলেই তিনি সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে দেবেন। পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আবার মজিবর ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তখন তিনি বলবেন সমস্যা কার, সাইদুরের না মোমেনার, নাকি দুজনেরই। তারপর যে চিকিৎসার দরকার হবে তিনি তা করবেন।

সাইদুর তাঁর কাছে জানতে যায় দুজনে রাজশাহী গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে কত টাকা খরচ হবে। ডাক্তার সায়েব তাকে হাজার পাঁচেক টাকা নিয়ে যেতে বলেন; তা শুনে সাইদুরের মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার দশা হয়। কারণ অত টাকা তার নাই। ভ্যানগাড়ি চালিয়ে তিন বেলা খেয়ে কোন রকমে দিন গুজরান করা যায়; পাঁচ হাজার কেন, এক হাজার টাকাও জমানো সম্ভব নয়। তা ছাড়া টাকা খরচ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হয়তো দেখা গেল সাইদুরের বীর্যে গন্ডগোল, তাহলে কী লাভ হবে? চিকিৎসা? খালি পরীক্ষা পেছনেই পাঁচ হাজার টাকা খরচ হলে চিকিৎসা নিশ্চয়ই লাখ টাকার ব্যাপার। অতএব হবে না। ‘হবার লয়। আল্লাতালা কপালে ছলপল লেখেনি!’
সাইদুর অতএব তার বউকে বলে, ‘ব্যাটাবেটি না হলে তোর যুদি এক্কিবারে না-ই চলে, তালে যা, আর এডা লিকা বস্’।
মোমেনা ফোঁস করে ওঠে: ‘ইয়ার্কি-তামশা ভাল্লাগে না কয়া দিনু!’
‘কে তামশা করল রে মাগি?’ সাইদুর বসা থেকে উঠে নিজের পাছার নিচের পিঁড়িটা তুলে এক ঘা বসিয়ে দেয় মোমেনার পিঠে। মোমেনার দম বন্ধ হয়ে আসে, সে পিঠ বাঁকিয়ে দৌড় দেয় মণ্ডলবাড়ির দিকে। সেখানে সে দুবেলা রান্নাবান্না করে, হাড়িপাতিল ঘষামাজা করে, ঘর-বারান্দা-উঠান ঝাঁট দেয়, কাপড়চোপড় ধোয়, আরও নানা কাজকর্ম করে। বিনিময়ে সকালে পান্তা আর দুপুরে ও রাতে গরম ভাত খেতে পায়।

মোমেনার পিঠে সাইদুরের পিঁড়ির বাড়িতে ফটাস করে যে শব্দ হয়, তা পৌঁছে যায় সাইদুরের অন্ধ মায়ের তীক্ষ্ণ। ফলে বুড়ি চিৎকার করে ছেলেকে গালি দিতে শুরু করে : ‘ক্যা রে হাটকুরা, বউডাক্ এত মারিস ক্যান তুই? কী মরণ-বিকার হোছে তোর?’

জন্মদাত্রী মা-জননীও তাকে আটকুড়া বলে! সাইদুর পিঁড়িটা উঁচিয়ে মায়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে ওঠে: ‘চুপ কর বুড়ি! এক্কি বাড়ি দিয়ে মাথা ফ্যাটে ফালামু!’


মালেকের বউ মরেছে তিন বছর। কিন্তু সে আর শাদি করেনি। সে বলে বেড়ায়, শাদি আর করবে না। কারণ তার মরা বউ প্রতি রাতে তার কাছে আসে। গ্রামের লোকেরা তার কথা শুনে হাসে; কারণ তারা জানে এসব মিথ্যা কথা। কিন্তু তারা বিশ্বাস করে যে সে তার বউটাকে ভালোবাসত। তারা বলে, লোক খারাপ নয় মালেক। ভোলাভালা মানুষ, কারও সাতেপাঁচে নাই। জমি-জিরাত নাই, কাজকর্মও তেমন করে না। কিন্তু একেবারেই কোন কাজ না করে তো কেউ বেঁচে থাকতে পারে না। মালেককে গেরস্থদের বাড়ি বাড়ি খাটতে হয়। কিন্তু নিয়মিত খাটে না। একদিন খাটে তো তিন দিন শুয়ে-বসে কাটায়। অনাহারে থাকার ব্যাপারে সে বিখ্যাত। কেউ কেউ তাকে দেখলেই টিটকারির সুরে জিজ্ঞাসা করে, কবে শেষ বারের মতো তার পেটে দানা-পানি পড়েছে: ‘মালেক, শ্যাষ ভাত খাছু কী বারে?’ মালেক সত্য জবাবই দেয়; দিনটা রোববার হলে সে হয়তো বলে, ‘শুক্করবারে’। আর যদি ওই দিনই কোথাও কিছু জুটে থাকে, তাহলে হেসে বলে, ‘অ্যাক্ষনি খানু, ভাই’।

লোকেরা জানে মালেক পারতপক্ষে মিথ্যা বলে না। তাই তারা তার এই কথাটা বিশ্বাস করে যে সে আর শাদি-টাদি করবে না। তার স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কেও তাদের কোন খারাপ ধারণা নাই। তবু, মালেক নিজে যদি কোনদিন খেয়ালের বশে বা যৌবনের তাগিদে শাদি করতে চায়ও, মেয়ে পাবে না। কারণ কামাই-রোজগারে তার বেজায় অনীহা; তার মতো চালচুলাহীন অকর্মা লোককে কেউই মেয়ে দেবে না। কোন মেয়েও নিজে থেকে তাকে শাদি করতে রাজি হবে না।

কিন্তু কখন কী ঘটে যায় মানুষ তা বলতে পারে না। তা না হলে স্বামীর হাতে পিঠে পিঁড়ির ঘা খেয়ে মোমেনা চোখ মুছতে মুছতে যখন মণ্ডলবাড়ির উঠানে ঢুকবে, তখন কেন মালেকের নজর পড়বে তার বুকের ওপর? মোমেনা যখন উপুড় হয়ে আঙিনা ঝাঁট দিতে আরম্ভ করবে, তখন মালেক কেন তার ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে ভারাবনত স্তনজোড়ার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকবে?

সকালে মণ্ডলবাড়ির ছেলেমেয়েরা ইসকুলে চলে যায়, পুরুষেরা নানা কাজেকর্মে বাইরে বেরোয়, আর মহিলারা ঝি-রাঁধুনীদের বান্নাবান্নার কাজ সব বুঝিয়ে দিয়ে নিজ নিজ ঘরে ঢোকে। আঙিনা নির্জন, শুধু মোমেনার ঝাঁট দেওয়ার খসর খসর শব্দ। মালেক চেয়ে চেয়ে মোমেনার স্তন দেখে। মোমেনা ঝাঁটা সঞ্চালন করতে করতে মুখ ঘুরিয়ে উঠানের অন্য দিকে চলে যেতে থাকলে মালেক তার স্তনের বদলে নিতম্ব দেখে। মোমেনা আবার ঘুরে ঝাঁট দিতে দিতে মালেকের দিকে আসতে থাকে। সে কাছে এলে মালেক তাকে বলে, ‘সমচার ভালো, মোমেনা?’
ফোঁস করে ওঠে মোমেনা, ‘মোর সমচার দিয়ে তোর কী কাম রে হাটকুরা?’ কিন্তু মালেক তো আটকুড়া নয়, তার বউ মরেছে সন্তান প্রসবের সময়। এ অঞ্চলে হাটকুরা শব্দটা সব সময় সঠিক অর্থে ব্যবহৃত হয় না। স্রেফ ভর্ৎসনা করে বা গালি দিয়েও লোকে যে কোন পুরুষকে (সে ছলপলের বাপ হলেও) হাটকুরা বলতে পারে। মালেক যদিও জানে যে মোমেনা তার পৌরুষ ধরে টান দেয়নি, স্রেফ ভর্ৎসনা করেছে, তবু সে কণ্ঠে অভিমানের সুর আনার চেষ্টা করতে করতে বলে, ‘তুই মোক্ হাটকুরা কলু?’
‘হয় কছি, তা কী হোছে?’ মোমেনার কণ্ঠে শুধুই ঝাঁজ।
‘দুক্কু পানু।’ মালেক অভিমানে কাতর।
‘দুক্কু পালু ভালো কতা। তা বসে আছো ক্যা? কামণ্ডকাজ নাই?’
‘যাই বাপুরে, যাই। দুনিয়ার মানুষ তোরাই এত কাম কাম করিস কিসক? কী হোবে এত কাম কোরে?’


রাতে মালেকের চোখের পাতা পড়ে না। কিন্তু পেট তো ভরা; সারাদিন ধরে মণ্ডলদের পুকুরের পানা-শ্যাওলা সাফ করার বিনিময়ে পেট ভরে ভাত খেয়েছে তিন বেলা। তার তো এখন ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঘুম আসছে না। মালেক সমস্যাটা ধরতে পারছে না।

কী ব্যাপার? ঘুম আসে ক্যা? মনে মনে বলে সে। আগে তো কখনো এরকম হয়নি! এ রকম ভাবতে ভাবতে সে দেখে মনের মধ্যে ভেসে উঠছে মেয়েমানুষের ছবি। বড় জ্বালাময়।

সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। অন্ধকার গলিতে নামে, তারপর হাঁটতে শুরু করে। আপাতত উদ্দেশ্যহীন। একটা কুকুর তার পিছু নেয়। সেটা একবার আগে যায়, একবার পিছে পড়ে, পায়ে পায়ে বড়ই যন্ত্রণা করতে করতে চলে। মালেক বিরক্ত হয়ে লাথি বসিয়ে দেয় কুকুরটার পাঁজরে। কাঁউ কাঁউ আর্তনাদ করতে করতে কুকুরটা চলে যায়। মালেকের হাঁটার গতি বেড়ে ওঠে, দিকটাও এবার নির্ধারিত হয়ে যায়। সাইদুরের বাড়ির দিকে সে হন হন করে হাঁটতে শুরু করে।

উঠানে প্রাচীর নাই, ভাঙা বাড়ি সাইদুরের। দুইটা মাত্র ঘর, খসে খসে পড়ছে খড়ের চাল। ঘরের পিছনে গাছপালা, ঝোপঝাড়। পাল্লাবিহীন জানালার সামনে মালেক চোরের মতো দাঁড়ায়। অন্ধকারে খক খক শব্দে কেশে ওঠে সাইদুরের বুড়ি মা। কাশি থামলে হাঁপাতে হাঁপতে ডাকে, ‘বউ, ও বউ!’
‘কী হলো? চিগরাচিগরি কিসক্?’ মোমেনার কণ্ঠে অহেতুক ঝাঁজ। মালেক ভাবে, এত রগচটা কেন ছুঁড়িটা?
‘সাইদুর এখনো আসেনি?’ বুড়ি মা হাঁপায় আর ছেলের সন্ধান করে।
‘না।’ মোমেনার জবাব গম্ভীর।

সাইদুর তালে বাড়িত নাই! পুলকিত হয়ে ওঠে মালেক। কিন্তু পরের মুহূর্তেই খোঁচায় নিজেকে :
সাইদুর বাড়িত নাই তে তোর কী হে? তুই কি এই ফাঁকোত মোমেনার ঘরত সাঁন্ধাবার মতলব করিছু?
যদি সাঁন্ধাও?
হুঁশ করিস! মোমেনা আউমাউ কোরে চিগ্রে উঠলে…
তা অবশ্য ঠিক। ভয় খায়া মোমেনা চিগ্রে উঠবারও পারে।

‘সাইদুর কোন্টে গেছে? ও বউ, কোন্টে গেছে সাইদুর?’ বুড়ি মা ঘ্যানর ঘ্যানর করে। কিন্তু মোমেনার কোন সাড়া আর মেলে না। চারদিকে থই থই অন্ধকার। মোমেনার ঘরের ভিতরে অন্ধকার একদম নিরেট। মালেক জানালায় মুখ রেখে চোখ ছোট-বড় করে ঘরের ভিতরে তাকায়, কিন্তু কিচ্ছু দেখতে পায় না। এমন অন্ধকারে চোখ কোন কাজের বস্তু নয়; মালেক কান খাড়া করে। কিন্তু মোমেনার নড়াচড়া বা নিশ্বাসের শব্দও তার কানে পৌঁছে না।

‘দুর্ব-আতে সোয়ামি কোন্টে যায়, কী করে বেড়ায়, তার খবর তুই থুস্ না, ক্যাংকা বউ তুই?’ পাশের ঘরে অন্ধ বুড়ি বকবক করে চলে। কিন্তু এ ঘরে কোন সাড়া জাগে না।
‘হারামজাদাডা বলে তাস খেলে। গোয়াত নাই চাম, ভ্যানগাড়ি ঠেলে দুডা পসা পায়, তাও উড়ায় তাস খেলে। আর মাগি ভালোমানুষ সাজিছে। কেছু কওয়া পারে না’।
হঠাৎ খাঁউ করে ওঠে বেজে মোমেনার কণ্ঠস্বর: ‘বুড়ি তুই চুপ হলু? তোর ব্যাটাক্ কেছু কলে তার পিটনগুলা কি মাটিত পড়ে? ডাকাত জন্ম দিছু তুই, বুড়ি! তোর ব্যাটা এডা দস্যু’।

কিন্তু মালেক ধরতে পারে না, ঘরের ঠিক কোন বিন্দু থেকে মোমেনার কথাগুলো ভেসে আসছে। তার মনে হয় একসঙ্গে ঘরের সবখান থেকেই তার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা কী করে হয়? মালেক এবার বুকে সাহস নিয়ে জানালা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দেয়, যদি চৌকি-টৌকির স্পর্শ পাওয়া যায়। কিন্তু কিছুই ঠেকে না তার হাতে। তখন সে ভাবে, ফিসফিস করে একবার ডেকে উঠবে নাকি মোমেনার নাম ধরে? কিন্তু না, তার সাহসে কুলায় না।


কাক ডাকা ভোরবেলা মণ্ডলবাড়িতে হাজির মালেক। মণ্ডল তাকে দেখে অবাক: ‘কী রে, এত সকালে? কী মতলব তোর?’
মালেক দাঁত বের করে বলে, ‘কামত লাগমু, চাচা’।
‘বাহ্! সুমতি হলো দেখা যায়!’
‘প্যাটের দায়ে বাপু! প্যাট আছে লয়?’
‘তালে দিনচুক্তি ক্যান? বছরচুক্তি লাগ্। কী, লাগবু?’
‘হয়।’

আগে অনেকবার মালেক গৃহস্থদের বাড়িতে সংবৎসরের বাঁধা কিষাণ হিসাবে কাজ যোগ দিয়েছিল, কিন্তু কখনোই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি। মাঝখানে গৃহস্থের হাতে-পায়ে ধরে তাকে বলতে হয়েছে, ‘মাফ করো বাপু, ছাড়ান দ্যাও। বান্দা কাম মুই করা পারমু না। ফাঁপড় লাগে, বেড্ডায় ফাঁপড়!’
এবার সে মণ্ডলের এক কথায় ‘হয়’ বলে রাজি হলো বটে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করল, পারমু ত? আবার মাফ চাওয়া লাগবে না ত?

তার অনেক পরে মোমেনা এসে উঠান ঝাঁট দিতে আরম্ভ করলে মালেক তার নিতম্বের দিকে চেয়ে বিড় বিড় করে বলে, ‘পারমু’।
নির্জন উঠান ঝাঁট দিতে দিতে বারান্দায় বসে থাকা মালেককে দেখে মোমেনা বলে, ‘বছরচুক্তি কামত লাগলু বলে?’
‘হয় হয়, লাগনু। গাওত বাতাস লাগায়া ঘুরে ফিরে বেড়ানু ত মেলাই।’
‘ভালো ভালো! বুদ্দি হোছে তোর।’ বলে মুখ ঘুরিয়ে মালেকের দিকে নিতম্ব বাগিয়ে মোমেনা উঠান ঝাঁট দিতে দিতে চলে যায়।


সাইদুর জুয়া খেলে বড়লোক হওয়ার লোভে নয়, মনের আনন্দে। ‘মোর ত ছলপল নাই, ট্যাকা-পসা দিয়ে মোর কী হোবে?’ তাই জুয়া খেলে সে তার হাড়ভাঙা খাটনির রোজগার উড়িয়ে দেয়।

কিন্তু আজ সন্ধ্যার পর উপজেলা সদরে এক বেড়ার ঘরে ৯৫ টাকা নিয়ে জুয়া খেলতে বসে সে ভাবল অন্য কথা, ট্যাকা দরকার। হাজার পাঁচেক ট্যাকা হলে বউডাক লিয়ে রাজশাহী লিয়ে যাওয়া গেল হিনি।

এটা বোধ হয় শুভচিন্তা। তাই সে জুয়ার আসরে আজ জিততে আরম্ভ করে।

তার হাতে এখন ২০০ টাকা লাভ। কিন্তু খেলে সে বরাবরের মতো আনন্দ পাচ্ছে না, অস্বস্তিকর একটা উত্তেজনা কাজ করছে মনে। এই লাভ কি আরও বাড়বে? নাকি সব হারাবে শেষ পর্যন্ত? এমনকি নিজের পূঁজিটাও? খালি হাতে দুপুর রাতে বাড়ি ফিরে গিয়ে বউকে ঘুম থেকে তুলে পেটাবে?
‘মুই গেনু রে। আজ মোর কাম আছে।’ খেলা থেকে উঠে পড়তে চাইল সাইদুর।
সঙ্গীদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি হেরেছে সে বলে উঠল ‘দেরি আছে! যাবু কোন্টে এত সকালে?’
‘বাড়িত যামু। কাম আছে।’ কেজো ভঙ্গিতে বলল সাইদুর।
‘অত সোজা লয়। দশটা বাজুক।’
‘এখন গেলে কী করবু তুই?’
‘যা দিনি!’
‘গেলে তুই কী করবু?’
‘কনু তো, সাহস থাকলে উঠে দ্যাখ্!’

সাইদুরের সাহস হলো না। কারণ যে ওই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল সে লোকটা সুবিধার নয়। পেশায় চোরাকারবারি, আবার তাড়িটাড়িও খায়, গায়ে-গতরেও দশাসই। তবে সাইদুর তার ভয়েই খেলা ছেড়ে উঠতে পারছে না এটা প্রমাণিত হওয়ার আগেই অন্য জুয়াড়িরা বলল, ‘দশটা বাজুক। নিয়ম ভাঙা ঠিক লয়’।

সাইদুর যেন উদ্ধার পেয়ে গেল। তবে সে নিয়মনিষ্ঠার ভান দেখাতে ছাড়ল না: ‘ঠিক আছে। নিয়ম মুই ভাঙমু না’।

খেলা চলতে থাকল। সাইদুর জিতে চলল। কিন্তু ৩০০ টাকা পর্যন্ত জেতার পর থেকে হঠাৎ করে তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে উল্টা দিকে চলতে আরম্ভ করল। দশটা বাজতে বাজতে সে একদম ফতুর হয়ে গেল। তারপর টাকা ধার করে হারল এবং শেষমেশ শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে ঘুমন্ত বউকে ডেকে তুলে যথারীতি পেটাল।


মালেক বলল, ‘তোর ভাতার তোক্ এত মারে ক্যান, মোমেনা?’
মোমেনা ফোঁস করে উঠল, ‘তাতে তোর কী?’
মালেক দরদমাখা কণ্ঠে বলল, ‘মোর খারাপ লাগে। বিনাদোষে এত মারে ক্যা?’
‘কে কলো তোক্?’ মোমেনার কণ্ঠ এবার শান্ত, স্বাভাবিক।
মালেক রহস্য করে বলল, ‘মুই জাঁনো’।
‘ক্যাংকা করে জানিস?’ মোমেনার কৌতূহল বোধ হলো, কে তার অসুখী দাম্পত্য জীবনের নিন্দা গেয়ে বেড়াচ্ছে। মালেক মোমেনার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে রহস্য আরও ঘন করে তুলতে চাইল। বলল, ‘কাল আত্রে সাইদুর তাড়ি খায় বাড়িত আসছিল, লয়? খামোকাই অত পিটন পিটল ক্যান তোক্?’
‘তোক্ কে কলো সেই কতা ক আগে!’
‘কনু ত। কেউ কয়নি। মুই জাঁনো।’
‘ক্যাংকা কোরে জানিস? তুই দরবেশ হছু?’
‘না, দরবেশ হঁওনি। মুই খালি তুকি দেখবার পাঁও।’
‘ক্যাংকা করে?’
‘স্বপ্নে!’

খিলখিল করে হেসে উঠল মোমেনা। তার হাসির শব্দ মালেকের বুকের ভিতরে এমনভাবে বাজতে লাগল যেন টিনের চালে কেউ বাঁশের কঞ্চি পেটাচ্ছে।


মালেক মণ্ডলদের পুকুর সাফ করছে। দুপুরে মোমেনা গোসল করতে নামল সেই পুকুরে। গোসল করা মানে গোটা দুই ডুব দিয়ে উঠে ঘাড়-কোমর-ঊরু-জংঘা-বগল কচলে-কাচলে আবার দুটো ডুব দিয়ে ভেজা কাপড়ে পুকুর থেকে উঠে চলে যাওয়া।

মালেক পুকুরের অন্য পাশে, মোমেনা ঘাটের কাছে গলা-পানিতে দাঁড়িয়ে ঘাড়-গলা কচলাচ্ছে। ওপার থেকে মালেক বলল, ‘সাঁতার জানিস না?’
‘জানলে কী হোবে?’ কোনাকুনি কথা মোমেনার।
‘কী হোবে আবার? সাঁতরাবু!’
‘লাগবে না হামার সাঁত্রান।’ বলে একটা ডুব মারল মোমেনা। তারপর ভুস করে মাথা তুলে দেখল মালেক নাই। একটু পরেই টের পেল তার একটা ঠ্যাং ধরে কেউ তাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে মাঝপুকুরের দিকে।
‘এই হারামজাদা বজ্জাত! মানষে দেখবে রে হাটকুরা!’ চাপা গলায় বলতে বলতে মোমেনা পানির নিচে খামচে ধরল মালেকের চুলের ঝুঁটি ।


‘শাদি করিস না ক্যান?’ মোমেনা মালেককে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলল, ‘ও, তুই ত আবার সাদু-সন্ন্যাসী। লিত্যি আত্রে তোর বউ তোর কাছে আসে।’ একটু থেমে চোখ পিটপিট করে বলল, ‘নাকি আর আসে না রে?’
‘আর আসে না।’
‘ক্যা? আর আসে না ক্যা?’
‘এইবার মনে হয় সত্যিই ম’ছে।’
‘তালে তুই এবার এডা শাদি করলেই পারিস?’
‘করমু। শাদি করা লাগবে।’

মালেক রাতে শুয়ে শুয়ে বিড়বিড় করে বলল, শাদি এবার করাই লাগে। দেয়ালের টিকটিকি বলে উঠল, টিক টিক টিক!

সাইদুর ত হাটকুরা। মোমেনার ত আর ছলপল হোবে না। মোমেনাক্ যদি শাদির প্রস্তাব দেওয়া হয়? কিন্তুক্ তার আগে ত সাইদুরের কাছ থিনি মোমেনার তালাক হওয়া দরকার। শালা হাটকুরাডা ত মোমেনাক্ তালাক দিবে না। আচ্চা, মোমেনাই যদি কয়, সাইদুরের ভাত মুই আর খামু না? সাইদুর তালে মোমেনাক পিটতে পিটতে খুনই করে ফালাবে। তালে উপায়?

দেয়ালের টিকটিকি বলল, টিক টিক টিক।

মালেক বলল, ‘টিক টিক করিস না, চুদির ভাই! এডা উপায় বাতলে দে’।

কিন্তু টিকটিকি আর সাড়া দিল না। মালেক ঘর ছেড়ে অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল।

অন্ধকার জানালায় মালেক ফিসফিস করে ডেকে উঠল, ‘মোমেনা! ও মোমেনা!’
ঘরের ভিতরে ধড়ফড় করে উঠল মোমেনা, ‘ওরেই মাহ্! কে রে?’
‘শ্ শ্! মুই, মুই, মালেক!’
‘কী খাবা আছু রে গরুডা?’ জানালার কাছে সরে এসে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল মোমেনা। পাশের ঘর থেকে বুড়ি ডেকে উঠল, ‘ও বউ, সাইদুর এখনো আসেনি?’
‘না আম্মা। আসেনি এখনো।’ বুড়িকে শান্ত রাখার জন্য মোমেনা গলার স্বরে দরদ মাখাল। তারপর জানালায় মালেকের জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকাল। ভয় দেখানোর সুরে বলল, ‘ভয়-ডর নাই তোর? কী জন্যে আছু দুর্ব আত্রে?’
‘মোর নিন্ আসে না, মোমেনা!’
‘শাদি কর, নিন্ আসপে। যা যা! সাইদুর আসপে এখন। জানা পালে তোর হারহাডি পাউডার করবে দেখিস!’
কিন্তু মালেকের নড়া-চড়া নাই। সে জানালার কাঠের শিক ধরে মোমেনার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে চেয়ে রইল।
‘কী? লড়িস না ক্যা? গরুপিটন খাওয়ার সখ জাগিছে তোর? যা বাপু, বাড়িত যা। সাইদুর জানা পালে তোক্ ত ধোলাই দিবে দিবে, মোরও পিটের চামড়া থুবে না।’
‘ও বউ, একলা-একলি ফুসুরফাসুর করিস কিসক্? ভূতে ধরল নাকি তোক্? না পাগলি হলু? হারামজাদা হাটকুরাডা এত আত্রে কী করে বেড়ায়, আল্লা! জুয়া খেলার ট্যাকা এত কে জোগায় তাক্? ও বউ, নিন্দ আসে না তোর? আহারে কপাল মোর! আহারে জিন্দেগি…।’ পাশের ঘরে বুড়ি মায়ের প্যাঁচাল আর থামে না। কখনো সে ছেলেকে উদ্দেশ করে গালাগাল করে, কখনো মোমেনার জন্যে দুয়েকটা সান্ত্বনার কথা বলে, কখনো নিজের কপালে গোষ্ঠী উদ্ধার করে।

মোমেনা নানা রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে মালেককে তাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু মালেক আরও শক্ত করে জানালার শিক ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। এইভাবে চলল, যতক্ষণ পর্যন্ত না সাইদুর জুয়ার আসরে সব টাকা খুইয়ে ঘরে ফিরে এসে মোমেনাকে পেটাতে শুরু করল। মোমেনা মার খেতে আরম্ভ করলে মালেক জানালা থেকে একটু সরে গিয়ে ঝোপের আড়ালে দাঁড়াল। মারপিট চলল কুপির আলোয়। সাইদুরের দস্যুপনা দেখতে দেখতে মালেক বোঝার চেষ্টা করল লোকটা কী অপরাধে তার বউকে ওভাবে পেটায়। সে বুঝতে পারল না।

১০
‘মোমেনা, তুই মণ্ডলের কাছে নালিশ দে।’ সকালে মণ্ডলবাড়ির বারান্দায় বসে পান্তা খেতে খেতে মালেক মোমেনাকে বলল।
‘কিসের নালিশ?’ মোমেনা মালেকের কথা ধরতে পারল না।
‘কিসের আবার? লিত্যি আত্রে সাইদুর তোক্ গরুর মতন পিটাবে, আর তুই মুখ বুঞ্জে সহ্য করে যাবু দিনের পর দিন? এডা কি হয়? তুই কি মানুষ লোস?’
‘তালে কী করমু?’
‘বিচার চা। নালিশ দে।’
‘তার পরের পিটনডা তুই লিজে পিঠ পাতে লিবু?’
‘তালে কি সাইদুরের হাতত থে তোর নিস্তার নাই?’
‘নিস্তার নাই। আল্লা লিজ হাতে এই কপালত লেখে দিছে ভাতারের পিটন।’
‘কোনদিন তুই মরে যাবু মোমেনা!’
‘তোর এত দরদ কিসক্ রে? মোর ভাতার মোক্ ম্যারে-ক্যাটে খারিত ফ্যালে দিয়ে আসলে তোর কী? তুই এত ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করিস কিসক?’
খাওয়া থামিয়ে মালেক ফ্যালফ্যাল করে মোমেনার মুখের দিকে চেয়ে রইল। মোমেনা ফোঁত ফোঁত করতে করতে কাঁদতে কাঁদতে বারান্দা থেকে নেমে গোয়ালের দিকে চলে গেল।

নির্জন দুপুরে মণ্ডলদের বারবাড়ির খড়ের পালার আড়ালে মালেক মোমেনার হাত চেপে ধরল।
‘তোর জন্যে মোর বুক ফ্যাটে যায়, মোমেনা!’
‘হাত ছাড়্! মানষে দেখপে!’
মালেক মোমেনার হাত ছাড়ল না, বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
‘তুই তালাক লে মোমেনা। মুই তোক্ শাদি করমু। তোর কোল জুড়ে ব্যাটা আসপে।’
‘হাত ছাড়েক, মালেক! দেখলো মানষে।’
‘দেখুক! তুই কেছু এডা ক!’
‘আজ সন্দ্যার পর আসিস!’
মালেকের মুঠি থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে মোমেনা দৌড়ে পালাল।

সন্ধ্যার পর মোমেনার অন্ধ শ্বাশুড়ি যখন ভাত খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল, আর বরাবরের মতো সাইদুর বাড়িতে নাই, তখন ঝোপের আড়াল থেকে মালেক বেরিয়ে এসে সুরুত করে ঢুকে পড়ল মোমেনার ঘরে। সঙ্গে সঙ্গে মোমেনা শক্ত করে দরজার খিল এঁটে দিল। তারপর কুপিয়ে নিভিয়ে দিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে ঘাপটি মেরে রইল। মালেক অন্ধকারে ফিসফিস করে ‘ও মোমেনা’ ‘ও মোমেনা’ বলে সারা ঘর হাতড়ে বেড়াতে লাগল। মোমেনা ঠোঁট চেপে নিঃশব্দে হাসতে থাকল।

১১
তারপর থেকে মালেক যখনই সুযোগ পায় সুরুত করে ঢুকে পড়ে মোমেনার ঘরে। থাকে অনেকক্ষণ। জুয়ার আসর থেকে সাইদুরের ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে এলে মোমেনা মালেককে বিদায় করে দেয়। মালেক ধূর্ত বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে বেরিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে যায়। নাক ডাকিয়ে ঘুমায় সারারাত।

তারপর একদিন মোমেনা পেটের ভিতরে অন্য রকম এক স্পন্দন টের পায়। সকালে বিকালে বমি করে গলা ছেড়ে, প্রাণ খুলে। সাইদুর জিজ্ঞাসা করে, ‘কী হোছে তোর? কী ব্যারাম ধরালু?’

মোমেনা কিছু বলে না, শধু হাসে। সাইদুর শুকরিয়া আদায় করতে ছুটে যায় জুম্মাঘরে। পরের শুক্রবারে শিন্নির ঘোষণা দিয়ে আসে। জুয়া খেলা ছেড়ে দিয়ে সে ভালোমানুষ হয়ে যায়। দিনের কাজ সেরে সন্ধ্যা হতেই ঘরে ফিরে আসে। মোমেনার গায়ে আর ভুলেও হাত তোলে না। বরং আহ্লাদ করে বলে যে মোমেনাকে সে আর মণ্ডলবাড়িতে ঝিগিরি করতে যেতে দেবে না।

সব দেখেশুনে মোমেনা শুধু হাসে।

মালেকের সঙ্গে মোমেনা আর বিনা দরকারে পারতপক্ষে কথা বলে না। মালেক মোমেনার চোখেমুখে এক রহস্যময় গাম্ভীর্য দেখতে পায়। একদিন দুপুরে মণ্ডলদের গোয়ালের মধ্যে সে মোমেনার হাত চেপে ধরে: ‘কী হোছে তোর ক দিনি? তফাৎ তফাৎ থাকা শুরু করলু ক্যান? আর সাইদুর ক্যান সন্দ্যা লাগতেই বাড়িত চলে আসে?’

মোমেনা কিছু না বলে ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গোয়াল থেকে বেরিয়ে আসে। মালেকও তার পিছু পিছু বেরিয়ে এলে দুজনকে একসঙ্গে দেখতে পেয়ে পোড়ার মায়ের ১২ বছর বয়সী ব্যাটা পোড়া বলে ওঠে, ‘ওস্, কয়া দিমু!’

সন্ধ্যায় সালিশ বসে মণ্ডলদের খলায়। মণ্ডল পোড়াকে বলে, ‘সত্যি করে কবু, তুই কী দেখিছু?’
পোড়া নির্ভয়ে গড়গড় করে বলে, ‘তোমাগেরে গোয়ালের মদ্যে মালেক মোমেনার সাথে খারাপ কাম করিছে।’
ভিড়ের মধ্যে থেকে সাইদুর লাফিয়ে ওঠে, ‘তুই দেখিছু?’
‘হয়।’
‘ক্যাংকা করে? তুই কি গোয়ালের মদ্যে সান্দাছিলু?’
‘না। ভুল্কি দিয়ে দেখিছুঁ।’
‘ক্যা? গোয়ালের মদ্যে তুই ভুলকি দিবা গেলু কী জন্যে?’
‘ফুসুরফাসুর শব্দ শুনে। গোয়ালের আগ দিয়ে যাবা লাগিছুঁ, হটাৎ শুনবা পানু গোয়ালের মদ্যে ফিসফাস। মনে মনে কনু, কী ব্যাপার? চোরেরা গরু চুরি করবা অ্যাছে নাকি? তাই ভুল্কি দিনু। ভুল্কি দিয়ে দেখনু..।’
‘কী দেখলু?’
‘কওয়া যাবে না। শরমের কতা।’
‘তোর আবার কিসের শরম রে? দুই দিনের চ্যাংরা, শরমের কী বুঝিস তুই? ক, কী দেখলু?’
‘দেখনু মালেক আর মোমেনা জাপটা-জাপটি করোছে। মালেকের গোয়াত তবন নাই।’
‘আর মোমেনার?’
‘কাপড় তোলা। চরপটা উন্দা।’

এতক্ষণ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল মালেক। এবার সে চিৎকার করে উঠল, ‘আল্লার গজব পড়বে তোর উপর। মুখত অক্ত উঠে মরবু রে তুই। এত্তিকোনা চ্যাংরা তুই ইংকা জাজ্যিল্লিমান মিছাকতা কওয়া শিখলু কোন্টে?’
‘মালেক, তুই থাম।’ মণ্ডলের গম্ভীর ধমক। তারপর সে উপস্থিত লোকজনকে বলে, ‘আর কেউ কেছু দেখিছিন? মোমেনার স্বভাব-চরিত্র লিয়ে কারও কেছু কওয়ার আছে?’
সাইদুর চিৎকার করে বলল, ‘হামার বউ, হামি জানি। মোমেনার মতন চরিত্র কম মেয়ামানুষেরই আছে।’
‘বলদ কাঁহেকা!’ মণ্ডল সাইদুরকে ভর্ৎসনা করতে লাগল, ‘তোর বউ কি তোক্ কয়া বলে ছিনালি করে বেড়াবে রে আহাম্মক?’
ভিড়ের একজন বলল, ‘পোড়া চ্যাংরা মানুষ। যা দেখিছে তা-ই কছে। মিছা কথা কোবে ক্যান?’
আরেক জন বলল, ‘চ্যাংরা মানুষ মিছাকতা কোবে কী দরকারে? মোমেনার সাথে পোড়ার কী শত্রুতা?’
মণ্ডল মোমেনাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘ক মাগি, মালেকের সাথে তোর কী আছে?’
মোমেনা ঠোঁট শক্ত করে বলল, ‘কেছু নাই।’
‘তালে পোড়ার মায়ের ব্যাটা এগলান্ কী কয়?’
‘ব্যাবাক মিছা কতা।’
‘মাসুম বাচ্চা, অর মিছা কতা কওয়ার কী দরকার পরিছে?’
‘সেডা পোড়ার মায়ের ব্যাটাই জানে।’
‘আচ্ছা, তালে তুই ঝাড়া অস্বীকার?’
‘কেছু থাকলে ত স্বীকার যামু।’

এই বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে নিদারুণ অসন্তোষ প্রকাশ করে ভিড়ের একজন বলল, ‘পাপী কি লিজের পাপ নিজে স্বীকার করে মণ্ডল সায়েব? তাক্ এত জিজ্ঞাসাবাদের দরকারডা কী? সোজা দোর্রা মারা আরম্ভ করেন’।
মণ্ডল বক্তৃতা শুরু করে দিল: ‘অন্ধ হাকিমের মতন বিচার লয় হামার। মোমেনার সত্যিই কোন দোষ আছে কি না সেডা আগে জানা দরকার। তা না হলে তোমরাই পরে কবিন ভুল বিচার করিছি হামি। মালেক, তুইও লিচ্চই অস্বীকার যাবু? ঠিক আছে। সাক্ষী-সাবুদ যখন আর নাই, তখন আর কী করা যাবে। কিন্তু কান খুলে শুনে লে তোরা দুইজনে। সত্যি সত্যি তোরগে দুইজানার মদ্যে যদি কেছু থাকেই, গাঁয়ের মানষের চোখোত ধুলা দেওয়া তোরা পারবু না। গাঁয়ের ব্যাবাক মানুষ কানা লয়, ব্যাবাকের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই পাপকর্ম তোরা কদ্দিন চালাবু? ধরা একদিন পড়াই লাগবে। আজ পোড়ার মায়ের ব্যাটা দেখিছে, কাল আরেকজন দেখপে, পরশু দেখপে আরেকজন কেউ। হাতেনাতেও ধরা পড়ে যাবার পারিস। তাই দুইজনার ভালোর জন্যে কই, সমাজের ভালোর জন্যেও কই, হুঁশিয়ার হয়া যা মোমেনা, হুঁশিয়ার হয়া যা মালেক! পাপের রাস্তা ছাড়েক্। এর পরে যদি আর কেছু হামার কানত আসে, তখন আর সাক্ষী-সাবুদের দরকার হোবে না। শরিয়তের বিচার কী জিনিশ তখন তোরাই ট্যার পাবু’।

১২
মণ্ডলবাড়িতে মোমেনার কাজে যাওয়া বন্ধ করে দিল সাইদুর। প্রথমত বউয়ের প্রতি নবজাগ্রত সোহাগবশত, দ্বিতীয়ত লোকজনের ফুসুরফাসুর-গুজুরগাজুর বন্ধ করার জন্য। না, মোমেনার প্রতি সাইদুরের কোন সন্দেহ জাগেনি। সে মনে করে মোমেনার চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন তোলাটাই অন্যায় হয়েছে। বিয়ের পর পাঁচ বছর ধরে বাচ্চা হওয়ার কোন লক্ষণ ছিল না মোমেনার, কিন্তু জন্য সে একটা দিনও সাইদুরকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেনি। সাইদুর যে প্রায় নিয়মিতভাবে তাকে অকারণে নির্দয়ভাবে পেটায়, তার প্রতিবাদে কোনদিন দিন সে মুখ তুলে টুঁ শব্দটি করেনি। সে সব সময় মনে মনে ভেবে এসেছে, বাচ্চা না হওয়ার জন্য সে নিজেই দায়ী। সে জন্য সাইদুর তাকে তাড়িয়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করলেও তার কোন অপরাধ হতো বলে মনে হয়নি মোমেনার।

মোমেনা এখন সারাদিন ঘরেই বসে থাকে। ভাঙা বাড়ির বেআব্রু উঠানের আগাছা সাফ করে ডাঁটা শাকের বীজ বুনে বারান্দায় বসে বসে কাঁথা সেলাই করে। তাকে এখন কম কথা বলতে শোনা যায়, বেশ গম্ভীর হয়ে গেছে সে। সারাক্ষণ কথা বলে শুধু তার শ্বাশুড়ি। কপালের প্রতি তার আক্ষেপ দূর হয়ে গেছে। তার আর সাইদুরকে বকাঝকা করারও দরকার পড়ে না; কারণ সে এখন প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই ঘরে ফিরে আসে; জুয়া খেলতে উপজেলা সদরে যায় না।

মণ্ডলবাড়ির কাজকর্মে আর মন নাই মালেকের। মোমেনার সঙ্গে সে আর কোনভাবেই যোগাযোগ করতে পারে না। মোমেনার দিক থেকেও তেমন কোন চেষ্টা নাই। মালেকের পক্ষে দিনের বেলা তো সাইদুরের বাড়ি গিয়ে মোমেনার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়। মণ্ডলের দোর্রার ভয় আছে, গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়ার ভয় আছে। সাইদুর সন্ধ্যা না নামতেই বাড়ি ফিরে বউয়ের কোলের মধ্যে সান্ধায়, এটা মালেকের জন্য সবচেয়ে অসহ্য ব্যাপার। একদিন সে গলিতে পোড়ার মায়ের ব্যাটাকে পেয়ে চড়াও হয় তার উপর, ওই ছেলেটাই তো সব নষ্টের কারণ। পোড়াকে দুই হাতে পাকড়ে ধরে শূন্যে তুলে আছাড় মেরে মাটিতে ফেলে তার পেটের উপর পা তুলে দিয়ে কাদাখোঁচা আরম্ভ করে মালেক। ছেলেটার মরণ-চিৎকার শুনে দু-চারজন মেয়ে-পুরুষ বেরিয়ে না এলে ওকে এ যাত্রা অক্কাই পেতে হতো।

কিন্তু পোড়ার মায়ের ব্যাটাকে আধমরা করেও মালেকের গায়ের জ্বালা কমল না। এক দুপুরে ‘যা হয় হোক’ বলে সে গিয়ে দাঁড়াল মোমেনার উঠানে। তাকে দেখে আঁতকে উঠল বারান্দায় বসে কাঁথা সেলাইরত মোমেনা। তার আঙুলে সুঁই ফুটে রক্ত বেরিয়ে গেল। সে সভয়ে ডানে-বায়ে তাকিয়ে দেখল কেউ দেখছে কি না। তারপর প্রায় ধমক দিয়ে বলে উঠল, ‘খুব সাহস বাড়িছে তোর?’

মালেক পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল মোমেনার দিকে।
‘থামেক্। ফিরে যা, ফিরে যা, মালেক! জীবনের মায়া করিস্!’
হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মালেক। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল সে; মোমেনাকে সে আর যেন চিনতে পারছে না।
‘কী হলো? কথা কানত যায় না?’ মোমেনা ধমকাতেই থাকল, ‘ওস্, এইবার নালিশ দিমু মুই লিজে। গলা পর্যন্ত পুঁতে ইটা ম্যারে তোক শ্যাষ করবে গাঁয়ের মানুষ।’
‘ক্যা? তুই নালিশ দিবু ক্যা?’
‘দিমু! এইবার চিগরাচিগরি করে মানুষ ডাকমু।’
‘থাম্ থাম্! কী হোছে তোর, মোমেনা?’
‘বাঁচার ইচ্ছা থাকলে চলে যা তাড়াতাড়ি।’
‘ইংকা নিমকহারাম মাগি তুই?’
‘কথা কস না। দূর হয়া যা!’

বিস্ময়ে, ক্রোধে, প্রতারিতের জিঘাংসায় মালেকের মাথার চাঁদি দপদপ করে জ্বলতে শুরু করে। মোমেনা সুঁই-সুতা আর কাঁথার কাপড় নিয়ে বারান্দা থেকে উঠে ঘরে ঢুকে দরজায় খিল এঁটে দেয়।

১৩.
মালেকের চোয়ালের হাড্ডি ঠেলে উঁচু হয়ে উঠল। দৃঢ়বদ্ধ দুই পাটি দাঁত আর শিথিল হলো না। উঠান থেকে বালুমেশানো মাটি তুলে এনে ঘরের চৌকাঠে দা ধার দিল সারা সন্ধ্যা ধরে। তারপর আঁধার নেমে এলে কোমরে শক্ত করে গামছা বেঁধে ডান হাতে ধারালো দা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

মালেক সাইদুরের উঠানে দাঁড়িয়ে ঘরের খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেল কেরোসিনের কুপির আলোয় সাইদুর মেঝেতে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে, তার মাথার কাছে বসে আছে মোমেনা। সাইদুরের মাথাটা মোমেনার কোলের উপর, এবং সে সাইদুরের মুখের ওপর ঝুঁকে প্রবলবেগে ঠোঁট নেড়ে কথা বলছে আর হাসছে।

মালেকের চাঁদি ধাঁ করে জ্বলে উঠল। আরও গভীর রাতের জন্য, আরও নিস্তব্ধতার জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্য রইল না। ডান হাতে দা’টা শক্ত করে চেপে ধরে ছুটে গেল দরজার দিকে। উন্মত্তের মতো প্রবলবেগে ঘরে ঢোকার মুখে দরজার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে দড়াম শব্দে পড়ে গেল ঘরের মেঝেতে। তার হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল দা। মোমেনার মুখ থেকে এমন একটা ধ্বনি বেরিয়ে এল যেন তার প্রাণটাই উড়ে গেল। তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠল সাইদুর। মালেকও ফুঁসে উঠল, একটা লাফ মেরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সাইদুরের বুকের উপর। সাইদুরের কোমরে মচাত্ শব্দ উঠল, এক পা হড়কে সে পড়ে গেল মেঝেতে, মালেক তার বুকের ওপর উঠে দুহাতে চেপে ধরল টুঁটি। সাইদুরের গলা থেকে গোঁ গোঁ আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে লাগল, সে দুই হাতের দশটা আঙুলে সে প্রবলভাবে খামচে ধরল মালেকের চোখমুখ। মোমেনা হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, তারপর এক নিমিষে মেঝেতে পড়ে থাকা দা তুলে নিয়ে প্রচণ্ড একটা কোপ বসিয়ে দিল মালেকের মাথার ঠিক মাঝখানে। মালেকের মুখ থেকে একটা অদ্ভুত ধ্বনি বেরিয়ে এল, সাইদুরের টুঁটি চেপে-ধরা তার দুই হাত মুহূর্তেই শিথিল হয়ে খসে পড়ল।

সাইদুর ধড়মড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মোমেনার হাত থেকে দা কেড়ে নিয়ে সভয়ে বলে উঠল, ‘এডা তুই কী করলু, আঁ? ছল প্যাটত লিয়ে এখন জেল খাটবু ক্যাংকা কোরে?’

মোমেনা কথা বলল না। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল মেঝেতে রক্তের মধ্যে লুটানো নিঃসাড় মালেকের দিকে।


লেখক

মশিউল আলম


error: Content is protected !!